
মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর।
দেবেন্দ্রনাথ ও সারদাসুন্দরীর ছিল ভরা সংসার। পুত্র-কন্যা মিলিয়ে পনেরোটি সন্তান-সন্ততি। সারদাসুন্দরী অবশ্য দীর্ঘজীবী হননি। অর্ধশতকও তাঁর আয়ুষ্কাল নয়। মৃত্যু হয়েছিল ঊনপঞ্চাশে। রবীন্দ্রনাথ তখন কৈশোরে পা রেখেছেন। তেরো বছর দশ মাস বয়স।
সারদাসুন্দরী জোড়াসাঁকো-ঠাকুরবাড়িতে বধূ হয়ে এসেছিলেন ছ’বছর বয়সে। কেউ কেউ বলেন, ‘ছয়’ নয়, তাঁর বয়স ছিল আট। ছয় বা আট যাই হোক না কেন, এটা নিশ্চয়ই বিয়ের বয়স নয়। সেকালে এমন তো আকছার ঘটত। বিবাহকালে দেবেন্দ্রনাথের বয়স ছিল আঠেরো।
জীবনের অনেকখানি যে সারদাসুন্দরীর আঁতুড়ঘরে কেটেছে, তা বলাই বাহুল্য। সারদাসুন্দরী ছিলেন সৌভাগ্যবতী, প্রিন্স দ্বারকানাথের তেমনই মনে হয়েছিল। দ্বারকানাথ ছিলেন সফল ব্যবসায়ী। গৃহে নতুন বধূর আগমনের পর আরও সাফল্য আসে, সে কারণেই এমন মনে হয়েছিল শ্বশুরমশায়ের। অত্যন্ত উৎফুল্ল হয়ে তিনি বালিকাবধূকে এক লক্ষ টাকার হিরে ও মুক্ত বসানো খেলনা কিনে দিয়েছিলেন।
সারদাসুন্দরী জোড়াসাঁকো-ঠাকুরবাড়িতে বধূ হয়ে এসেছিলেন ছ’বছর বয়সে। কেউ কেউ বলেন, ‘ছয়’ নয়, তাঁর বয়স ছিল আট। ছয় বা আট যাই হোক না কেন, এটা নিশ্চয়ই বিয়ের বয়স নয়। সেকালে এমন তো আকছার ঘটত। বিবাহকালে দেবেন্দ্রনাথের বয়স ছিল আঠেরো।
জীবনের অনেকখানি যে সারদাসুন্দরীর আঁতুড়ঘরে কেটেছে, তা বলাই বাহুল্য। সারদাসুন্দরী ছিলেন সৌভাগ্যবতী, প্রিন্স দ্বারকানাথের তেমনই মনে হয়েছিল। দ্বারকানাথ ছিলেন সফল ব্যবসায়ী। গৃহে নতুন বধূর আগমনের পর আরও সাফল্য আসে, সে কারণেই এমন মনে হয়েছিল শ্বশুরমশায়ের। অত্যন্ত উৎফুল্ল হয়ে তিনি বালিকাবধূকে এক লক্ষ টাকার হিরে ও মুক্ত বসানো খেলনা কিনে দিয়েছিলেন।
সারদাসুন্দরীর শেষ সন্তান বুধেন্দ্রনাথ। রবীন্দ্রনাথের জন্মের প্রায় দু-বছর পর, ১৮৬৩তে তাঁর জন্ম হয়েছিল। পরের বছরই মারা যান। রবীন্দ্রনাথের আগের জন সোমেন্দ্রনাথ। তাঁর জন্ম রবীন্দ্রনাথের জন্মের বছর দুয়েক আগে, ১৮৫৯তে। রবীন্দ্রনাথের অগ্রজ বীরেন্দ্রনাথের মানসিক ভারসাম্যের অভাব দেখা গিয়েছিল। অবস্থা এমন গুরুতর হয়ে ওঠে যে, তাঁকে অ্যাসাইলামেও রাখতে হয়েছিল দীর্ঘকাল। তাঁর মানসিকপীড়া কতখানি ভয়াবহ আকার নিয়েছিল, তা পত্নী প্রফুল্লময়ী দেবীর লেখায় আছে। বীরেন্দ্রনাথের পুত্র অকালপ্রয়াত বলেন্দ্রনাথ ছিলেন রবীন্দ্রনাথের অত্যন্ত স্নেহভাজন।
আরও পড়ুন:

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১২২: মহর্ষির নির্দেশে ঘণ্টা বাজত জোড়াসাঁকোয়

মুভি রিভিউ: সত্যিই তো, সবার নিজের নিজের মতো করে সবটাই নর্মাল

রহস্য রোমাঞ্চের আলাস্কা, পর্ব-৬১: রাস্তায় গাড়ির তেল শেষ হয়ে গেলে দুর্গতির কোনও সীমা থাকবে না
সোমেন্দ্রনাথের মধ্যেও মস্তিষ্কবিকৃতির লক্ষণ দেখা গিয়েছিল। অবশ্য কখনোই তা বীরেন্দ্রনাথের মতো ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠেনি। রবীন্দ্রনাথের থেকে প্রায় দু’ বছরের বড় হলেও তিনি ছিলেন কবির সহপাঠী, একইসঙ্গে বড়ো হয়েছেন তাঁরা। একইসঙ্গে খেলতেন, গান গাইতেন, বেহালা বাজাতেন। একইরকম পোশাক পরতেন। একই সঙ্গে তাঁদের উপনয়নও হয়েছিল। পড়াশোনা করেছেন একই স্কুলে। পড়াশোনা করতেন ক্যালকাটা ট্রেনিং একাডেমিতে। ভাগ্নে সত্যপ্রসাদও তাঁদের সঙ্গে ওই স্কুলে পড়তেন। রবীন্দ্রনাথ ভৃত্যদের দ্বারা প্রতিপালিত। যে ভৃত্যটি তাঁকে দেখাশোনা করত, সেই ভৃত্যের ওপরই সোমেন্দ্রনাথকে দেখাশোনার ভার ছিল।

সারদাসুন্দরী দেবী।
কৈশোরকাল থেকে সোমেন্দ্রনাথের সংগীতে আগ্রহ, সাহিত্যে আকর্ষণ। রবীন্দ্রনাথের প্রতি তাঁর যথেষ্ট ভালোবাসা ছিল। সেই ভালোবাসা কখনও কখনও ‘পক্ষপাত’ বলে মনে হত। ছোটভাইয়ের প্রতি সোমেন্দ্রনাথের এই ভালোবাসা কতখানি সুতীব্র, তা ‘জীবনস্মৃতি’তে উল্লিখিত একাধিক ঘটনায় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। রবীন্দ্রনাথের কবিতা জনে জনে শুনুক, চেয়েছিলেন সোমেন্দ্রনাথ। কাছারিতে ভাইকে সঙ্গে করে প্রায়ই নিয়ে যেতেন। কাছারির আমলাদের গর্বিত অগ্রজ শোনাতেন অনুজের কবিতা।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১০৬: বাজ

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১২১: খেলা শুরুর প্রস্তুতি
এইরকমই একদিন ভাইয়ের কবিতা শুনিয়ে সোমেন্দ্রনাথ কাছারি থেকে বাড়ি ফিরেছেন, সঙ্গে যথারীতি রবীন্দ্রনাথও ছিলেন, হঠাৎই ‘ন্যাশনাল’ পত্রিকার সম্পাদক নবগোপাল মিত্রের সঙ্গে দেখা। তারপরে কী ঘটেছিল, ‘জীবনস্মৃতি’থেকে তুলে দেওয়া যেতে পারে। ’তৎক্ষণাৎ দাদা তাঁহাকে গ্রেফতার করিয়া কহিলেন, ‘নবগোপালবাবু, রবি একটা কবিতা লিখিয়াছে, শুনুন-না।’ শুনাইতে বিলম্ব হইল না। কাব্য-গ্রন্থাবলির বোঝা তখন ভারী হয় নাই। কবিকীর্তি কবির জামার পকেটে-পকেটেই তখন অনায়াসে ফেরে। ‘নিজেই তখন লেখক, মুদ্রাকর, প্রকাশক, এই তিনে-এক একে-তিন হইয়া ছিলাম, কেবল বিজ্ঞাপন দিবার কাজে আমার দাদা আমার সহযোগী ছিলেন।’

সুধীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
পদ্মফুল নিয়ে কিশোর রবীন্দ্রনাথ একটি কবিতা লিখেছিলেন। সেই কবিতাটি দেউড়ির সামনে দাঁড়িয়ে উচ্চকণ্ঠে নবগোপালবাবুকে শুনিয়েছিলেন। তিনি একটু হেসে জানতে চেয়েছিলেন, কবিতার একটি শব্দের অর্থ। শব্দটি ‘দ্বিরেফ।’ ‘দ্বিরেফ’ ব্যবহার না করে রবীন্দ্রনাথ ‘ভ্রমর’ লিখতে পারতেন। ভ্রমর লিখলেও ছন্দের কোনও সমস্যা হত না। শব্দটার উপরই কিশোর রবীন্দ্রনাথের ‘আশাভরসা সবচেয়ে বেশি ছিল।’
সচেতনভাবেই ব্যবহার করেছিলেন। শব্দের এই ব্যবহার নিয়ে নবগোপাল মিত্রের মধ্যে কোনও তাপউত্তাপ লক্ষ করেননি রবীন্দ্রনাথ। তাঁর নিরুত্তাপ আচরণ এতই কষ্ট দিয়েছিল যে, তিনি আর কখনো নবগোপালবাবুকে কবিতা শোনাননি। ঘটনাটি শুধু রবীন্দ্রনাথের নয়, পাশে দাঁড়ানো সোমেন্দ্রনাথেরও নিশ্চিত খারাপ লেগেছিল। এরপরই লক্ষ্য করা যায় কবি-অনুজকে আরও বেশি করে পাঠকের কাছে, মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে সোমেন্দ্রনাথের সক্রিয়তা। পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব স্বেচ্ছায় তিনি নিয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘কবিকাহিনী’ প্রকাশের ব্যাপারে সোমেন্দ্রনাথের সক্রিয় ভূমিকা ছিল। দ্বিতীয় গ্রন্থ ‘বনফুল’ প্রকাশেও তাঁর তৎপরতার কোনো তুলনা হয় না। ‘বনফুল’ প্রকাশিত হয়েছিল ১৮৮০-তে। ঠিক তার আগের বছর সোমেন্দ্রনাথের মস্তিষ্কবিকৃতি ধরা পড়েছিল। চিকিৎসায় সে রোগ খানিক স্তিমিত হয়েছিল। বীরেন্দ্রনাথের মতো তাঁর মস্তিষ্কবিকৃতি কখনোই বাড়াবাড়ির পর্যায়ে পৌঁছয়নি।
সচেতনভাবেই ব্যবহার করেছিলেন। শব্দের এই ব্যবহার নিয়ে নবগোপাল মিত্রের মধ্যে কোনও তাপউত্তাপ লক্ষ করেননি রবীন্দ্রনাথ। তাঁর নিরুত্তাপ আচরণ এতই কষ্ট দিয়েছিল যে, তিনি আর কখনো নবগোপালবাবুকে কবিতা শোনাননি। ঘটনাটি শুধু রবীন্দ্রনাথের নয়, পাশে দাঁড়ানো সোমেন্দ্রনাথেরও নিশ্চিত খারাপ লেগেছিল। এরপরই লক্ষ্য করা যায় কবি-অনুজকে আরও বেশি করে পাঠকের কাছে, মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে সোমেন্দ্রনাথের সক্রিয়তা। পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব স্বেচ্ছায় তিনি নিয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘কবিকাহিনী’ প্রকাশের ব্যাপারে সোমেন্দ্রনাথের সক্রিয় ভূমিকা ছিল। দ্বিতীয় গ্রন্থ ‘বনফুল’ প্রকাশেও তাঁর তৎপরতার কোনো তুলনা হয় না। ‘বনফুল’ প্রকাশিত হয়েছিল ১৮৮০-তে। ঠিক তার আগের বছর সোমেন্দ্রনাথের মস্তিষ্কবিকৃতি ধরা পড়েছিল। চিকিৎসায় সে রোগ খানিক স্তিমিত হয়েছিল। বীরেন্দ্রনাথের মতো তাঁর মস্তিষ্কবিকৃতি কখনোই বাড়াবাড়ির পর্যায়ে পৌঁছয়নি।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১২০: সত্য ও ন্যায় পরস্পরের সম্পূর্ণ বিরোধী নয়, তবে? ঔজ্জ্বল্য বেশি কার?

পর্দার আড়ালে, সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-৫: সমাপ্তি: শেষ হয়ে হইল না শেষ
সোমেন্দ্রনাথের পাগলামিতে কেউ অন্যরকম ব্যঞ্জনা খুঁজতে চাইলে, তাও হয়তো পাবেন। নির্বিচারে চেনা-জানা সবাইকেই তিনি আলিঙ্গন করতেন, করমর্দন করতেন। কুকুরকে কোলে তুলে নিয়ে চুম্বন করা বা মেথরকে ঘরে এনে বিছানায় বসানো আর যাই হোক, ভীতিজনক নয়। এসব করতেও সোমেন্দ্রনাথ অভ্যস্ত ছিলেন।
‘তত্ত্ববোধিনী’ পত্রিকায় সুধীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁকে নিয়ে একটি স্মৃতিকথা লিখেছিলেন। সুধীন্দ্রনাথ ছিলেন দ্বিজেন্দ্রনাথের পুত্র। ‘সোমকাকা’র দৈনন্দিন কর্মকাণ্ডের ভিন্নতর ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন তিনি, তাঁর ব্যাখ্যা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। যুক্তি রয়েছে যথেষ্ট। সুধীন্দ্রনাথ লিখেছেন, ‘সাংসারিক লোকের চক্ষে ইহা উন্মাদের পূর্ণলক্ষণ বলিয়া মনে হইতে পারে, কিন্তু যিনি মানবপ্রাণের মানবচরিত্রের ভিতরকার কথা, নিগূঢ় রহস্যতত্ত্বের সমাচার রাখেন, তিনিই জানেন, ইহা কি মহৎপ্রাণের সমবেদনার ব্যাকুল অভিব্যক্তি। সোমকাকা বাস্তবিকই বিশ্বপ্রেমিক ছিলেন; … তাঁহাকে ভালো করিয়া চিনিবার জানিবার আমার যেমন সুযোগ ঘটিয়াছে এমন আর কাহারও ঘটে নাই। এই সুদীর্ঘকাল ধরিয়া প্রতিদিন আমি দেখিতাম প্রাতরাশের সময় কাকামহাশয় তাঁহার পানীয় দুগ্ধের কিয়দংশ কুকুর বা বিড়ালের আহারের জন্য রাখিয়া দিতেন…।’
‘তত্ত্ববোধিনী’ পত্রিকায় সুধীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁকে নিয়ে একটি স্মৃতিকথা লিখেছিলেন। সুধীন্দ্রনাথ ছিলেন দ্বিজেন্দ্রনাথের পুত্র। ‘সোমকাকা’র দৈনন্দিন কর্মকাণ্ডের ভিন্নতর ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন তিনি, তাঁর ব্যাখ্যা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। যুক্তি রয়েছে যথেষ্ট। সুধীন্দ্রনাথ লিখেছেন, ‘সাংসারিক লোকের চক্ষে ইহা উন্মাদের পূর্ণলক্ষণ বলিয়া মনে হইতে পারে, কিন্তু যিনি মানবপ্রাণের মানবচরিত্রের ভিতরকার কথা, নিগূঢ় রহস্যতত্ত্বের সমাচার রাখেন, তিনিই জানেন, ইহা কি মহৎপ্রাণের সমবেদনার ব্যাকুল অভিব্যক্তি। সোমকাকা বাস্তবিকই বিশ্বপ্রেমিক ছিলেন; … তাঁহাকে ভালো করিয়া চিনিবার জানিবার আমার যেমন সুযোগ ঘটিয়াছে এমন আর কাহারও ঘটে নাই। এই সুদীর্ঘকাল ধরিয়া প্রতিদিন আমি দেখিতাম প্রাতরাশের সময় কাকামহাশয় তাঁহার পানীয় দুগ্ধের কিয়দংশ কুকুর বা বিড়ালের আহারের জন্য রাখিয়া দিতেন…।’

সোমেন্দ্রনাথ ঠাকুর।
কত দিকে নজর ছিল সোমেন্দ্রনাথের। সুধীন্দ্রনাথের ওই লেখা থেকেই জানা যায়, বালক থেকে যুবক, সকলের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য নানা রকম ব্যায়াম ও শিক্ষার ব্যবস্থা করেছিলেন তিনি। শিক্ষা দেওয়ার জন্য কলকাতার নারকোলডাঙায় একটি বিদ্যালয়ও প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। পরে তাঁর অসুস্থতা বাড়ায় বিদ্যালয়টি বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। বাড়ির ছোটোদের তিনি জাদুঘরে নিয়ে যেতেন, চিড়িয়াখানায় নিয়ে যেতেন, বোটানিক্যাল গার্ডেনেও নিয়ে যেতেন।
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৮৩: দুর্জনের সম্মান, সাধুর জন্য ফাঁদ

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-১০৫: মা সারদার সাধুভক্তি
অতিশয় মাতৃভক্ত ছিলেন সোমেন্দ্রনাথ। প্রায়ই মায়ের কথা বলতেন। মনে পড়ে যেত, ছেলেবেলায় মা তাকে কী রান্না করে খাওয়াতেন। সেসব বলতে বলতে সোমেন্দ্রনাথের দু-চোখে জলে ভরে উঠত। সুধীন্দ্রনাথের কাছে তিনি মনের কথা নির্দ্বিধায় বলতেন। বলতেন, তাঁর যদি শরীর ভালো থাকত, আর টাকা থাকত, তাহলে কত কী করতেন। মানুষের কল্যাণ হোক, সকলের মঙ্গল হোক, মনেপ্রাণে চেয়েছিলেন তিনি।
সুধীন্দ্রনাথের পুত্র সৌম্যেন্দ্রনাথের স্মৃতিগ্রন্থ ‘যাত্রী’তেও সোমেন্দ্রনাথের কথা আছে। আদরের নাতি সৌম্যেন্দ্রনাথকে নিজের খাটে শোয়াতেন তিনি।গল্প করতেন, হাসির গান শোনাতেন। কখনো বা দু-চার পঙক্তি কবিতাও শোনাতেন।
সুধীন্দ্রনাথের পুত্র সৌম্যেন্দ্রনাথের স্মৃতিগ্রন্থ ‘যাত্রী’তেও সোমেন্দ্রনাথের কথা আছে। আদরের নাতি সৌম্যেন্দ্রনাথকে নিজের খাটে শোয়াতেন তিনি।গল্প করতেন, হাসির গান শোনাতেন। কখনো বা দু-চার পঙক্তি কবিতাও শোনাতেন।

সৌম্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর।
অবনীন্দ্রনাথের লেখা থেকে জানা যায়, দ্বারকানাথ ঠাকুরের ভাগ্নে ঈশ্বরচন্দ্র সোমেন্দ্রনাথের গান শুনে বলেছিলেন, ‘হ্যাঁ, গলা হচ্ছে সোমবাবুর।’ সোমেন্দ্রনাথ রবীন্দ্রনাথের থেকেও নাকি ভালো গান করতেন। এমনও বলেছেন কেউ কেউ। অর্ধেন্দুকুমার গঙ্গোপাধ্যায় তাঁর গান শুনেছিলেন। তাঁর লেখা থেকে জানা যায়, রবীন্দ্রনাথের গানই বেশি করতেন তিনি। রবীন্দ্রনাথের গান গাইতে গাইতে কতখানি ‘এক্সাইটেড’ হয়ে পড়তেন, সে বিবরণও আছে। অর্ধেন্দুকুমার তাঁর ‘ভারতের শিল্প ও আমার কথা’ বইতে সযত্নে দিয়েছেন প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার বিবরণ। লিখেছেন, ‘তাঁর কণ্ঠস্বর ছিল অতি মধুর।… আমাদের বাড়িতে যখন তাঁকে দেখেছি তখন তিনি প্রায় প্রৌঢ়ত্বের কোঠায় পৌঁচেছেন। সুদীর্ঘ চেহারা, প্রকৃত গৌরকান্তি সুপুরুষ। তাঁকে দেখলে বোঝা যেত না যে তিনি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ছিলেন না।’
সোমেন্দ্রনাথের মধ্যে উন্মাদ রোগের লক্ষণ দেখেছিলেন চিকিৎসকরা। তাঁর চিকিৎসাও হয়েছিল। তিনি বিকৃতমস্তিষ্ক, এই যুক্তিতে পৈত্রিক সম্পত্তির অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয় তাঁকে। সোমেন্দ্রনাথের জন্য বরাদ্দ হয়েছিল মাসোহারা। মাসে মাসে পেতেন কুড়ি টাকা।
সোমেন্দ্রনাথের মধ্যে উন্মাদ রোগের লক্ষণ দেখেছিলেন চিকিৎসকরা। তাঁর চিকিৎসাও হয়েছিল। তিনি বিকৃতমস্তিষ্ক, এই যুক্তিতে পৈত্রিক সম্পত্তির অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয় তাঁকে। সোমেন্দ্রনাথের জন্য বরাদ্দ হয়েছিল মাসোহারা। মাসে মাসে পেতেন কুড়ি টাকা।
* গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি (Tagore Stories – Rabindranath Tagore) : পার্থজিৎ গঙ্গোপাধ্যায় (Parthajit Gangopadhyay) অবনীন্দ্রনাথের শিশুসাহিত্যে ডক্টরেট। বাংলা ছড়ার বিবর্তন নিয়ে গবেষণা, ডি-লিট অর্জন। শিশুসাহিত্য নিয়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে গবেষণা করে চলেছেন। বাংলা সাহিত্যের বহু হারানো সম্পদ পুনরুদ্ধার করেছেন। ছোটদের জন্য পঞ্চাশটিরও বেশি বই লিখেছেন। সম্পাদিত বই একশোরও বেশি।


















