
ছবি : প্রতীকী। সংগৃহীত।
এদিকে অগ্নিযুগে অনুশীলন সমিতির সদস্যদের অনেকেই কুমিল্লা ও সন্নিহিত অঞ্চল থেকে উদয়পুরে এসে আত্মগোপন করতেন বলে জানা যায়। প্রখ্যাত বিপ্লবী ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তী উদয়পুর এসে আত্মগোপন করে স্বদেশীদের অস্ত্র চালনার প্রশিক্ষণ দিতেন। অনুশীলন সমিতির সদস্যরা উদয়পুরের পুরান রাজবাড়ি এলাকার গভীর জঙ্গলে লুকিয়ে থাকতেন। এলাকাটি তখন গভীর জঙ্গলে ঢাকা ছিল। বাংলার বিপ্লবীরা বিলোনীয়ার বোকাফা ও মাইছড়াতে কৃষি খামার কেন্দ্র স্থাপন করেছিলেন কার্যত যা ছিল বিপ্লবীদের অস্ত্র প্রশিক্ষণ কেন্দ্র।
এ রকম কৃষি খামার উদয়পুরের মাতাবাড়ির কাছে ধোপাইছড়ির বনের মধ্যে একটি হয়েছিল বলে জানা যায়। সাব্রুমের পশ্চিমদিকে হার্বাতলী-বেতাগার গভীর জঙ্গলেও গড়ে উঠেছিল এমন খামার। যাতে দিনের বেলায় স্হানীয় মানুষ কৃষি কাজ করতেন, রাতে বিপ্লবীরা দিতেন অস্ত্র প্রশিক্ষণ। বিপ্লবীরা বেতাগার জঙ্গলে একটি চানমারিও গড়ে তুলেছিলেন। ত্রিপুরার দক্ষিণাঞ্চলের মতো উত্তরাঞ্চলের কৈলাসহরেও মূর্তিছড়া চা বাগান এলাকায় এমন কৃষি খামার গড়ে ওঠার কথা জানা যায়।
আরও পড়ুন:

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-১০০ : স্থানীয়রা দিনে কৃষি কাজ করতেন, আর রাতে অস্ত্র প্রশিক্ষণ দিতেন বিপ্লবীরা

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৫৬: প্রাকৃতিক অবস্থার পরিবর্তন ও প্রাণীদের অস্থিরতা : যুদ্ধের দূষণ, মনে, প্রাণে, বাতাবরণে, সর্বত্র

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৮৯ : আনকো আলোয় যায় দেখা ওই ‘সপ্তপদী’-র পথ চলা

দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৯ : নয়া ভুবনের প্রজাপতি
এই ভাবেই সেদিনের স্বাধীন পার্বত্য ত্রিপুরাতেও দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রভাব পড়েছিল। আন্দোলনের দুটি ধারা, গান্ধীজির অহিংস অসহযোগ এবং সশস্ত্র তৎপরতা দুটিরই প্রভাবে নৃপতি শাসিত ত্রিপুরা প্রভাবিত হয়েছিল। ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহের সময় ত্রিপুরার সিংহাসনে ছিলেন ঈশানচন্দ্র মাণিক্য। ত্রিপুরাতেও এই বিদ্রোহের ছোঁয়া লেগেছিল সেদিন। ১৮ নভেম্বর চট্টগ্রামের ৩৪ নং পদাতিক বাহিনীর ভারতীয় সিপাহিরা বিদ্রোহ করে অস্ত্রাগার ও কোষাগার লুণ্ঠন করে। কারাগার ভেঙ্গে কয়েদিদের মুক্ত করে তারা। বিদ্রোহীরা তারপর লুণ্ঠিত অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ত্রিপুরার দিকে ধাবিত হয়। তাদের ধারণা ছিল দেশীয় রাজ্যের রাজা তাদের সাহায্য করবেন। কিন্তু ত্রিপুরার রাজা ছিলেন তখন ইংরেজদের প্রবল চাপের মুখে। তিনি বিদ্রোহী সিপাহিদের বহিষ্কারের আদেশ প্রচার করেন।
আরও পড়ুন:

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-২৭ : সোনার কেল্লা: ডিটেকশনের ড্রয়িংরুম

একলা নববর্ষ
বিদ্রোহীরা এরপর মণিপুরের উদ্দেশ্যে শ্রীহট্ট-কাছাড় অভিমুখে যাত্রা করে। তারা মণিপুরের রাজার সাহায্য পাবে-হয়তো তাদের এমন একটা আশা ছিল। কিন্তু বিদ্রোহী সিপাহিরা মণিপুরে প্রবেশ করতেই পারে নি। কাছাড়েই ঘটে তাদের বিয়োগান্ত পরিণতি। ইংরেজ বাহিনীর সঙ্গে কাছাড়ে বিদ্রোহী সিপাহিদের উপর্যুপরি সংঘর্ষ ঘটে। নিহত হয় বহু সিপাহি।যারা ধরা পড়ে তাদের ফাঁসিতে লটকানো হয়।চরম খাদ্যাভাব আর ইংরেজদের নৃশংস তৎপরতায় বরাক উপত্যকায় নির্বাপিত হয় চট্টগ্রাম থেকে বয়ে আনা বিদ্রোহের মশাল।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৪৬: সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী— সবুজ কাছিম

ত্রিপুরা: বছর সন্ধির পার্বণ ও নববর্ষ
চট্রগ্রামের বিদ্রোহী সিপাহিদের অভিযান সম্পর্কে ইতিপূর্বে যে সব আলোচনা হয়েছে তাতে জানা যায় যে, বিদ্রোহীরা প্রথমে ত্রিপুরার দিকে অগ্ৰসর হয়েছিল। তারপর রাজার বিরোধিতায় তারা শ্রীহট্ট হয়ে কাছাড়ের প্রবেশ করে। বিদ্রোহীরা স্বাধীন পার্বত্য ত্রিপুরার ভেতর দিয়েই শ্রীহট্টে গিয়েছিল। Sir Edward Gait তাঁর A History of Assam গ্ৰন্হে এ সম্পর্কে উল্লেখ করেছেন, In November 1857, there companies of the 34th Native Infantry stationed at Chittagong mutinied and after burning their lines, breaking open the jail and plundering the treasury, marched in the direction of comilla, they then turned off into the jungles of Hill Tippera, whence they subsequently emerged in the south-east of the Sylhet district.Their intention was to push on, through the South of Cachar into Manipur.
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক পর্ব-১৬২ : আঁধারে আলো

চৈত্রশেষে
অচ্যুতচরণ চৌধুরী তত্ত্বনিধি তাঁর সুবিখ্যাত গ্ৰন্হ ‘শ্রীহট্টের ইতিবৃত্ত’-তে লিখেছেন, “চট্টগ্রামে গবর্ণমেন্ট তিনশত সীমান্ত রক্ষক সৈন্য ছিল।ইহারা উত্তর পশ্চিম সীমান্তের বিদ্রোহের সংবাদে বিদ্রোহী হইয়া তথাকার কালেক্টরী লুন্ঠন করতঃ ২৭৮২৬৭ টাকা ও তিনটি হস্তী লইয়া এবং কারারুদ্ধ অপরাধীদিগকে মুক্ত করিয়া, ত্রিপুরার মধ্যভেদ পূর্ব্বক শ্রীহট্ট জেলায় প্রবেশ করে।…”—চলবে।
* ত্রিপুরা তথা উত্তর পূর্বাঞ্চলের বাংলা ভাষার পাঠকদের কাছে পান্নালাল রায় এক সুপরিচিত নাম। ১৯৫৪ সালে ত্রিপুরার কৈলাসহরে জন্ম। প্রায় চার দশক যাবত তিনি নিয়মিত লেখালেখি করছেন। আগরতলা ও কলকাতার বিভিন্ন প্রকাশনা থেকে ইতিমধ্যে তার ৪০টিরও বেশি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। ত্রিপুরা-সহ উত্তর পূর্বাঞ্চলের ইতিহাস ভিত্তিক তার বিভিন্ন গ্রন্থ মননশীল পাঠকদের সপ্রশংস দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। দেশের বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়ও সে-সব উচ্চ প্রশংসিত হয়েছে। রাজন্য ত্রিপুরার ইতিহাস, রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে ত্রিপুরার রাজ পরিবারের সম্পর্ক, লোকসংস্কৃতি বিষয়ক রচনা, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা সঞ্জাত ব্যতিক্রমী রচনা আবার কখনও স্থানীয় রাজনৈতিক ইতিহাস ইত্যাদি তাঁর গ্রন্থ সমূহের বিষয়বস্তু। সহজ সরল গদ্যে জটিল বিষয়ের উপস্থাপনই তাঁর কলমের বৈশিষ্ট্য।


















