
ছবি : প্রতীকী। সংগৃহীত।
এই গল্প নতুন আর পুরাতনের দ্বন্দ্বে নবীনের প্রতিষ্ঠাগাথা নয়। এ কাহিনি আত্মমর্যাদা ও আত্মপ্রতিষ্ঠার সংঘাতের। বিজ্ঞান যোগ্যতমের উদ্বর্তনের তত্ত্বকে যুক্তি ও প্রমাণে প্রতিষ্ঠিত করে। জীবনে, সমাজেও তা সত্য অবশ্যই, কিন্তু সেই আত্মপ্রতিষ্ঠার নেপথ্যেও থেকে যায় কিছু সত্য। এ কাহিনি তার কথাই বলবে।
পুরাকালে সেই জন্মে বোধিসত্ত্ব সুবর্ণহংসযোনিতে জন্ম নিয়েছেন। তখন বারাণসীর রাজা ব্রহ্মদত্ত। সোনার হাঁসটি প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে চিত্রকূট পর্বতের সোনার গুহায় বাস করে। এই হিরণ্ময় রূপ, এই সুবর্ণময় আবাস হংসের শ্রেষ্ঠত্বের দ্যোতক। সেই হাঁসটি প্রতিদিন হিমালয়ের একটি হ্রদের তীরে প্রকৃতির খেয়ালে অনায়াসজাত শালিধান খেতে যেত। তারপর ফিরে আসতো নিজের আবাসে। এই যাতায়াতের কালে একটি বিরাট পলাশগাছের শাখায় হাঁসটি বিশ্রাম নিতো। এভাবেই ক্রমে ক্রমে তাঁর সঙ্গে বৃক্ষবাসী বৃক্ষদেবতার সখ্য জন্মাল।
আরও পড়ুন:

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-২৮ : মহাপুরুষ—কাল আজ পরশু

উপন্যাস: আকাশ এখনও মেঘলা, পর্ব-৭৬: আকাশ এখনও মেঘলা

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-১০৫: পদ বা ক্ষমতা পেলেই কি ভিতরের স্বভাব বদলে যায়? পঞ্চতন্ত্রের অমোঘ শিক্ষা

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৯৪ : শেষ অঙ্ক
একবার কোনও এক পাখি সেই পলাশগাছের কাণ্ডে বসে মলত্যাগ করেছিল। তার আগে সে পরশপাথরের পাকা বটফল খেয়েছিল। পলাশগাছের কাণ্ড ও শাখার সংযোগস্থলে সেই মলের মধ্যে থাকা বটের বীজে ক্রমে ক্রমে অঙ্কুরোদ্গম ঘটল। দেখতে দেখতে আঙুল-চারেক লম্বা হয়ে গেল সেই চারাগাছ। রক্তাভ অঙ্কুর থেকে উদ্গত সবুজ কোমল পাতা অনন্ত ভবিষ্যতের ইশারা পেয়েছিল বুঝি! কিন্তু যা পরিত্যজ্য, তাকে ত্যাগ করাই ভাল। যা আশঙ্কার কারণ, তাকে থেকে আশঙ্কিত হওয়াই শ্রেয়।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৫৭: ধেড়ে ইঁদুর

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৭৩ : পিঞ্জরে অচিন পাখি
কিন্তু পলাশবৃক্ষের দেবতা এতে আশঙ্কিত হননি। বোধিসত্ত্বরূপী প্রাজ্ঞ হংসরাজ যদিও তাঁকে বারবার বলেছিল, “ওহে পলাশ! যে গাছে বটের অঙ্কুর জন্মায়, বেড়ে উঠে সে অঙ্কুর তার আশ্রয়দাতাকেই বিনষ্ট করে নাকি শুনেছি। তাই আর কালক্ষেপ কোরো না। অঙ্কুরেই বিনষ্ট করো একে। না হলে তোমার এই সুরম্য প্রাসাদ ধ্বস্ত হবে এই বলে রাখলাম। এখনই যাও, ওকে নষ্ট করে দাও।”
পলাশ কিন্তু একথা মানলেন না। যতোই হোক, বৃক্ষদেবতা তিনি। তিনি প্রকাণ্ড। তিনি ক্ষুদ্রের আশ্রয়। তাঁদের ছায়া, জল দিয়ে বিবৃদ্ধ করে পরম ধর্মটি পালন তাঁর কর্তব্য। তিনি বললেন, “না ভাই! ক্ষতি কী! এই বটাঙ্কুর বেড়ে উঠুক। এ হবে আমার পুত্রোপম। আমিই এর জনক হব। আমিই হব জননী।”
পলাশ কিন্তু একথা মানলেন না। যতোই হোক, বৃক্ষদেবতা তিনি। তিনি প্রকাণ্ড। তিনি ক্ষুদ্রের আশ্রয়। তাঁদের ছায়া, জল দিয়ে বিবৃদ্ধ করে পরম ধর্মটি পালন তাঁর কর্তব্য। তিনি বললেন, “না ভাই! ক্ষতি কী! এই বটাঙ্কুর বেড়ে উঠুক। এ হবে আমার পুত্রোপম। আমিই এর জনক হব। আমিই হব জননী।”
আরও পড়ুন:

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-১০২ : ত্রিপুরার রাজপরিবারে সতীদাহ প্রথা

রবীন্দ্র জয়ন্তী: তথ্যচিত্র— রবীন্দ্রনাথ, সভ্যতার সঙ্কট
“কিন্তু যাকে তোমার কোলে রেখেছো, সে যে তোমার পক্ষে বড় ভয়ানক হবে গো! আজ এই বলে গেলাম।” স্বর্ণহংস প্রত্যুত্তরে বলে। হংসরাজ পাখা মেলে। চিত্রকূটের দিকে চলে যায়। আর সে কোনওদিন ফিরে আসে না সেই পলাশগাছের কাছে। সেই বটের চারা ক্রমে বিবৃদ্ধ হয়ে মহীরূহ হয়ে উঠল। তাতেও এক বৃক্ষদেবতা উৎপন্ন হলেন। একদিন সেই মহাবৃক্ষ পলাশকে বিদীর্ণ করে দিল। শাখাসমেত সেই পলাশবৃক্ষের দেবতার প্রাসাদ ভূতলে পতিত হল। তখন তিনি মনে ভাবলেন, “এই দূরাগত মহাভয়কেই হংসরাজ দেখতে পেয়েছিলেন। তখন অবশ্য আমি তাঁর নিষেধবাক্য শুনিনি।” তাঁর দুটি চোখ জলে ভরে আসে।
কালক্রমে সেই মহাতরু মেরুপর্বতের মতোই বিপুল হয়ে উঠে পলাশবৃক্ষকে গ্রাস করে নিল। খণ্ড-বিখণ্ড হতে হতে তার আর কিছুই দৃশ্যমান থাকল না। কেবল পড়ে থাকল তার অবশেষ, স্থানু নিশ্চল কাণ্ডটি। বিস্তৃত বটের ডালপালা, শাখাপ্রশাখার মাঝে একলা হয়ে।
কালক্রমে সেই মহাতরু মেরুপর্বতের মতোই বিপুল হয়ে উঠে পলাশবৃক্ষকে গ্রাস করে নিল। খণ্ড-বিখণ্ড হতে হতে তার আর কিছুই দৃশ্যমান থাকল না। কেবল পড়ে থাকল তার অবশেষ, স্থানু নিশ্চল কাণ্ডটি। বিস্তৃত বটের ডালপালা, শাখাপ্রশাখার মাঝে একলা হয়ে।
আরও পড়ুন:

দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৯ : নয়া ভুবনের প্রজাপতি

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৬৪: ভাবি প্রশাসক রামের প্রশিক্ষণের সূচনা—রাক্ষস খরের সঙ্গে সংঘাত
এ কাহিনির উপদেশটি সুবিদিত। দাঁত থাকতে যেমন দাঁতের মর্ম বুঝতে হয়, তেমন-ই পায়ের তলার মাটির ক্ষেত্রেও তা প্রাসঙ্গিক। যা নিশ্চিত আশ্রয় তাও ধ্বস্ত হয় উপেক্ষায়, অনাদরে। যা অতিক্ষুদ্র, তাও একদিন সর্বগ্রাসী হয়। কালের অবিরত যাত্রার পথে যোগ্যতমের মাথায় রাজমুকুট ওঠে, তার পাশে আত্মমর্যাদা নিয়ে থেকে যায় অনেকেই। কিন্তু থাকেও না অনেকেই, যারা একদা লব্ধপ্রতিষ্ঠ অনিবার্য হলেও আত্মাভিমানে বিবেচনারহিত হয়। তারা তখন হয় দুর্বল, তাকে নস্যাৎ করেই জেগে ওঠে অন্যতর বিপুল শক্তি। জগতের নিয়মেই তার জাগরণ। কিন্তু একদা যা স্বতন্ত্র, বিরাট, তার বিনষ্টি হয় আত্মদোষে। জাতকমালার এই কাহিনি বড় বিষণ্ণ বেদনাহত করে। জগৎ চলে তার আপনবেগে, কেবল থেকে যায় লব্ধপ্রতিষ্ঠ আত্মদুষ্টের অনিবার্য মর্যাদাক্ষয়ের গ্লানিটুকু।—চলবে।
* ড. অভিষেক ঘোষ (Abhishek Ghosh) সহকারী অধ্যাপক, বাগনান কলেজ। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগ থেকে স্নাতকস্তরে স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত। স্নাতকোত্তরের পর ইউজিসি নেট জুনিয়র এবং সিনিয়র রিসার্চ ফেলোশিপ পেয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগে সাড়ে তিন বছর পূর্ণসময়ের গবেষক হিসাবে যুক্ত ছিলেন। সাম্বপুরাণের সূর্য-সৌরধর্ম নিয়ে গবেষণা করে পিএইচ. ডি ডিগ্রি লাভ করেন। আগ্রহের বিষয় ভারতবিদ্যা, পুরাণসাহিত্য, সৌরধর্ম, অভিলেখ, লিপিবিদ্যা, প্রাচ্যদর্শন, সাহিত্যতত্ত্ব, চিত্রকলা, বাংলার ধ্রুপদী ও আধুনিক সাহিত্যসম্ভার। মৌলিক রসসিক্ত লেখালেখি মূলত: ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে। গবেষণামূলক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়ে চলেছে বিভিন্ন জার্নাল ও সম্পাদিত গ্রন্থে। সাম্প্রতিক অতীতে ডিজিটাল আর্ট প্রদর্শিত হয়েছে আর্ট গ্যালারিতে, বিদেশেও নির্বাচিত হয়েছেন অনলাইন চিত্রপ্রদর্শনীতে। ফেসবুক পেজ, ইন্সটাগ্রামের মাধ্যমে নিয়মিত দর্শকের কাছে পৌঁছে দেন নিজের চিত্রকলা। এখানে একসঙ্গে হাতে তুলে নিয়েছেন কলম ও তুলি। লিখছেন রম্যরচনা, অলংকরণ করছেন একইসঙ্গে।


















