রবিবার ৮ মার্চ, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি

(বাঁদিকে) তালপাতায় তালবাতাসি জুটির বাসা। (মাঝখানে) শুকনো তালপাতায় ঝুলন্ত অবস্থায় রাত্রিযাপন। (ডানদিকে) ডিমে তা দিচ্ছে তালবাতাসি। ছবি: সংগৃহীত।

ছোট থেকেই দেখতাম প্রধাণত বিকেলের দিকে বিশেষ একরকম ছোট ছোট পাখি কী দ্রুতবেগে আকাশে এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে চক্কর খেত। সাত-আটটা কিংবা তারও বেশি পাখি দ্রুতবেগে উড়ে যাচ্ছে এক একদিকে, তারপর গোঁত্তা খেয়ে আবার আরেক দিকে। কখনও নিচের দিকে নেমে আসছে, আবার উপরের দিকে উঠে যাচ্ছে। ওদের গতিবেগ এত দ্রুত যে ভালো করে দেখতে পেতাম না পাখিটার চেহারা কেমন। তবে একটা বিষয় খুব স্পষ্ট বুঝতে পারতাম যে পাখিটার লেজ ইংরেজি ‘V’ এর মতো চেরা। আর পাখিটার রঙ কালো বলেই মনে হত। বর্ষার পরের দিনগুলোতে ওদের ওড়াউড়ি যেন খুব বেড়ে যেত। ওদের দেখলেই আমি মনে মনে কখনও গুনগুনিয়ে উঠতাম রবি ঠাকুরের গান “ওরা অকারণে চঞ্চল”, আবার কখনও গুনগুনিয়ে উঠতাম “কোথাও আমার হারিয়ে যাওয়ার নেই মানা”। সত্যি তখন মনে হত ওদের মতো যদি এইভাবে দ্রুত উড়তে পারতাম!
ভালোভাবে দেখতে না পেলেও বাবার মুখে শুনেছি এই পাখিগুলোকে বলে তালবাতাসি। ওরা নাকি রাতে তাল গাছে থাকে, আর তাই এমন নাম। যদিও আমাদের গ্রামের বাড়িতে অনেক তালগাছ ছিল কিন্তু কোনওদিন ওদের তালগাছে বসতে দেখিনি। কী জানি, ছোটবেলায় এইসব কথা শুনে মনে সন্দেহ হত সত্যি ওরা তালগাছে থাকে তো? পরে যখন বড় হলাম, জানলাম এই পাখিটার ইংরেজি নাম হল ‘Asian palm swift’। তখন কিন্তু আর আমার মনে কোনও সন্দেহ রইল না যে সত্যিই এরা তালগাছে থাকে। পরে পড়াশোনা করে জানলাম যে তালবাতাসি পাখির পা নাকি এত ছোট যে গাছের ডালে এদের পক্ষে বসা সম্ভব নয়। তবে আছে নখরযুক্ত আঙুল। ওই আঙুলের সাহায্যেই ওরা তালগাছের পাতা আঁকড়ে ঝুলন্ত অবস্থায় রাতে বিশ্রাম নেয়। আর দিনের বেলা সারাক্ষণ উড়ে চলে। উড়তে উড়তেই নাকি ওরা বিশ্রাম নেয়। সুন্দরবনের ভারি বিস্ময়কর পাখি এই তালবাতাসি। ছোট্ট এই সুইফট জাতীয় পাখির বিজ্ঞানসম্মত নাম ‘Cypsiurus balasiensis’। যদিও কিছুদিন আগেও এই পাখিটিকে আফ্রিকান পাম সুইফট বলে মনে করা হত কিন্তু এখন একে আলাদা প্রজাতির সুইফট হিসেবেই বলা হয়েছে।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১১৩: শকুন

পৃথিবীর সর্বোচ্চ একক আর্চ ব্রিজের নির্মাণে বিনয়ী এক অধ্যাপিকা

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১২৯: চেন টেনে উমাচরণের জেল হয়েছিল

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১২৯: পথিমধ্যে অতর্কিতে

তালবাতাসির আকার চড়ুই পাখির থেকে বড় নয়, লম্বায় মাত্র ১১ থেকে ১২ সেন্টিমিটার। তবে এদের ডানা কিন্তু বেশ লম্বা। যখন ডানা মেলে ওড়ে দেখে মনে হবে দেহের দু’পাশে দুটো লম্বা কাস্তে। আর লেজের কথা তো আগেই বলেছি গভীরভাবে দ্বিখন্ডিত লেজ। মাথা, ঘাড় আর দেহ ধরলে লম্বা নলাকার দেহ। এদের পিঠের দিকের রঙ ধূসর বাদামি আর পেটের দিকে রঙ হালকা বাদামি। এদের চঞ্চু বেশ ছোট আর চোখদুটো যেন উপবৃত্তাকার। দলবেঁধে যখন ওড়ে তখন এরা বেশ তীব্র স্বরে “হি-হি-হি হি-হি-হি” করে ডাকতে থাকে। খোলা মাঠ, আবাদি জমি, ঝোপ-জঙ্গল ঘেরা এলাকা, এমনকি জলাশয়ের কাছাকাছি আকাশে এরা প্রচন্ড দ্রুতবেগে ওড়ে।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১২৭: আশ্রমকন্যা শকুন্তলার পুত্রের উত্তরাধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে চিরন্তন মাতৃত্বের প্রকাশ এবং দুষ্মন্তের লাম্পট্য ও প্রতারণা, সব যুগেই বিদ্যমান

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৭৩: রাজা গোবিন্দমাণিক্য চেয়েছিলেন ঘরে ঘরে পুরাণ পুঁথির প্রচার হোক

জীবনের অধিকাংশ সময়টাই যদি এরা উড়তে উড়তে আকাশে কাটায় তাহলে এরা খায় কী, আর প্রজননই বা করে কীভাবে? ওরা উড়ন্ত অবস্থাতেই উড়ন্ত পোকামাকড় শিকার করতে অসম্ভব পটু। এমনও দেখা গেছে ওরা একটা পোকা ঠোঁট দিয়ে শিকার করে সেটা পায়ের নখে ধরে রেখে আরেকটা পোকা শিকার করে। কেউ কেউ বলেন যে তালবাতাসি পাখিরা নাকি উড়তে উড়তেই যৌনমিলন করে। স্ত্রী ও পুরুষ তালবাতাসি দেখতে একই রকম হয়। তাই উড়ন্ত অবস্থায় কে পুরুষ আর কে স্ত্রী বোঝা মুশকিল, আর উড়ন্ত দুটি পাখিকে প্রজননরত অবস্থায় পক্ষী বিশেষজ্ঞরাও দেখেননি। তাই এ বিষয়ে স্থির সিদ্ধান্তে আসা মুশকিল।
কলকাতায় বৃষ্টি

উড়ন্ত তালবাতাসি। ছবি: সংগৃহীত।

অপরিণত তালবাতাসিরা পরিণতদের থেকে দেখতে কিছুটা আলাদা হয়। বিশেষ করে অপরিণত তালবাতাসিদের লেজ হয় ছোট। আগেই বলেছি পা অত্যন্ত ছোট হওয়ায় গাছের ডাল কিংবা মাটি কোথাও এরা বসতে পারে না বা চলাফেরা করতে পারে না। তাহলে এরা জল পান করে কী করে? আমি কিন্তু আমাদের গ্রামে মাঠের মাঝে থাকা বড় পুকুরে এদের অদ্ভুত কায়দায় জল পান করতে দেখেছি। ছোটবেলা অবশ্য বুঝতাম না যে ওরা এভাবে জল পান করে। ওরা উড়তে উড়তে হঠাৎ করে তীরবেগে জলের দিকে নেমে এসে জল ছুঁয়ে ফের ওপরে উড়ে যেত। এই জল ছোঁয়ার সময় ওরা চঞ্চুতে কিছুটা জল তুলে নেয়। বড়ো বিচিত্র এই জলপানের ভঙ্গি। যারা জীবনের অধিকাংশ সময় উড়ে কাটায় আর জীবনে কখনওই মাটির স্পর্শ করে না, তারা এছাড়া আর কোন পদ্ধতিতেই বা জল পান করবে?
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৮৮: নীতি কেবল মুখোশ, রাজনীতির মূল হল কৌশল আর ছলনা

রহস্য উপন্যাস: হ্যালো বাবু! পর্ব-৯৬: গ্রিন টি /৪

তালবাতাসি পাখিরা বাতাসে ভেসে আসা পালক আর বিভিন্ন বীজ বাতাস থেকেই সংগ্রহ করে আঠা দিয়ে জুড়ে জুড়ে তালপাতার নিচে অগভীর ছোট্ট বাসা বানায়। আর তারপর স্ত্রীপাখি সেই বাসায় দুটি বা তিনটি ছোট্ট সাদা রঙের ডিম পাড়ে। তারপর বাবা আর মা পাখি মিলে বাসায় তা দেয়। ডিম ফুটে যে বাচ্চা বেরোয় তারা দেখতে পায় না, আর গায়ে কোনও পালও থাকে না। প্রায় সাত দিন পর বাচ্চারা দেখতে পায় আর গায়ে পালক তৈরি হয়। তারপর চার সপ্তাহ বয়স হলে বাচ্চারা উড়তে শেখে। যতদিন না বাচ্চারা উড়তে শেখে ততদিন বাবা ও মা তালবাতাসি তাদের ভরণপোষণের দায়িত্ব নেয়। তারা উড়ন্ত পোকামাকড় ধরে নিয়ে এসে বাচ্চাদের খাইয়ে দেয়।
আরও পড়ুন:

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-৯ : মণিহারা: করিডর, সেজবাতি আর…

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-১১০: মা সারদার মানবীলীলার অবসান

সুন্দরবনের পরিবেশের জন্য তালবাতাসি পাখিদের গুরুত্ব অপরিসীম। যেহেতু এরা কেবল পোকামাকড় শিকার করে তাই সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্রে বিভিন্ন কীটপতঙ্গের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার ক্ষেত্রে তালবাতাসি পাখিদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফসলের ক্ষতিকর কীটপতঙ্গের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করতেও এরা সাহায্য করে। ফলে কৃষকের উপকার করে ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধিতে এদের ভূমিকা অনস্বীকার্য।

বর্তমানে আমার বসতি এলাকায় তালবাতাসি পাখিদের আর আগের মতো দেখতে পাই না। আমার মনে হয় আজ থেকে চার দশক আগে যে পরিমাণ তালগাছ সুন্দরবন অঞ্চলে ছিল বর্তমানে তার এক চতুর্থাংশ রয়েছে কিনা সন্দেহ। ছোটবেলায় দেখেছি প্রতি বাড়িতে পুকুরপাড়ে তালগাছ থাকত।
কলকাতায় বৃষ্টি

তালবাতাসি বাচ্চাসহ মা। ছবি: সংগৃহীত।

বর্ষাকালে পাকা তাল দিয়ে রুটি, বড়া আর পিঠে ছিল বাঙালির লোভনীয় খাবার। তাছাড়া পুরুষ তালগাছে গুড় তৈরির জন্য রস দেওয়া হত। তালপাতা ছিল চমৎকার জ্বালানি আবার তালগাছ দিয়ে কড়িকাঠ, পুকুরঘাট ইত্যাদি তৈরি হত। তালপাতা দিয়ে ঘর ছাওয়াও হত। আর বিদ্যুৎহীন সুন্দরবনে গ্রীষ্মকালে তালপাতা দিয়ে তৈরি হাতপাখা ছিল গরমের হাত থেকে কিছুটা আরাম পাওয়ার একমাত্র উপকরণ। কিন্তু বিদ্যুতের আগমন আর প্লাস্টিক হাত পাখার আবির্ভাব তালপাতার হাতপাখাকে বিলুপ্ত করে দিয়েছে। বাঙালির কাছে ঋতুভিত্তিক খাবার হিসেবে তালের গুরুত্ব এখন কমে গিয়েছে। আর তালের রস থেকে গুড় তৈরি করা বাঙালির আর পেশা নয়। এইসব কারণে শুধু সুন্দরবন নয়, সর্বত্র তালগাছের সংখ্যা কমেছে। তালগাছ না থাকলে তালবাতাসিরা থাকবে কোথায়?

তবু এখনও ওরা টিকে আছে সুন্দরবনের আনাচে-কানাচে। এখনও এক একদিন যখন বিকেলে খোলা ছাদে গিয়ে বসে আকাশের দিকে তাকাই তখন ছোটবেলায় দেখা একই ভঙ্গিমায় মাথার ওপর ওদের উড়তে দেখি। আর তখনই মনে মনে ছোটবেলার সেই গানটা গুনগুনিয়ে উঠি—“ওরা অকারনে চঞ্চল”।
—চলবে।
* সৌম্যকান্তি জানা। সুন্দরবনের ভূমিপুত্র। নিবাস কাকদ্বীপ, দক্ষিণ ২৪ পরগনা। পেশা শিক্ষকতা। নেশা লেখালেখি ও সংস্কৃতি চর্চা। জনবিজ্ঞান আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত। বিজ্ঞান জনপ্রিয়করণের জন্য ‘দ্য সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশন অফ বেঙ্গল ২০১৬ সালে ‘আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু মেমোরিয়াল অ্যাওয়ার্ড’ এবং শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞান লেখক হিসেবে বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদ ২০১৭ সালে ‘অমলেশচন্দ্র তালুকদার স্মৃতি সম্মান’ প্রদান করে সম্মানিত করেছে।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content