রবিবার ৮ মার্চ, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি

রবীন্দ্রনাথ।

একঝলকে

● ছবি : উত্তরমেঘ

● পরিচালনা : জীবন গঙ্গোপাধ্যায়

● ছবির নায়িকা: সুপ্রিয়া চৌধুরী

● প্রেক্ষাগৃহ : শ্রী, ইন্দিরা ও আলোছায়া

● মুক্তির তারিখ : ১২.০২.১৯৬০

‘উত্তরমেঘ’, উত্তম-সুপ্রিয়া অভিনীত একটি কম-দেখা ছবি যা,তৎকালীন যুগে সামাজিক প্রেক্ষাপটে নির্মিত হয়েছিল। আসলে পঞ্চাশের দশকের দ্বিতীয়-অর্ধ থেকে উত্তম কুমার নামক ম্যাজিক এমন একটা জায়গায় পৌঁছেছিল যে কোনও নায়িকাকে উত্তম কুমারের সঙ্গে জুড়ে দিতে পারলেই সে ছবি হিট হতো বলে প্রযোজক ও পরিবেশকগোষ্ঠীরা মনে করতেন। উত্তমবাবু নিজেতো ছিলেন সেল্ফ-ডিরেক্টেড একজন অ্যাক্টর। কাজেই উনি প্রত্যেক নায়িকার পালস অনুযায়ী নিজেকে ভেঙে গড়ে একটা নতুন রূপ দিতে পারতেন খুব সহজে যা ছবির নির্মাণকর্তাদের চোখ এড়াতো না।
বাংলা বাণিজ্যিক ছবির ইতিহাসে এ ধরনের নায়কের অভির্ভাব, শুধু প্রযোজক পরিবেশকের ঘরেই লক্ষীলাভ করায়নি; বাংলার বিপুল দর্শককূল বিশেষত যাঁরা বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে অগ্রণী তাঁরাও উত্তমবাবুর ছবিকে একটা অন্যমানের বলে স্বীকার করে নিতে দ্বিধাবোধ করেননি। যদিও সেটা সময়সাপেক্ষ। কোনও জিনিস বিচার পায় সময়ের হাত ধরে। হয়তো প্রথম রিলিজেই ছবিটা সুপার-ডুপার হিট করলো না কিন্তু পরবর্তীকালে পুনর্মুক্তিতে এমন জায়গা পেয়ে গেল যেটা, ছবিটিকে অমরত্ব দান করল।
আরও পড়ুন:

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৭৮ : কুহক

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৮৮: অসম-মিজোরাম সীমান্তে ঘাড়মুড়ার নব আবিষ্কৃত ভাস্কর্যও সুপ্রাচীন

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৩২: সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী— গন্ধগোকুল

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৪৫: পোষা হরিণকে সাঁওতালপাড়ায় মারা হয়েছিল তির ছুঁড়ে

অতি আগ্রহী উত্তম ভক্তরাও বোধহয় তাঁর অভিনীত সমস্ত ছবি দেখে উঠতে পারেনি। যাইহোক ১৯৬০ সালে উত্তম কুমার ছবির জগতে একটি উর্বর ভূমিতে অবস্থান করছেন, যখন তাঁর হাতে যেসব ছবি আসছে প্রত্যেকটার কাহিনী, প্রযুক্তির কাজ যে যেখানেই থাকুক না কেন, উত্তম কুমার নামক ম্যাজিকেই বাণিজ্যিক সাফল্য মিলছে।
আরও পড়ুন:

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-১৪: রাঙা মেঘের বেলাভূমি

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৪৭: মধ্যরাতের অভিযান

এই একটি ফর্মুলাকে মূলধন করে বাকি সমস্ত আঙ্গিক অবস্থান সাজানো হতো। একসময় যে উত্তম কুমারকে প্রযোজকের বাড়ির দরজায় দরজায় কাজের আশায় ঘুরতে হতো, এখন উত্তমবাবুর বাড়ির দরজায় প্রযোজক, পরিবেশক, পরিচালকরা কাহিনী চিত্রনাট্য ছবির নায়কা নির্বাচনের খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে অপেক্ষা করেন। উত্তম বাবুর যে অংশটা ছবির মধ্যে সবচেয়ে বেশি করে ফুটে উঠেছে সময় অনুযায়ী ছবির ইতিহাস ভূগোল কি হওয়া উচিত তার নিখুঁত জরিপ।
কলকাতায় বৃষ্টি
যে সমস্ত সমালোচকরা ‘নায়ক’ পরবর্তী উত্তমবাবুকে বাহবা দিয়েছেন প্রাক-নায়ক পর্বেও উত্তম কুমার যে শুধুই উত্তম কুমারই ছিলেন সে, ব্যাপারটা উনি ক্যামেরার সামনে বুঝিয়ে ছেড়েছেন। তাঁর প্রকৃত দেবতা বোধহয় ক্যামেরাই ছিল যাঁর সামনে নিজেকে উৎসর্গ করে গিয়েছেন। ক্যামেরা দেবতাকে সন্তুষ্ট করার কোন খামতিই তিনি কর্মজীবনে রাখতেন না। আর কেউ না জানুক ক্যামেরার লেন্স জানত তিনি কিভাবে একটি যুগ নির্মাণ করেছিলেন।
আরও পড়ুন:

উপন্যাস: আকাশ এখনও মেঘলা, পর্ব-৫০

দশভুজা, অন্য লড়াই: এই স্বাধীনতার জন্য আমরা লড়াই করিনি

আমাদের এ কথা ভুললে চলবে না, উত্তমবাবু ফিল্মে আসার আগে বাংলা চলচ্চিত্র শিল্পে বহু দিকপাল পরিচালক ক্ষনজন্মা প্রযুক্তিবিদ্- সংগীত পরিচালক মণিকাঞ্চন যোগ ঘটিয়েছেন।
কিন্তু প্রত্যেকের চেষ্টাকে সাফল্যের দরজা পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়ার যে সারস্বত-গুণ থাকা দরকার ছিল সেই গুণের অধিকারী যাঁরা ছিলেন তাদের মধ্যে উত্তম কুমার এগিয়ে ছিলেন। সালতামামির ইতিহাস দাবি করবে তিনি কি সময়ের থেকে এগিয়ে ছিলেন! আমি বলব ‘না’। তিনি কখনো চাননি সময়ের থেকে এগিয়ে থাকতে। এই ‘উত্তরমেঘ’ ছবিটা পুঙ্খানুপুঙ্খ আলোচনা করলে আমরা দেখতে পাব, ছবির পরতে পরতে তিনি সময়কেই চ্যালেন জানিয়েছেন।

সমকালীন সমাজ ব্যবস্থা কি চাইছে, বুনিয়াদি ব্যবস্থা ভেঙে কিভাবে আণবিক সমাজ ব্যবস্থা গড়ে উঠছে সেই পরিবর্তিত ও পরিস্থিতির জরিপকার্যের নিখুঁত কারিগরের নাম ছিল উত্তম কুমার। বর্তমান প্রতিবেদকের উদ্দেশ্য নয়, ছবির আলোচনা প্রসঙ্গে উত্তমপ্রশস্তি বা তর্পণ করা। কিন্তু একটি ছবির নির্মাণ ব্যবস্থায় নতুন নায়িকা সুপ্রিয়া চৌধুরী। ঋত্বিক ঘটকের মতো পরিচালকের চোখের ইশারায় হাতে খড়ি হলেও বাণিজ্যিক ছবির ভাষা কিভাবে রপ্ত করতে হয় ফ্রেমের পর ফ্রেমে উত্তমবাবু দাবি করতেন তিনিই এ বিষয়ের সূচীপত্র।

ছবিটিতে সুপ্রিয়া চৌধুরীর অভিনয় যথেষ্ট মর্যাদাপূর্ণ ছিল। যে উত্তমকুমার সংলাপের বাঁধুনীতে দাবি করছিলেন তিনি নিছক ম্যাটিনি আইডল হিসাবে সীমাবদ্ধ থাকতে জন্মাননি। উদভ্রান্ত বাংলা ও বাঙালিয়ানার স্মৃতি-সত্তা-ভবিষ্যতের অবলম্বন হতে এসেছেন তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সুপ্রিয়ার অভিনয় যথেষ্ট প্রশংসার দাবি রাখে।
আরও পড়ুন:

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-১৭ : কাঞ্চনজঙ্ঘা: দেখা হবে চন্দনের বনে

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৪২: রামায়ণে মহর্ষি অগস্ত্যের তপস্যালব্ধ শুভশক্তির আবেদন চিরন্তন

পাশাপাশি জীবন গঙ্গোপাধ্যায়ের মতো পরিচালক যিনি ‘ব্রতচারিনী’-র মতো পারিবারিক ছবি নির্মাণের হিম্মত রাখেন তিনি এখানেও উপযুক্ত চরিত্র নির্মাণের মাধ্যমে ছবিটিতে প্রাণ সঞ্চারের চেষ্টা করেছেন। অর্থাৎ একক উত্তম নন, কাহিনীকে প্রাণ দান করতে সহশিল্পীদের ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ এ ছবি বোধহয় সেদিক দিয়ে ফিল্ম স্টাডিজের ছাত্রদের একটি নিদর্শন হয়ে থাকবে।

ছবিটিকে সর্বাঙ্গ সুন্দর করতে রবীন চট্টোপাধ্যায়ের মতো সুরকারের শুধু গানের জাদু নয়, ছবির ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকও অন্যতম ভূমিকা হয়ে উঠেছিল। আমরা উপেক্ষা করি ছবির আবহসংগীত নির্মাণের রসদকে। ভারত বিখ্যাত যে ছবি আজও পঞ্চাশ বছরের বয়সের ভার নিয়ে ভারতবাসীকে আনন্দ দিচ্ছে সেই ‘শোলে’ ছবির ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক অত্যন্ত মূল্যবান তথা ছবির অন্যতম সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল। কারণ একটি অপরিচিত ঘটনাকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলার জন্য রাহুল দেব বর্মন নামক ক্ষণজন্মা একজন সুরের জাদুকর যে এক্সপেরিমেন্ট চালিয়েছিলেন তা, অত্যন্ত যথাযথ হয়েছিল। ছবিটির প্রাণ সঞ্চার করতে তাঁর মত সাংগীতিক দখল নেওয়া মানুষ খুব কমই দেখা গিয়েছে। আমরা ‘শোলে’ ছবির অন্যান্য সম্পদ আলোচনা করলেও তার ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিককে নিয়ে অবহেলাই করেছি।
কলকাতায় বৃষ্টি

১৯৬০ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত বাংলা ছবির তালিকা।

সেদিক দিয়ে বাংলায় যত ছবি নির্মাণ হয়েছে একমাত্র তরুণ মজুমদার ও হেমন্ত মুখোপাধ্যায় জুটির ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক ছাড়া সে ধরনের কোন আলোচনা পাতে আসেনি। যে সমস্ত পাঠক-দর্শকরা ‘উত্তর মেঘ’ ছবিটি এখনও দেখেননি তাঁরা একবার দেখলে বুঝতে পারবেন আবহসঙ্গীত কতটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে একটি ছবির নির্মাণ পর্বে।

ছবিটির এই যে সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম কাজ, তাকে মাথায় রেখে ক্যামেরার সামনে নিজেকে মেলে ধরা এবং সহশিল্পীর আবেদনটিতে যথাযথ সাড়া দেওয়ার যে মানের দক্ষতা সেটাই আগামী দিনের মহানায়ককে তৈরি করেছিল।

সবদিক দিয়ে বিচার বিবেচনা করলে দেখা যাবে উত্তম কুমারের ফিল্মি কেরিয়ারে এ ছবি অন্য একটা মাইলস্টোন যা বহু জায়গাতেই উপেক্ষিত রয়ে গিয়েছে।—চলবে।

* উত্তম কথাচিত্র (Uttam Kumar–Mahanayak–Actor) : ড. সুশান্তকুমার বাগ (Sushanta Kumar Bag), অধ্যাপক, সংস্কৃত বিভাগ, মহারানি কাশীশ্বরী কলেজ, কলকাতা।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content