আজকের কাহিনিটির প্রতিপাদ্য বিষয় অভিনব নয়। বরং সুখ-সম্ভোগ ও নিরাসক্তির পরস্পর বিপরীত মেরুদুটি এই কাহিনিতে প্রকট হয়েছে। জাতকমালার কাহিনি বোধিসত্ত্বের জন্মান্তরের পুণ্যগাথা, কিন্তু চূড়ান্ত জন্মটিতেও তো এ কাহিনিটিই যেন নবরূপে দেখা দেয়। সেখানে সিদ্ধার্থ রাজপুত্র, অতুল বৈভবের অনিবার্য ভোগসুখকে হেলায় উপেক্ষা করে এক বিজন রজনীতে তাঁর মহানিষ্ক্রমণ ঘটল, এই কাহিনি তো সুবিদিত। মৃত্যু, ব্যাধি ও জরায় জর্জর জগতের অনিবার্য পরিণতির উপলব্ধি করে মুক্তিকামী মানবাত্মার গোপনপুরের মর্মকথা এমন অভ্রান্ত যে এই কাহিনিগুলি বহু যুগ অতিক্রম করেও চিরন্তন হয়ে থাকে। আজকের কাহিনিতেও বোধিসত্ত্ব সুখাসক্তি অতিক্রম করে প্রবজ্যা গ্রহণ করলেন এমনটাই প্রতিপাদ্য বিষয়।
সেই জন্মে বোধিসত্ত্ব বারাণসীরাজ ব্রহ্মদত্তের রাজপুরোহিতের পুত্র হয়ে জন্ম নিলেন। তিনি যে দিন জন্মালেন, সেদিন রাজার-ও ছেলে হল। রাজা অনুসন্ধান করে জানলেন যে তাঁর পুত্রের সঙ্গে পুরোহিতের পুত্র-ও একই দিনে জন্মগ্রহণ করেছে। সেই থেকে দুটি পুত্র একত্রে একই আহার্য, পানীয়, বস্ত্র, আভরণে প্রতিপালিত হতে থাকল। রাজা পুরোহিতপুত্রের সকল দায়িত্ব নিলেন। কালক্রমে দুজনেই তক্ষশিলায় গিয়ে সর্ববিদ্যাপারঙ্গম হয়ে বারাণসীতে ফিরে এল। ফিরে এলে রাজপুত্র ঔপরাজ্যে অভিষিক্ত হয়ে বিশেষ মানমর্যাদায় অধিষ্ঠিত হলেন। তখনও তাঁরা একত্রে আহার, নিদ্রায় অভ্যস্থ, পরস্পরের অত্যন্ত বিশ্বাসভাজন ও প্রিয়। কালক্রমে রাজার প্রয়াণ ঘটলে রাজপুত্র রাজা হয়ে অতুল বৈভবের অধিকার পেলেন।
এই হল জীবনের একটি দিক।
রাজপুত্র রাজা হয়ে সিংহাসনে বসলে পুরোহিতপুত্র ভাবলেন, যথাসময়ে তাঁর মিত্র তাঁকে পৌরোহিত্যে বরণ করবেন। কিন্তু তিনি তার অভিলাষী নন। তিনি প্রব্রজ্যা নেবেন। তাই সংসারধর্ম, সংসারচিন্তা তাঁর জন্য নয়। তিনি মাতাপিতার অনুমতি লাভ করে বিপুল বৈভব ত্যাগ করে গৃহত্যাগ করলেন। হিমালয়ের সুরম্য প্রদেশে পর্ণকুটির নির্মাণ করে তপশ্চরণে ক্রমে ক্রমে সিদ্ধির পথে এগিয়ে চললেন।
অন্যদিকে রাজা তাঁর মিত্রকে স্মরণ করলেন। অমাত্যরা সকলকিছু জানালে তিনি এক অমাত্যকে বোধিসত্ত্বের সন্ধানে প্রেরণ করলেন। সহ্য নামের সেই অমাত্য যথাস্থানে এসে বনেচরদের সাহায্যে বোধিসত্ত্বের পর্ণকুটির খুঁজে পেলেন, তাঁকে জানালেন রাজার সন্দেশ। রাজা তাঁকে পুরোহিতপদে নিযুক্ত করবেন। কিন্তু বোধিসত্ত্ব ফিরলেন না। পৌরোহিত্য তো সামান্য, কাশী-কোশল কিংবা জম্বুদ্বীপের অধিকার পেলেও তা তিনি গ্রহণ করবেন না। নিষ্ঠীবন যেমন একবার ত্যক্ত হলে গ্রহণীয় নয়, তেমনই পণ্ডিত যিনি, তিনি পাপের সংসর্গমুক্ত হয়ে তাকে পুনরায় গ্রহণ করেন না। প্রব্রাজকের ভিক্ষাপাত্রটুকুই সম্বল। তাঁর আশ্রয় নেই, আহার-নিদ্রা-জীবনের নিশ্চয়তা নেই, সহায় নেই, হিংসা নেই, দ্বেষ নেই। তবুও তাঁর কাছে রাজসম্পদ ও ভোগসুখ তুচ্ছ, যে জন এই গ্রন্থিহীন জীবনের স্বাদ পেয়েছে সে আর পিছন ফিরে চায় না। তাই বোধিসত্ত্ব রাজার অনুরোধ হেলায় ফিরিয়ে দিলেন। এ কাহিনি এতটুকুই।
প্রশ্ন জাগবে, রাজধর্ম, রাজসুখ কি পাপের সমতুল? তা কেন বিষবত্ পরিত্যজ্য? মানবসংসার, জীবন, জীবধর্ম, অনন্ত বন্ধনে মহানন্দময় মুক্তির ধারণা এসব কি তবে মিথ্যা নাকি আপেক্ষিক? এই কাহিনি এর উত্তরে কিছু বলতে চায়?
লক্ষ্য করা যাবে যে দৌত্যকর্মে নিযুক্ত অমাত্যের নাম সহ্য। অনুঘটন তাঁর ভূমিকা। মূল কাহিনিতে তাঁর মুখ্যভূমিকা না থাকলেও জাতককথা তাঁর নামেই নামাঙ্কিত। কী এর তাত্পর্য?
অনুমান করা যায় যে, সহনশীলতার অনুষঙ্গ নিয়ে সহ্য নামটি, চরিত্রটি অবতীর্ণ। তিনি বোধিসত্ত্বের বার্তা রাজার কাছে নিবেদন করলেন। এখানে তাঁর সহনশীলতার কী ভূমিকা? মনে করা যেতে পারে “সহ্য” একটি রূপক, একটি আদর্শ। কথামৃতের অনুসরণে মনে পড়বে, যে সয় সে রয়। যে না সয় সে নাশ হয়। এই তো সংসারের মর্মবাণী, অভিযোজন ও যোগ্যতমের উদ্বর্তনের বার্তা। রাজাকে বন্ধুবিচ্ছেদ মেনে নিতে হবে, সহ্য করতে হবে। প্রব্রাজকের মাতাপিতাকেও সহ্য করতে হবে সন্তানবিচ্ছেদ। সর্বোপরি, প্রব্রাজক যে জীবন বেছে নিলেন তার প্রতি একান্ত আস্থা, কৃচ্ছ্রসাধনের পীড়া ও আপাত সুখসম্ভোগহীন জীবনকে সহ্য করতে হবে। এই সহনশীলতা জীবনের প্রকৃত শিক্ষা। এখান থেকে জীবন বিচ্যুত হলে তা নিতান্তই কষ্টদায়ক, যা আপাতভাবে পীড়াদায়ক, তার গভীরেই সুখ প্রচ্ছন্ন থাকে। যিনি এই সত্য উপলব্ধি করবেন, তাঁর কাছে রাজার ধন নিতান্তই তুচ্ছ, রাজার সঙ্গে জন্ম নিয়ে, রাজবৈভবে লালিত হয়ে, অতুল বৈভবের অধিকার পেয়েও তা তাঁর কাছে হেয়, বর্জনীয়। এই হল জীবনের অন্য দিকটি।
তাই দুটি মানুষ একই পরিস্থিতিতে জাত, লালিত, পালিত, শিক্ষিত ও প্রতিষ্ঠিত হলেও তাদের জীবনদর্শন কাউকে করে রাজা, কাউকে সংসারবিমুখ সন্ন্যাসী। দুজনেই হয়তো তাঁদের স্বস্থানে সম্পন্ন। রাজা রাজসিক গুণে ও বৈভবে, ত্যাগী মুমুক্ষায়, পূর্ণবোধে। কিন্তু জীবনের একান্ত সত্য ও চমত্কৃতি এখানেই যে, সমভাবাপন্ন হলেও প্রতিটি জীবন একক ও স্বতন্ত্র। তাই তাদের নৈকট্য থাকলেও শেষপর্যন্ত জাগতিক জীবনে তারা ভিন্ন, স্ব-ভাবে ভাস্বর ও সমুজ্জ্বল। কেউ ঐশ্বর্যে বৈভবে রাজা, কেউ নির্বেদে। তাই রাজার সঙ্গে বেড়ে উঠেও একটি জীবন সংসারবিমুখ হয়, বোধিসত্ত্বের সঙ্গে বেড়ে উঠেও জনৈক রাজপুত্র রাজা হয়ে ওঠে কেবল। এই জাতককাহিনি সেকথাই বলে, বলে চলে। —চলবে।
* ড. অভিষেক ঘোষ (Abhishek Ghosh) সহকারী অধ্যাপক, বাগনান কলেজ। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগ থেকে স্নাতকস্তরে স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত। স্নাতকোত্তরের পর ইউজিসি নেট জুনিয়র এবং সিনিয়র রিসার্চ ফেলোশিপ পেয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগে সাড়ে তিন বছর পূর্ণসময়ের গবেষক হিসাবে যুক্ত ছিলেন। সাম্বপুরাণের সূর্য-সৌরধর্ম নিয়ে গবেষণা করে পিএইচ. ডি ডিগ্রি লাভ করেন। আগ্রহের বিষয় ভারতবিদ্যা, পুরাণসাহিত্য, সৌরধর্ম, অভিলেখ, লিপিবিদ্যা, প্রাচ্যদর্শন, সাহিত্যতত্ত্ব, চিত্রকলা, বাংলার ধ্রুপদী ও আধুনিক সাহিত্যসম্ভার। মৌলিক রসসিক্ত লেখালেখি মূলত: ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে। গবেষণামূলক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়ে চলেছে বিভিন্ন জার্নাল ও সম্পাদিত গ্রন্থে। সাম্প্রতিক অতীতে ডিজিটাল আর্ট প্রদর্শিত হয়েছে আর্ট গ্যালারিতে, বিদেশেও নির্বাচিত হয়েছেন অনলাইন চিত্রপ্রদর্শনীতে। ফেসবুক পেজ, ইন্সটাগ্রামের মাধ্যমে নিয়মিত দর্শকের কাছে পৌঁছে দেন নিজের চিত্রকলা। এখানে একসঙ্গে হাতে তুলে নিয়েছেন কলম ও তুলি। লিখছেন রম্যরচনা, অলংকরণ করছেন একইসঙ্গে।
গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম
‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com