রবিবার ৮ মার্চ, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি

ছবি: প্রতীকী।

মৃগয়া বিহারী রাজা দুষ্মন্ত মহর্ষি কণ্বের আশ্রমে ঋষি কণ্বের পালিতা কন্যা শকুন্তলাকে দেখে মুগ্ধ হলেন। রাজা দুষ্মন্ত,কণ্বাশ্রমে পালিতা শকুন্তলার জন্মবৃত্তান্ত অবগত হলেন। রাজা নিশ্চিন্ত হলেন রাজর্ষি বিশ্বামিত্রের ঔরসজাতা ও অপ্সরা মেনকার গর্ভজাতা কন্যা শকুন্তলা। ক্ষত্রিয়কন্যার সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপনে কোন শাস্ত্রীয় বাধা নেই। অতএব রাজা, তাঁর প্রণয় নিবেদন করলেন। ভার্য্যা মে ভব সুশ্রোণি!ব্রূহি কিং করবাণি তে। হে সুন্দরি, তুমি আমার স্ত্রী হও। বল, তোমার জন্যে আমি কি করতে পারি।

রাজা জানালেন, স্বর্ণমালা, সনসমূহ, সুবর্ণনির্মিত দুটি কুণ্ডল, নানা দেশীয় নির্মল সুন্দর সব মণিরত্ন, বক্ষের আভরণ, মৃগচর্ম এই সবকিছু, শকুন্তলার জন্যে তিনি আহরণ করে এনেছেন।আবেগ বিগলিত কণ্ঠে রাজা প্রণয় নিবেদন করলেন, হে, সুন্দরি, এমন কি আজ থেকে রাজ্যটি ও তোমার হোক, শুধু তুমি আমার পত্নী হও। সর্ব্বং রাজ্যং ত্ববাদ্যাস্তু ভার্য্যা মে ভব শোভনে। রাজা প্রস্তাব দিলেন, গান্ধর্ববিবাহবিধি (বরবধূর সম্মতিক্রমে এই বিবাহে,কন্যা দানের আবশ্যকতা নেই) অনুসারে এই বিবাহ সম্পন্ন হোক। কারণ, বিবাহগুলির মধ্যে গান্ধর্ববিবাহকে শ্রেষ্ঠ বলা হয়ে থাকে।

শকুন্তলার বিনম্র উত্তর, পিতা কণ্ব, ফল আহরণের জন্যে আশ্রমের বাইরে রয়েছেন। রাজা মুহূর্তকাল অপেক্ষা করুন, পিতাই রাজাকে কন্যাদান করবেন। শকুন্তলা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় অকপটে নিজ মত ব্যক্ত করলেন, সর্বদা পিতাই শকুন্তলার প্রভু, তিনি তাঁর কাছে দেবতুল্য। পিতা যাঁকে শকুন্তলাকে দান করবেন, তিনিই হবেন তাঁর স্বামী। পিতা হি মে প্রভুর্নিত্যং দৈবতং পরমং মম।যস্মৈ মাং দাস্যতি পিতা স মে ভর্তা ভবিষ্যতি।। নিজ বক্তব্যের সমর্থনে তিনি বললেন, কুমারী অবস্থায় পিতা রক্ষা করেন, যৌবনকালের রক্ষক হন স্বামী, জরাগ্রস্ত হলে পুত্র রক্ষা করে থাকেন, তাই নারীর স্বাতন্ত্র্য বলে কিছু নেই। পিতা রক্ষতি কৌমারে ভর্তা রক্ষতি যৌবনে। পুত্রস্তু স্থাবিরে ভাবে ন স্ত্রী স্বাতন্ত্র্যমর্হতি।। শকুন্তলা দৃঢ়কণ্ঠে স্বমত প্রকাশ করলেন, তপস্বী পিতাকে অগ্রাহ্য করে,অধর্মের পথ অবলম্বন করে,রাজেন্দ্র দুষ্মন্তর বরমাল্য কীভাবে তিনি গ্রহণ করবেন? রাজা দুষ্মন্ত, বাধা দিলেন, হে কল্যাণি, এমন কথা বলনা। মা মৈবং বদ কল্যাণি! তপোরাশিং দমাত্মকম্।
তপোরাশি ইন্দ্রিয়সংযম করে থাকে। শকুন্তলা উত্তর দিলেন, ব্রাহ্মণদের অস্ত্র ক্রোধ, এ ছাড়া আর কোনও অস্ত্র তাঁদের নেই। ইন্দ্র যেমন বজ্রের সাহায্যে অসুর নিধন করেন, তেমনই ক্রুদ্ধ ব্রাহ্মণগণ ক্রোধের মাধ্যমে শত্রুদের হত্যা করে থাকেন। অগ্নির আছে তেজোসঞ্জাত দাহিকাশক্তি, সূর্যের দহনজ্বালা রয়েছে তাঁর রশ্মিগুলিতে তেমনই রাজা দণ্ডদ্বারা দগ্ধ করেন।

দুষ্মন্ত বললেন,আমি তোমার প্রণয়প্রার্থী, হে অনিন্দিতা সুন্দরি,জেনে নাও,তোমাতেই আমার মন স্থিত হয়েছে, তোমাতেই লীন হয়ে আছে আমার হৃদয়। ত্বদর্থং মাং স্থিতং বিদ্ধি তদ্গতং হি মনো মম। রাজার যুক্তি হল, নিজে নিজের বন্ধু,নিজের গতি নিজেরই হাতে, শকুন্তলা ধর্মসঙ্গতভাবেই নিজেকে সমর্পণ করতে সক্ষম। রাজা ধর্মশাস্ত্রানুসারে বিবাহের আটটি প্রকারভেদ বর্ণনা করলেন। স্বায়ম্ভুব মনু কথিত আট প্রকার বিবাহ হল — যথাক্রমে, ব্রাহ্ম, দৈব, আর্ষ, প্রাজপত্য, আসুর, গান্ধর্ব, রাক্ষস ও পৈশাচ।

ব্রাহ্মণদের ক্ষেত্রে প্রথম চারটি বিবাহ প্রশস্ত, ক্ষত্রিয়ের ক্ষেত্রে শেষ ছয়টি বিবাহবিধি ধর্মসঙ্গত। রাজাদের ক্ষেত্রে আসুরবিবাহ হতে পারে, বৈশ্য ও শূদ্রদের ক্ষেত্রে আসুরবিবাহ ধর্মসঙ্গত বলে পরিগণিত হয়ে থাকে। প্রথম পাঁচটি বিবাহের মধ্যে অর্থাৎ ব্রাহ্ম, দৈব, প্রাজাপত্য, আসুর ও গান্ধর্ব বিবাহের মধ্যে ব্রাহ্ম, দৈব ও প্রাজাপত্য এই তিনটি বিবাহ সর্বোত্তম। অপর দুটি অর্থাৎ আর্ষ ও আসুর বিবাহ উপরোক্ত তিনটির তুলনায় নিকৃষ্ট। ব্রাহ্মণদের ক্ষেত্রে আসুরবিবাহ নিষিদ্ধ।সকল বর্ণের ক্ষেত্রেই পৈশাচবিবাহ প্রশংসনীয় নয়। রাজা শকুন্তলাকে আশ্বস্ত করলেন, গান্ধর্ব ও রাক্ষস বিবাহ, ক্ষত্রিয়ের পক্ষে ধর্মানুগ। দুই প্রকারের লক্ষণের মিশ্রবিবাহবিধি ধর্মসঙ্গত। এ বিষয়ে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই। আমি তোমাকে কামনা করি, তেমনই আমিও তোমাকে চাই। তাই গান্ধর্ববিবাহের মাধ্যমে তুমি আমার ভার্যা হওয়ার যোগ্যা। সা ত্বং মম সকামস্য সকামা বরবর্ণিনী। গান্ধর্ব্বেণ বিবাহেন ভার্য্যা ভবিতুমর্হসি।।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১২৪: আনন্দমূর্তি রামের অভাবে অযোধ্যায় নৈরাশ্যের ছায়া, বাস্তব জীবনেও কি আনন্দহীনতা অবসাদ ডেকে আনে?

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১২৭: রবীন্দ্রনাথের নামে ভিত্তিহীন অভিযোগ, ‘চোখের বালি’ নাকি চুরি করে লেখা

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১১১: পাতিকাক

শকুন্তলা বিবাহবিষয়ে শর্ত আরোপ করলেন,যদি এটিই ধর্মসঙ্গত হয়, যদি আমি সম্প্রদানবিষয়ে নিজেই নিজের প্রভু হই, তবে হে পৌরবশ্রেষ্ঠ, আমার শর্ত শুনুন। যদি ধর্ম্মপথস্ত্বেষ যদি চাত্মা প্রভুর্মম। প্রদানে পৌরবশ্রেষ্ঠ!শৃণু মে সময়ং প্রভো।। এই জনহীনস্থানে আমার বক্তব্য হল, আপনি এই মর্মে প্রতিশ্রুতি দিন, আমার যে পুত্র জন্মাবে সে আপনার জীবদ্দশায় যুবরাজরূপে স্বীকৃত হবে এবং আপনার পরবর্তী মহারাজ হবেন। রাজা দুষ্মন্ত আপনি যদি এতে সম্মত হন তবে সত্যের নামে শপথ করে বলছি, আপনার সঙ্গে আমার সঙ্গম সম্ভব হতে পারে। সত্যং মে প্রতিজানীহি যথা বক্ষ্যাম্যহং রহঃ। ময়ি জায়েত যঃ পুত্রঃ স ভবেত্ত্বদনন্তরঃ।। যুবরাজো মহারাজ!সত্যমেতদ্ ব্রবীমি তে। যদ্যেতদেবং দুষ্মন্ত! অস্তু মে সঙ্গমস্ত্বয়া।। রাজা শকুন্তলার শর্তটি কোন বিবেচনা না করেই তাঁর সিদ্ধান্ত প্রকাশ করলেন,তাই হোক, এবমস্ত্বিতি আরও জানালেন তিনি শকুন্তলাকে নিজ নগরে নিয়ে যাবেন। আবেগে শপথ বাক্য উচ্চারণ করলেন রাজা, শকুন্তলা সত্যিই রাজধানীতে বসবাসের উপযুক্ত। এই কথা বলে গান্ধর্ববিধিমতে শকুন্তলার পাণিগ্রহণ করে তাঁর সঙ্গে সঙ্গমে লিপ্ত হলেন রাজা। শকুন্তলার বিশ্বাস উৎপাদনের জন্য বারে বারে বলতে লাগলেন, তোমার জন্যে চতুরঙ্গ বাহিনী প্রেরণ করব, সেই বাহিনী তোমাকে নিজ প্রাসাদে নিয়ে যাবে।

শকুন্তলাকে এমন প্রতিশ্রুতি দিয়ে মহর্ষি কণ্বের বিষয়ে চিন্তা করতে করতে প্রস্থান করলেন। তপস্যার গৌরবে মহান ঋষি কণ্ব এই খবর শুনে, না জানি কি করবেন, এমন সব চিন্তা করতে করতে রাজা দুষ্মন্ত, নিজের নগরে প্রবেশ করলেন।কিছুক্ষণ পরে মহর্ষি কণ্ব আশ্রমে প্রত্যাবর্তন করলেন। সলজ্জা শকুন্তলা, পিতার মুখোমুখি হতে পারলেন না। দিব্যজ্ঞানী, মহাতপস্বী মহর্ষি কণ্ব, শকুন্তলা সম্বন্ধে সমস্ত বৃত্তান্ত জেনে, অলৌকিক দৃষ্টিদ্বারা সব কিছু অবগত হলেন। প্রীত ঋষি বললেন, হে মঙ্গলময়ি, আজ আমাকে অমান্য করে, গোপনে যা করেছ, এই পুরুষসংসর্গ ধর্মবিরুদ্ধ নয়। ত্বয়াদ্য ভদ্রে! রহসি মামনাদৃত্য যঃ কৃতঃ। পুংসা সহ সমাযোগো ন স ধর্ম্মোপঘাতকঃ।।
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৮৭: শুধু মুখে ধর্মের বুলি আওড়ালেই কেউ ধার্মিক হয়ে যায় না

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১২৬: মিটিং

মহর্ষির মতে, ক্ষত্রিয়ের পক্ষে গান্ধর্ববিবাহ শ্রেষ্ঠ মনে করা হয়। এই বিবাহ, নির্জনে কামী পুরুষের সঙ্গে কামার্তা নারীর মন্ত্রহীন বিবাহবিধি অনুসারে হয়ে থাকে। ধর্মাত্মা, মহান, পুরুষশ্রেষ্ঠ, দুষ্মন্তের পতিত্ব স্বীকার করেছেন শকুন্তলা। কণ্বের কণ্ঠে ভবিষ্যদ্বাণী উচ্চারিত হল, পৃথিবীতে শকুন্তলার গর্ভে মহাত্মা, মহাবলশালী পুত্র জন্ম গ্রহণ করবে,যে এই সসাগরা সমস্ত ধরণী ভোগ করবে। উদারমনা, সার্বভৌম সেই পুত্র শত্রুর প্রতি যখন ধাবিত হবে তখন সে হবে অপ্রতিহতগতি। শকুন্তলা, মহর্ষিকে ফল প্রভৃতির ভারমুক্ত করে, পাদুটি ধুইয়ে দিয়ে বিশ্রামরত ঋষিকে বললেন, পুরুষ শ্রেষ্ঠ রাজা দুষ্মন্তকে আমি স্বামীরূপে বরণ করেছি, আপনি সমন্ত্রী রাজার প্রতি অনুগ্রহ করুন। মহর্ষি কণ্ব জানালেন, শকুন্তলার এই বিবাহবিষয়ে ইতিমধ্যেই তিনি সন্তুষ্ট হয়েছেন। এখন শকুন্তলা, ঋষির কাছে যথেচ্ছ কাঙ্খিত বর প্রার্থনা করতে পারেন। শকুন্তলা দুষ্মন্তের সার্বিক হিতকামনার প্রার্থনা জানালেন, পৌরবদের ধার্মিকতা ও রাজ্যের স্থায়িত্ব যেন অক্ষুণ্ণ থাকে।

প্রতিশ্রুতিবদ্ধ দুষ্মন্ত বিদায় নেওয়ার পরে শকুন্তলা গর্ভস্থ অমিততেজস্বী পুত্রের জন্ম দিলেন। তিন বৎসর অতিক্রান্ত হলে সেই দুষ্মন্তপুত্র প্রদীপ্ত-অগ্নিশিখাতুল্য রূপ ও ঔদার্যগুণান্বিত হয়ে উঠল। সর্বোত্তম পুণ্যবান মহর্ষি কণ্ব, বিধিসম্মত উপায় অবলম্বন করে, বর্ধিত বুদ্ধিমান পুত্রটির জাতকর্ম প্রভৃতি সংস্কার সম্পন্ন করলেন। বালকটির শুভ্র দন্তপঙক্তি, সিংহসম শারীরিক গঠন, চক্রচিহ্নিত কর, কান্তিমান বালকটির মস্তকটি বিশাল,মহাবলশালী হয়ে উঠল সে। দেবশিশুর মতো বালকটি কণ্বাশ্রমে ক্রমে ছয় বৎসর বয়স পর্যন্ত বেড়ে উঠল। বালকটি, আশ্রমের কাছে সিংহ, বাঘ, বরাহ, মহিষ, গজ প্রভৃতি প্রাণীদের গাছের সঙ্গে বেঁধে রাখত। সে কখনও (বৃক্ষ বা পর্বতে) আরোহণ করে, কখনও বা (পশুদের) উৎপীড়ন করত, কখনও ক্রীড়াচ্ছলে ধাবিত হত।আশ্রমবাসীরা তার নামকরণ করলেন সর্বদমন। কারণ সে সকলকে দমন করে তাই তখন থেকে তার নাম হল সর্বদমন। অস্ত্বয়ং সর্ব্বদমনঃ সর্ব্বং হি দময়ত্যয়ম্। স সর্ব্বদমনো নাম কুমারঃ সম্পদ্যত।। সেই বালক, উৎসাহশক্তিতে, তেজে, বলবত্তায় পরিণত হয়ে উঠল।
আরও পড়ুন:

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৭০: ত্রিপুরায় বারবার দেশের ইংরেজ শাসন বিরোধী মানসিকতার প্রতিফলন ঘটেছে

রহস্য রোমাঞ্চের আলাস্কা, পর্ব-৬৩: অগত্যা আমার গাড়িতে বন্ধুদের নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম আলাস্কা ভ্রমণে

কুমারের অতিলৌকিক শক্তি ও কার্যকলাপ দেখে, মহর্ষি কণ্ব, শকুন্তলাকে বললেন, এর যুবরাজপদে অভিষিক্ত হওয়ার সময় হয়েছে। কণ্ব শিষ্যগণকে আদেশ দিলেন, তাঁরা যেন সর্বগুণান্বিত পুত্রসহ শকুন্তলাকে পতিগৃহে রেখে আসেন। কারণ নারীদের দীর্ঘদিন পিতৃগৃহে বাস, বন্ধু জনদের অভিপ্রেত নয়। নারীর কীর্তি, চরিত্র, ধর্ম, এর ফলে নষ্ট হয়ে থাকে। তাই হবে, এই বলে ব্রহ্মচর্যজনিত তেজের আধার কণ্বশিষ্যরা সপুত্র শকুন্তলাকে নিয়ে হস্তিনাপুরনগরের উদ্দেশে প্রস্থান করলেন। দুষ্মন্তকে যিনি বিশেষভাবে জানেন, সেই সুন্দরভ্রূবিশিষ্টা শকুন্তলা পদ্মনেত্র, দেবশিশুতুল্য পুত্রটিকে নিয়ে সেখানে উপস্থিত হলেন। শকুন্তলার উপস্থিতির কথা রাজা দুষ্মন্তকে জানানো হল, রাজার অনুমতিক্রমে নবোদিত সূর্যসম তেজস্বী পুত্রটিসহ শকুন্তলা প্রবেশ করলেন। কণ্বশিষ্যরা স্বস্থানে প্রস্থান করলেন। শকুন্তলা রাজাকে যথারীতি সম্মান প্রদর্শন করে বললেন, অয়ং পুত্রস্ত্বয়া রাজন্!যৌবরাজ্যে অভিষিচ্যতাম্। হে রাজন, আপনার এই পুত্রটিকে যৌবরাজ্যে অভিষিক্ত করুন। আরও বিশদে জানালেন শকুন্তলা,এই দেবশিশুর মতো পুত্রটি আপনার ঔরসে আমার গর্ভজাত। আপনি এখন শর্ত রক্ষা করুন।

মহর্ষি কণ্বের আশ্রমে সঙ্গমকালে রাজার কৃত শপথের কথা স্মরণ করিয়ে দিলেন। শকুন্তলার কথা শুনে, সমস্ত বৃত্তান্ত রাজার স্মরণে এলেও, রাজা অস্বীকার করে বললেন, অব্রবীন্ন স্মরামীতি কস্য ত্বং দুষ্টতাপসি। আমি স্মরণ করতে পারছি না, হে দুষ্টতপস্বিনি,তুমি কার লোক? রাজা প্রত্যাখ্যানের ভাষা হল —ধর্ম, অর্থ, কামের সঙ্গে সম্বন্ধযুক্ত তোমার সঙ্গে কোনও ঘটনার স্মৃতি আমার নেই।তুমি ইচ্ছেমতো যেখানে খুশি যাও বা থাক, যা ইচ্ছে তাই কর। ধর্ম্মকামার্থসম্বন্ধং ন স্মরামি ত্বয়া সহ। গচ্ছ বা তিষ্ঠ বা কামং যদ্বাপীচ্ছসি তৎ কুরু।। সম্বোধন ও রাজার বক্তব্য শুনে তপস্বিনী শকুন্তলা, লজ্জায় চেতনা হারিয়ে,প্রবল কষ্টে স্তম্ভের মতো নিশ্চলা হলেন। ক্রোধ ও অস্থিরতাবশত তাম্রবর্ণ হল নয়নদুটি, তাঁর ওষ্ঠদ্বয় থরথর করে কেঁপে উঠল। কটাক্ষে রাজাকে দগ্ধ করতে করতে তিনি রাজার প্রতি বক্রদৃষ্টি নিক্ষেপ করলেন। নিজের ক্রোধান্বিত আকৃতি গোপন রেখে, শকুন্তলা, তপোবলে সংগৃহীত তেজ ধারণ করলেন।
আরও পড়ুন:

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-৮ : গরুর চোখে জল

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-১১০: মা সারদার মানবীলীলার অবসান

মৃগয়াবিহারী রাজা দুষ্মন্ত, কণ্বাশ্রমে আশ্রমকন্যা শকুন্তলার প্রণয়প্রার্থী হলেন। তাঁর কণ্ঠস্বরে ছিল মুগ্ধতা, বিবাহ নামক প্রাতিষ্ঠানিক সিলমোহর দিয়ে যে কোনও উপায়ে নিষ্পাপ, সরলা, আশ্রমকন্যার যৌবনোপভোগ ছিল তাঁর লক্ষ্য। যে কোনও বিবাহের ক্ষেত্রেই লম্পটদের কোন ছলের অভাব হয় না। গান্ধর্ববিবাহের অছিলায় রাজা ক্ষণিক দৈহিক সুখ, কামোপভোগের আনন্দ চরিতার্থ করেছেন। শকুন্তলার জন্মবৃত্তান্ত অবগত হওয়ার হয়তো কোনও প্রয়োজনই ছিল না। দুরাত্মা মানুষ, নিজের মতানুসারেই শাস্ত্রের ব্যাখ্যা করে থাকেন। ছলে, বলে, কৌশলে কার্যোদ্ধার তার লক্ষ্য। এখানে রাজা ছলনা ও কৌশল প্রয়োগ করে আশ্রমবালিকা শকুন্তলাকে প্রভাবিত করেছেন। পিতার সম্মতির অপেক্ষা করলেন শকুন্তলা। সেই পিতা-অন্তঃপ্রাণ শকুন্তলার মনটিকে নমনীয় করে তুললেন রাজা, তাঁরা বহুবল্লভা, মধুকরবৃত্তি তাঁর স্বভাব,ফুলে ফুলে মধু ভক্ষণ করে যে মধুমক্ষিকা, কামার্ত রাজারাও তেমনই এক নারী থেকে অপর নারীতে আসক্ত হন নারীর সৌন্দর্য উপভোগের তাগিদে।

রাজা দুষ্মন্ত কথিত আট প্রকার বিবাহ বিধি হল – বরকে আহ্বান করে সালঙ্কারা কন্যাদান ব্রাহ্মবিবাহ।যজ্ঞকর্তা ঋত্বিককে কন্যাদান ব্রাহ্মবিবাহ। বরের কাছে থেকে গোমিথুন গ্রহণ করে কন্যাদান আর্ষবিবাহ। প্রার্থী বরের সঙ্গে একযোগে ধর্মাচরণের অঙ্গীকারের মাধ্যমে প্রাজাপত্য বিবাহবিধি সম্পন্ন হয়। বরের কাছে থেকে যথেষ্ট অর্থের বিনিময়ে কন্যাদান আসুর বিবাহ। বর ও বধূ পরস্পরের প্রতি অনুরক্ত হয়ে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হলে সেটি গান্ধর্ব বিবাহ। যুদ্ধ করে বলপ্রয়োগ করে কন্যাকে হরণ করে যে বিবাহ সেটি রাক্ষস বিবাহ। নিদ্রিতা কন্যার সঙ্গে বলপূর্বক সঙ্গমে লিপ্ত হয়ে যে বিবাহ সম্পন্ন হয় সেটি পৈশাচ বিবাহ।
কলকাতায় বৃষ্টি

ছবি: প্রতীকী।

রাজা দুষ্মন্ত গান্ধর্ব বিবাহের প্রতিশ্রুতি দিয়ে কার্যত গান্ধর্ব ও রাক্ষস এই মিশ্র বিবাহ বিধির আশ্রয় নিয়েছেন। যুদ্ধ করে নয়,অলিখিত মানসযুদ্ধের আশ্রয় নিয়ে নির্মলা এক কুমারীর কৌমার্য হরণ করেছেন। শকুন্তলার ব্যক্তিত্বে দৃঢ়তা ছিল, তিনি তাঁর ভাবী পুত্রের রাজ্যাধিকারের জন্যে বিবাহে শর্ত আরোপ করেছেন। নির্জনে কৃত রাজার শর্তরক্ষার প্রতিশ্রুতি ছিল শুধু তাৎক্ষণিক বাচিক প্রতিশ্রুতিমাত্র। রাজার শর্তরক্ষার শপথে না ছিল নিষ্ঠা, না সততা। ছিল শুধু দ্বিচারিতাময় স্তোকবাক্য। সারল্যের প্রতিমূর্তি শকুন্তলা রাজার প্রস্তাব মেনে নিয়েছেন, যেমন আধুনিক যাপনচিত্রে এমন মেনে নেওয়ার দৃষ্টান্ত প্রায়শই সংবাদপত্রে খবর হয়ে ওঠে। এই রকম সহবাসের প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে কোন নারীকে সঙ্গমে লিপ্ত করার প্রবণতায় রাজা দুষ্মন্ত বোধ হয় পথিকৃৎ। সেই থেকে ভরতবংশীয়দের মধ্যে এই প্রবণতা লুপ্ত হয়নি বরং বেড়েই চলেছে।প্রশাসনিক প্রধান যখন নিজেই অসততার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন তখন সমাজ, সংসারের পক্ষে সেটি বোধ হয় অনুকূল নয়।

এখন প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের ফলে এই বিষয়ে আইনানুগ প্রতিবিধানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। মানুষের জৈব প্রবৃত্তির তাগিদ চিরন্তন। নিয়মের নিগড়ে বাঁধবার প্রবণতা হল বিবাহ নামক প্রতিষ্ঠানের আশ্রয় নেওয়া। রাজা সেই বিবাহের পরস্পরের অনুরাগের অঙ্গীকারকে অসম্মান করেছেন, বিবাহবিধিকে কলুষিত করেছেন। প্রশাসনিক সর্বোচ্চ পদাধিকারীর পক্ষে যা নিতান্তই অবৈধ ও অসঙ্গত। সেই ট্র্যাডিশন এখনও অব্যাহত। পুত্রসন্তানের মুখ পিতার হৃদয়ে করুণার উদ্রেক করতে পারে না। হতে পারে রাজা দুষ্মন্ত, তখন হয়তো অন্য কোনও সুন্দরীর সঙ্গে সম্পর্কে লিপ্ত হয়েছেন। রাজার স্মৃতিতে শকুন্তলার উজ্জ্বল উপস্থিতি অথচ তিনি অস্বীকার করছেন সম্পর্কের সূত্রটি। নারীত্বের এমন অবমাননা এ যুগেও বিরল নয় বরং নিতান্তই সুলভ দৃষ্টান্ত। রাজা দুষ্মন্তরা, তঞ্চকতার মুখোশ পড়ে সমাজে প্রণয়ীর ছদ্মবেশে, এখনও আছেন অন্য নামে, অন্য পরিচয়ে, আজও।—চলবে।
* মহাকাব্যের কথকতা (Epics monologues of a layman): পাঞ্চালী মুখোপাধ্যায় (Panchali Mukhopadhyay) অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপিকা, সংস্কৃত বিভাগ, যোগমায়া দেবী কলেজে।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content