শনিবার ৭ মার্চ, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি
এই প্রথমবার তৃপ্তি জেলে গিয়ে দুলালের সঙ্গে দেখা করল।
—আমি জানি তোমার ভয়ঙ্কর খারাপ লাগছে এখানে এসে, আর কখনও এসো না, আজই শেষবারের মতো আমি তোমাকে ডেকেছি। তৃপ্তি, জানি না কার অভিশাপে আমাদের জীবনটা ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল। একমাত্র শান্তি যে ফাদার স্যামুয়েল অতনুর সব দায়িত্ব নিয়েছেন। বাড়ির দলিল টাকাপয়সা গয়নাগাটি যা আছে, মণির বরকে বোলো সেগুলো তোমার আর অতনুর নামে করে দিতে। এখনই। আর যেন দেরি না করে। আমি মণির বরকে বলেছি সে যেন মণিকে এ নিয়ে কিছু না জানায়। সন্তান হারিয়ে সে এখনও মানসিকভাবে পুরোপুরি সুস্থ নয়! আর দিদিদের তো নয়ই, তারা যখন কোনও যোগাযোগ রাখে না… যাই হোক যেটা বলতে ডেকেছি, তুমি আর উকিলের পেছনে আর একটা পয়সাও খরচা করবে না।
—কী বলছ তুমি?
— ঠিকই বলছি। ভারতবর্ষের সেরা উকিল এলেও মহেশ্বরী তাকে কিনে নেবে! আমি আমার লড়াই একাই লড়বো!
—তা কি হয় নাকি?
— হয় ! আমাদের সংবিধান আমাদের সেই অধিকার দিয়েছে!
— কিন্তু তুমি তো আইন পড়োনি!
—যাঁরা আইন পড়ে এসেছিলেন তারা তো বেআইনি কাজ করছেন, তাদের পেছনে আর পয়সা খরচা করার কোন মানে নেই। নিজেই দেখি চেষ্টা করে।
আবার সেদিন রাতে ছেলে অতনুকে নিয়ে ছাদে অন্ধকার খোলা আকাশের নিচে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল তৃপ্তি।
—কাল তোকে চার্চে ফাদার স্যামুয়েলের কাছে দিয়ে আসব। এখানকার স্কুলে তুই টিকতে পারবি না। লোকজন তোকে মন দিয়ে পড়াশোনা করতে দেবে না। কিন্তু তোকে অনেক বড় হতে হবে। আমি বা তোর বাবা লড়াইয়ে যদি হেরে যাই, বড়ো হয়ে লড়াইটা কিন্তু তোকে করতে হবে তনু! এইসব অন্যায়ের প্রতিশোধ নিতে হবে সেদিন। আর একটা কথা, ফাদার স্যামুয়েলের কাছে চার্চের কাছে আমাদের ঋণের কোনও শেষ নেই, সেটা কোনোদিন ভুলিস না! তাঁর জন্যে শিক্ষার যে সুযোগ তুই পাবি, তার একটা মিনিট একটা কণাও যেন বৃথা না যায়!
আরও পড়ুন:

উপন্যাস: আকাশ এখনও মেঘলা, পর্ব-৪৭: আকাশ এখনও মেঘলা

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-১২: এ দিন যাবে, রবে না

পিতার ঔজ্জ্বল্য কখনও ম্লান হয়নি পুত্রের খ্যাতিতে

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৮৬: বক্সনগরে আবিষ্কৃত হয়েছে বৌদ্ধ স্তুপ, চৈত্যগৃহ ও একটি মঠ

অন্যদিকে দুলাল তার সব সততা দিয়ে তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া অপবাদ থেকে মুক্তি পাবার চেষ্টা করেছিল। পাবলিক প্রসিকিউটার ছাড়াও স্নিগ্ধার হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন কলকাতার একরাশ নামি ব্যারিস্টার। আইনের ঘোরপ্যাঁচে তারা দুলালকে ছিন্নবিচ্ছিন্ন করে দিলেন। আইনের ধারা-উপধারাকে অস্ত্রের মতো ব্যবহার করে বুঝিয়ে দিলেন, একজন ধর্ষক কখনও বলতে পারেন না, তিনি অপরাধ করেননি। কারণ অপরাধের কোন সাক্ষী নেই। অপরাধ ঘটে যাওয়ার ঠিক পরমুহূর্তের ভিডিও রয়েছে। সেখানে মানুষ অপমানিতা মেয়েটির শরীরের অবস্থা জামাকাপড়ের অবস্থা দেখেছে এবং এইজন্যেই আইনের ধারায় উপধারায় বলা হয়েছে যার ওপর অত্যাচার হয়েছে তার কথাই শেষ কথা।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৩০: কাদাখোঁচা

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৭৬ : মায়ামৃগ

মাসখানেক টানা শুনানির পর সাজা হল। প্রচুর মামলা জমে যাচ্ছে, মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি করাটা খুব জরুরি! দশজন অপরাধী মুক্তি পেলেও কোনও নিরাপরাধী যেন সাজা না পায়- দুলাল এই শব্দবন্ধটা কোথায় যেন শুনেছিল। তবু তার সাজা হল, প্রাপ্ত প্রমাণের ভিত্তিতে আইপিসি ৩৫৪ অনুযায়ী দু’ বছরের সশ্রম কারাদন্ড এবং ২৫ হাজার টাকা জরিমানা। জরিমানা অনাদায়ে আরও এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ড!
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৪৫: জরুরি একটি ফোন

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৪০: রামের সত্যরক্ষা, প্রবাদপ্রতিম রামরাজ্যের স্রষ্টার বৈরাগ্যের রূপ

সেই দিনই চার্চ থেকে অতনু চলে গেছে কলকাতার মিশনারি স্কুলের হোস্টেলে। দুপুরে তার সাথে দেখা করে এসে বাড়ির দরজা বন্ধ করে খোলা ছাতে আকাশের দিকে তাকিয়ে বসেছিল তৃপ্তি। একটা অসম্ভব দোটানা ছিল! ফাদার স্যামুয়েল বলেছেন ঈশ্বর সব দেখছেন। বারবার উকিলদের ঘুষ দিয়ে নিজের পক্ষে টেনে নিয়েছে চটকল মালিক কানাইলাল মহেশ্বরী। মিথ্যে অপবাদ দিয়ে স্নিগ্ধা মাথা উঁচু করে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আর দুলালের অপবাদের ভাগীদার হয়ে তৃপ্তি যেন মাথা তুলতে পারছে না। শ্রমিক ইউনিয়নের একটি ছেলে তৃপ্তিকে বলেছিল যে তাকে আদালতে নিয়ে যাবে মণির বরও বলেছিল। তৃপ্তি আদালতে যায়নি। ছাদ থেকে দেখতে পেল সেই ছেলেটি সাইকেল নিয়ে আসছে।
আরও পড়ুন:

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-১৭ : কাঞ্চনজঙ্ঘা: দেখা হবে চন্দনের বনে

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৪৩: মাঝ-রাতে আশ্রমে একটি বালক কাঁদছিল কেন?

একটি আলসের ধারে ছুটে এসে চিৎকার করে জানতে চাইল—
—ভাই আজ কোর্টে কি হল?
ছেলেটি সাইকেল থেকে নেমে একমুহূর্ত মাথা নিচু করে তারপর চিৎকার করে কেঁদে উঠে বলল
—আজ সব শেষ হয়ে গেল বৌদি! দুলালদার দু’ বছরের জেল ২৫ হাজার টাকা জরিমানা না দিলে আরো এক বছর। হিসাবে চিন্তা করবেন না আমরা চাঁদা তুলে হায়ার কোর্টে আপিল করব!

ছাতের আলসের একটা অংশের পাঁচিলটা ভেঙে গিয়েছে। সারাবে সারাবে ভেবেছিল, সারানো হয়নি। সেখানটা একটা বাঁশের আগল দেওয়া আছে। তৃপ্তি সেই জায়গাটার দিকে উদ্ভ্রান্তের মত এগিয়ে আসছে।
ছেলেটা সদর দরজার বাইরে থেকে ছাদের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে—
—বৌদি সাবধান! পড়ে যাবেন! পাঁচিলটা যে ভাঙ্গা!
তৃপ্তি যেন কোনও কিছু শুনতে পাচ্ছে না, চোখে দেখতে পাচ্ছে না সামনে পাঁচিল নেই। পড়ে থাকা বাঁশটা জল পড়ে পচে গিয়েছে, টলতে টলতে এগিয়ে আসা তৃপ্তির পা লেগে ক্ষয়ে যাওয়া ভঙ্গুর বাঁশের কঙ্কালটা মট করে ভেঙে গেল।
— বৌদি!
পাড়ার লোকজনকে নিয়ে সদর দরজা ভেঙে ভেতরে এসে দেখা গেল উঠোনে তৃপ্তির দলাপাকানো শরীরটা থকথকে রক্তে ভেসে যাচ্ছে। টকটকে লাল কাঁচা রক্ত!—চলবে।

* জিৎ সত্রাগ্নি (Jeet Satragni) বাংলা শিল্প-সংস্কৃতি জগতে এক পরিচিত নাম। দূরদর্শন সংবাদপাঠক, ভাষ্যকার, কাহিনিকার, টেলিভিশন ধারাবাহিক, টেলিছবি ও ফিচার ফিল্মের চিত্রনাট্যকার, নাট্যকার। জিৎ রেডিয়ো নাটক এবং মঞ্চনাটক লিখেছেন। ‘মেঘে ঢাকা ঘটক’ নাটকের রচয়িতা, ‘বুমেরাং’ চলচ্চিত্রের কাহিনিকার। প্রকাশিত হয়েছে ‘জিৎ সত্রাগ্নি’র নাট্য সংকলন’, উপন্যাস ‘পূর্বা আসছে’ ও ‘বসুন্ধরা এবং…(১/২/৩ খণ্ড)’ ও নাটক ‘মেঘে ঢাকা ঘটক’। এখন লিখছেন ‘হ্যালো বাবু’এবং ‘আকাশ এখনও মেঘলা’।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content