রবিবার ৮ মার্চ, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি

ছবি: সংগৃহীত।

কয়েকটা মুহূর্ত স্নিগ্ধা মাথা নিচু করে বসেছিল। বাড়িতে দুলালদা যে দিন সরাসরি মায়ের প্রস্তাবে না বলে দিয়েছিল, সেদিন হঠাৎ করে এমনটা হয়েছিল। ঠিক সেরকম হঠাৎ মাথাটা ভয়ংকর ফাঁকা লাগছে। কান যেন গরম হয়ে উঠছে। আশপাশটা হঠাৎ খালি হয়ে গিয়েছে। কিচ্ছু নেই। যেন একটা বিরাট উঁচু পাহাড়ের একেবারে খাদের কোণে এসে দাঁড়িয়েছে স্নিগ্ধা। মাথা নিচু করলে চোখ খুলে তাকাতে পারছে না, আকাশের দিকেও তাকাতে পারছে না, সারা গা-হাত পা বেয়ে যেন মিনমিন করে ঘাম দিচ্ছে।
কাঁধের পাশে একটা আলতো ছোঁয়া। প্রিন্সিপাল ম্যাডাম পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। কাপড়ের আঁচল দিয়ে মুখটা মুছে নিয়ে স্নিগ্ধা চোখ খোলে, তারপর দাঁড়িয়ে উঠে!
— আমি এখন আসি না হলে বাড়ি ফিরতে দেরি হয়ে যাবে।
— আমি তোমায় আটকাবো না ভাই ! একা এসেছো, কল্যানী থেকে চুঁচুড়া অনেকটা রাস্তা!
উদ্ভ্রান্তের মতো স্নিগ্ধা ঘর থেকে চৌকাঠের কাছে পৌঁছে গেছে হঠাৎ কি ভেবে ঘুরে তাকালো।
—কিছু বলবে?
—না লিখে যাব! একটা চিঠি, একটু কাগজ হবে।
— বসো!
আরও পড়ুন:

আকাশ এখনও মেঘলা/৪২

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-৭: কেমন আছেন সুনীতি, নদীর নরম ছেড়ে সমুদ্রের নুনে!

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৩৮: পার্ক স্ট্রিট থেকে মহর্ষি ফিরে এসেছিলেন জোড়াসাঁকোয়

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৩৬: এক অনন্য অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ রামচন্দ্রের অরণ্যবাস

ট্রেনের জানলার ধারে বসে ছিল স্নিগ্ধা। চোখের সামনে দিয়ে একে একে স্টেশনগুলো চলে যাচ্ছে। গৌরহট্ট-মাটিয়ারী-গোপালপুর।
প্রিন্সিপাল ম্যাডাম রাইটিং ক্লিপে লাগিয়ে ফুলস্কেপ কাগজ দিয়েছিলেন। পাশে একটা খাম। স্টেপলার এবং সেলোটেপ। উনি জানেন খোলা চিঠি রেখে যেতে কেউ চাইবেন না। তাই বলার আগেই সব গুছিয়ে দিয়েছেন। লম্বা সাদাপাতাটার দিকে তাকিয়ে স্নিগ্ধা ভাবছিল কী লিখবে? কী লেখা উচিত? স্কুলে খুব ইচ্ছে ছিল, কিন্তু চিঠি লিখে প্রেম করা হয়নি।
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৪০: কেঁচো খুঁড়তে কেউটে

সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১২৪: সুন্দরবনের পাখি: গোত্রা

দুলালদা তো ধরাছোঁয়ার বাইরেই রয়ে গেল! তবে স্নিগ্ধা চিঠিটা গুছিয়ে লিখতে পারে। স্কুলে কয়েকজন বান্ধবীর প্রেমিককে, বান্ধবীদের বয়ানে প্রেমে ভরপুর চিঠি লিখে দিত। নিজের হাতের লেখা পাল্টে পাল্টে লিখতে পারে স্নিগ্ধা।
আপনি বলবো না তুমি বলবো ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না। তাই কোনও সম্বোধন ছাড়াই শুরু করে দিলাম, মায়ের শরীর ভালো নয়। তাই চুঁচুড়ায় যাবার জন্য ব্যাগ নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলাম।
আরও পড়ুন:

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৭৯: ‘বেতারে দু-খানা গান গাইলাম, পারিশ্রমিক পেলাম দশ টাকা’

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-১৩ : জনঅরণ্য: সরস্বতী না লক্ষ্মী?

কলম থমকে ভেবে নিলো কয়েকমুহূর্ত! মায়ের শরীর খারাপের অজুহাতটা মিথ্যে। কিন্তু মিথ্যেটা সবসময় বজায় রাখতে হয়। আবার লেখা শুরু করল—
স্টেশনে এসে মত বদলে মনে হল, আমার মোহনপুর যাওয়া উচিত! দুম করে এসে চমকে দেবো, মেসে থাকার জায়গা তো হবে না। কাছেপিঠে কোথাও হোটেলে আমায় তুলতে হবে। কিন্তু এসে দেখা পেলাম না। তারপর সব জানতে পেরে আমিই নিজে চমকে গেলাম। ঈশ্বর আমার জন্য যে এত বড় চমক সযত্নে গোপন করে রেখেছেন, তা আমি ধারণাও করতে পারিনি।

পুরুষ হয়ে আর একজন পুরুষের সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কে লিপ্ত আজ বহু বছর। তাহলে প্রথাগত বিয়েতে রাজি হয়েছিলেন কেন? একজন মানুষকে এভাবে ঠকালেন কেন? না, যে যেভাবে ব্যাখ্যা করতে চান, করুন! আমি আপনাদের সম্পর্ককে কোনও মর্যাদা দিই না! এটা বিকৃত অস্বাভাবিক ব্যভিচার এবং মানসিক বিকার বলে আমি মনে করি। সঠিক সময়ে মানসিক চিকিৎসা হলে সুস্থ স্বাভাবিক হওয়া যেত। হ্যাঁ! আমার সন্দেহ একটা হয়েছিল। কিন্তু ভেবেছিলাম আমাদের মধ্যে কোনও তৃতীয় নারী রয়েছে। তাই আমার গয়নাগাটি এবং দামি শাড়ি সঙ্গের সুটকেসে নিয়েই বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলাম। এখানে এসে দেখলাম যে আমি ঠিকই করেছি। আমি বাড়ি চলে যাচ্ছি! কোনও নপুংসকের মুখদর্শন করারও কোনও স্পৃহা নেই! কোর্টে গিয়ে বিবাহবিচ্ছেদের মামলা করলে জগতসংসারের সামনে নিজের শারীরিক অক্ষমতা প্রকাশ পেয়ে যাবে সুতরাং সে চেষ্টা বৃথা! আমার কোনও অস্তিত্ব রাখতে চাইনা, তাই চিঠির শেষে নিজের নামটা লিখতে ঘৃণা হচ্ছে।
আরও পড়ুন:

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৬৬: জীবন নিয়ে কৌতুক আর ‘যৌতুক’

রহস্য রোমাঞ্চের আলাস্কা, পর্ব-৬৫: একদিকে জল, অন্যদিকে পাহাড় সিউয়ার্ডের রাস্তা যেন স্বর্গদ্বার!

স্নিগ্ধা ভেবেছিল পাতাটা সাদাই থেকে যাবে। কিন্তু লেখা শেষ করার পর দেখল অনেকটা লিখে ফেলেছে!
চিঠি খামের মধ্যে ঢুকিয়ে খামে স্টেপল করে দিল। প্রিন্সিপাল ম্যাডাম বললেন।
—স্টেপল পিনের উপর দিয়ে সেলোটেপ লাগিয়ে দাও!
—কোনও প্রয়োজন নেই।
—আছে। আর হ্যাঁ খামের ওপর নামটা
—হাতে করে নামটা লিখতে আমার ঘৃণা হচ্ছে!
—কিছু খাবে? একটু জল?
—না আমি আসি! দেরী হয়ে যাবে! আপনাকে অনেক ধন্যবাদ!
হঠাৎ স্নিগ্ধা দেখল ট্রেন বালিয়াডাঙ্গা ঢুকছে। তার মানে কাঁচরাপাড়া, হালিশহর পেরিয়ে এসেছে। এরপরেই নৈহাটি, সেখানে নামতে হবে।—চলবে।

* জিৎ সত্রাগ্নি (Jeet Satragni) বাংলা শিল্প-সংস্কৃতি জগতে এক পরিচিত নাম। দূরদর্শন সংবাদপাঠক, ভাষ্যকার, কাহিনিকার, টেলিভিশন ধারাবাহিক, টেলিছবি ও ফিচার ফিল্মের চিত্রনাট্যকার, নাট্যকার। জিৎ রেডিয়ো নাটক এবং মঞ্চনাটক লিখেছেন। ‘মেঘে ঢাকা ঘটক’ নাটকের রচয়িতা, ‘বুমেরাং’ চলচ্চিত্রের কাহিনিকার। প্রকাশিত হয়েছে ‘জিৎ সত্রাগ্নি’র নাট্য সংকলন’, উপন্যাস ‘পূর্বা আসছে’ ও ‘বসুন্ধরা এবং…(১/২/৩ খণ্ড)’ ও নাটক ‘মেঘে ঢাকা ঘটক’। এখন লিখছেন ‘হ্যালো বাবু’এবং ‘আকাশ এখনও মেঘলা’।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content