
ছোটবেলাতে মা-বাবাকে একসঙ্গে হারিয়েছিল নাগা সন্ত্রাসবাদিদের আক্রমণে। ২৩ এপ্রিল ১৯৬৬ তৃপ্তির বয়স তখন মাত্র তিন বছর। তার ভাইয়ের বয়স এক। বাবা আসামের তিনসুকিয়ায় চা বাগানে কাজ করতেন। বহু চেষ্টার পর চা বাগানের মালিকরা তাকে তিনসুকিয়া থেকে শিলিগুড়ি চাবাগানে বদলি করেছিলেন। ছেলে মেয়ে দুজনেই বড্ড ছোট তাই শ্যামনগরের বাড়িতে জেঠু-জেঠিমার কাছে রেখেই তৃপ্তির মা গিয়েছিলেন আসাম থেকে তার বাবাকে শিলিগুড়ির নতুন কোয়ার্টার গুছিয়ে দিতে আসতে। অত ব্যাগপত্র একা মানুষের পক্ষে সামলানো মুশকিল। অনেক চেষ্টার পর মানুষটা ঘরের কাছে ফিরে আসছে সবাই খুব খুশি।
তিনসুকিয়া থেকে নিউ জলপাইগুড়ি যাবার পথে ট্রেনটা আসামের ডিফু স্টেশনে দাঁড়িয়েছিল। আসামে তখন নাগাল্যান্ডের জাতিগত সংঘাতের প্রভাব পড়েছে। সন্দেহভাজন নাগা বিদ্রোহীরা মানুষের মনে ভয় সঞ্চারিত করার জন্য জলপাইগুড়ি যাবার যাত্রী বোঝাই ট্রেনটাকে বোমা দিয়ে উড়িয়ে দিল। তৃপ্তির মা-বাবা-সহ সরকারিভাবে ৪১ জন মারা গিয়েছিলেন। আহতর সংখ্যা ৮১। যদিও কাগজপত্রে সেই সময় বেরিয়েছিল বেসরকারিভাবে সংখ্যাটা অনেক অনেক বেশি। সেই থেকে তৃপ্তি আর তার ভাই জ্যাঠামশাই জেঠিমার কাছেই মানুষ হয়েছে। তারপর হল সেই ভয়ংকর ১৯৮২ সালের কালীপুজো। ১৪ নভেম্বর, সেটা রবিবার ছিল। পরদিন ১৫ সোমবার কালীপূজো নিয়ে গণ্ডগোল। দু’দলে বোমাবাজি। আসলে কালীপুজোতে উপলক্ষ মাত্র। আসল লড়াইটা রাজনৈতিক দখলদারির।
আরও পড়ুন:

আকাশ এখনও মেঘলা/পর্ব-৩০

গল্পবৃক্ষ, পর্ব-৩৬: বরুণজাতক: অলস মস্তিষ্কের গল্প

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১২৭: রবীন্দ্রনাথের নামে ভিত্তিহীন অভিযোগ, ‘চোখের বালি’ নাকি চুরি করে লেখা

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১১২: দাঁড়কাক
তৃপ্তির ভাই সেই বোমাবাজির মধ্যে পড়ে প্রাণ দিল। না রাজনৈতিক দল, না পুলিশ—কেউ সেই খুনের কোনও দায়িত্ব নিল না। পোস্টমর্টেম হলেও তাতে কি পাওয়া গেল সেটা জানা গেল না। জ্যাঠামশাই জেঠিমার বয়স হয়েছে, তারা নিঃসন্তান। তৃপ্তি আর তার ভাইকে নিয়েই তারা বেঁচে ছিলেন। এই নিয়ে বলার কেউ ছিল না। কিন্তু সংসারে কথা শোনানোর লোকের কোনও অভাব হয় না। কানাঘুষো এ কথা শোনা যেত, মেয়েটা অপয়া। বাবা-মাকে খেয়েছে, এবার জলজ্যান্ত ভাইটা দুম করে মরে গেল। তৃপ্তি কলেজে পড়ার কথা ভাবেনি। মন খারাপ করে বাড়িতেই থাকতো তার মধ্যে কোনও একটা সূত্রের দুলালের সঙ্গে সম্বন্ধ হতে জেঠু জেঠিমা যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন!
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৮৭: শুধু মুখে ধর্মের বুলি আওড়ালেই কেউ ধার্মিক হয়ে যায় না

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৭০: ত্রিপুরায় বারবার দেশের ইংরেজ শাসন বিরোধী মানসিকতার প্রতিফলন ঘটেছে
সারাক্ষণ আতঙ্কে থাকা নিজের দুর্ভাগ্য নিয়ে নিজেকে সন্দেহ করতে থাকা তৃপ্তিও যেন নিশ্চিন্ত হয়েছিল। কিন্তু বৌভাতের দিনে মূর্তিমান বিভীষিকার মতো সামনে এসে দাঁড়ালো স্নিগ্ধা। মণি তৃপ্তির বড় বল-ভরসা ছিল তার ডাকাবুকো ছোটননদ যেন স্নিগ্ধার আক্রমণ থেকে তাকে আগলে রাখবে এরকম একটা ধারণা হয়েছিল তৃপ্তির। শাশুড়ি মাও তার কাছে একটা বড় আশ্রয়! অতনুকে ঘিরে তার অনেক স্বপ্ন। এসবের মাঝেই আবার অঘটন। শাশুড়ি মা চলে গেলেন সেই নিয়ে আচমকা সাংসারিক অশান্তি, সম্পর্কের অবনতি। তারপর মণির জীবনে দুর্যোগ নিজের কপালে অদৃশ্য অক্ষরে লেখা দুর্গতির জন্য আবার নিজেকে সন্দেহ করতে শুরু করল তৃপ্তি।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১২৫: আজও আধুনিক সমাজ রাজা দুষ্মন্তের তঞ্চকতা এবং দ্বিচারিতার দূষণমুক্ত নয়

রহস্য রোমাঞ্চের আলাস্কা, পর্ব-৬৩: অগত্যা আমার গাড়িতে বন্ধুদের নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম আলাস্কা ভ্রমণে
দুলালকে নিয়ম-কানুন দিয়ে বাঁধতে না পেরে মালিকপক্ষ বেপরোয়া হয়ে উঠল! তারা দুলালের ব্যক্তি জীবনের খোঁজ খবর নিতে শুরু করল। সমস্ত সৎ ভালোলোকের সমর্থনে অনেক লোক থাকে কিন্তু তার বিরুদ্ধে সমালোচনা করার লোকজনও আমাদের সমাজে কম নয়। এই নিন্দুকেরা সরাসরি মুখ খুলে খারাপ হয় না। কিন্তু আড়ালে আবডালে অসত্য অর্ধসত্য কুৎসা টেনে এনে নোংরামি করতে পাশবিক আনন্দ পায়!
আরও পড়ুন:

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-৯ : মণিহারা: করিডর, সেজবাতি আর…

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-১১০: মা সারদার মানবীলীলার অবসান
পয়সাওয়ালা ব্যবসায়ীর খবর জোগাড় করে দেওয়ার চর অনুচরের অভাব হয় না। এক্ষেত্রেও তারা অতীত থেকে স্নিগ্ধার সঙ্গে দুলালের সম্পর্কের কথা জানতে গিয়ে সরাসরি স্নিগ্ধার মা ছন্দার কাছে গিয়ে পৌঁছল। নিজের মেয়ের বিয়ে সুখের হয়নি, খাতায়-কলমে ডিভোর্স না হলেও স্নিগ্ধা চিরকালের জন্য বিবাহ বিচ্ছিন্ন অবস্থাতেই শ্বশুরবাড়ি ছেড়ে বাপের বাড়িতে থেকে গিয়েছে। বয়স বেড়ে যাচ্ছে। আবার দ্বিতীয়বার বিয়ে করতে সে চাইছে না। এদিকে দুলালের বিয়ে হয়েছে, তার ঘরে ফুটফুটে ছেলে হয়েছে। এসব ছন্দাকে বেশ যন্ত্রণা দেয়। —চলবে।
* জিৎ সত্রাগ্নি (Jeet Satragni) বাংলা শিল্প-সংস্কৃতি জগতে এক পরিচিত নাম। দূরদর্শন সংবাদপাঠক, ভাষ্যকার, কাহিনিকার, টেলিভিশন ধারাবাহিক, টেলিছবি ও ফিচার ফিল্মের চিত্রনাট্যকার, নাট্যকার। জিৎ রেডিয়ো নাটক এবং মঞ্চনাটক লিখেছেন। ‘মেঘে ঢাকা ঘটক’ নাটকের রচয়িতা, ‘বুমেরাং’ চলচ্চিত্রের কাহিনিকার। প্রকাশিত হয়েছে ‘জিৎ সত্রাগ্নি’র নাট্য সংকলন’, উপন্যাস ‘পূর্বা আসছে’ ও ‘বসুন্ধরা এবং…(১/২/৩খণ্ড)’। এখন লিখছেন ‘হ্যালো বাবু’এবং ‘আকাশ এখনও মেঘলা’।


















