মঙ্গলবার ১০ মার্চ, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি
শহরতলির মধ্যরাত। গাড়িঘোড়া, রিকশা কোথায় পাওয়া যাবে? তবু দুলালের জানাশোনা ছিল, অ্যাম্বুল্যান্সে করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল! দুলালের মায়ের তখনও জ্ঞান ছিল। ডাক্তারবাবু বলেছিলেন, মাথার ভিতরে চোট লেগেছে। রক্তক্ষরণ হয়ে যাচ্ছে! চুঁচুড়ায় বসে কিছু করা যাবে না, কলকাতায় পিজি হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। পার্টিসূত্রে ফোন-টোন করে ব্যবস্থা করা হল। কিন্তু চুঁচুড়া থেকে অন্য একটা অ্যাম্বুল্যান্সের ব্যবস্থা করে কলকাতার জন্য আর রওনা হওয়া গেল না। চিকিৎসকের সামনেই পৃথিবী ছেড়ে গেলেন দুলালের মা!
ছোটবোন মণি তখন সন্তানসম্ভবা! অ্যাডভান্স স্টেজ! খুব কান্নাকাটি করলেও তাকে নিয়ে আসা হয়নি। শ্বশুরমশাই আর ছোটজামাই এসেছিলেন। মায়েরও এক দুর্ঘটনায় মৃত্যু! বাবা অমৃতলাল সেনের ক্ষেত্রে তাই হয়েছিল। দুলালকে আজীবন এই দুর্ভাগ্যকে মেনে চলতে হবে! ছোটজামাই বা বড়—দুই জামাই মুখে কিছু না বললেও দুই দিদি সরাসরি দুলাল ও তার পরিবারকে দায়ী করলেন। বৃদ্ধা মা সিঁড়ি ভাঙতে পারে না। তাই একতলায় থাকতেন! দুলাল স্ত্রী-সন্তান নিয়ে দোতলার বাসিন্দা। বয়স্ক মানুষকে রাতেরবেলায় বারবার কলঘরে যেতে হয়। কিন্তু তাকে এ ভাবে একা রাখাটা কি ঠিক হয়েছিল? বড় দুই জামাইবাবু তাদের স্ত্রীদের সামলাবার চেষ্টা করলেও মায়ের আচমকা মৃত্যুতে তারা দু’জনেই বিহ্বল। দু’জনেই শেষ দেখাটুকু দেখতে পেলেন না!
আরও পড়ুন:

উপন্যাস: আকাশ এখনও মেঘলা, পর্ব-২৯: আকাশ এখনও মেঘলা

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১২৭: রবীন্দ্রনাথের নামে ভিত্তিহীন অভিযোগ, ‘চোখের বালি’ নাকি চুরি করে লেখা

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১১১: পাতিকাক

সংসারে এরকম দোষারোপ হয়, মিটেও যায়! কিন্তু মানুষের মনে কখন যে কোনও কথা কীভাবে লেগে যায় কেউ বলতে পারে না। দুলালের সংসার গড়ে দেওয়ার জন্য তার দুই দিদির অবদান অনেক। মায়ের পরে দুই দিদিকে ভীষণ সম্মান করতো দুলাল। কিন্তু মায়ের মৃত্যুতে এ ভাবে দোষারোপ করার কারণে শ্রাদ্ধশান্তি মিটে যাবার পর থেকে দুলাল আর তার দুই দিদির সঙ্গে কোন যোগাযোগ রাখেনি। জামাইবাবুরা চিঠি দিয়েছেন, দুলাল ছোট্ট পোস্ট কার্ডে উত্তর দিয়ে প্রণাম জানিয়েছে। ব্যাস ওইটুকুই। মণির বাড়িতে কাছা পরে কর্তব্য সারতে উপস্থিত হতে হয়েছিল। সন্তানসম্ভবা মণি পরে তার বরের কাছে সব শুনে তার খবর নিতে যাওয়া দুলালকে বারবার বলেছে দিদিদের কথায় এ ভাবে কষ্ট না পেতে। দুলাল হেসেছে, কিন্তু কোনও উত্তর দেয়নি।
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৮৭: শুধু মুখে ধর্মের বুলি আওড়ালেই কেউ ধার্মিক হয়ে যায় না

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৭০: ত্রিপুরায় বারবার দেশের ইংরেজ শাসন বিরোধী মানসিকতার প্রতিফলন ঘটেছে

মণি অনেকটা ছোট। তাকে দুলাল ছোটবোনের থেকেও প্রায় খানিকটা মেয়ের মতোই দেখে! সন্তান প্রসব হতে গিয়ে কি একটা জটিলতায় বাচ্চাটাকে বাঁচানো গেল না! এমন ঘটনা ঘটে। চিকিৎসাশাস্ত্রের প্রভূত উন্নতি ঘটার পরেও এমন দুর্ঘটনা ঘটে যায়! মানুষ সেই দুঃখ-যন্ত্রণা সয়ে নিজেকে আবার জীবনে ফিরিয়ে আনে! কিন্তু মণি পারল না! এই সন্তান নিয়ে তার অনেক স্বপ্ন ছিল। সন্তানের জন্য ছোট ছোট পোশাক বানানো থেকে তার পুতুল কেনা, এমনকি নাম পর্যন্ত ঠিক করে রেখেছিল মণি! এই পুরো স্বপ্নটা চুরমার হয়ে যেতে সে মানসিকভাবে নিজেকে সামলাতে পারল না। নানারকম শারীরিক ও মানসিক রোগে জর্জরিত হয়ে পড়ল দুলাল সেনের ছোটবোন মণি !
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১২৫: আজও আধুনিক সমাজ রাজা দুষ্মন্তের তঞ্চকতা এবং দ্বিচারিতার দূষণমুক্ত নয়

রহস্য রোমাঞ্চের আলাস্কা, পর্ব-৬৩: অগত্যা আমার গাড়িতে বন্ধুদের নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম আলাস্কা ভ্রমণে

দুলাল ভেঙে পড়ল। বাবার মৃত্যু, পরে মায়ের মৃত্যু দুটোই দুর্ঘটনায়! ছোটবোন মণির জীবনে এরকম একটা দুর্যোগ ঘটে গেল! মার মৃত্যু নিয়ে দুই দিদির সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হল! জামাইবাবুরা সব সময় পাশে দাঁড়িয়েছেন বড় দাদার মতো, কিন্তু তারা তো দিদিদের বাদ দিয়ে নয়। দিদিদের সম্পর্কেই জামাইবাবুদের সঙ্গে সম্পর্ক। মণির শ্বশুর-শাশুড়ি বা মণির বর এরকম একটা আকস্মিক ঘটনায় বাকরুদ্ধ হয়ে গিয়েছেন। এত হাসিখুশি একটা পরিবার, নাতি বা নাতনি আসার আনন্দে তাঁরাও উদ্বেলিত হয়ে উঠেছিলেন। নানা রকমের প্ল্যান করে রেখেছিলেন। এমনকি প্যারাম্বুলেটারও কেনা হয়ে গিয়েছিল! তৃপ্তি দুলালকে বলেছিল এত আগে থেকে কেন এরা এসব করছে? দুলাল কোনও কুসংস্কার মানে না। তাই সে খুব একটা গুরুত্ব দেয়নি।
আরও পড়ুন:

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-৯ : মণিহারা: করিডর, সেজবাতি আর…

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-১১০: মা সারদার মানবীলীলার অবসান

পরপর ঘটনাগুলো, শাশুড়ির নিচের কলঘরে পা পিছলে পড়ে গিয়ে মৃত্যু তারপর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ দুই দিদির সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি এবং শেষমেশ মণির জীবনে এরকম একটা ভয়ংকর দুর্যোগ সব মিলে তৃপ্তি দুলালের থেকেও মনে মনে বেশি ভেঙে পড়ল! এ বার তাকে যেন একটা অজানা আশঙ্কা ছুটিয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে। এরপর কি তাদের সংসারেও এমন কিছু ঘটবে? —চলবে।
* জিৎ সত্রাগ্নি (Jeet Satragni) বাংলা শিল্প-সংস্কৃতি জগতে এক পরিচিত নাম। দূরদর্শন সংবাদপাঠক, ভাষ্যকার, কাহিনিকার, টেলিভিশন ধারাবাহিক, টেলিছবি ও ফিচার ফিল্মের চিত্রনাট্যকার, নাট্যকার। জিৎ রেডিয়ো নাটক এবং মঞ্চনাটক লিখেছেন। ‘মেঘে ঢাকা ঘটক’ নাটকের রচয়িতা, ‘বুমেরাং’ চলচ্চিত্রের কাহিনিকার। প্রকাশিত হয়েছে ‘জিৎ সত্রাগ্নি’র নাট্য সংকলন’, উপন্যাস ‘পূর্বা আসছে’ ও ‘বসুন্ধরা এবং…(১/২/৩খণ্ড)’। এখন লিখছেন ‘হ্যালো বাবু’এবং ‘আকাশ এখনও মেঘলা’।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content