
ছবি: প্রতীকী।
গল্পসাহিত্যে কাককে নিয়ে নানা বিচিত্র আখ্যান আছে। গল্পসাহিত্যের আঙ্গিকে কাক সেই সব মানুষের প্রতিনিধি যারা চতুর অথবা বোকাও বটে। কখনও কখনও কাক বুদ্ধিমান, জলের কলসি থেকে জল খেতে পারে। কখনও আত্মশ্লাঘায় ভরপুর, লেজে ময়ূরপুচ্ছ জুড়ে ময়ূর হতে চায়, কখনও নেহাত বোকা, শেয়ালের চালাকিতে ভুলে গান গাইতে গিয়ে মাংসের টুকরোটা হারায়। কখনও কোকিল তাকে ঠকিয়ে যায়।
এরকম লোকজন সমাজের আনাচে কানাচে ঘুরছে। ধূর্ত বা চতুরের থেকে বুদ্ধিমান জীবের কিছু পার্থক্য ছিল, আছে, থাকবে। এই জাতককথায় সেই আভাসটিও স্পষ্ট হয়ে উঠবে।
বারাণসীতে ব্রহ্মদত্তের শাসনকালে বোধিসত্ত্ব সেবার ময়ূর হয়ে জন্মেছেন। ক্রমে প্রাপ্তবয়স্ক হলে তিনি অরণ্যে বাস করতে থাকলেন। তখন বণিকরা বারেরু নামের এক বিদেশে বাণিজ্য করতে যেত। বারেরু রাজ্যে তখন পাখি ছিল না। সেখানকার অধিবাসীরা পাখি কখনও চোখে দেখেনি। সেই দেশের ঘাটেই বণিকদের জাহাজ এল।
বারাণসীতে ব্রহ্মদত্তের শাসনকালে বোধিসত্ত্ব সেবার ময়ূর হয়ে জন্মেছেন। ক্রমে প্রাপ্তবয়স্ক হলে তিনি অরণ্যে বাস করতে থাকলেন। তখন বণিকরা বারেরু নামের এক বিদেশে বাণিজ্য করতে যেত। বারেরু রাজ্যে তখন পাখি ছিল না। সেখানকার অধিবাসীরা পাখি কখনও চোখে দেখেনি। সেই দেশের ঘাটেই বণিকদের জাহাজ এল।
আরও পড়ুন:

গল্পবৃক্ষ, পর্ব-২৭: গুল্মিকজাতক—লোভে পাপ পাপে মৃত্যু

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১০২: কণ্ঠী ঘুঘু
বণিকদের কাছে একটি “দিশাকাক” ছিল। নৌযাত্রায় দিকনির্দেশনার জন্যই হয়তো বা নাবিকরা সঙ্গে কাক রাখতেন। সমুদ্রে দিক ভুল হয়ে গেলে সেই পোষা কাককে তাঁরা উড়িয়ে দিতেন। কাক তার বিবেচনায় যেদিকে উড়ে যেত, নাবিকরা মনে করতেন সেদিকেই স্থলভাগ আছে।
বারেরু রাজ্যের বন্দরে জাহাজের মাস্তুলের ওপর কাকটা বসে ছিল। সেখানকার লোকজন যাওয়া আসার পথে হাঁ করে কাকটাকে দেখছিল। কেমন চোখ! কেমন অক্ষিগোলক! চোখদুটি যেন মণিগোলক! কী মনোহর শরীরের বর্ণ, গলার প্রান্তে কেমন সুন্দর মাথাটি! কাকের রূপে মুগ্ধ হয়ে তারা বণিকদের বলল
— “মশাইরা! কাকটা আমাদের দিয়ে দিন, বড় মনোহর জীব, আপনাদের দেশে তো এমন অনেক অনেক পাবেন।”
— “তা আবার হয় নাকি, এ বড় কাজের জিনিস যে”
— “তা হোক, আমাদের এটি লাগবে, দিন”
— “লাগে তো মূল্য দিয়ে কিনুন, এমনি হবে না”
— “তা এক কাহন নিন মশাইরা, এককাহন নিয়ে দিয়ে দিন”
— “এককাহনে এমনটি পাবে না ভাইরা, দাম আছে এর।”
বারেরু রাজ্যের বন্দরে জাহাজের মাস্তুলের ওপর কাকটা বসে ছিল। সেখানকার লোকজন যাওয়া আসার পথে হাঁ করে কাকটাকে দেখছিল। কেমন চোখ! কেমন অক্ষিগোলক! চোখদুটি যেন মণিগোলক! কী মনোহর শরীরের বর্ণ, গলার প্রান্তে কেমন সুন্দর মাথাটি! কাকের রূপে মুগ্ধ হয়ে তারা বণিকদের বলল
— “মশাইরা! কাকটা আমাদের দিয়ে দিন, বড় মনোহর জীব, আপনাদের দেশে তো এমন অনেক অনেক পাবেন।”
— “তা আবার হয় নাকি, এ বড় কাজের জিনিস যে”
— “তা হোক, আমাদের এটি লাগবে, দিন”
— “লাগে তো মূল্য দিয়ে কিনুন, এমনি হবে না”
— “তা এক কাহন নিন মশাইরা, এককাহন নিয়ে দিয়ে দিন”
— “এককাহনে এমনটি পাবে না ভাইরা, দাম আছে এর।”
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১১৬: রাম যৌথ পরিবারের আদর্শনিষ্ঠ জ্যেষ্ঠ, তাঁর যেন এক ঘরোয়া ভাবমূর্তি

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১১৮: কবির ভালোবাসা, কবির জন্য ভালোবাসা
কাকটি নিলামে উঠল। সেদেশের লোক হেঁকে ডেকে কাকের দর বাড়িয়ে দিল। শেষে একশ কাহনে কাকটি বিক্রয় হয়ে গেল!
কাকটি সোনার খাঁচায় থাকে। স্বর্ণপিঞ্জরে থেকে নানারকম মত্স্য, মাংস, বনফল খায় সুখে। নানা অসদ্ধর্মযুক্ত কাক কেবল পরিস্থিতির কারণে পরম আদরে যত্নে লালিত হতে থাকল।
মানুষের সমাজে এমনটা হয় তো? বিকল্পের অভাবে, অভিজ্ঞতার অভাবে কদন্নকেও পরমান্ন মনে হয়, মেনে নিতে হয়।
গল্পের শেষটা কেমন ছিল দেখা যাক। পরেরবার বণিকরা একটা ময়ূর নিয়ে এল। শিক্ষিত উৎকৃষ্ট ময়ূর। তুড়ি দিলে কেকারব করে। হাততালি দিলে নাচে। এই ময়ূরটিই বোধিসত্ত্ব।
বারেরু রাজ্যের জনগণ বন্দরে ভিড় করে ময়ূরের মধুর কেকারব শুনতে লাগলো, দেখতে লাগলো অনুপম নৃত্যকলা। তারা বিমুগ্ধ হয়ে আবেদন রাখল –
“এই মনোমুগ্ধকর পক্ষীরাজটি আমাদের দান করুন মশাইরা।”
“সেবার একটা কাক আনলাম, তোমরা নিলে। এবার ময়ূর আনলাম, এটাও তোমরা চাইছো। বলি তোমাদের দেশে কি পাখি-টাখি নেই বাপু! পরেরবার তো আর পাখি আনা যাবে না দেখছি।”
“তা হোক মশাইরা, এটা আমাদের দিন। আপনাদের দেশে অনেক অনেক পেয়ে যাবেন।”
কাকটি সোনার খাঁচায় থাকে। স্বর্ণপিঞ্জরে থেকে নানারকম মত্স্য, মাংস, বনফল খায় সুখে। নানা অসদ্ধর্মযুক্ত কাক কেবল পরিস্থিতির কারণে পরম আদরে যত্নে লালিত হতে থাকল।
মানুষের সমাজে এমনটা হয় তো? বিকল্পের অভাবে, অভিজ্ঞতার অভাবে কদন্নকেও পরমান্ন মনে হয়, মেনে নিতে হয়।
গল্পের শেষটা কেমন ছিল দেখা যাক। পরেরবার বণিকরা একটা ময়ূর নিয়ে এল। শিক্ষিত উৎকৃষ্ট ময়ূর। তুড়ি দিলে কেকারব করে। হাততালি দিলে নাচে। এই ময়ূরটিই বোধিসত্ত্ব।
বারেরু রাজ্যের জনগণ বন্দরে ভিড় করে ময়ূরের মধুর কেকারব শুনতে লাগলো, দেখতে লাগলো অনুপম নৃত্যকলা। তারা বিমুগ্ধ হয়ে আবেদন রাখল –
“এই মনোমুগ্ধকর পক্ষীরাজটি আমাদের দান করুন মশাইরা।”
“সেবার একটা কাক আনলাম, তোমরা নিলে। এবার ময়ূর আনলাম, এটাও তোমরা চাইছো। বলি তোমাদের দেশে কি পাখি-টাখি নেই বাপু! পরেরবার তো আর পাখি আনা যাবে না দেখছি।”
“তা হোক মশাইরা, এটা আমাদের দিন। আপনাদের দেশে অনেক অনেক পেয়ে যাবেন।”
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৮১: সুষ্ঠুভাবে শাসনকার্য চালাতে গেলে নিজের লোকেদের পিছনেও চর নিয়োগ করতে হয়

রহস্য রোমাঞ্চের আলাস্কা, পর্ব-৫৮: হেলিকপ্টারে সওয়ার হয়ে চূড়ার কাছাকাছি গিয়ে পাহাড় দেখার রোমাঞ্চটাই আলাদা
এরপর ময়ূরটির দাম বেড়ে বেড়ে হাজার কাহন হয়ে গেল। এক হাজার কাহনে ময়ূরটি তারা কিনে সপ্তরত্নখচিত বিচিত্র পিঞ্জরে রাখল। খেতে দিল নানা মত্স্য, মাংস, স্বাদু ফল, খই, মধু, শর্করাপুষ্ট জল। পরম আদরে যত্নে ভরিয়ে রাখল সকলে।
ময়ূর আসার পর কাকের মর্যাদা কমল।
আগের মতো আর খাদ্য পানীয় আসে না। কেউ ঘুরেও তাকিয়ে দেখে না তার দিকে। ভোজ্য পানীয়ের অভাবে অনিয়মে শেষে কা কা রব করে বিষ্ঠাপূর্ণ স্থানে কাকটি ঘুরে বেড়াতে লাগল।
ময়ূর আসার পর কাকের মর্যাদা কমল।
আগের মতো আর খাদ্য পানীয় আসে না। কেউ ঘুরেও তাকিয়ে দেখে না তার দিকে। ভোজ্য পানীয়ের অভাবে অনিয়মে শেষে কা কা রব করে বিষ্ঠাপূর্ণ স্থানে কাকটি ঘুরে বেড়াতে লাগল।
আরও পড়ুন:

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-১: খাওয়াব আজব খাওয়া

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-১০১: মা সারদার মায়িকবন্ধন ত্যাগ

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-১০১: মা সারদার মায়িকবন্ধন ত্যাগ
বৌদ্ধধর্মের দৃষ্টিকোণে এর ব্যাখ্যা হল, যতদিন তথাগত বুদ্ধদেবের আবির্ভাব ঘটেনি, ততদিন শ্রমণ-ব্রাহ্মণসম্প্রদায় মানুষের কাছে ভক্তি, প্রণাম, পূজা পেয়েছেন। তিমিরনাশী বুদ্ধদেব আবির্ভূত হলে তাঁর চিত্তগ্রাহী ব্রহ্মভাষে ও ধর্মদেশনায় জনগণ বিমুগ্ধ হল, হতমান পূজ্যপাদগণ তখন সমাজের শ্রদ্ধা হারালেন।
এই কাহিনি জীবনবোধকেও দৃপ্ত করবে। জীবন ও জীবধর্ম তার আকাঙ্ক্ষার পরিপূরণ করতে চায়। কাঙ্ক্ষিত বিষয়ের বল অথবা অবল, ইতি-নেতি বিবেচনার কথা অনেকসময়েই বিস্মৃত হতে হয়। পরিস্থিতি ও ভ্রান্তি কিংবা অজ্ঞতার মোহান্ধকারে অপাংক্তেয়কে উত্তম, অন্যায্যকে অবশ্যম্ভাবী মনে হয়। এই জাতককথা সেই আচ্ছন্ন জীবনবোধের ছায়াময় পথে অমলিন আলোকবর্তিকা জ্বেলে দেয়।
এই কাহিনি জীবনবোধকেও দৃপ্ত করবে। জীবন ও জীবধর্ম তার আকাঙ্ক্ষার পরিপূরণ করতে চায়। কাঙ্ক্ষিত বিষয়ের বল অথবা অবল, ইতি-নেতি বিবেচনার কথা অনেকসময়েই বিস্মৃত হতে হয়। পরিস্থিতি ও ভ্রান্তি কিংবা অজ্ঞতার মোহান্ধকারে অপাংক্তেয়কে উত্তম, অন্যায্যকে অবশ্যম্ভাবী মনে হয়। এই জাতককথা সেই আচ্ছন্ন জীবনবোধের ছায়াময় পথে অমলিন আলোকবর্তিকা জ্বেলে দেয়।
* ড. অভিষেক ঘোষ (Abhishek Ghosh) সহকারী অধ্যাপক, বাগনান কলেজ। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগ থেকে স্নাতকস্তরে স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত। স্নাতকোত্তরের পর ইউজিসি নেট জুনিয়র এবং সিনিয়র রিসার্চ ফেলোশিপ পেয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগে সাড়ে তিন বছর পূর্ণসময়ের গবেষক হিসাবে যুক্ত ছিলেন। সাম্বপুরাণের সূর্য-সৌরধর্ম নিয়ে গবেষণা করে পিএইচ. ডি ডিগ্রি লাভ করেন। আগ্রহের বিষয় ভারতবিদ্যা, পুরাণসাহিত্য, সৌরধর্ম, অভিলেখ, লিপিবিদ্যা, প্রাচ্যদর্শন, সাহিত্যতত্ত্ব, চিত্রকলা, বাংলার ধ্রুপদী ও আধুনিক সাহিত্যসম্ভার। মৌলিক রসসিক্ত লেখালেখি মূলত: ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে। গবেষণামূলক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়ে চলেছে বিভিন্ন জার্নাল ও সম্পাদিত গ্রন্থে। সাম্প্রতিক অতীতে ডিজিটাল আর্ট প্রদর্শিত হয়েছে আর্ট গ্যালারিতে, বিদেশেও নির্বাচিত হয়েছেন অনলাইন চিত্রপ্রদর্শনীতে। ফেসবুক পেজ, ইন্সটাগ্রামের মাধ্যমে নিয়মিত দর্শকের কাছে পৌঁছে দেন নিজের চিত্রকলা। এখানে একসঙ্গে হাতে তুলে নিয়েছেন কলম ও তুলি। লিখছেন রম্যরচনা, অলংকরণ করছেন একইসঙ্গে।


















