মঙ্গলবার ১০ মার্চ, ২০২৬


দুলাল সব ব্যবস্থা করে গিয়েছে। ক্লাবের সেই বুবুন নামের ছেলেটা বিয়েবাড়ির উল্টোদিকে সাইকেল নিয়ে দাঁড়িয়ে।
—ওমা তুই কতক্ষণ দাঁড়িয়ে আছিস?
—এই তো, সবে এসেছি! মনিদিকে জিগ্যেস করেছিলুম, আপনি কি না খেয়ে চলে যাচ্ছেন? এত তাড়াতাড়ি বেরোলেন কী করে? ভাগ্যিস একটু আগে আগে এসে গিয়েছি।
—না রে বাবা আজকাল আর পংক্তিভোজ করি না! একটু দই মিষ্টি খেয়ে নিয়েছি আর এখন বিয়ে বাড়ির হইচই চলছে তো, সবাই ব্যস্ত। আমি আর একা একা কি করি তাই বেরিয়ে এলাম।
—রিক্সা করে দেবো মাসিমা।
—না না, এতোটুকু রাস্তা আমি দিব্যি হেঁটে যেতে পারবো। আমার জন্য তো শুধুমুদু ঝঞ্ঝাট হল।
—না না, ঝঞ্জাট আর কী? ক্লাবে ক্যারাম খেলছিলাম, দুলালদা তো সেই মিটিং থেকে ফোন করেছিল আমাকে মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য।
দুলালের কর্তব্য-জ্ঞানের কথা ভেবে মায়ের দু’চোখ যেন ঝাপসা হয়ে এল। তবে এই বিয়েবাড়িতে আজ যেসব কথা সে শুনেছে সেসব দুলালকে বলা যাবে না। বরং বড় জামাইয়ের সঙ্গে কথা বলে এবার দুলালের একটা বিয়ের ব্যবস্থা করতেই হবে। বড় এবং মেজ জামাই দু’জনেই বড় ভালো হয়েছে। ছোটটিও খুব ভালো। মণির বিয়ের সময় তিনি তো চলে গিয়েছেন। ঠিক হল বড়ভাই দুলাল বোনকে সম্প্রদান করবে! দুলাল বেঁকে বসল, বলল বড় জামাইবাবু ও মেজ জামাইবাবু যদি রাজি না হন, তখন দুলাল সম্প্রদান করবে। তাঁরাও মণির দাদা। মায়ের পেটের না হলেও সম্মানে তারা গুরুজন! বড় জামাই মণিকে সম্প্রদান করেছিল।
আরও পড়ুন:

উপন্যাস: আকাশ এখনও মেঘলা, পর্ব-১৬: আকাশ এখনও মেঘলা

বিখ্যাতদের বিবাহ-বিচিত্রা, পর্ব-১৭: একাকিত্বের অন্ধকূপ/২: অন্ধকারের উৎস হতে

কঁ, কঁককঁক ডোরবেল ককিয়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে মণি দরজার খুলল!

বড় জামাই সনাতনপন্থী। সরকারি চাকরি করে কিন্তু বাঙালি রীতিনীতি পুরনো ধ্যান-ধারণার খুব সম্মান করে দুলালের মানসিকতার প্রশংসা করে বলেছিল। আজকাল অবশ্য সব বদলে যাচ্ছে। এখন কন্যাসম্প্রদান আর রীতি নয়, দু’দিন বাদে ছাতনাতলা উঠে যাবে। বরের আবাহন থাকবে না। মহিলা পুরোহিতের পুজো বা সম্প্রদান এখন বদলে যাওয়া সমাজের প্রভাব। ভাত-কাপড়ে আজকাল স্বামী-স্ত্রী দু’জন-দুজনের দ্বায়িত্ব নেন। আসলে আমাদের মানে বাঙ্গালিদের মধ্যে আধুনিক ভাবনাচিন্তার জন্ম সেই রাজা রামমোহনের সময় থেকেই আমরা অন্যসকলের চেয়ে দশকদম আগে। আমরা ছাড়া অন্যকোনও রাজ্যের মানুষ তাঁদের সম্প্রদায়ের চিরাচরিত রীতিনীতিতে কোনও যুগান্তকারী বদল ঘটাননি, সেটা তাঁরা ঐতিহ্য বা রেওয়াজের মর্যাদা দিয়েছেন। তাঁরা নিজেদের রীতিনীতি বদলে আমাদের নিয়মে বিয়ে দেন না আমরা দিই।
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১১৩: ভাবনা উইদাউট ভদ্‌কা

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১১৩: একটি হিংসা অনেক প্রতিহিংসা, জিঘাংসা, হত্যা এবং মৃত্যুর কারণ হয়ে ওঠে সর্বত্র

আমরা সংগীতের আয়োজন করি—”বিদাই” বলি, কনকাঞ্জলি তুলে দিয়েছি। কারণ আমরা মুক্তমনা। তাঁরা বিবাহের কাজকর্ম থমকে রেখে “মূহুর্ত”-এর জন্য অপেক্ষা করেন। এখনও আইএএস আইপিএস মেয়ের বাবারা জামাইয়ের পা ধুইয়ে দেন। সপ্তপদীতে বর আগে হাঁটে কনে পিছনে। ভাত কাপড়ের দায়িত্ব নেওয়াটা আগেই বিয়ের মন্ত্রে বর উচ্চারণ করেন- স্ত্রীর সব দায়দায়িত্ব নেবার কথা সর্বসমক্ষে সংস্কৃতে স্বীকার করেন। সেটার একটা অনুষঙ্গ “ভাতকাপড়” বিয়ের পুরো অনুষ্ঠানটাই আলঙ্কারিক। ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকার বধূও অবাঙালি বিয়েতে পুঙ্খানুপুঙ্খ নিয়মকানুন মানেন, নয়তো রেজিস্ট্রি বিয়ে করেন। ইসলাম বিয়েতে মৌলবির কথা বর এবং কনেকে “কবুল” করতে হয়, খ্রিস্টান ধর্মে “আই ডু” বলাটা চিরায়ত নিয়ম।
আরও পড়ুন:

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-৯৭: শ্রীমার কথায় ‘ঠাকুরের দয়া পেয়েচ বলেই এখানে এসেচ’

রহস্য রোমাঞ্চের আলাস্কা, পর্ব-৫৫: সর্বত্র বরফ, কোত্থাও কেউ নেই, একেবারে গা ছমছম করা পরিবেশ

দুলালের বাবার চলে যাওয়াটা এতই আচমকা যে ব্যাপারটা হজম করতেই বছরখানেক কেটে গিয়েছিল। কিন্তু কি আশ্চর্য বড় দুই জামাই যে এতখানি দায়িত্ববান সেটা অমৃতলাল সেন বেঁচে থাকার সময় ততটা বোঝা যায়নি। যে সময় তার বাবা চলে গেল তখন দুলালের চাকরি নেই। বাবার ইচ্ছের সম্মান দিয়ে এমএ-তে ভর্তি হবার চেষ্টা চালাচ্ছে। সেই অবস্থায় জামাইরা দুলালের দু’পাশে দুই বড় দাদার মতো আগলে দাঁড়ালো! তিন মেয়েরই সম্বন্ধ করে বিয়ে হয়েছে। বড় দুই মেয়ে জামাইরা কেউ কাউকে তার আগে চিনতই না। মণি তার বরকে অবশ্য আগে থেকে চিনত কিন্তু কোনও যোগাযোগ কখনও ছিল না। কিন্তু এই অজানা অচেনা পরিবারের মানুষজন কীভাবে একাত্ম হয়ে গিয়েছে।
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৭৮: রক্তে ভেজা মাটিতে গড়ে ওঠে সত্যিকার প্রাপ্তি

পঁচিশে বৈশাখ

মণিকে দিয়ে বড় জামাইবাবু আর মেজো জামাইবাবুকে ফোন করালেন দুলালের মা।
—বাবা তোমরা ছাড়া আমার আর কে আছে? দুলালকে বললে সে তো কিছুতেই রাজি হবে না —কিন্তু আমি চাই আর দেরি না করে দুলালের এখুনি একটা বিয়ের ব্যবস্থা করতে।
দুই দিদি জামাইবাবুর চেষ্টায় দুলালের বিয়ের ঠিক হল পাত্রী তৃপ্তি বারো ক্লাস পাশ করেছে। একটু রোগাটে চুপচাপ। খুব কম কথা বলে। তবে সম্ভ্রান্ত-বুদ্ধিষ্ণু পরিবারের মেয়ে, শ্যামনগরে থাকে।—চলবে।
* জিৎ সত্রাগ্নি (Jeet Satragni) বাংলা শিল্প-সংস্কৃতি জগতে এক পরিচিত নাম। দূরদর্শন সংবাদপাঠক, ভাষ্যকার, কাহিনিকার, টেলিভিশন ধারাবাহিক, টেলিছবি ও ফিচার ফিল্মের চিত্রনাট্যকার, নাট্যকার। জিৎ রেডিয়ো নাটক এবং মঞ্চনাটক লিখেছেন। ‘বুমেরাং’ চলচ্চিত্রের কাহিনিকার। উপন্যাস লেখার আগে জিৎ রেডিয়ো নাটক এবং মঞ্চনাটক লিখেছেন। প্রকাশিত হয়েছে ‘জিৎ সত্রাগ্নি’র নাট্য সংকলন’, উপন্যাস ‘পূর্বা আসছে’ ও ‘বসুন্ধরা এবং…(১ম খণ্ড)’। এখন লিখছেন বসুন্ধরা এবং…এর ৩য় খণ্ড।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content