
সাহিত্যিক প্রফুল্ল রায় প্রয়াত।
‘একা তবু একা নই একাকী অরণ্যে হারিয়ে গেলাম’—স্বনামধন্য সাহিত্যিক প্রফুল্ল রায়ের কোনও লেখা থেকে উদ্ধৃতি নয়, এটা তাঁর জনপ্রিয় উপন্যাস অবলম্বনে ইটিভিতে প্রচারিত হওয়া ‘একাকী অরণ্যে’ নামের তারকাখচিত ধারাবাহিকের শীর্ষসঙ্গীতের প্রথম ছত্র। যিনি এই গান গেয়েছিলেন, সেই প্রতীক চৌধুরীও হারিয়ে গিয়েছেন জীবনপুরের পথ ছাড়িয়ে অনেক দূরে!
প্রয়াত সাহিত্যিকের বয়স ৯০ পেরিয়ে গিয়েছিল, স্বাভাবিক অসুস্থতা ছিল। গতকাল ১৯ জুন ২০২৫ দুপুর তিনটে পনেরো মিনিটে মানবজীবন সাঙ্গ করে চলে গেলেন, একা একা অন্য এক জনমের পারে। হয়তো বা অনেক চেনাজনের ভিড়ে, সে এক অন্য জনারণ্য!
এই কিছুদিন আগেই হায়দ্রাবাদে রামোজি ফিল্ম স্টুডিওতে ইটিভি -র পুরোনো একজনের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। ইটিভির জন্য পরিচালক প্রভাত রায়ের সঙ্গে আমার যৌথভাবে লেখা ধারাবাহিক একাকী অরণ্যে নিয়ে কথা হতে হতে প্রফুল্ল রায়ের সম্বন্ধে কথা হলো। বললাম অনেক বয়স হয়ে গেছে এখন খুব অসুস্থ।
এই কিছুদিন আগেই হায়দ্রাবাদে রামোজি ফিল্ম স্টুডিওতে ইটিভি -র পুরোনো একজনের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। ইটিভির জন্য পরিচালক প্রভাত রায়ের সঙ্গে আমার যৌথভাবে লেখা ধারাবাহিক একাকী অরণ্যে নিয়ে কথা হতে হতে প্রফুল্ল রায়ের সম্বন্ধে কথা হলো। বললাম অনেক বয়স হয়ে গেছে এখন খুব অসুস্থ।
আরও পড়ুন:

হ্যালো বাবু! পর্ব-৮৭: অনুসরণ/৮

বাংলা সাহিত্যে নক্ষত্রপতন, ‘কেয়া পাতার নৌকো’র স্রষ্টা সাহিত্যিক প্রফুল্ল রায় প্রয়াত

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-১০২: শ্রীমার অন্তিম সময়কালীন ভবিষ্যবাণী
অনেক পুরনো স্মৃতি। প্রায় ২৫ বছর হয়ে গেল একাকী অরণ্যের প্রস্তুতির। প্রভাতদা বলেছিলেন প্রফুল্লবাবুর সঙ্গে বসে আলোচনা করে চিত্রনাট্য তৈরি করতে। লেখালিখি করতাম কিন্তু চাকরি ছেড়ে শুধু লেখার ভরসায় সংসার সন্তানের দায়দায়িত্ব পালন করতে পারব এত মনের জোর ছিল না! তাই চাকরি করতাম। কাজের চাপ থাকতো ছুটির পর স্ক্রিপ্ট মিটিংয়ে বসতাম। বাড়ি ফিরে খাওয়া-দাওয়ার পর রাতে লিখতে বসতাম। অনেকটা রাত জাগার পর বিশ্রাম, পরদিন আবার অফিস! এভাবেই সামান্য যেটুকু কাজ করতে পেরেছি তারই অনেক প্রাপ্তির মধ্যে একটা হল এই সমস্ত বিদগ্ধ বিশিষ্ট মানুষের সান্নিধ্যে আসার বিরল সুযোগ।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১০৪: ভুবন চিল ও শঙ্খচিল

পর্দার আড়ালে, সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-৩: পরেশের পরশপাথর
নাটক বা চিত্রনাট্যে অনেক সময় আকর্ষণ বাড়ানোর জন্য দৃশ্যের রদবদল ঘটানো হয়। যে ক্রমানুসারে কাহিনি গড়িয়েছে তাকে ভেঙেচুরে সময়ের হেরফের ঘটিয়ে দেওয়া হয়! এখন দায়দায়িত্ব সেরে অবসরের পর লেখার জন্য অখণ্ড অবকাশ। মাঝে মাঝে ভাবি এখন যদি ফেলে আসা সময়ের কাজগুলোকে ফিরিয়ে আনতে পারতাম। সেই সব কালজয়ী লেখক চিত্রপরিচালক চিত্রসম্পাদকদের সঙ্গে যদি এখন বসতে পারতাম, কল্পনায় টাইম এন্ড স্পেস বদলানো যায়, বাস্তবে তা হয় না।
সোনার সংসার বা নিবেদিতা রিসার্চ ল্যাবরেটরি ধারাবাহিক লিখতে গিয়ে মণিশংকর মুখোপাধ্যায়ের মতো ঔপন্যাসিকের সংস্পর্শে আসার সুযোগ, অতিক্রম, সামান্য ভুল—টেলিফিল্ম লেখার সময় সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, সোঁদা মাটি নোনা জল ধারাবাহিকের সময়ের আব্দুল জব্বার বা অন্য নকশি লিখতে গিয়ে আবুল বাশারের পরামর্শ। অবাধ্য গল্প নিয়ে হিন্দি টেলিফিল্ম লেখার সময় অনবদ্যস্রষ্টা সমরেশ বসুর বিরল সান্নিধ্য, বায়েন টেলিফিল্মের সময়ে মহাশ্বেতা দেবীর সঙ্গে আলোচনার সুযোগ আমার কাছে ধারাবাহিক টেলিফিল্ম নাটক বা কাহিনিচিত্রের সাফল্যের মতোই অত্যন্ত সম্মানীয় স্মৃতিচারণা।
সোনার সংসার বা নিবেদিতা রিসার্চ ল্যাবরেটরি ধারাবাহিক লিখতে গিয়ে মণিশংকর মুখোপাধ্যায়ের মতো ঔপন্যাসিকের সংস্পর্শে আসার সুযোগ, অতিক্রম, সামান্য ভুল—টেলিফিল্ম লেখার সময় সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, সোঁদা মাটি নোনা জল ধারাবাহিকের সময়ের আব্দুল জব্বার বা অন্য নকশি লিখতে গিয়ে আবুল বাশারের পরামর্শ। অবাধ্য গল্প নিয়ে হিন্দি টেলিফিল্ম লেখার সময় অনবদ্যস্রষ্টা সমরেশ বসুর বিরল সান্নিধ্য, বায়েন টেলিফিল্মের সময়ে মহাশ্বেতা দেবীর সঙ্গে আলোচনার সুযোগ আমার কাছে ধারাবাহিক টেলিফিল্ম নাটক বা কাহিনিচিত্রের সাফল্যের মতোই অত্যন্ত সম্মানীয় স্মৃতিচারণা।
আরও পড়ুন:

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১২০: রবীন্দ্রনাথ আশ্রমের একমাত্র তাঁকেই প্রণাম করতেন

রহস্য রোমাঞ্চের আলাস্কা, পর্ব-৬০: পাহাড়ের চূড়ায় বসে দেখলাম হিমবাহের সেই অপরূপ শোভা
একাকী অরণ্যের সময়েই শ্রদ্ধেয় সাহিত্যিক প্রফুল্ল রায়ের আরও একটি মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাস ‘নিজের সঙ্গে দেখা’নিয়েও আমরা কাজ করছিলাম। এটি ধারাবাহিক হিসেবে তৈরি করার পরিকল্পনা হয়েছিল। জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত জনপ্রিয় চিত্রপরিচালক প্রভাত রায় একাকী অরণ্যের মতোই নিজের সঙ্গে দেখা ধারাবাহিককেও বেশ বড় ক্যানভাসে ভেবেছিলেন। কিন্তু শেষমেশ ধারাবাহিকটি হয়ে ওঠেনি।
ক্রিয়েটিভ কাজকর্মের ক্ষেত্রে যেসব পরিকল্পনা সফলভাবে পরিবেশিত হয় তার চেয়ে অনেক বেশি পরিকল্পনা বাক্সবন্দি হয়ে পড়ে থাকে। কারণ কাহিনিচিত্র, ধারাবাহিক বা নাটক যাইহোক নিজ নিজ ক্ষেত্রে এসবই এক সুবিশাল কর্মকাণ্ড। অনেক মানুষের একসঙ্গে করা পরিশ্রমের ফসল। নিজস্ব গণ্ডিতে অনেক টাকার লগ্নি করে তবে সেইসব সৃষ্টি মানুষের কাছে পৌঁছয়, আবার অনেক সৃষ্টি পৌঁছতে ব্যর্থ হয়! ঐ যেমন শচীন তেন্ডুলকার বা বিরাট কোহলির এক একটি শতরানের জন্য অনেকগুলো কম রানে আউট হওয়া, বহুবার ৫০ টপকাতে না পারা ,১oo ছুঁতে না পারার ব্যর্থতা জমা থেকে যায়।
ক্রিয়েটিভ কাজকর্মের ক্ষেত্রে যেসব পরিকল্পনা সফলভাবে পরিবেশিত হয় তার চেয়ে অনেক বেশি পরিকল্পনা বাক্সবন্দি হয়ে পড়ে থাকে। কারণ কাহিনিচিত্র, ধারাবাহিক বা নাটক যাইহোক নিজ নিজ ক্ষেত্রে এসবই এক সুবিশাল কর্মকাণ্ড। অনেক মানুষের একসঙ্গে করা পরিশ্রমের ফসল। নিজস্ব গণ্ডিতে অনেক টাকার লগ্নি করে তবে সেইসব সৃষ্টি মানুষের কাছে পৌঁছয়, আবার অনেক সৃষ্টি পৌঁছতে ব্যর্থ হয়! ঐ যেমন শচীন তেন্ডুলকার বা বিরাট কোহলির এক একটি শতরানের জন্য অনেকগুলো কম রানে আউট হওয়া, বহুবার ৫০ টপকাতে না পারা ,১oo ছুঁতে না পারার ব্যর্থতা জমা থেকে যায়।
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৮২: যে রাজাকে দেখলে প্রজারা ভয় পান, সেই রাজা ভালো প্রশাসক হতে পারেন না

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১১৯: গোখরো কিংবা কালাচ
প্রফুল্ল রায়ের মতো এইসব মহান সাহিত্যিকরা সারা জীবন দিয়ে মানবজীবন লেখার রসদ সংগ্রহ করেছেন। অফিস করে পৌঁছতাম রিজেন্ট পার্কের কাছে ওঁর বাড়িতে এত ব্যস্ত একজন বিশিষ্টমানুষ আমার মত অতি সাধারণ একজনের জন্য আলাদা করে সময় নিয়ে বসে থাকতেন। ট্রেন বাস টপকে সব সময় নির্ধারিত সময়ে পৌঁছতে পারতাম না, অল্পবিস্তর দেরী হয়েই যেত। আমাকে বসতে বলে প্রথমেই বাড়িতে বলে দিতেন “ওর জন্য কিছু খাবার দাও ও অফিস থেকে আসছে!”
তারপর শুরু হোত কথা—উপন্যাসের পাতার কল্পনার চরিত্রগুলিকে চেহারা দিয়ে রক্তমাংসে গড়ে তোলার পরিকল্পনা কথার আঁকেবাঁকে উঠে আসতো তাঁর নানান আশ্চর্য সব অভিজ্ঞতার কথা!
তারপর শুরু হোত কথা—উপন্যাসের পাতার কল্পনার চরিত্রগুলিকে চেহারা দিয়ে রক্তমাংসে গড়ে তোলার পরিকল্পনা কথার আঁকেবাঁকে উঠে আসতো তাঁর নানান আশ্চর্য সব অভিজ্ঞতার কথা!

প্রফুল্ল রায়ের সাহিত্যজীবন তাঁর লেখার ঘরানা এসব নিয়ে আলোচনা করার ধৃষ্টতা আমার নেই। তার জন্যে সমাজের বহুগুণী মানুষজন আছেন তাঁরা কাগজেপত্রে নিশ্চয়ই লিখবেন! এ শুধু আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা—”আমাকে দেখুন”-এর অসাধারণ স্রষ্টাকে পরপর বেশ কিছুদিন ধরে কাছ থেকে দেখা , মানুষটির পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করার বিরল সুযোগ।
যেদিন আমাদের আলোচনা মোটামুটি শেষ হল সেদিন উনি ‘মানবজীবন’ বইটি নিজে হাতে সই করে আমাকে দিলেন! সেটা ২০০০ সাল। সেদিন ভাবিনি ২৫ বছর বাদে সেই বইয়ের পাতায় লেখা জ্বলজ্বলে অক্ষর আবার আমার পুরনো স্মৃতিকে এইভাবে ফিরিয়ে আনতে বাধ্য করবে।
যেদিন আমাদের আলোচনা মোটামুটি শেষ হল সেদিন উনি ‘মানবজীবন’ বইটি নিজে হাতে সই করে আমাকে দিলেন! সেটা ২০০০ সাল। সেদিন ভাবিনি ২৫ বছর বাদে সেই বইয়ের পাতায় লেখা জ্বলজ্বলে অক্ষর আবার আমার পুরনো স্মৃতিকে এইভাবে ফিরিয়ে আনতে বাধ্য করবে।
* জিৎ সত্রাগ্নি (Jeet Satragni) বাংলা শিল্প-সংস্কৃতি জগতে এক পরিচিত নাম। দূরদর্শন সংবাদপাঠক, ভাষ্যকার, কাহিনিকার, টেলিভিশন ধারাবাহিক, টেলিছবি ও ফিচার ফিল্মের চিত্রনাট্যকার, নাট্যকার। জিৎ রেডিয়ো নাটক এবং মঞ্চনাটক লিখেছেন। ‘বুমেরাং’ চলচ্চিত্রের কাহিনিকার। উপন্যাস লেখার আগে জিৎ রেডিয়ো নাটক এবং মঞ্চনাটক লিখেছেন। প্রকাশিত হয়েছে ‘জিৎ সত্রাগ্নি’র নাট্য সংকলন’, উপন্যাস ‘পূর্বা আসছে’ ও ‘বসুন্ধরা এবং…(১ম খণ্ড)’। এখন লিখছেন বসুন্ধরা এবং…এর ৩য় খণ্ড।


















