রবিবার ৮ মার্চ, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি

ছবি: পথের পাঁচালী ছবির একটি দৃশ্য।

আজ আমরা শিক্ষাঙ্গনে একটু উঁকি মারি। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, শিক্ষা মানুষ গড়ার একটি মাধ্যম। বিদ্যা আলোকগামী করে। প্রথমে প্রসন্ন গুরুমশায়ের পাঠশালায় ঢোকা যাক। অপুর পাঠশালায় প্রথম দিন। দাঁড়িপাল্লা হাতে গুরুমশাই দোকান সামলাতে সামলাতে কিছু ডিকটেশন দিচ্ছেন। তাঁর দৈনন্দিন দোকানদারি আর পাঠদানের মধ্যে সেতু বেঁধে দেয় নানা উচ্চ অনুচ্চ ধ্বনি, বিক্রিবাটা আর পড়াশোনা দুটোতেই তারা সমান অর্থবহ। সরস্বতী আর লক্ষ্মীর দ্বন্দ্ব-ব্যবধান এখানে নেই। ক্রমে এই উপমহাদেশের শিক্ষা অর্থকরী, বাণিজ্যমুখী হয়েছে। শিশুশিক্ষার প্রথম ধাপটিতে সেকালের সমাজমানস থেকে আজকের শিক্ষাবাণিজ্যে প্রসন্নগুরুমশাইরা আছেন।
নামে প্রসন্ন হলেও চরিত্রবৈশিষ্ট্যে তার বিপরীত। ডিকটেশনের ফাঁকে ফাঁকে ওজন করেন, পয়সা নেন। আসন্ন দুর্গোত্সবে গ্রামে ভবিতব্য যাত্রাপালার আলোচনা হয়, মাতব্বর জনৈক গ্রামবৃদ্ধ তাঁর ক্ষমতাবলে মাস্টারমশাইয়ের দেয় চাঁদা মকুব করেছেন জানান, বদলে সময়ে-অসময়ে অনৈতিক সুযোগ নেওয়ার আবদারটুকু থাকে ও স্যারের হ্যাঁ-তে হ্যাঁ মেলানো সম্মতির পর দোকানের তেলের বোতল থেকে তেল মাথায় মেখে তিনি পলায়মান জনৈক চক্রবর্তীকে চাঁদার জন্য তাড়া করেন। যাওয়ার আগে আসন্ন পুজোয় ঢাকের বাদ্যির ঘনঘটার উল্লেখ করতে ভোলেন না। দর্শকের মনে হয়, উত্সবের সার্থকতা যাত্রাপালায়, ঢাকের আওয়াজে। লক্ষ্যের থেকে উপলক্ষের গুরুতর হয়ে ওঠার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণের ব্যঞ্জনাময় এই আয়োজন।
আরও পড়ুন:

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-৬: জয় বাবা ফেলুনাথ: রুকুর অন্দরমহল

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৮৫: অধিকার নয়, অবস্থানই বলে দেয় জায়গা কার– মালিকের? না দখলদারের?

রহস্য রোমাঞ্চের আলাস্কা, পর্ব-৬২: আলাস্কা ঘুরে দেখার জন্য গাড়ি ভাড়া পাওয়া দুষ্কর

বিনি পয়সায় তেলা মাথায় তেল দেওয়ার বাধ্যবাধকতায় মনে মনে ক্ষুব্ধ প্রসন্নস্যার এবার নিজের নামের প্রতি সুবিচার না করেই এতক্ষণ চলতে থাকা কাটাকুটি খেলা ইত্যাদি-প্রভৃতির মূলে থাকা দুষ্ট বালকটিকে কান ধরে আনিয়ে বেত চালান, দোকানে মুড়ি কিনতে এসে এই বিচিত্র পালা দেখতে থাকা বালিকাটি এসব দেখে ভয়ে পালিয়ে যায়। অপু শুষ্কমুখে বসে দেখে। পরের দৃশ্যে মুক্ত প্রকৃতি, জলাশয়, আকাশ, উড়ে যাওয়া পাখি দেখা যায়। দৃশ্যের নেপথ্যে থাকা অন্তর্গত বার্তাটি বোধগম্য হয়।

জনৈক গ্রামবৃদ্ধটির সংলাপে শোনা যায় “এ মানুষ মারা কল”, “কটি মাছি পড়ল”। জানা যায় আটটি থেকে নটি হয়েছে, নবরত্ন। অপুকে হাসতে দেখে প্রসন্নগুরুমশাই “এটা কি নাট্যশালা?” বলে চোখ রাঙান।
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১২৩: তত্ত্বতালাশ

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১২২: রামের পাদুকাগ্রহণের মাহাত্ম্য, ভরত কী রামের ছায়াশ্রিত প্রশাসক?

এই দৃশ্যে মূল লক্ষণীয়টি হল দোকান বনাম পাঠালয়। আপাতভাবে তাচ্ছিল্যের ভাব জাগলেও তত্ত্ব ও প্রয়োগ, বিদ্যা ও অর্থ যেন এখানে একীভূত। গুরুমশাইয়ের রথ দেখা ও কলা বেচার এই আয়োজনে কোনটি রথ কোনটির জন্য কলা তা বোঝা সহজ নয়, তবে বাণিজ্য এখানে মুখ্য, বিদ্যার ভয়াবহ আয়োজনটি ততটা নয় তা বেশ বোঝা যায়। এবং, পরিচালক প্রথাগত শিক্ষা, জীবনবোধ ও শিক্ষার প্রহসনের নেপথ্যে থাকা বিতর্কের সূত্রটিকেই যেন নানা আয়োজনে ধরিয়ে দিতে চান।

এ প্রসঙ্গে, অশনি সংকেতের (সেটিও বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাহিনি) জনৈক ব্রাহ্মণের পৌরোহিত্যের পাশাপাশি পাঠদানের আয়োজনটি মনে পড়ে। সমাজকাঠামোয় তা স্বীকৃত-ও। বর্ণবিভক্ত সমাজের উচ্চে থাকা ব্রাহ্মণের জাতিগত বৃত্তি অধ্যয়ন, অধ্যাপন, যজন, যাজন, দান, প্রতিগ্রহের বৌদ্ধিক ব্যবস্থার অসহায় আত্মসমর্পণ সেখানে দেখা যাবে। মনে পড়তে পারে, সুকুমার রায়ের জীবনীনির্ভর তথ্যচিত্রে দৃশ্যায়িত জনৈক গুরুমশাইয়ের পাঠদান। তবে সে প্রসঙ্গ পরে।

পথের পাঁচালীর পাঠশালায় গুরুমশাইয়ের হাতে বাণিজ্যের মাপকাঠি দাঁড়িপাল্লা বা তুলাযন্ত্র। শিক্ষার বাণিজ্যীকরণের তত্ত্বটি অনায়াসে মনে আসবে। অন্তঃসারহীন তুল্যমূল্য বিচারের গভীরের প্রহসনটি নাকি জীবনের পাঠশালায় অর্জিত অভিজ্ঞতার বৃহত্তর পরিসর মানুষকে পূর্ণ করে সেই প্রশ্নটি জেগে ওঠে।
আরও পড়ুন:

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১২৩: মেথরকে ডেকে এনে বসাতেন নিজের বিছানায়

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১০৮: লক্ষ্মী প্যাঁচা

গুরুমশাই যে ডিকটেশন দেন, এবং বলাবাহুল্য, তো কেউই গ্রহণ করে না, তা স্মৃতিনির্ভর। মুখস্থ কথার চর্বিতচর্বণে “এই সেই জনস্থানমধ্যবর্তী প্রস্রবণ-গিরি। ইহার শিখরদেশে আকাশপথে সতত-সমীর-সঞ্চরমাণ-জলধরপটল-সংযোগে নিরন্তর নিবিড় নীলিমায় অলঙ্কৃত” ইত্যাদির সমাসবহুল বাক্যগুলি শোনা যায়। বিদ্যাসাগরের সীতার বনবাস। দর্শক যদি ভাবতে চান, বিদ্যা এখানে নির্বাসিত তবে তা হয়তো ভুল নয়। সীতা উত্তররামচরিত-নির্ভর এই কাহিনিতে অজ্ঞাতে নির্বাসিত, বিদ্যাভ্যাসের এই আয়োজন স্বাভাবিক মনে হলেও তাতে একরকম অসুস্থতা তো আছেই। তবে এটিও প্রণিধেয় যে, শৈশবের এই পাঠশালায় শোনা অপূর্ব কিছু শব্দে ধ্বনিময় রূপকল্পের স্বপ্নিল জগতের নির্মাণের নেপথ্যে ওই পাঠশালা, ওই গুরুমশাই। জীবন যখন অনেকটা এগিয়ে যায়, ছোটবেলার নিশ্চিন্দিপুরের অন্দরের সেই পাঠশালাগুলো হয়তো ততোটা গুরুতর থাকে না, তার ফাঁক, ফাটলগুলো চোখে পড়ে, কিন্তু সেটা দেখার চোখের ওপারের শক্তিটুকুর স্ফুরণ ঘটে তো ওইসব আঁতুড়ঘরেই।
আরও পড়ুন:

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-১০৬: দীনদুখিনীর জননী সারদা

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-১১: ভাগ্যের ফেরে হাস্যকর ‘লাখ টাকা’

শিক্ষার ফাটলের কথার প্রসঙ্গেই আমরা চলে যাব সেই ছোটবেলার ইস্কুলে, “অপরাজিত”র অপুর স্কুলে। সেদিন স্কুলে ইন্সপেক্টর আসবেন। ব্যস্ত হেডস্যার গলাবন্ধ কালো কোট আর ধুতিতে নিয়ম ও সময়ের ধারক বাহক হয়ে ক্লাসে ক্লাসে জানিয়ে যাচ্ছেন “আর আধঘণ্টা, ওনলি হাফ অ্যান আওয়ার”, শেষ মুহূর্তে সব কিছু নিখুঁত রাখতে চাইছেন। পাশে জীর্ণ দেওয়ালগুলি ফেটে ইট দেখা যায়, হতশ্রী বিদ্যাঙ্গনের প্রাণবায়ুর তদন্তের দিন আজ। কিন্তু সেখানেই হয়তো সোনার ফসল, সোনার কমল ফোটে।

কেশববাবুকে কখনও ডেকে কিছু নির্দেশ দেন, কখনও মাটিতে পড়ে থাকা কাগজ তুলতে গিয়ে দেওয়ালে নিজের বেত-উঁচানো ভয়াবহ ছবি দেখে জগদীশবাবুকে তা দেখিয়ে ব্যবস্থা নিতে বলেন, কখনও গেট দিয়ে ঢুকে পড়া গরুটিকে “গেট আউট গেট আউট” বলে তাড়া করে জনৈক বৈকুণ্ঠকে স্মরণ করেন। আশ্চর্য! যিনি কেশব তিনিই জগদীশ, তাঁর আবাসই বৈকুণ্ঠ। গোলোকের অধিপতি স্থিতিকালের দেবতা বিষ্ণুর সঙ্গেও বাহন হয়ে থাকে গরু। এঁরা সকলে যে একই ব্যবস্থা, সিস্টেমের অংশ তা বোঝা যায়।

বোঝা যেতে পারে, বিদ্যাকে বহন নাকি বাহন করা হবে সেই সপ্রশ্ন ইঙ্গিতটুকুও। ইন্সপেক্টর এসে পড়েন। কৌতূহলী উঁকিঝুঁকি দেখা যায়, বৈকুণ্ঠ আসে কীনা জানা যায় না, কিন্তু অবোধ বিদ্যার্থীর আপাত মূর্খতাকে কণ্টকিত করে “গরু”র বোধবুদ্ধির সঙ্গে তুলনা করার দুনিয়ায় সেই অকুণ্ঠ গরুটি বুঝি এ বিষয়ে অনুযোগ জানাতে পথরোধ করতে আসে। মুহূর্তটি সরস, ব্যঞ্জনাময়। ইন্সপেক্টর প্রবেশ করেন, ক্রমে একটি ক্লাসে আসেন। পাঠ্য বইয়ের নামে থাকা কিশলয় শব্দের মানে জানতে চাইলে ছাত্র বলতে পারে না, হেডমাস্টারের মুখ ভীতচকিত। পাশের ছেলে অপূর্ব রায় সদুত্তর দিলে প্রসন্ন হয়ে বিদ্যালয় পরিদর্শক তাকে রিডিং পড়তে বলেন, মুগ্ধ হয়ে শুনতে থাকেন সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের কবিতা “কোন দেশেতে তরুলতা….কোন্ ভাষা মরমে পশি আকুল করি তোলে প্রাণ।”
কলকাতায় বৃষ্টি

ছবি: অপরাজিত ছবির একটি দৃশ্য।

চলচ্চিত্রের পরিচালকের অভিপ্রায়টি অনুধাবন করা যায়। যে পাঠশালায় এককালে অঙ্কুরোদ্গম ঘটে, তা বৃহত্তর পরিসরে সতেজ সরস হয়ে ওঠে। ক্ষেত্র ছোট থেকে বড় হয়, তার হতশ্রী দশা কিংবা তার নেপথ্যে থাকা নিরর্থক প্রহসনটুকুও কমে না, বরং বাড়ে, কিন্তু এ পথেই ক্রমমুক্তি ঘটে অপুদের। আপাদমস্তক সাহেবী পোষাকে নিজেকে মোড়া ব্রিটিশ স্বাভিমান, নিয়মানুবর্তিতার আদর্শে দীক্ষিত, শয়নে স্বপনে “ওদের মতো” হয়ে উঠতে চাওয়া ইন্সপেক্টরের ঔপনিবেশিক আকাঙ্ক্ষা এক স্কুলবালকের অনায়াস উপস্থাপনার সৌন্দর্যে মোহিত হয়। মাতৃভাষায় বিদ্যাভ্যাস, বোধের স্ফুরণ কিংবা আড়ম্বরটুকু বাদ দিলে সদর্থক বিদ্যাশিক্ষার গভীরে জেগে ওঠা চেতনার আলোতে সতত সঞ্চরমান মেঘরাশির নিচে ঝরে পড়া ঝর্ণাধারার নিবিড় সৌন্দর্যটির অনুভবেই শিক্ষার মুক্তি, শিক্ষাঙ্গনের সাফল্য, জীবনের পূর্ণতা। এই আলোচনার পথেই আসবে হীরক রাজার দেশের উদয়ন পণ্ডিত, প্রতিদ্বন্দ্বী, জনঅরণ্যের শিক্ষার হালচাল, আগন্তুকে মনমোহন মিত্রের পাঠশালা, আগামী পর্বগুলিতে।—চলবে।
* ড. অভিষেক ঘোষ (Abhishek Ghosh) সহকারী অধ্যাপক, বাগনান কলেজ। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগ থেকে স্নাতকস্তরে স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত। স্নাতকোত্তরের পর ইউজিসি নেট জুনিয়র এবং সিনিয়র রিসার্চ ফেলোশিপ পেয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগে সাড়ে তিন বছর পূর্ণসময়ের গবেষক হিসাবে যুক্ত ছিলেন। সাম্বপুরাণের সূর্য-সৌরধর্ম নিয়ে গবেষণা করে পিএইচ. ডি ডিগ্রি লাভ করেন। আগ্রহের বিষয় ভারতবিদ্যা, পুরাণসাহিত্য, সৌরধর্ম, অভিলেখ, লিপিবিদ্যা, প্রাচ্যদর্শন, সাহিত্যতত্ত্ব, চিত্রকলা, বাংলার ধ্রুপদী ও আধুনিক সাহিত্যসম্ভার। মৌলিক রসসিক্ত লেখালেখি মূলত: ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে। গবেষণামূলক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়ে চলেছে বিভিন্ন জার্নাল ও সম্পাদিত গ্রন্থে। সাম্প্রতিক অতীতে ডিজিটাল আর্ট প্রদর্শিত হয়েছে আর্ট গ্যালারিতে, বিদেশেও নির্বাচিত হয়েছেন অনলাইন চিত্রপ্রদর্শনীতে। ফেসবুক পেজ, ইন্সটাগ্রামের মাধ্যমে নিয়মিত দর্শকের কাছে পৌঁছে দেন নিজের চিত্রকলা। এখানে একসঙ্গে হাতে তুলে নিয়েছেন কলম ও তুলি। লিখছেন রম্যরচনা, অলংকরণ করছেন একইসঙ্গে।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content