কলকাতায় বৃষ্টি
প্যান্ডেলের আলো তখন একে একে জ্বলে উঠছে। ঢাকের শব্দের সঙ্গে মিশে আছে ধূপের গন্ধ, মানুষের কোলাহল আর শরতের নরম বাতাস। অনির্বাণ প্রতিমার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল, অথচ তার চোখ দুর্গার দিকে ছিল না। এদিক ওদিক বারবার তাকিয়ে কাকে যেন খুঁজছে সে। বারো বছর ধরে যে মুখটাকে সে মনে মনে খুঁজেছে, আজও সেই মুখটাই দেখবার জন্য সে অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় আছে।

হঠাৎ পিছন থেকে ভেসে এল সেই সুরেলা কণ্ঠ—
— “তুমি এখনও এমন করে একা দাঁড়িয়ে থাকবে?”
অনির্বাণের বুকটা থরথর করে কেঁপে উঠল।
সে দ্বিগবিদিক শূন্য হয়ে দ্রুত ফিরে তাকালো।
পল্লবী।
বারো বছর আগের সেই নরম কোমল পল্লবী নয়— এই পল্লবীর যেন চোখের কোণে বয়সের সামান্য ছাপ পড়েছে, মুখে এসেছে পরিণত শান্তি। কিন্তু একই রকম রয়েছে সেই উজ্জ্বল চোখ দুটো!!
অনির্বাণ মনে মনে বলল— এই চোখ দুটোকে কী এত সহজে ভুলে থাকা যায়, প্রিয়ে?
কয়েক মুহূর্ত অনির্বাণ পল্লবীর সঙ্গে কোনও কথা বলতে পারল না। নির্বাক দৃষ্টিতে একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইল।
পল্লবী হেসে বলল—
— “কী হল? অমন হাঁ করে তাকিয়ে আছো কেন? চেনা যাচ্ছে না বুঝি আমাকে?”
আবেগে অনির্বাণের ঠোঁট দুটো কেঁপে উঠল। মিটিমিটি হেসে বলল—
— “ভুলে যাওয়ার মতো তুমি কোনওদিন ছিলে না কি?”
পল্লবীর হাসিটা নিমেষে মিলিয়ে গেল।
অভিমানে সে চোখ নামিয়ে বলল—
— “তবু ত একেবারে ভুলেই গিয়েছিলে।”
আরও পড়ুন:

এআই যুগেও উপনিষদের আবেদন অমলিন, কেন?

রহস্য উপন্যাস: হ্যালো বাবু! পর্ব-১৫৬: হার্ড ড্রাইভ হত্যারহস্য

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৮৮: প্রতিপক্ষ অন্ধকার

মহালয়া

খুব ধীরে ধীরে কথাটা বলল। কিন্তু অনির্বাণের মনে হল, এক লহমায় যেন বারো বছরের সমস্ত নীরবতা একসঙ্গে তার সামনে এসে দাঁড়াল।
— “না গো, আমি ভুলিনি তোমায় পল্লবী।”
— “তাহলে ফিরে আসতে এত দেরি করলে কেন?”
অনির্বাণ কোনও উত্তর দিতে পারল না।
পল্লবী এবার তার দিকে চোখ তুলে তাকাল।
— “জানো, প্রথম কয়েক বছর আমি সত্যিই ভেবেছিলাম তুমি আসবে। ষষ্ঠীর দিন প্যান্ডেলের ভিড়ে তোমাকে এদিক ওদিক খুঁজতাম। মনে হতো, হঠাৎ পিছন থেকে এসে বলবে—‘পল্লবী, এতদিন কোথায় ছিলে?’”
কথা গুলো এক নিশ্বাসে বলে ও একটু থামল।
— “তারপর একদিন বুঝলাম, অপেক্ষা করতে করতে মানুষও ক্লান্ত হয়ে যায়।”
চোখ ভিজে উঠেছিল।

অনির্বাণ শুধু বলল—“আমাকে একবারও ডাকোনি কেন?”
পল্লবী মৃদু হেসে বলল—
— “ডেকেছিলাম। তুমি শুনতে পাওনি।”
— “কোথায়?”
— “প্রতি বছর এই প্যান্ডেলে।”
অনির্বাণ মুখ ফিরিয়ে নিল।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৭৯: রাজসূয়যজ্ঞে চেদিপতি শিশুপাল ও কুরুপ্রধান ভীষ্মের কথোপকথনে সদর্থক ও নঞর্থক চিন্তার সংঘাত,মহাকাব্যে প্রতিফলিত জীবনবোধ

মহালয়া

ঢাকের শব্দ যেন হঠাৎ অনেক দূরে চলে গেল।
অনির্বাণ ধীরে ধীরে বলল—
— “আমি ভেবেছিলাম তুমি আমাকে ভুলেই গেছো।”
পল্লবী, এবার আর হাসল না।
— “মানুষকে ভুলে যাওয়া এত সহজ হলে বারো বছর ধরে একটা নাম মনে রেখে বেঁচে থাকা যায় কী?”
অনির্বাণ ধীরে ধীরে তার সামনে এসে দাঁড়াল।
— “আমি তো ফিরে এসেছি।”
অনির্বাণ নিজের হাতে পল্লবীর মুখ তুলল।
পল্লবী চোখ তুলে তাকাল।
— “কত দিনের জন্য?”
প্রশ্নটা শুনে অনির্বাণ বুকের ভেতরটা যেন ফাঁকা হয়ে গেল।
সে বলল—
— “জানি না।”
— “তাহলে আবার চলে যাবে তো?”
— “হয়তো।”
পল্লবী, মুখ ফিরিয়ে নিল।
— “তাহলে আজ আমাকে আবার নতুন করে অপেক্ষা করতে বলো না।”
অনির্বাণ এবার তার হাতের কাছে এসে থেমে গেল। কোনও স্পর্শ নয়, শুধু খুব কাছে দাঁড়িয়ে বলল,
— “বারো বছর আগে আমি তোমাকে বলেছিলাম—ফিরে আসব। তখন বুঝিনি, একটা কথা রাখতে দেরি হলে সেই কথার ভিতর কতটা কষ্ট জমে যায়।”
পল্লবী, চোখ দিয়ে অবিরাম অশ্রু গড়িয়ে পড়ল।
— “তুমি জানো না, কতবার তোমার ওপর রাগ করেছি।”
— “জানি।”
— “কতবার ভেবেছি, তোমাকে আর কোনোদিন দেখতে চাই না।”
— “জানি।”
— “কতবার মনে হয়েছে, তুমি এলে আমি তোমাকে বলব—এত দেরি করলে কেন?”
অনির্বাণ খুব আস্তে বলল—
— “এখন বলো।”
পল্লবী, তার দিকে নিষ্পলক ভাবে তাকিয়ে রইল।
তারপর এতদিনের জমে থাকা অভিমান যেন একটিমাত্র বাক্যে বেরিয়ে এল—
— “এত দেরি করলে কেন, অনির্বাণ?
আরও পড়ুন:

জন্মশতবর্ষে উত্তমকুমার : শতফুল বিকশিত হোক

শ্রদ্ধাঞ্জলি : সঙ্গীতই আমার ফার্স্ট লাভ : শচীন দেববর্মণ

অনির্বানের চোখে এবার আর জল আটকাল না।
— “আমি ভয় পেয়েছিলাম।”
— “কিসের?”
— “তোমাকে হারানোর।”
পল্লবী, অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।
অনির্বাণ বলল—
— “ভাবতাম, ফিরে এসে যদি দেখি তুমি অন্য কারও জীবনে সুখী, তাহলে কী করব? তাই দূরে থেকেছি। অথচ বুঝিনি—দূরে থাকাটাই হয়তো তোমাকে হারানোর সবচেয়ে বড় কারণ।”
পল্লবী, কোনও উত্তর দিল না।
শুধু চোখ মুছে নিল।
প্যান্ডেলের আলোয় তখন প্রতিমার মুখটা উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। চারপাশে মানুষের ভিড়। ঢাক বাজছে। শিশুরা ছুটছে। কেউ তাদের দিকে তাকাচ্ছে না।
তবু অনির্বাণ মনে হল, এই বিশাল পৃথিবীতে এই মুহূর্তে শুধু তারা দু’জনই আছে।
পল্লবী, ধীরে বলল—
— “এবার যদি যাও?”
অনির্বাণ বলল—
— “যাব।”
পল্লবী স্তব্ধ হয়ে গেল।
অনির্বাণ যোগ করল—
— “কিন্তু ফিরে আসব না—এই কথাটা আর কোনোদিন বলব না। কারণ এবার যাওয়ার আগেই তোমাকে সঙ্গে নিয়ে যাব আমার জীবনের ঠিকানায়।”
পল্লবী, তাকাল।
তার চোখে তখন জল আর হাসি পাশাপাশি।
— “বারো বছর পরেও তুমি কথা বলতে শিখোনি।”
অনির্বাণ হেসে ফেলল।
— “তুমি তো বুঝতে শিখেছ।”
পল্লবী, মাথা নাড়ল।
— “না। তোমাকে বোঝার চেষ্টা করতেই বারো বছর কেটে গেল।”
আরও পড়ুন:

দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৯ : নয়া ভুবনের প্রজাপতি

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৬৮: চন্দ্রবোড়া

দূরে তখন ঢাকের শব্দ আরও জোরে উঠেছে।
অনির্বাণ বলল—
—পল্লবী,
— “হুম?”
“আমাকে আর একবার সুযোগ দেবে?”
পল্লবী, কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
তারপর বলল—
— “একটা শর্তে।”
— “কী?”
— “এবার আর হারিয়ে যেও না।”
অনির্বাণ ধীরে মাথা নাড়ল।
— “কখনও না।”
পল্লবী, তার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর খুব আস্তে বলল—
— “তাহলে এসো। পুজোটা এবার একসঙ্গে দেখি।”
দু’জন পাশাপাশি হাঁটতে শুরু করল।
প্যান্ডেলের আলো তাদের ছায়া দুটোকে একসঙ্গে মাটিতে ফেলেছিল।
বারো বছর আগে যে দুটো ছায়া আলাদা পথে চলে গিয়েছিল, শরতের সেই সন্ধ্যায় তারা আবার পাশাপাশি ফিরল।
আর অনির্বাণ বুঝল—
কিছু মানুষকে জীবন থেকে হারিয়ে ফেলা যায়, কিন্তু হৃদয় থেকে নয়।
কিছু অপেক্ষার কোনো শেষ হয় না।
শুধু একদিন, দুর্গাপুজোর ঢাকের শব্দের মধ্যে, শিউলি-ভেজা এক সন্ধ্যায়—
অপেক্ষার মানুষটি ফিরে আসে।—শেষ।
* লেখক: ড. সঞ্চিতা কুণ্ডু (Sanchita Kundu) সংস্কৃতের অধ্যাপিকা, হুগলি মহসিন কলেজ।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content