কলকাতায় বৃষ্টি

ছবি : প্রতীকী।

দুর্দমনীয় দশভাই দশভেয়েদের ত্রাসে তখন চারিদিকে একটাই রব—ত্রাহি ত্রাহি। এ এক আশ্চর্য ব্যাপার বটে! ভবিষ্যতে যিনি হবেন সকলের ইহকাল পরকালের ত্রাতা, তাঁর থেকেই তখন পরিত্রাণ চাইছে সকলে!

মানুষই দেবতা গড়ে, তাহারই কৃপার ‘পরে করে দেব মহিমা নির্ভর!

সে যাই হোক, এঁদের ধরার জন্য রাজকীয় মল্লযুদ্ধের আয়োজন হবে। সেখানে লড়ে জয় ছিনিয়ে না নিতে পারলে সম্মান নিয়ে টানাটানি হবে। লোকে বলবে, “এত বড় বীর তোমরা, তোমাদের বাহুবলে দেশ কম্পমান, তো মল্লযুদ্ধে নামতে এত ভয় কীসের? হেরে যাবে? নাকি ধরা পড়ার ভয়? এইরকম বীরপুরুষ তোমরা তাহলে!”
রাজার অমাত্যরাও মনে মনে জানতেন যে এই আহ্বান এড়িয়ে যেতে ওঁরা পারবেন না বোধহয়। তখন চাণূব ও মুষ্টিক নামের দুই দুর্ধর্ষ মল্লযোদ্ধাকে ডেকে আনা হল। রাজাঙ্গনে নির্মিত হতে থাকল বৃতিবেষ্টিত যুদ্ধমণ্ডল, ক্রমে ক্রমে সেজে উঠতে থাকল সেই মল্লভূমি, নির্দিষ্ট একটি স্থানে বেঁধে রাখা হল জয়পতাকা। নগরে ভেরী বাজিয়ে রাজার ঘোষক ঘোষণা করতে লাগল —
“শোনো শোনো সবাই শোনো, রাজা আদেশ দিয়েছেন যে আজ থেকে সপ্তম দিনে মল্লযুদ্ধ হবে।”
আরও পড়ুন:

বিচিত্রের বৈচিত্র, গল্পবৃক্ষ, পর্ব-৬৮ : ঘটজাতক/৩ : দশে মিলে?

এআই যুগেও উপনিষদের আবেদন অমলিন, কেন?

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৬৫: শিয়রচাঁদা

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৭৫: কৃষ্ণবিরোধিতার প্রসঙ্গে ভীষ্মের বিরূপ সমালোচনা সত্ত্বেও কে স্মরণীয়? শিশুপাল? না ভীষ্ম?

মাঝে একটিমাত্র সপ্তাহ কেবল! সমগ্র নগরী যেন উত্তেজনায় ফুটছে। কী হয়! কী হয়! সকল নগরবাসী উদগ্রীব আগ্রহে সেই দিনটির প্রতীক্ষা করতে লাগল। তাদের বসার জন্য যুদ্ধমণ্ডলকে বেষ্টন করে করে চক্রাকারে প্রস্তুত হতে থাকল আসনমঞ্চসমূহ।
ক্রমে এসে পড়ল সেই দিন!
চাণূব ও মুষ্টিক যথাসময়ে প্রবেশ করল মণ্ডলে। যুদ্ধমণ্ডলে প্রবেশ করে তারা গর্জন ও লম্ফনে সকলকে সচকিত করে তুলল। বুক ফুলিয়ে বাহুর পেশীস্ফোটন করে তারা মণ্ডলে পরিভ্রমণ করতে লাগল।
আরও পড়ুন:

উপন্যাস, পর্ব-৮৭ : আকাশ এখনও মেঘলা

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-১০৮: স্তাবক-পরিবেষ্টিত রাজা কেবল অন্ধই হন না, নিজের দুর্গেই জ্যান্ত সেদ্ধ হন!

এই বিপুল আয়োজনে কে দূরে সরে থাকতে পারে! দশভেয়েরাও বেরিয়ে পড়লেন। আসার পথে তাঁরা রজকপল্লী আক্রমণ করে রঞ্জিত বস্ত্রসমূহ লুণ্ঠন করে পরিধান করলেন। গন্ধবণিকদের বিপণিতে অতর্কিত হানা দিয়ে গন্ধদ্রব্য কেড়ে নিয়ে অঙ্গরাগ সম্পন্ন করলেন। মালাকারদের দোকানে আক্রমণ করে লুণ্ঠন করলেন মাল্যভার। এরপর গন্ধানুলেপনে, মাল্যশোভায় বিভূষিত হয়ে, কর্ণ কর্পূরে শীতল ও শোভমান করে তাঁরাও এসে উপস্থিত হলেন যুদ্ধমণ্ডলে। বুক ফুলিয়ে তর্জন, গর্জন, লম্ফন ও বাহুস্ফোটনে সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন।
আরও পড়ুন:

জন্মশতবর্ষে উত্তমকুমার : শতফুল বিকশিত হোক

এই দেশ এই মাটি, ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-১১১ : কবি রাজার বিবসনা রমণীর চিত্রাঙ্কন / ৪

সমগ্র নগরী বুঝি এই মহাক্ষণের অপেক্ষায় অধীর উৎকণ্ঠায় কালহরণ করছিল! যাঁর পদতল আনন্দ-বেদনার নিত্যপ্রবাহে সদাসর্বদাই মধুর-বিধুর সেই কাল-ও কি স্বয়ং প্রহর গণনা করছিলেন?

আভরণে বিলেপনে বিভূষিত দশভেয়েরা যুদ্ধমণ্ডলে দেখা দিলেন। চাণূব এতক্ষণ হাতের পেশী ফুলিয়ে মণ্ডলে পরিভ্রমণ করছিল। বলদেব একেই লক্ষ্য করে তাঁর কর্তব্যকর্ম স্থির করে নিলেন। অভিনব উপায়ে জনতাকে চমত্কৃত করতে হবে। বলদেব মনে মনে ভাবলেন, “এই বাহুবলীকে হাত দিয়ে স্পর্শ করব না!”

তারপর তিনি রাজার হস্তিশালা থেকে একটি বিরাট যোত্র আনলেন। শকটে পশুবন্ধনের এই রজ্জু বা যোত্র নিয়ে মহালম্ফন ও ভয়াল গর্জন করতে করতে তিনি নিমেষেই চাণূবের উদরদেশ বেঁধে ফেললেন। এরপর আর কী! সেই রজ্জুর প্রান্ত দৃঢ়মুষ্টিতে ধরে মাথার ওপর রজ্জুনিবদ্ধ মহাবলীকে বনবন করে ঘোরাতে ঘোরাতে এমন বেগে দূরে নিক্ষেপ করলেন যে, সেই মহাঘূর্ণনে মহাকায় মল্লবীর চাণূব যুদ্ধমণ্ডলের বৃতির, আবৃতভূমির বাইরে গিয়ে পড়ল।
আরও পড়ুন:

দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৯ : নয়া ভুবনের প্রজাপতি

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৮৪: বুনো তেঁতুল, বাঘা ওল

জোর যার মুলুক তার বটে!
যুগে যুগ এমন পেশীবল ও কূটনীতিতে ভর করেই দেখা দেয় নতুন দিন। দেখা দেয় নবতর শঙ্কা, সম্ভাবনা ও সমাপতনের দ্যোতনা নিয়ে।

দশভাই দাস দশভেয়েরা এমন ক্রান্তিকালেই বুঝি অবস্থান করছিলেন।

যিনি পরে লাঙল নিয়ে অবতীর্ণ হবেন ভারতবর্ষের রঙ্গমঞ্চে, হবেন বলভদ্র কিংবা বলরাম, যাঁর নামেই বল বা শক্তির ব্যঞ্জনা, সেই বলদেব তাঁর অপরাজেয় বাহুবলে এখন মল্লভূমির যুদ্ধক্ষেত্রে নিষ্কণ্টক করছেন জয়ের পথ। এবার মুষ্টিকের পালা। চাণূব নিহত হয়েছে। রাজা এখন মুষ্টিককে আদেশ দিলেন যুদ্ধ করতে। কী হবে এর ফল? ক্ষমতার এই আস্ফালনের স্রোতে কি কখনো এসে মিলবে কল্যাণধারা? দেখা যাবে পরবর্তী পর্বে।
* ড. অভিষেক ঘোষ (Abhishek Ghosh) সহকারী অধ্যাপক, বাগনান কলেজ। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগ থেকে স্নাতকস্তরে স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত। স্নাতকোত্তরের পর ইউজিসি নেট জুনিয়র এবং সিনিয়র রিসার্চ ফেলোশিপ পেয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগে সাড়ে তিন বছর পূর্ণসময়ের গবেষক হিসাবে যুক্ত ছিলেন। সাম্বপুরাণের সূর্য-সৌরধর্ম নিয়ে গবেষণা করে পিএইচ. ডি ডিগ্রি লাভ করেন। আগ্রহের বিষয় ভারতবিদ্যা, পুরাণসাহিত্য, সৌরধর্ম, অভিলেখ, লিপিবিদ্যা, প্রাচ্যদর্শন, সাহিত্যতত্ত্ব, চিত্রকলা, বাংলার ধ্রুপদী ও আধুনিক সাহিত্যসম্ভার। মৌলিক রসসিক্ত লেখালেখি মূলত: ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে। গবেষণামূলক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়ে চলেছে বিভিন্ন জার্নাল ও সম্পাদিত গ্রন্থে। সাম্প্রতিক অতীতে ডিজিটাল আর্ট প্রদর্শিত হয়েছে আর্ট গ্যালারিতে, বিদেশেও নির্বাচিত হয়েছেন অনলাইন চিত্রপ্রদর্শনীতে। ফেসবুক পেজ, ইন্সটাগ্রামের মাধ্যমে নিয়মিত দর্শকের কাছে পৌঁছে দেন নিজের চিত্রকলা। এখানে একসঙ্গে হাতে তুলে নিয়েছেন কলম ও তুলি। লিখছেন রম্যরচনা, অলংকরণ করছেন একইসঙ্গে।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content