কলকাতায় বৃষ্টি

মহারাজা বীরচন্দ্র মাণিক্য। ছবি : সংগৃহীত।

আনুষ্ঠানিক ভাবে সিংহাসনে অভিষেকের পর বীরচন্দ্র যেন এক নতুন রূপে উদ্ভাসিত। তিনি আর দুর্বল কিংবা অনুগামী নির্ভর নন। মামলা-মকদ্দমা শেষ। প্রয়োজন ফুরিয়েছে সাক্ষ্যদানেরও। রায় তাঁর অনুকূলে গিয়েছে। ভ্রাতাগণ পরাস্ত। আর ‘ডিফেক্টো’ নন। এবার তিনি সিংহাসনে সুদৃঢ় ভাবে প্রতিষ্ঠিত। ঈশানচন্দ্রের জ্যেষ্ঠ পুত্র ব্রজেন্দ্রচন্দ্র, বিতর্কিত রোবকারী অনুসারে যিনি বড় ঠাকুর, মামলা চলাকালীন সময়েই তাঁর মৃত্যু ঘটেছিল। সে সময়েই ঈশানচন্দ্রের রানিদের সঙ্গে কথা হয়েছিল, বীরচন্দ্র মামলায় জয়ী হয়ে পোক্ত ভাবে সিংহাসনে বসলে যুবরাজ করা হবে ঈশানচন্দ্রের অপর পুত্র নবদ্বীপচন্দ্রকে।
এই ভাবেই রাজ অন্তঃপুরকেও নিজের অনুকূলে নিয়ে এসেছিলেন বীরচন্দ্র। কিন্তু বীরচন্দ্র শেষপর্যন্ত নবদ্বীপচন্দ্রকে অবরুদ্ধ করে রাখেন। অনেক নির্যাতন সহ্য করতে হয় তাঁকে। উল্লেখ করা যায় যে, এই নবদ্বীপচন্দ্র হলেন পরবর্তীকালের ভারত বিখ্যাত সুরকার শচীন দেববর্মণ অর্থাৎ এসডি বর্মণের পিতা। যাইহোক, ভ্রাতুষ্পুত্র নবদ্বীপচন্দ্রের প্রতি বীরচন্দ্রের আচরণ সম্পর্কে সুবিখ্যাত ঐতিহাসিক কৈলাসচন্দ্র সিংহ লিখেছেন: “…মহারাজ বীরচন্দ্র দ্বারা ঈশানচন্দ্রের একমাত্র পুত্র নবদ্বীপচন্দ্র একটি গৃহমধ্যে অনাহারে অবরুদ্ধ থাকিয়া শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণা ভোগ করিতেছিলেন। তদন্তর প্রায় এক বৎসর তিন মাস নবদ্বীপচন্দ্র মহারাজ বীরচন্দ্র দ্বারা রাজভবনে অবরুদ্ধ ছিলেন। এই কাল মধ্যে মহারাজ বীরচন্দ্র ক্রমে ক্রমে নবদ্বীপচন্দ্রের বন্দুক, তরবারি প্রভৃতি অস্ত্রশস্ত্র অপহরণ করেন।…”
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-১০৮ : কবি রাজার বিবসনা রমণীর চিত্রাঙ্কন / ১

উপন্যাস: হ্যালো বাবু! পর্ব-১৪৭: হার্ড ড্রাইভ হত্যারহস্য / ২৭

শ্রদ্ধাঞ্জলি : বাইশে শ্রাবণ

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৬২: ছুঁচো

কিছুদিন পর নবদ্বীপচন্দ্র তাঁর মাকে নিয়ে সহায়-সম্পদহীন অবস্থায় আগরতলা ত্যাগ করে কুমিল্লায় চলে আসেন। এদিকে বীরচন্দ্র পুরনো রাজকর্মচারীদের সরিয়ে নতুনদের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ করেন। যে সব বিশ্বস্ত কর্মচারী মামলার সময় বীরচন্দ্রকে নানা ভাবে সাহায্য করেছিলেন অবিচার করা হয় তাদের প্রতিও। বীরচন্দ্রকে সিংহাসনে বসানোর জন্য যে গুরু বিপিন সর্বাত্মক উদ্যোগ নিয়েছিলেন সেই বিপিন বিহারীকেই রাজা অবরুদ্ধ করেছিলেন। একদা বীরচন্দ্রের বিশ্বাসভাজন ব্রজমোহন ঠাকুরও পদচ্যুত ও অবরুদ্ধ হয়েছিলেন। দেওয়ান গুরুদাসকেও পদচ্যুত করে রাজ্য থেকে বিতাড়িত করা হয়েছিল। সব মিলিয়ে বলা যায়,রাজত্ব রক্ষায় যা কিছু করণীয় রাজা বীরচন্দ্র তা অবলীলায় করে গিয়েছেন।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৭২: কামোদ্দীপক প্ররোচনা ও রাবণের পরস্ত্রী-অপহরণের লোলুপতা আজও অব্যাহত

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-১০৮: স্তাবক-পরিবেষ্টিত রাজা কেবল অন্ধই হন না, নিজের দুর্গেই জ্যান্ত সেদ্ধ হন!

তবে বীরচন্দ্রের রাজত্ব লাভের মতো রাজত্ব রক্ষাও কম কঠিন ছিল না। ইংরেজ কর্তৃপক্ষও নানা ভাবে মহারাজ বীরচন্দ্রের ক্ষমতা খর্ব করার চেষ্টা করছিল। ১৮৭১ সালে তারা আগরতলায় পলিটিক্যাল এজেন্ট বসিয়েছিল।কখনও রাজার প্রশাসনিক ক্ষমতা কেড়ে নেবার চেষ্টা হয়েছে, ইংরেজদের চাপে সর্ব ক্ষমতাসম্পন্ন মন্ত্রীও নিয়োগ করতে হয়েছে রাজাকে। সশস্ত্র কুকিদের বিরুদ্ধে অভিযানের নামে ত্রিপুরার পূর্ব প্রান্তের এক বিরাট এলাকা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যভুক্ত করে নেওয়া হয়েছিল বীরচন্দ্রের রাজত্বকালেই। বীরচন্দ্র যেমন ইংরেজদের কাছ থেকে নানা ভাবে চাপের মধ্যে ছিলেন, তেমনই আভ্যন্তরীণ অবস্থাও তাঁকে উত্যক্ত করে তুলেছিল। তাঁর ঊর্ধ্বতন কর্মচারীগণ নিজেদের মধ্যে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়ে বহুলাংশে রাজ্যের যেমন অনিষ্ট সাধন করে যাচ্ছিলেন, তেমনই রাজাকেও দুর্বল করে তুলেছিলেন।সব মিলিয়ে রাজা ছিলেন ঘরে বাইরে প্রবল চাপের মধ্যে।
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৭৯ : নুনিয়ার টান

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৯৭ : সূর্যশিখা

বীরচন্দ্র ছিলেন এক আশ্চর্য গুণসম্পন্ন রাজা। সাহিত্য-সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষকতার পাশাপাশি তিনি ছিলেন সে যুগের এক বিখ্যাত বৈষ্ণব কবি। তাঁর লেখা ছয়টি কাব্যগ্ৰন্হের কথা জানা যায়। বীরচন্দ্রের কঠোর সমালোচক ঐতিহাসিক কৈলাসচন্দ্রও রাজার কাব্যের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছেন। পাশাপাশি তিনি ছিলেন একজন সংগীতজ্ঞ। এমন কি রবীন্দ্রনাথও বলে গিয়েছেন: “মহারাজ বীরচন্দ্র অসাধারণ সঙ্গীত বিশারদ ছিলেন।”
আরও পড়ুন:

দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৯ : নয়া ভুবনের প্রজাপতি

মুভি রিভিউ: আজও অর্ধাঙ্গিনী: ভালোবাসার পরেও যে সম্পর্ক বেঁচে থাকে

বীরচন্দ্র একজন চিত্রকর এবং এক অভিজ্ঞ ফটোগ্রাফারও ছিলেন। এমনকি ভারতবর্ষে ফটোগ্রাফি চর্চার সূচনাপর্বের ইতিহাসে বীরচন্দ্রের নাম আজও উজ্জ্বল হয়ে আছে। সব মিলিয়ে একজন মানুষের মধ্যে এত গুণের সমাহার সত্যিই বিরল। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে সম্পর্কও বীরচন্দ্রকে ঔজ্জ্বল্য দান করেছে। —চলবে।
* ত্রিপুরা তথা উত্তর পূর্বাঞ্চলের বাংলা ভাষার পাঠকদের কাছে পান্নালাল রায় এক সুপরিচিত নাম। ১৯৫৪ সালে ত্রিপুরার কৈলাসহরে জন্ম। প্রায় চার দশক যাবত তিনি নিয়মিত লেখালেখি করছেন। আগরতলা ও কলকাতার বিভিন্ন প্রকাশনা থেকে ইতিমধ্যে তার ৪০টিরও বেশি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। ত্রিপুরা-সহ উত্তর পূর্বাঞ্চলের ইতিহাস ভিত্তিক তার বিভিন্ন গ্রন্থ মননশীল পাঠকদের সপ্রশংস দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। দেশের বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়ও সে-সব উচ্চ প্রশংসিত হয়েছে। রাজন্য ত্রিপুরার ইতিহাস, রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে ত্রিপুরার রাজ পরিবারের সম্পর্ক, লোকসংস্কৃতি বিষয়ক রচনা, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা সঞ্জাত ব্যতিক্রমী রচনা আবার কখনও স্থানীয় রাজনৈতিক ইতিহাস ইত্যাদি তাঁর গ্রন্থ সমূহের বিষয়বস্তু। সহজ সরল গদ্যে জটিল বিষয়ের উপস্থাপনই তাঁর কলমের বৈশিষ্ট্য।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content