
ধাড়ি ইঁদুর। ছবি : সংগৃহীত।
আমাদের বাড়ির সামনে যে নোনা জলের খাল ছিল তার পাড়ে প্রচুর পরিমাণে ছিল ইঁদুরের গর্ত। গর্তের মুখগুলোতে মাটির দলা স্তুপ হয়ে থাকত। যখন প্রথমে কাঁচা মাটি তুলত তখন তার রং মাটির রঙের মতো হলেও কিছুদিন পরে শুকিয়ে গিয়ে তার রং হয়ে যেত সাদাটে। আর মাটির দানাগুলোকে দেখলে মনে হবে যেন নকুল দানা। এই মাটির একটা দুর্দান্ত গুরুত্ব ছিল। পৌষ সংক্রান্তিতে প্রত্যেক বাড়িতে লক্ষ্মীপুজো হত। সেই সময় ধানের গাদা ও ধান সিদ্ধ করার উনুন থেকে ন্যাতা দিয়ে একটা চওড়া দাগ দিয়ে দেওয়া হত বাড়ির মধ্যে যেখানে লক্ষ্মীপুজো হচ্ছে সেখান পর্যন্ত। যেহেতু মাটির বাড়ি তাই ন্যাতা দিয়ে দাগ দিতে কোনও অসুবিধে ছিল না। খামারে বা ঘরের মধ্যে মেঝেতে যখন ওই দাগ টানা হত কিছুক্ষণ পর তা শুকিয়ে গিয়ে প্রায় সাদা রঙের স্পষ্ট দাগ তৈরি হত। এর কারণ জলে ইঁদুরের তোলা মাটি গুলে যে থকথকে লেই তৈরি করা হত তা দিয়েই দাগ টানা হত। এই কারণে দু’ একদিন আগেই খালের পাড়ে গিয়ে ইঁদুর গর্তের সামনে থেকে ওই মাটি সংগ্রহ করে এনে কলসির মধ্যে রেখে জল ঢেলে দেওয়া হত।
বেশিরভাগ সময় আমি নিজে ওই ইঁদুর মাটি সংগ্রহ করতে যেতাম। গ্রামের প্রত্যেক বাড়িতে যেহেতু পৌষ সংক্রান্তিতে লক্ষ্মীপুজো হত এবং এভাবেই ইঁদুরের তোলা মাটি দিয়ে দাগ দেওয়া হত তাই ইঁদুরের তোলা মাটির খুব চাহিদা থাকত ওই সময়। খালের ধার থেকে আগেভাগে মাটি সংগ্রহ না করলে পরে পাওয়ার সম্ভাবনা থাকত না। বাড়ির লোকেরা বলত ধাড়ি ইঁদুরের মাটি। আমাদের মাটির পুরনো বসতবাড়ি লাগোয়া ছিটেবেড়ার একটা ছোট মাটির ঘর পরে তৈরি করা হয়েছিল। সেই ঘর মূলত ভাঁড়ার ঘর হিসেবে ব্যবহার হত। মাঝে মাঝে দেখতাম সেই ঘরের মেঝেতে ইঁদুর মাটি তুলেছে। মাটির রং দেখে বোঝা যেত খালের ধারের ইঁদুর আর ঘরের মেঝেতে গর্ত করা ইঁদুর একই। ওই ঘরে যেহেতু ধান-চাল রাখা হত তাই ইঁদুরের আনাগোনা বেশি হওয়াই স্বাভাবিক ছিল। অনেকবার লোকজন দিয়ে ওই ঘরের মেঝে শাবল ও কোদাল দিয়ে কুপিয়ে গর্ত নষ্ট করা হত।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৫৯: মেঠো ইঁদুর

মুভি রিভিউ: আজও অর্ধাঙ্গিনী: ভালোবাসার পরেও যে সম্পর্ক বেঁচে থাকে

এআই যুগেও উপনিষদের আবেদন অমলিন, কেন?

উপন্যাস: আকাশ এখনও মেঘলা, পর্ব-৮০ : আকাশ এখনও মেঘলা
ইঁদুরগুলো নিশাচর বলে দেখতে পেতাম কদাচিৎ। তবে আকারে কিন্তু ওরা বেশ বড়সড়। মোটাসোটা সাইজের ইঁদুরগুলো লম্বায় হতো ২০ থেকে ২৫ সেমি। তবে এদের লেজ দেহের দৈর্ঘ্যের তুলনায় কিছুটা ছোট। এদের লেজের রং কিন্তু অন্যান্য ইঁদুরের মতো একাধিক রঙের নয়, পুরোটাই কালো। ধাড়ি ইঁদুরের মাথাটা যেন অন্যান্য ইঁদুরের তুলনায় বেশ মোটা ও ভারী। মরা ধাড়ি ইঁদুর দেখে বুঝেছিলাম এদের সামনের দুটো দাঁত অর্থাৎ কৃন্তক দাঁত বেশ চওড়া ও বড়, অনেকটা ছুতোর মিস্ত্রির বাটালির মতো। এদের কান দুটো প্রায় গোলাকার। গায়ের লোমের রং কালচে-ধূসর আর লোমগুলোর মাঝে খোঁচা খোঁচা কর্কশ লম্বা কিছু লোম বেরিয়ে থাকে। লোমগুলোর আগার দিকটা কালো। পুরুষদের আকার স্ত্রীদের তুলনায় কিছুটা বড়। এদের গড় ওজন ২০০ থেকে ২৫০ গ্রাম। তবে কখনও কখনও ৪৫০ গ্রাম পর্যন্ত হতেও দেখা গিয়েছে।

ধাড়ি ইঁদুরের গর্তের মুখ (বাঁদিকে )। ধান (ওপরে) ও গমের (নীচে) ক্ষেতে ধাড়ি ইঁদুরের কাণ্ড। ছবি : সংগৃহীত।
ধাড়ি ইঁদুর যেমন সুন্দরবনের জঙ্গল এলাকাতে থাকে তেমনই বসতি এলাকাতেও থাকে। আবার জঙ্গল ও বসতির সংলগ্ন অঞ্চলেও এদের উপস্থিতি রয়েছে। যেসব অঞ্চলে নিয়মিত জোয়ার-ভাঁটা খেলে অর্থাৎ মাটি ভেজা থাকে সেখানে এদের গর্ত বেশি পরিমাণে দেখা যায়। কারণ, এরা ভেজা মাটিতে বেশি গর্ত করে বাসা বানায়। এই কারণেই আমাদের বাড়ির সামনে খালের দু’ধারে এদের প্রচুর গর্ত দেখেছি। মিষ্টি জলের পুকুরের পাড়ে কিন্তু এদের কখনও গর্ত করতে দেখিনি। মাটির ঘরের মেঝেতেও যেমন এরা গর্ত করে তেমনই ভেজা বাগানের মাটিতেও গর্ত করে। আমি তো আমাদের আলু বাগানের মধ্যে ওদের গর্ত বহুবার দেখেছি। বুঝতে অসুবিধা হয় না, ওরা আলু নিয়ে পালাত। বাগান থেকে আলু, কচু, গাজর, বিট, ওলকপি ইত্যাদি কন্দ জাতীয় সবজি চুরি করতে ওস্তাদ। ধান জমি থেকে কিংবা ঘরের মধ্যে ধানের বস্তা বা গোলাঘর থেকে ধান চুরি করতে এদের জুড়ি নেই। আবার ধান-চালের মধ্যে মূত্রত্যাগ ও মলত্যাগ করে তা ব্যবহারের অযোগ্য করে দেয়।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৬৯: যুধিষ্ঠির-আয়োজিত রাজসূয়যজ্ঞের মহাসম্মেলন ও চেদিরাজ শিশুপালের ভূমিকা

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৯৬ : উত্তরায়ণ
শুধু কি ধান-চাল? গম, ভুট্টা বা ডাল জাতীয় শস্য, আনারস, টমাটো, আখও ওদের পছন্দ। আনারস বা আখের বাগানে আধখাওয়া আনারস বা আখ দেখলেই বোঝা যাবে এদের কীর্তি। নারকেল চারা লাগালে এরা অনেকসময় নারকেল খেয়ে নেয়, ফলে চারা শুকিয়ে মরে যায়। ওরা এইসব খাদ্য বয়ে নিয়ে গিয়ে গর্তের মধ্যে নির্দিষ্ট কুঠুরিতে ওরা সঞ্চয় করে। মাটির নিচে ওদের খাদ্য জমানো, বাচ্চার জন্ম দেওয়া আর বিশ্রাম করার আলাদা কুঠুরি থাকে। অবশ্য এরা দিনেই বিশ্রাম করে। খাবারের সন্ধানে বেরোয় রাতে।
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৭৭ : শাক্য সিংহের খোঁচর!

দশভুজা : আমি আর কখনওই ফিরে আসার প্রত্যাশা করি না…
যেসব ধাড়ি ইঁদুর জঙ্গল এলাকায় থাকে তারা বিভিন্ন জলজ ঘাস, কচু জাতীয় উদ্ভিদ বা নদী তীরবর্তী ঘাস জাতীয় উদ্ভিদের কন্দ ও বীজ খায়। এরা বিভিন্ন পোকামাকড়, কেঁচো, শামুক, কাঁকড়া, চিংড়ি, এমনকি ছোটখাটো মাছও জলের ধার থেকে বা কাদায় নেমে গিয়ে খায়। এরা আবর্জনার স্তূপ থেকে বা নদীর ধার থেকে মরা কাঁকড়া বা শামুক নিজের বাসায় বয়ে নিয়ে যায়। জলে নেমে সাঁতার দিয়েও এরা খাবার সংগ্রহ করতে পারে। অর্থাৎ খাবারের ব্যাপারে এরা একদম খুঁতখুঁতে নয়। যখন যেমন খাবার পায় তেমনই খায়।

ধাড়ি ইঁদুর আনারস নষ্ট করে। ছবি : সংগৃহীত।
যদিও এরা সারা বছর ধরেই প্রজনন করে তবে শীতকালে এবং বসন্তকালের শুরুর দিকে প্রজনন হার বেড়ে যায়। কারণ এই সময় খাবারের প্রাচুর্য থাকে। একটা স্ত্রী ধাড়ি ইঁদুর বছরে ৯ বার পর্যন্ত বাচ্চা দিতে পারে। আর প্রত্যেকবারেই ৬ থেকে ১২টি বাচ্চা জন্মায়। এর থেকেই বোঝা যায় কী বিপুল পরিমাণ এদের বংশবিস্তারের ক্ষমতা রয়েছে। স্ত্রী ধাড়ি ইঁদুর ৬০ দিন এবং পুরুষ ধাড়ি ইঁদুর ৫১ দিন বয়স হলে প্রজননে সক্ষম হয়। স্ত্রী ধাড়ি ইঁদুরের গর্ভাবস্থা ২১ থেকে ২৫ দিন স্থায়ী হয়। জন্মের সময় বাচ্চাদের চোখ ফোটে না কিন্তু ১৪ দিন বয়স হলে চোখ ফুটে যায়। প্রজননের আগে স্ত্রী ধাড়ি ইঁদুর প্রজনন কক্ষে শুকনো ঘাস পাতা আর খাদ্যশস্যের খোসা দিয়ে নরম বিছানা তৈরি করে। তার ওপরেই সে বাচ্চাদের জন্ম দেয়। বাচ্চাদের নিরাপত্তার জন্য মাটির তলায় এদের গর্ত মাটির অনেক গভীরে অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। আর পূর্ণ জোয়ার আসার আগে কিংবা ভারী বর্ষায় গর্তে জল ঢোকার সম্ভাবনা থাকলে ওরা গর্তের মুখে নরম কাদা দিয়ে আগেই জল ঢোকার রাস্তা বন্ধ করে দেয়। এ ব্যাপারে এদের বুদ্ধি তুলনাহীন।
আরও পড়ুন:

দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৯ : নয়া ভুবনের প্রজাপতি

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-১০৫: পদ বা ক্ষমতা পেলেই কি ভিতরের স্বভাব বদলে যায়? পঞ্চতন্ত্রের অমোঘ শিক্ষা
ইংরেজিতে ধাড়ি ইঁদুরকে বলে ‘Lesser Bandicoot Rat’, বিজ্ঞানসম্মত নাম ‘Bandicota bengalensis’। কিন্তু এদের থেকে সামান্য বড় আকারের ইঁদুরের কথা আগে বলেছি যারা এই সুন্দরবন অঞ্চলে যথেষ্ট পরিমাণে দেখা যায়। তারা হল ধেড়ে ইঁদুর, ইংরেজিতে ‘Greater Bandicoot Rat’, বিজ্ঞানসম্মত নাম ‘Bandicota indica’। এই দুই ধরনের ইঁদুরকে চোখে দেখে ও স্বভাব দেখে পার্থক্য করা যায়। ধেড়ে ইঁদুরের পিঠের দিকের লোম কালচে বাদামি, কিছুটা ধাড়ি ইঁদুরদের মতো হলেও ওদের কিন্তু ওই কর্কশ লম্বা ও আগার দিকে কালো লোম নেই। আকারে আর ওজনে যে ধেড়ের থেকে ধাড়ি বড় তা আগেই বলেছি। তবে ধেড়ে ইঁদুরের বাসা ধাড়িদের তুলনায় অপেক্ষাকৃত জটিল। আর ধাড়ি ইঁদুররা উত্তেজিত হলে বা ভয় পেলে শূকরদের মতো অনেক সময় ঘোঁতঘোঁত আওয়াজ করে। ধেড়েরা এমনটা করে না।

ধাড়ি ইঁদুর। ছবি : সংগৃহীত।
যদিও এই ইঁদুররাও নদীর তীরে এবং ঘরের মেঝেতে গর্ত খুঁড়ে নদীবাঁধ ও ঘরের মেঝের ব্যাপক ক্ষতি করে এবং বিভিন্ন শস্য, ফসল খেয়ে কৃষক ও গৃহস্থের ক্ষতি করে। এদের থেকে লেপ্টোস্পাইরোসিস, সালমোনেলোসিস ইত্যাদি রোগ ছড়ানোর সম্ভাবনাও রয়েছে। তাও বাস্তুতান্ত্রিক দিক থেকে এই ইঁদুররা সুন্দরবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রাণী। বিভিন্ন সাপ এবং শিকারি পাখিদের খাদ্য হল এই ইঁদুর। সুন্দরবনের জঙ্গল এলাকায় এরা বাঘেরও খাদ্য। যদিও এদের বিলুপ্তির কোনও সম্ভাবনা অদূর ভবিষ্যতে দেখা যাচ্ছে না তবুও সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্রে ধাড়ি ইঁদুরদের উপস্থিতি বাস্তুতন্ত্রের স্থিতিশীলতা রক্ষা করতে সাহায্য করছে।—চলবে।
* সৌম্যকান্তি জানা। সুন্দরবনের ভূমিপুত্র। নিবাস কাকদ্বীপ, দক্ষিণ ২৪ পরগনা। পেশা শিক্ষকতা। নেশা লেখালেখি ও সংস্কৃতি চর্চা। জনবিজ্ঞান আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত। বিজ্ঞান জনপ্রিয়করণের জন্য ‘দ্য সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশন অফ বেঙ্গল ২০১৬ সালে ‘আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু মেমোরিয়াল অ্যাওয়ার্ড’ এবং শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞান লেখক হিসেবে বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদ ২০১৭ সালে ‘অমলেশচন্দ্র তালুকদার স্মৃতি সম্মান’ প্রদান করে সম্মানিত করেছে।


















