কলকাতায় বৃষ্টি

ছবি : প্রতীকী। সংগৃহীত।

ভারতে মোগল আধিপত্যের যুগে সতীদাহ প্রথা যে ত্রিপুরার রাজপরিবারে প্রচলিত ছিল তা আহোম রাজদূতদ্বয়ের বর্ণনা থেকেই স্পষ্ট। তবে রাজপরিবারের বাইরে সাধারণ প্রজাদের মধ্যে সে সময়ে এই প্রথা কতটুকু প্রচলিত ছিল তা আজ আর জানার উপায় নেই। রত্ন মাণিক্যের পরবর্তী রাজাদের রাজত্বকালেও রাজপরিবারে সতীদাহ প্রথা ছিল। ১৭২৯ খ্রিস্টাব্দে সিংহাসনে বসেন মুকুন্দ মাণিক্য। তাঁর রাজত্বকালে স্বাধীনচেতা এক রাজপুরুষ রুদ্রমণি ঠাকুরের মোগল বিরোধী তৎপরতার জন্য রাজা বিপদে পড়েন। মোগল ফৌজদার হাজি মাসুম তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের জন্য মহারাজাকে দায়ী করলেন এবং মহারাজা সহ তাঁর দুই পুত্র ও ভ্রাতুষ্পুত্রকে বন্দি করলেন।
মুকুন্দ মাণিক্য এই অপমানের জ্বালা সহ্য করতে না পেরে বিষপানে আত্মহত্যা করেন। মুকুন্দ মাণিক্যের রানি পতির সহগামিনী হয়েছিলেন। এই ঘটনা সম্পর্কে কৈলাসচন্দ্র সিংহ তাঁর সুবিখ্যাত গ্রন্হ ‘রাজমালা বা ত্রিপুরার ইতিহাসে’ লিখেছেন, “মহারাজ মুকুন্দ মাণিক্য যবন কর্তৃক বন্দী হইয়া অপমান সহ্য করিতে পারিলেন না।তিনি বিষপানে প্রাণ ত্যাগ করিলেন। তাঁহার সৎকারার্থে চিতা প্রস্তুত হইল। তদীয় রাজ্ঞী সহমৃতা হইতে প্রস্তুত হইলেন।…এই বলিয়াই রাজ্ঞী প্রজ্বলিত অনলে দেহ বিসর্জন করিলেন।”
আরও পড়ুন:

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-১০৪ : ত্রিপুরার রাজপরিবারে সতীদাহ প্রথা /৩

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৯৬ : উত্তরায়ণ

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৫৯: মেঠো ইঁদুর

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৭৫ : শেষের খুব কাছে

এই ভাবে ত্রিপুরার মাণিক্য রাজবংশের ইতিহাসে সতীদাহের বিবরণ পাওয়া গেলেও ঐতিহাসিক যুগে সাধারণ প্রজাদের মধ্যে সতীদাহ প্রথার প্রচলন ছিল কিনা তা জানা যায় না। কিন্তু ইংরেজ আধিপত্যের যুগে ঊনবিংশ শতাব্দীতে যে ত্রিপুরার প্রজাবর্গের মধ্যে সহমরণের প্রথা অল্প বিস্তর প্রচলিত ছিল তার তথ্য পাওয়া যায়।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা পর্ব-১৬৮: রামায়ণে পরস্ত্রীহরণের সিদ্ধান্তে বীরত্বের প্রকাশ নেই, আছে অনেক মৃত্যুর আবাহনবার্তা

হ্যালো বাবু! পর্ব-১৪৩: হার্ড ড্রাইভ হত্যারহস্য / ২৩

ইংরেজ কর্তৃপক্ষ কিন্তু খুব সহজে এ দেশে সতীদাহ নিষিদ্ধ ঘোষণা করতে পারেনি। ১৮০৫ খ্রিস্টাব্দে তারা প্রথম এ ব্যাপারে চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়।সেদিন হিন্দুদের তুমুল আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে ইংরেজরা সতীদাহ নিষিদ্ধ করার পথ থেকে ফিরে আসে। অবশেষে এর প্রায় সিকি শতাব্দী পর রাজা রামমোহন রায়ের আন্দোলন ও দেশের বিশিষ্ট সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিদের সমর্থনের পরিপ্রেক্ষিতে ১৮২৯ খ্রিস্টাব্দের ৪ঠা ডিসেম্বর আইন করে সতীদাহ প্রথা নিষিদ্ধ ঘোষণা করে ইংরেজ সরকার। তারপর দেশীয় রাজ্য সমূহের মধ্যেও এই আইন কার্যকরী করতে তারা উদ্যোগী হয়।
আরও পড়ুন:

রথযাত্রা

দশভুজা : আমি আর কখনওই ফিরে আসার প্রত্যাশা করি না…

ভারতে সতীদাহ প্রথা নিষিদ্ধ ঘোষণার পর আরও প্রায় ছয় দশক দেশীয় রাজ্য ত্রিপুরাতে এই কুপ্রথা প্রচলিত ছিল। উল্লেখ করা যায় যে, মহারাজা বীরচন্দ্রের রাজত্বকালে ১৮৭১ খ্রিস্টাব্দে ত্রিপুরায় প্রথম ইংরেজ সরকার পলিটিক্যাল এজেন্ট নিযুক্ত করে। ইংরেজ সরকার এরপর থেকেই ত্রিপুরার রাজাকে নানা ভাবে চাপের মধ্যে রেখেছিল। ১৮৮৮ খ্রিস্টাব্দে ইংরেজ সরকারের নির্দেশ মোতাবেক চট্টগ্রামের কমিশনার লায়াল সাহেব ত্রিপুরার সতীদাহ প্রথা রদ করতে উদ্যোগী হন।
আরও পড়ুন:

দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৯ : নয়া ভুবনের প্রজাপতি

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-১০৫: পদ বা ক্ষমতা পেলেই কি ভিতরের স্বভাব বদলে যায়? পঞ্চতন্ত্রের অমোঘ শিক্ষা

কমিশনারের চিঠির জবাবে প্রথমে ত্রিপুরার রাজদরবার থেকে তাঁকে জানানো হয়েছিল যে, সতীদাহ ত্রিপুরায় একটি পুরনো ও ধর্মীয় প্রথা। এখানে স্বেচ্ছায় সতীরা স্বামীর চিতায় জীবন বিসর্জন দেয়। এই জন্য এই রাজ্যে কোনও বল প্রয়োগ করা হয় না। এইসব যুক্তি দেখিয়ে বলা হয়েছিল যে,ত্রিপুরায় সতীদাহ বন্ধ করার জন্য কোনও আদেশ জারির প্রয়োজন নেই। কিন্তু চট্টগ্রামের কমিশনার রাজদরবারের এই যুক্তি মেনে নিতে পারেননি। শেষপর্যন্ত ইংরেজ কর্তৃপক্ষের হুমকির মুখে ত্রিপুরায় সতীদাহ নিষিদ্ধ করে রাজাদেশ জারি করা হয়।—চলবে।
* ত্রিপুরা তথা উত্তর পূর্বাঞ্চলের বাংলা ভাষার পাঠকদের কাছে পান্নালাল রায় এক সুপরিচিত নাম। ১৯৫৪ সালে ত্রিপুরার কৈলাসহরে জন্ম। প্রায় চার দশক যাবত তিনি নিয়মিত লেখালেখি করছেন। আগরতলা ও কলকাতার বিভিন্ন প্রকাশনা থেকে ইতিমধ্যে তার ৪০টিরও বেশি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। ত্রিপুরা-সহ উত্তর পূর্বাঞ্চলের ইতিহাস ভিত্তিক তার বিভিন্ন গ্রন্থ মননশীল পাঠকদের সপ্রশংস দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। দেশের বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়ও সে-সব উচ্চ প্রশংসিত হয়েছে। রাজন্য ত্রিপুরার ইতিহাস, রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে ত্রিপুরার রাজ পরিবারের সম্পর্ক, লোকসংস্কৃতি বিষয়ক রচনা, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা সঞ্জাত ব্যতিক্রমী রচনা আবার কখনও স্থানীয় রাজনৈতিক ইতিহাস ইত্যাদি তাঁর গ্রন্থ সমূহের বিষয়বস্তু। সহজ সরল গদ্যে জটিল বিষয়ের উপস্থাপনই তাঁর কলমের বৈশিষ্ট্য।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content