
ছবি : প্রতীকী।
বারাণসীর রাজপুরোহিতকুলে জন্ম নিয়েছেন বোধিসত্ত্ব। ক্রমে ক্রমে বড় হলেন। তক্ষশিলা থেকে বিদ্যালাভ করে ফিরে এলেন। পিতার মৃত্যুর পর পৌরোহিত্যে নিয়োজিত হলেন। হলেন রাজার ঐহিক ও পারত্রিক উভয়বিধ বিষয়ের হিতসাধক ধর্মার্থানুশাসক।
তাঁর এই রাজকর্মের পথ নিষ্কণ্টক ছিল না। তিনি রাজার মঙ্গলসাধক হলেও তাঁর অকল্যাণের জন্য ‘কর্ণেজপ’ কান-ভাঙানো লোকের সংখ্যা কম ছিল না। এদের কাজই হল মনোমালিন্য ঘটানো, ভেদসাধন। রাজা ব্রহ্মদত্ত এদের পাতা ফাঁদে পা দিয়ে বিমোহিত হলেন। এই সময় মানুষ কানে দেখে, চোখে শোনে। রাজার দশাও তা-ই হল। সেই সকল দুষ্টু লোকেরা তাঁকে কী বুঝিয়েছিল কে জানে! রাজা আশেপাশের কান-ভাঙানো লোকের কথায় বিশ্বাস করে বোধিসত্ত্বের ওপর ক্রুদ্ধ হলেন। জানিয়ে দিলেন, “বিদেয় হও এই মুহূর্তেই।” নির্বাসিত করলেন নগর থেকে।
তাঁর এই রাজকর্মের পথ নিষ্কণ্টক ছিল না। তিনি রাজার মঙ্গলসাধক হলেও তাঁর অকল্যাণের জন্য ‘কর্ণেজপ’ কান-ভাঙানো লোকের সংখ্যা কম ছিল না। এদের কাজই হল মনোমালিন্য ঘটানো, ভেদসাধন। রাজা ব্রহ্মদত্ত এদের পাতা ফাঁদে পা দিয়ে বিমোহিত হলেন। এই সময় মানুষ কানে দেখে, চোখে শোনে। রাজার দশাও তা-ই হল। সেই সকল দুষ্টু লোকেরা তাঁকে কী বুঝিয়েছিল কে জানে! রাজা আশেপাশের কান-ভাঙানো লোকের কথায় বিশ্বাস করে বোধিসত্ত্বের ওপর ক্রুদ্ধ হলেন। জানিয়ে দিলেন, “বিদেয় হও এই মুহূর্তেই।” নির্বাসিত করলেন নগর থেকে।
বোধিসত্ত্ব তখন সপরিবার কাশীরাজ্যের একটি গ্রামে আশ্রয় নিয়েছেন। কিছুদিন যেতে না যেতেই বোধিসত্ত্বের কথা বার বার মনে পড়তে লাগল রাজার। “আহা! বড় ভালমানুষ ছিলেন সেই মহাত্মা!” কিন্তু রাজা হয়ে আচার্যকে ডেকে আনানো ভাল দেখায় না যে! মেজাজটাই তো আসল রাজা! তাহলে কী করা যায়?
রাজা বেশ করে ভেবে দেখে এক উপায় স্থির করলেন। এক কাজ করা যাক! গাছের পাতায় একট্ গান লেখা যাক। সেই গানটাই হবে সবকিছুর চাবিকাঠি। তাহলে তো গান বাঁধতে হয়। তো রাজা একটা গান লিখে ফেললেন। গাছের পাতায় লেখা ওই গান, সঙ্গে রান্না করা কাকের মাংস। সবটা নিয়ে শ্বেতবস্ত্রে বেশ করে বেঁধে তা রাজমুদ্রাঙ্কিত করে পাঠিয়ে দেওয়া হবে আচার্যের কাছে। তিনি যদি প্রকৃত ধীমান ও পণ্ডিত হন, তবে এর মর্মার্থ বুঝতে তাঁর কিছুমাত্র অসুবিধা হওয়ার নয়। তিনি বুঝবেন যে, এ বস্তুটি কাকমাংস এবং অনতিবিলম্বে এখানে চলে আসবেন। আর, না বুঝলে আসবেন না।
রাজা বেশ করে ভেবে দেখে এক উপায় স্থির করলেন। এক কাজ করা যাক! গাছের পাতায় একট্ গান লেখা যাক। সেই গানটাই হবে সবকিছুর চাবিকাঠি। তাহলে তো গান বাঁধতে হয়। তো রাজা একটা গান লিখে ফেললেন। গাছের পাতায় লেখা ওই গান, সঙ্গে রান্না করা কাকের মাংস। সবটা নিয়ে শ্বেতবস্ত্রে বেশ করে বেঁধে তা রাজমুদ্রাঙ্কিত করে পাঠিয়ে দেওয়া হবে আচার্যের কাছে। তিনি যদি প্রকৃত ধীমান ও পণ্ডিত হন, তবে এর মর্মার্থ বুঝতে তাঁর কিছুমাত্র অসুবিধা হওয়ার নয়। তিনি বুঝবেন যে, এ বস্তুটি কাকমাংস এবং অনতিবিলম্বে এখানে চলে আসবেন। আর, না বুঝলে আসবেন না।
আরও পড়ুন:

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৯৬ : উত্তরায়ণ

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৫৯: মেঠো ইঁদুর

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৭৫ : শেষের খুব কাছে

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-১০৪ : ত্রিপুরার রাজপরিবারে সতীদাহ প্রথা /৩
কী লেখা ছিল ওই গানে? লেখা ছিল যে, জলপূর্ণ স্রোতস্বিনী নদীর জল যার পেয়, কচি যবের ক্ষেত্রে যে লুকিয়ে থাকে, যার ডাক শুনে দূরদেশে থাকা প্রিয় বন্ধুর শীঘ্র প্রত্যাবর্তনের আশা করা হয়, তার মাংস তোমাকে পাঠালাম। হে ব্রাহ্মণ, ভোজন করে দেখো।
কাকমাংসের সঙ্গে গানের আভিধানিক অর্থের কী যোগ? কী-ই বা ভাবার্থ এই গানের? কী বার্তা দিতে চান রাজা তাঁর দূরদেশের প্রিয়জনকে?
বুঝ লোক যে জান সন্ধান!
পরিপূর্ণ নদীকে কাকপেয়া বলা হয়। কারণ, কাক নাকি সে নদীর তীরে বসেই গলা বাড়িয়ে জলপান করতে পারে। আবার, তরুণ শস্যের ক্ষেত্রে কাক নাকি আত্মগোপন করে থাকতে পারে, তাই তার নাম কাকগুহা। আবার, কাকচরিত্রের বিষয়ে অভিজ্ঞ মানুষ কাকের ডাক শুনে তা বিচার করে নাকি নির্ণয় করতে পারেন যে দূরদেশে থাকা প্রিয়জন শীঘ্রই স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করবে কীনা! এই তিনের মধ্যে কাকের উপস্থিতি সর্বত্র। অর্থ ভিন্ন, কিন্তু শব্দশরীরে কাক তার স্বাতন্ত্র্য নিয়ে উপস্থিত।
কাকমাংসের সঙ্গে গানের আভিধানিক অর্থের কী যোগ? কী-ই বা ভাবার্থ এই গানের? কী বার্তা দিতে চান রাজা তাঁর দূরদেশের প্রিয়জনকে?
বুঝ লোক যে জান সন্ধান!
পরিপূর্ণ নদীকে কাকপেয়া বলা হয়। কারণ, কাক নাকি সে নদীর তীরে বসেই গলা বাড়িয়ে জলপান করতে পারে। আবার, তরুণ শস্যের ক্ষেত্রে কাক নাকি আত্মগোপন করে থাকতে পারে, তাই তার নাম কাকগুহা। আবার, কাকচরিত্রের বিষয়ে অভিজ্ঞ মানুষ কাকের ডাক শুনে তা বিচার করে নাকি নির্ণয় করতে পারেন যে দূরদেশে থাকা প্রিয়জন শীঘ্রই স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করবে কীনা! এই তিনের মধ্যে কাকের উপস্থিতি সর্বত্র। অর্থ ভিন্ন, কিন্তু শব্দশরীরে কাক তার স্বাতন্ত্র্য নিয়ে উপস্থিত।
আরও পড়ুন:

গল্পবৃক্ষ, পর্ব-৬৩ : অস্থান-জাতক—অসম্ভবের ছন্দ

আকাশ এখনও মেঘলা, পর্ব-৭৭: আকাশ এখনও মেঘলা
বোধিসত্ত্ব পত্র পাঠ করেই এর মর্মার্থ বুঝলেন। রাজা তাঁকে দেখতে চান। তিনি অবিলম্বেই একটি পত্রে তাঁর প্রত্যুত্তর জানালেন একটি গাথা রচনা করে। তার মধ্যে কোনও ইঙ্গিত নেই, আছে সমর্পণ। অর্থ এরকম: কাকের মাংস মনে আবার আশা সঞ্চারিত করছে, মনে হয় রাজা আমাকে আবার স্মরণ করবেন। পাশাপাশি, যদি হংস-ক্রৌঞ্চ-ময়ূরের মাংস পান তো তার ভাগ-ও দেবেন। প্রভু স্মরণ করলে আশ্রিত মানুষের মঙ্গল-ই, প্রভু বিস্মৃত হলেই নানা অকল্যাণ।
রাজপুরোহিতরূপী বোধিসত্ত্বের মনে কোনও অভিমান ছিল কীনা জানা নেই। এ তাঁর খেদোক্তি কীনা কে জানে! তবে মধুরেণ সমাপয়েত ঘটে। এরপর তিনি শকট প্রস্তুত করে যাত্রা করলেন। রাজা তাঁকে দেখে তুষ্ট হলেন। পুনরায় তিনি রাজপুরোহিতের পদে নিয়োজিত হলেন।
রাজপুরোহিতরূপী বোধিসত্ত্বের মনে কোনও অভিমান ছিল কীনা জানা নেই। এ তাঁর খেদোক্তি কীনা কে জানে! তবে মধুরেণ সমাপয়েত ঘটে। এরপর তিনি শকট প্রস্তুত করে যাত্রা করলেন। রাজা তাঁকে দেখে তুষ্ট হলেন। পুনরায় তিনি রাজপুরোহিতের পদে নিয়োজিত হলেন।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৬৭: রাজসূয়যজ্ঞ কী শুধু একচ্ছত্র ক্ষমতার প্রদর্শনী? না স্বতঃস্ফূর্ত গণসমর্থনলাভের উদ্যোগ?

সরস্বতীর লীলাকমল, পর্ব-৩৮: নন্দিতা কৃপালনি— বিশ শতকের বিদুষী
এ কাহিনিতে কাক একটি বিশেষ ভূমিকা নিয়েছে। কাহিনি ইঙ্গিত দেয় যে, কাকের মাংস রান্না করলে তা বোঝার উপায় থাকে কি? রাজা তো তাঁর সেই সকল “শুভাকাঙ্ক্ষী”দের চিনতে পারেননি, যাঁরা তাঁকে ভুল বুঝিয়েছিল। তাহলে যথার্থ কিংবা অযথার্থ চেনার উপায়? বাহ্য আকার নয়, আন্তরপ্রকৃতির অনুধ্যান। ধীমান মানুষ সেই শক্তি অর্জন করেন। যা রাজার ছিল না। ছিল বোধিসত্ত্বের। কিন্তু যে রাজা প্রকৃতিরঞ্জক, প্রজাকল্যাণকামী হবেন তাঁকে তো অর্জন করতে হবে এই সত্য-মিথ্যার প্রভেদ করার বোধ, কর্মে রাখতে হবে কাকপেয়া পূর্ণনদীর বিপুল ও অনায়াসগম্য স্বচ্ছতা, যাকে রাজনীতির তত্ত্বে “অভিগম্য” বলা হয়। আবার কাকগুহা যবক্ষেত্রের অনুষঙ্গের মতোই আত্মরক্ষার পথটিও সুনিশ্চিত করতে হবে। হতে হবে “অধৃষ্য”।
আরও পড়ুন:

দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৯ : নয়া ভুবনের প্রজাপতি

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-১০৫: পদ বা ক্ষমতা পেলেই কি ভিতরের স্বভাব বদলে যায়? পঞ্চতন্ত্রের অমোঘ শিক্ষা
কাকচরিত্রজ্ঞ ধীমান ব্যক্তি কাকের ডাক শুনে দূরদেশস্থ বান্ধবজনের শীঘ্র প্রত্যাবর্তনের বার্তা পান নাকি। রাজাও কি এমন আকার-ইঙ্গিত-চেষ্টাবিষয়ে অভিজ্ঞ হবেন না? মুড়ি মিছরির ভেদটুকুর বিষয়ে, বিপরীতে থাকা মানুষটির মনস্তত্ত্ব-বিষয়ে তাঁকে সচেতন হতে হবে। হতে হবে তত্ত্বজ্ঞ। সমস্যার সঙ্গে জানতে হবে তার সমাধানের উপায়টিও। রান্না করা কাকমাংস এবং দূরাগত জনের এই তৃতীয় অনুষঙ্গটির সম্মিলনে প্রাজ্ঞ মানুষ বুঝবেন এর মর্মার্থ কী। রাজার অন্তরের সেই আকুতি বোধিসত্ত্ব উপলব্ধি করেছেন। ফিরে এসেছেন রাজার অনুশোচনাকে সম্মান জানিয়েই হয়তো, কিন্তু ধর্মার্থানুশাসকের মাহাত্ম্য ত্যাগ করে প্রভু-ভৃত্যের নিরাবেগ সম্পর্ককেই এবার মুখ্য মনে করেছেন। জাতকমালার এই কাহিনি সেই ধীশক্তির কথা বলে যা অভ্রান্ত, যা কাকপেয়া নদীর মতোই পূর্ণ, বিপুল এবং অনায়াসগম্য। এই কাহিনি ধীমান মানুষের সেই চরিত্রবৈশিষ্ট্যের কথা বলে যা ঔদার্যমণ্ডিত, মাহাত্ম্যে সমুজ্জ্বল।—চলবে।
* ড. অভিষেক ঘোষ (Abhishek Ghosh) সহকারী অধ্যাপক, বাগনান কলেজ। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগ থেকে স্নাতকস্তরে স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত। স্নাতকোত্তরের পর ইউজিসি নেট জুনিয়র এবং সিনিয়র রিসার্চ ফেলোশিপ পেয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগে সাড়ে তিন বছর পূর্ণসময়ের গবেষক হিসাবে যুক্ত ছিলেন। সাম্বপুরাণের সূর্য-সৌরধর্ম নিয়ে গবেষণা করে পিএইচ. ডি ডিগ্রি লাভ করেন। আগ্রহের বিষয় ভারতবিদ্যা, পুরাণসাহিত্য, সৌরধর্ম, অভিলেখ, লিপিবিদ্যা, প্রাচ্যদর্শন, সাহিত্যতত্ত্ব, চিত্রকলা, বাংলার ধ্রুপদী ও আধুনিক সাহিত্যসম্ভার। মৌলিক রসসিক্ত লেখালেখি মূলত: ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে। গবেষণামূলক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়ে চলেছে বিভিন্ন জার্নাল ও সম্পাদিত গ্রন্থে। সাম্প্রতিক অতীতে ডিজিটাল আর্ট প্রদর্শিত হয়েছে আর্ট গ্যালারিতে, বিদেশেও নির্বাচিত হয়েছেন অনলাইন চিত্রপ্রদর্শনীতে। ফেসবুক পেজ, ইন্সটাগ্রামের মাধ্যমে নিয়মিত দর্শকের কাছে পৌঁছে দেন নিজের চিত্রকলা। এখানে একসঙ্গে হাতে তুলে নিয়েছেন কলম ও তুলি। লিখছেন রম্যরচনা, অলংকরণ করছেন একইসঙ্গে।


















