
সুন্দরবনে রোদ পোহাচ্ছে নোনা জলের কুমির। ছবি : সংগৃহীত।
সুন্দরবনের লৌকিক দেবী বনবিবি ও দুখের কাহিনি অনেকেই জানেন। মৌলে দুই ভাই ধোনাই ও মোনাই তাদের ভাইপো দুখেকে সঙ্গে নিয়ে সুন্দরবনের জঙ্গলে মধু সংগ্রহ করতে গিয়ে দক্ষিণ রায়ের স্বপ্নাদেশে যখন দুখেকে জঙ্গলে ছেড়ে দিয়ে চলে যায় তখন বাঘবেশী দক্ষিণ রায় দুখেকে মারার জন্য হাজির হয়। এই সময় দুখে বনবিবিকে স্মরণ করলে তিনি ভাই শাহ জঙ্গলিকে নিয়ে হাজির হন এবং দক্ষিণ রায়কে তাড়িয়ে দিয়ে দুখেকে বাঁচান। তারপর বনবিবির নির্দেশে কুমিরবেশী তথা কুমিরের দেবতা কালু রায় দুখেকে পিঠে চাপিয়ে সুন্দরবনের নদী পার করে বাড়িতে পৌঁছে দেয়। সুন্দরবন-সহ পৃথিবীর সর্বত্র আদিম সংস্কৃতিতে হিংস্র পশুদের আক্রমণ থেকে বাঁচতে সেই সব পশুদের দেবতা হিসেবে পুজো করার রীতি রয়েছে। প্রাচীনকাল থেকেই সুন্দরবনের অধিবাসীদের দুই ভয়ংকর বিপদ প্রবাদেই পরিচিত —জলে কুমির ডাঙায় বাঘ। তাই সুন্দরবনে বাঘ ও কুমিরের ওপর দেবত্ব আরোপ করা হয়েছে সেই প্রাচীনকাল থেকে। সংস্কৃতিক রূপান্তরের পথ ধরে সুন্দরবনের ভয়ংকর নোনা জলের কুমির রূপান্তরিত হয়েছে কুমিরের দেবতা কালু রায়ে।
সুন্দরবনের নোনা জলের কুমির যে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের মতোই ভয়ংকর হিংস্র প্রাণী তা সর্বজনবিদিত। বর্তমানে পৃথিবীর সমস্ত সরীসৃপের মধ্যে এই কুমির আকারে সবচেয়ে বড়। পূর্ণবয়স্ক একটি পুরুষ কুমির লম্বায় হয় গড়ে ২০ ফুট। আর ওজন হয় গড়ে ১০ থেকে ১৫ কুইন্টাল। ২০০৬ সালে উড়িষ্যার ভিতরকণিকা অভয়ারণ্যে একটি পুরুষ কুমির পাওয়া গিয়েছিল যার ওজন ছিল প্রায় ২০ কুইন্টাল এবং লম্বায় ছিল ২৩ ফুট। এই কুমিরটি বৃহত্তম কুমির হিসেবে গিনেস বুকে নাম তুলেছিল। স্ত্রী কুমির কিন্তু আকারে খুবই ছোট হয়, মাত্র ৮ থেকে ১০ ফুট লম্বা, আর ওজন হয় ৭৬ থেকে ১০৩ কেজি। পুরুষ কুমিরদের ক্ষেত্রে একটা অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য দেখা যায়। এদের বৃদ্ধি হয় বর্গ ঘন নীতি (square-cube law) অনুসারে। অর্থাৎ এরা যত বড় হতে থাকে ততই এর দেহতলের ক্ষেত্রফলের থেকে দেহের আয়তন দ্রুততর হারে বৃদ্ধি পায়। এই কারণে ১৬ ফুট লম্বা একটা কুমিরের ওজনের থেকে ২০ ফুট লম্বা কুমিরের ওজন দ্বিগুনের বেশি হয়।

ভাগবতপুর কুমির প্রকল্পে এক বিশালাকার কুমির। ছবি: লেখক।
একটা সময় অবশ্য কুমিরের দৈর্ঘ্য বৃদ্ধি সীমিত হয়ে গিয়ে প্রস্থে বৃদ্ধি হতে থাকে, অর্থাৎ স্থূলকায় হয়ে যেতে থাকে। কুমির এত বড়সড় আকারের প্রাণী হলেও জন্মের সময় কিন্তু এদের আকার থাকে খুবই ছোট, লম্বায় মাত্র ১১ ইঞ্চির মতো, আর ওজন হয় গড়ে ৭১ গ্রাম। নোনা জলের কুমিরের মাথাটা হয় বিশালাকার। এদের চোখ থেকে শুরু করে লম্বা তুন্ডের কেন্দ্রস্থল পর্যন্ত পুঁতির দানার মতো অস্থিযুক্ত ভাঁজ দেখা যায়। পরিণত কুমিরের গায়ের রং গাঢ় ধূসর বা কালচে ধূসর। তবে মাঝে মাঝে গাঢ় সবুজ বা গাঢ় বাদামি ছোপ দেখা দিতে পারে। এই ধরনের রং ওদের কাদার মধ্যে নিজেকে লুকিয়ে রাখতে ভীষণ সাহায্য করে।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৪৮: সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী— তিল কাছিম

উপন্যাস: আকাশ এখনও মেঘলা, পর্ব-৬৮: আকাশ এখনও মেঘলা

ত্রিপুরায় আঞ্চলিক শক্তির উত্থান

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৬৫ : কালাদেওর গুহায়
নোনা জলের কুমিরের পেটের দিকে রঙ অবশ্য হলদেটে সাদা। এদের লেজ অত্যন্ত শক্তিশালী এবং আকারে বেশ বড়। লেজের রং ধূসর হলেও তার ওপরে আড়াআড়ি ডোরা দাগ থাকে। শক্তপোক্ত বড় লেজের কারণে এরা অত্যন্ত দ্রুতগতিতে সাঁতার কাটতে এবং দেহকে সুনিপুণভাবে চালনা করতে সক্ষম হয়। এদের পিঠের ওপরে বেশ পুরু শক্ত পাতের মতো আঁশ বা স্কুট থাকে। আঁশগুলো ডিম্বাকার। কম বয়সী কুমিরের রঙ হয় হালকা হলুদ, আর তার ওপরে কালো রঙের দাগ ও ছোপ থাকে। পরিণত না হওয়া পর্যন্ত এই ধরনের রং দেখা যায়।

কুমির প্রকল্পের জলাশয়ে একটি পরিণত কুমির। ছবি: লেখক।
সুন্দরবনের নদী ও খাঁড়ি হল নোনা জলের কুমিরের থাকার জায়গা। যেসব খাঁড়িতে জোয়ারের জল অনেক উঁচু পর্যন্ত ওঠে ও তার বিস্তার ১০ থেকে ১৩০ মিটার এবং লবণাক্ততার মাত্রা ১০ থেকে ২৩ পিপিটি সেটাই ওদের পক্ষে আদর্শ বাসস্থান। ভারতীয় সুন্দরবনের সজনেখালি, সুধন্যখালি ও দোবাঁকির খাঁড়িতে এদের ইদানিং বেশি দেখা যাচ্ছে। ২০২৫ সালের গণনায় ২২৩ টি নোনা জলের কুমির ভারতীয় সুন্দরবন অংশে দেখা গিয়েছে বলে জানা গিয়েছে। তবে শুধু সুন্দরবন নয়, এই কুমির বাংলাদেশ থেকে মায়ানমার, মালয়েশিয়া, ব্রুনেই, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপিন্স, সিঙ্গাপুর, সলোমান দ্বীপ, পালাউ, পাপুয়া নিউগিনি, ভানুয়াতু, তিমোর লেস্টে এবং অস্ট্রেলিয়ার উত্তর উপকূলেও পাওয়া যায়। ভারতে অবশ্য বর্তমানে সুন্দরবন থেকে উড়িষ্যার ভিতরকণিকা অভয়ারণ্য পর্যন্ত এদের উপস্থিতি রয়েছে। আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের উপকূলেও এদের দেখা যায়। এরা বাঘদের মতো নিজস্ব এলাকা নির্ধারণ করে সেখানেই থাকে। তার এলাকায় অন্য কারও উপস্থিতি এরা মোটেই পছন্দ করে না। বিশেষ করে পুরুষ কুমির তার এলাকায় অন্য পুরুষ কুমির উপস্থিত হলে ভয়ঙ্কর লড়াই করে। এই কারণে ছোট কুমিরেরা পরিণত হলে দূরে ছড়িয়ে পড়ে। এভাবেই নোনা জলের এই কুমিরের প্রজাতি বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে। এদের বিজ্ঞানসম্মত নাম ‘Crocodylus porosus’ । ৫৩.৩ কোটি থেকে ২৫.৮ কোটি বছর আগে প্লিয়োসিন মহাযুগে যে এরা পৃথিবীতে বিরাজ করত তার প্রমাণ এদের প্রাচীনতম একটি জীবাশ্ম অস্ট্রেলিয়ার উত্তর কুইন্সল্যান্ডে আবিষ্কৃত হয়। এদের জাতিজনি (Phylogeny) বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন যে, এদের পূর্বপুরুষের উৎপত্তি আফ্রিকা মহাদেশে আর তারপর তারা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও আমেরিকার দিকে ছড়িয়ে পড়ে।
আরও পড়ুন:

দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৯ : নয়া ভুবনের প্রজাপতি

ক্যাবলাদের ছোটবেলা, পর্ব-৩৭: লোকে যারে বড় বলে
নোনা জলের কুমির স্বভাবগতভাবে কিন্তু অলস। এরা কয়েক মাস না খেয়েই কাটিয়ে দিতে পারে। এদের দিনের বেলায় জলের ওপর ঠায় ভেসে থাকতে বা ভাঁটার সময় নদীর বা খাঁড়ির তীরে কাদার ওপর রোদ পোহাতে প্রায়শই দেখা যায়। এরা জলের নিচে দীর্ঘসময় থাকতে পারে। এই সময় এদের হৃৎস্পন্দন হার ও শারীরবৃত্তীয় ক্রিয়া কমিয়ে দিয়ে অক্সিজেনের খরচ অনেকটা কমিয়ে দিতে পারে। জলের ৪৯ ফুট গভীর পর্যন্ত এদের নামতে দেখা গিয়েছে।

ভাগতপুর কুমির প্রকল্পে অ্যালবিনো কুমির। ছবি: লেখক।
শিকার ধরার ব্যাপারে এরা অত্যন্ত সূচতুর। সন্তর্পনে এগিয়ে গিয়ে হঠাৎ করে ঝাঁপিয়ে পড়ে শিকারের উপর। জলের মধ্যে দিয়ে যখন এরা শিকারের দিকে এগিয়ে যায় তখন পুরো দেহটাই থাকে জলের নিচে, কেবল চোখ দুটো থাকে জলের ওপরে। ফলে শিকার বুঝতেই পারে না যে তার দিকে শিকারি এগিয়ে আসছে। আবার ডাঙাতে কাদা মাটির সঙ্গে এমন ভাবে মিশে থাকে যে কাছাকাছি এলেও বোঝা মুশকিল হয় যে সামনে শিকারি ওৎ পেতে আছে। এদের কামড় ভয়ংকর শক্তিশালী। একবার কামড়ে ধরলে ছাড়ানো প্রায় অসম্ভব। কারণ এদের চোয়ালের পেশি অত্যন্ত বড় এবং বাইরের দিকে স্ফীত হয়ে বেরিয়ে থাকে। এই পেশি এতটাই শক্ত যে স্পর্শ করলে মনে হয় হাড়। এদের চোয়াল বন্ধ করার পেশি অত্যন্ত শক্তিশালী হলেও চোয়াল খোলার পেশি অত্যন্ত দুর্বল। আর তাই একবার শিকার ধরে চোয়াল বন্ধ করলে নিজে থেকেও সহজে শিকারকে ছেড়ে দিতে পারে না।
আরও পড়ুন:

গল্পবৃক্ষ, পর্ব-৫৫: অকালরাবী জাতক—সময় গেলে সাধন হবে না

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৮৯ : আনকো আলোয় যায় দেখা ওই ‘সপ্তপদী’-র পথ চলা
এদের খাদ্যতালিকা খুবই দীর্ঘ। বিভিন্ন মাছ থেকে শুরু করে হরিণ, বানর, বুনো শূকর, গোরু, মোষ, কাঁকড়া, জলজ পাখি, সাপ, কচ্ছপ ইত্যাদি হল এদের খাদ্য। তবে সুযোগ পেলে মানুষকে ছাড়ে না, কারণ মানুষ হল ওদের সহজ শিকার। মানুষের প্রতিরোধ করার ক্ষমতা নেই বললেই চলে। এদের ৬৪ থেকে ৬৮ টি শঙ্কু আকারের তীক্ষ্ণ দাঁত থাকে যা শিকারকে চেপে ধরতে সাহায্য করে। শিকার ধরার পর ঝাঁকুনি দিয়ে শিকারকে মেরে তার মাংস ছিঁড়ে ছিঁড়ে খায়। দাঁতগুলো কিন্তু চিবোতে সাহায্য করে না। এদের দাঁতগুলো অস্থায়ী। কুড়ি মাস থেকে দু’ বছরের মধ্যে পুরনো দাঁত পড়ে গিয়ে নতুন দাঁত গজায়। মুখ বন্ধ থাকা অবস্থাতেও বেশ কয়েকটি বড় বড় দাঁত বাইরে থেকে দেখা যায়। দাঁতগুলোর রং হলুদ। এর কারণ হল সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদে ট্যানিনের পরিমাণ অত্যন্ত বেশি। সেই সব উদ্ভিদের পাতা, ফল ইত্যাদি জলে পড়ে বলে সুন্দরবনের নোনা জলে ট্যানিনের পরিমাণ বেশি থাকে। এই কারণে দাঁতের রং হয় হলুদ।

ভাগবতপুর কুমির প্রকল্প। ছবি : লেখক।
নোনা জলের পুরুষ কুমিরের বয়স প্রায় ১৬ বছর এবং স্ত্রী কুমিরের বয়স প্রায় ১৩ বছর হলে প্রজননে সক্ষম হয়। এই সময় স্ত্রী কুমির তার ডিম পাড়ার স্থান নির্বাচন করে। অবশ্য স্ত্রী পুরুষ উভয়ে মিলে প্রজননক্ষেত্র পাহারা দেয়। সাধারণত নদী ও খাঁড়ির প্রশস্ত তীর এদের ডিম পাড়ার জন্য উপযুক্ত জায়গা। কাদা ও ঝোপঝাড়যুক্ত অঞ্চলে এরা একটা ঢিপি বানায়। ঢিপির দৈর্ঘ্য হয় প্রায় সাড়ে পাঁচ ফুট এবং উচ্চতা হয় প্রায় দেড় ফুট। আর মুখ হয় প্রায় পাঁচ ফুট চওড়া। স্ত্রী কুমির ৪০-৬০টি ডিম পাড়ে। তবে কখনো কখনো ৯০ টি ডিম পাড়তেও দেখা গেছে। প্রতিটি ডিমের ওজন হয় গড়ে ১২১ গ্রাম, আর লম্বায় হয় ৫ সেন্টিমিটার। ৮০-৯৮ দিনের মধ্যে ডিম ফুটে বাচ্চা বেরোয়। তবে মজার ব্যাপার হল তাপমাত্রার ওপর নির্ভর করে বাচ্চাদের লিঙ্গ। ২৮ থেকে ৩০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রায় ফোটা সমস্ত বাচ্চাই হয় স্ত্রী। ৩০ থেকে ৩২ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রায় ফোটা বাচ্চাদের ৮৬ শতাংশ হয় পুরুষ। আবার ৩৩ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড বা তার বেশি তাপমাত্রায় ফোটা বাচ্চাদের ৮৪ শতাংশ হয় স্ত্রী।
মা কুমিরকে বাচ্চাদের মুখের মধ্যে নিয়ে বহন করতে দেখা যায়। বেশ কয়েক মাস মা কুমির বাচ্চাদের পাহারা দেয়। তবে দেখা গেছে ডিম ফুটে যত বাচ্চা বেরোয় তার মাত্র এক শতাংশ শেষ পর্যন্ত বেঁচে থাকে। কারণ অধিকাংশ বাচ্চাই বিভিন্ন প্রাণীর শিকার হয়ে মারা যায়। এদের খাদক হল গোড়িয়োল, গোসাপ, বুনো শূকর, ধেড়ে ইঁদুর, ঈগল, জলজ পাখি, অজগর, ভেটকি মাছ এমনকি বড় কুমিরও। আবার শূকর ও গবাদিপশুর পায়ের চাপে অনেক ডিম নষ্ট হয়ে যায়। সুন্দরবনের বাঘকেও কুমির বাচ্চা এবং পরিণত কুমির শিকার করে খেতে দেখা গিয়েছে। বাচ্চাদের বয়স ৮ মাস হলে পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন হতে শুরু করে, আর আড়াই বছর বয়স শুরু হলে নিজস্ব এলাকা তৈরি করতে মনোযোগ দেয়। নোনা জলের কুমির গড়ে ৭০ বছর বাঁচে, তবে কিছু ক্ষেত্রে ১০০ বছর পর্যন্ত বাঁচতে দেখা গিয়েছে।
মা কুমিরকে বাচ্চাদের মুখের মধ্যে নিয়ে বহন করতে দেখা যায়। বেশ কয়েক মাস মা কুমির বাচ্চাদের পাহারা দেয়। তবে দেখা গেছে ডিম ফুটে যত বাচ্চা বেরোয় তার মাত্র এক শতাংশ শেষ পর্যন্ত বেঁচে থাকে। কারণ অধিকাংশ বাচ্চাই বিভিন্ন প্রাণীর শিকার হয়ে মারা যায়। এদের খাদক হল গোড়িয়োল, গোসাপ, বুনো শূকর, ধেড়ে ইঁদুর, ঈগল, জলজ পাখি, অজগর, ভেটকি মাছ এমনকি বড় কুমিরও। আবার শূকর ও গবাদিপশুর পায়ের চাপে অনেক ডিম নষ্ট হয়ে যায়। সুন্দরবনের বাঘকেও কুমির বাচ্চা এবং পরিণত কুমির শিকার করে খেতে দেখা গিয়েছে। বাচ্চাদের বয়স ৮ মাস হলে পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন হতে শুরু করে, আর আড়াই বছর বয়স শুরু হলে নিজস্ব এলাকা তৈরি করতে মনোযোগ দেয়। নোনা জলের কুমির গড়ে ৭০ বছর বাঁচে, তবে কিছু ক্ষেত্রে ১০০ বছর পর্যন্ত বাঁচতে দেখা গিয়েছে।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৫৭: জরাসন্ধবধ ও জনার্দনের কৃতিত্ব

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-২৭ : সোনার কেল্লা: ডিটেকশনের ড্রয়িংরুম
সুন্দরবনে মানুষ-কুমিরের সংঘাত অতি পরিচিত ঘটনা। পেটের দায়ে যেসব মানুষ চিংড়ির মিন ধরতে বা কাঁকড়া শিকার করতে নদীতে যান মূলত তাঁরাই কুমিরের শিকার হন। আক্রান্ত মানুষের মধ্যে দেখা গিয়েছে ৮০ শতাংশই চিংড়ির মিন অর্থাৎ বাগদা চিংড়ির বাচ্চা সংগ্রহ করতে যাওয়া মানুষ। আর আক্রান্তদের মধ্যে ৬১.১৬ শতাংশই মারা গিয়েছেন। আসলে কুমিরের প্রচণ্ড শক্তিশালী কামড় থেকে বেঁচে ফেরা খুব মুশকিল। আরেকটি বিস্ময়কর তথ্য হল, মৃত মিন সংগ্রাহকদের মধ্যে ৫৫.১২% মহিলা। গত ২০০০ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে ১২৭টি এমন কুমির আক্রমণের ঘটনা ঘটেছে। আর তার সিংহভাগ গোসাবা ব্লকে। এছাড়াও বাসন্তী ও পাথরপ্রতিমা ব্লকের মিন সংগ্রহকরা বেশি কুমিরের শিকার হন। কেন মহিলারা বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন? এর কারণ হিসেবে দুটি যুক্তি উঠে এসেছে। প্রথম: পুরুষরা চাষবাস ও বাইরে শ্রমিকের কাজ করতে যাওয়ায় বাড়িতে কিছু রোজগারের জন্য বাড়ির মহিলাদের মিন সংগ্রহে বেশি যেতে হয়। আর দ্বিতীয়ত: ঋতুমতী মহিলাদের রজঃস্রাবের সময় ওই স্রাবে মিশে থাকা রক্তের গন্ধ কুমিরকে নাকি বেশি আকৃষ্ট করে। গবেষণায় এই তথ্য উঠে এসেছে।

কুমির প্রকল্পে প্রতিপালিত কুমির ছানা। ছবি: লেখক।
কুমির হল সুন্দরবনের জলজ বাস্তুতন্ত্রের সর্বোচ্চ খাদক। যে কোনও বাস্তুতন্ত্রে সর্বোচ্চ খাদকের ভূমিকা থাকে সর্বাধিক কারণ তারাই বাস্তুতন্ত্র নিয়ন্ত্রণ করে। তবে কয়েক দশক আগে থেকে সুন্দরবনে এদের সংখ্যা দ্রুত কমেছে। এর অন্যতম কারণ হল সুন্দরবনে জনবসতি গড়ে ওঠার সাথে সাথে বাসস্থান ধ্বংস, জলদূষণ এবং সুন্দরবনের নদীগুলোতে নৌকো, ট্রলার ইত্যাদির অত্যধিক সংখ্যাবৃদ্ধি। ভারতীয় বন্যপ্রাণ সংরক্ষণ আইনে এরা শিডিউল-১ তালিকাভুক্ত প্রাণী। সুন্দরবনে পাথরপ্রতিমা ব্লকের ভাগবতপুরে ১৯৭৬ সালে গড়ে ওঠা কুমির প্রকল্পে নোনা জলের কুমিরের কৃত্রিম প্রজনন করে সংখ্যাবৃদ্ধি করার চেষ্টা করা হয়েছে। ১৯৭৯ সাল থেকে এখনও পর্যন্ত ভাগবতপুর কুমির প্রকল্প থেকে ৬০০র বেশি কুমির নদীতে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। আর এর ফলে সুন্দরবন থেকে হারিয়ে যেতে বসা নোনা জলের কুমিরের সংখ্যা আগের তুলনায় যথেষ্ট বেড়েছে এবং তাদের এখন প্রায়শই বিভিন্ন খাঁড়িতে দেখা যাচ্ছে। ভাগবতপুর কুমির প্রকল্পে ডিম সংগ্রহ, কৃত্রিমভাবে ডিম ফোটানো ও ৫-৭ বছর বয়স পর্যন্ত বাচ্চাদের প্রতিপালন করা হচ্ছে। তারপর ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে নদীতে। সুন্দরবনের জলজ বাস্তুতন্ত্র রক্ষার এই অতন্দ্র প্রহরীরা সংখ্যায় বাড়ছে, সুন্দরবনবাসী হিসেবে এটা খুবই আনন্দের।—চলবে।
* সৌম্যকান্তি জানা। সুন্দরবনের ভূমিপুত্র। নিবাস কাকদ্বীপ, দক্ষিণ ২৪ পরগনা। পেশা শিক্ষকতা। নেশা লেখালেখি ও সংস্কৃতি চর্চা। জনবিজ্ঞান আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত। বিজ্ঞান জনপ্রিয়করণের জন্য ‘দ্য সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশন অফ বেঙ্গল ২০১৬ সালে ‘আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু মেমোরিয়াল অ্যাওয়ার্ড’ এবং শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞান লেখক হিসেবে বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদ ২০১৭ সালে ‘অমলেশচন্দ্র তালুকদার স্মৃতি সম্মান’ প্রদান করে সম্মানিত করেছে।


















