
ছবি : প্রতীকী। সংগৃহীত।
সেদিন স্যারকে নিয়ে বেতিয়া ক্যাম্প ঘুরে অফুরান অভিজ্ঞতা সংগ্রহ করল শংকর। বিস্ময়ের শেষ ছিল না তার মূলত দুটো বিষয় দেখে। একদিকে বেতিয়া ক্যাম্পের নারকীয় অবস্থা। আর অন্যদিকে নির্জীব ব্রজেন স্যারের তেড়েফুঁড়ে জেগে ওঠা মূর্তি।
বেতিয়া ক্যাম্প যেন নগ্নতা ক্ষুধা মৃত্যুর শ্মশানভূমি। অনেক উদ্বাস্তু এখানকার জীবন সহ্য করতে না পেরে পালিয়েছে। বাকিরা মৃত্যুর দিন গুনছে। ক্যাম্প অফিসাররা হৃদয়হীন। আর ক্যাম্পবাসীদের দেখতে কীট-পতঙ্গের মতো। দঙ্গল দঙ্গল মানুষ খেতে পাচ্ছে না। তার ওপর রোজের থেকে রোজ পঙ্গপাল মানুষের ভিড় বাড়ছে। ভিড়ের সঙ্গে ভিড় ঢেউয়ের মতো মিশে বেতিয়া চম্পারণ কে বানিয়েছে উদ্বাস্তু বাঙালের বিচ্ছিন্ন দ্বীপভূমি।
আরও পড়ুন:

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৩ : অপারেশন উদ্বাস্তু এবং গুরু-শিষ্য সংবাদ

দোলি হ্যায়!

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৫৬ : করিডোরে কেউ নেই

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৮৫ : সাথীহারা
শংকর মানুষের কাছে যাচ্ছে। যাবে না কেন, যাবার জন্যই তো এসেছে। কিন্তু বুকের ভিতরকার উৎসাহের টগবগানি অকুস্থলে পৌঁছে যেন অনেকটাই ম্লান। তীব্র অস্বস্তি পূর্ববঙ্গের স্ত্রীলোকদের দেখে। শাড়ি ছেঁড়া। ব্লাউজ সেমিজ নেই। সূর্যের আলোয় লজ্জাহীন হেঁটে চলেছে একফেরতা কাপড় জড়িয়ে। পাতলা মলিন বস্ত্র খণ্ডের ভিতর দিয়ে উলঙ্গ শরীরের রেখা স্পষ্ট। পুরুষগুলো শুয়ে আছে ঢ্যামনার মতো। বিড়ির অভাবে প্যাচাল পাড়ছে। চারপাশে দুর্গন্ধ। জঞ্জালের স্তূপ। ক্যাম্পের একধারে গোটা বারো উনুনে জাউ সেদ্ধ হচ্ছে। ফ্যানা ভাত আর ডালের জন্য ভ্যানভ্যানে মাছির মতো উড়ছে কাঙাল উলঙ্গ বাচ্চার পাল। ফাটা ছেঁড়া তাঁবুর পিছনের ফুটিফাটা মাঠে গোটা দশেক মৃতদেহ পড়ে। নিকিরির দল ভেঙে দু’ চারজন আধমরা মানুষ মড়া ঘিরে ইনিয়ে বিনিয়ে কাঁদছে।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৫০: দণ্ডকারণ্যে শূর্পনখা—একটি নাটকীয় চমক ও দ্বৈতসত্তায় অনন্য রাম

এই দেশ এই মাটি, ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৯৫: ত্রিপুরায় স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রভাব
শংকর কত দিন ধরে ভেবেছিল এখানে এসে বাঁশ দিয়ে তৈরি মঞ্চে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে সে অগ্নিবর্ষী ভাষণ দেবে। তার কথার শক্তিতে, নতুন করে প্রাণ পাবে উদ্বাস্তু মানুষ। স্বপ্নে ভরা শপথ নেবে আগামীর। বীজ রোপণ হবে সর্বহারার কম্যুনিস্ট পার্টির। কিন্তু এই নরকে তার লালিত স্বপ্ন বুদ্বুদের মতো মিলিয়ে গেল।
ক্লান্ত হয়ে পড়ল শংকর। আর তাজা ঘূর্ণি হয়ে এ খুপড়ি ও খুপড়ি ছুটে বেড়াতে লাগলেন ব্রজেন স্যার। সবচেয়ে আশ্চর্যের, কাঙাল মানুষের জমায়েত শংকরকে ফেলে জমে উঠল স্যারকে ঘিরে। স্যার অনুচ্চ কণ্ঠে ওদের কাছে সরল সোজা গল্পের মতো বিবৃত করছেন ভারতের ইতিহাসের কথা। পরাধীনতার শৃঙ্খল আর তাকে ভাঙার জন্য সশস্ত্র বিপ্লবের কথা। স্বাধীন সার্বভৌম একটা দেশ চাই, আর কিচ্ছু না। এদেশের মানুষের তিল তিল স্বপ্নে সেই ছিল একমাত্র প্রার্থনা। তারপর কী হল, স্বাধীন তো হলাম আমরা, কিন্তু তারপর!
ক্লান্ত হয়ে পড়ল শংকর। আর তাজা ঘূর্ণি হয়ে এ খুপড়ি ও খুপড়ি ছুটে বেড়াতে লাগলেন ব্রজেন স্যার। সবচেয়ে আশ্চর্যের, কাঙাল মানুষের জমায়েত শংকরকে ফেলে জমে উঠল স্যারকে ঘিরে। স্যার অনুচ্চ কণ্ঠে ওদের কাছে সরল সোজা গল্পের মতো বিবৃত করছেন ভারতের ইতিহাসের কথা। পরাধীনতার শৃঙ্খল আর তাকে ভাঙার জন্য সশস্ত্র বিপ্লবের কথা। স্বাধীন সার্বভৌম একটা দেশ চাই, আর কিচ্ছু না। এদেশের মানুষের তিল তিল স্বপ্নে সেই ছিল একমাত্র প্রার্থনা। তারপর কী হল, স্বাধীন তো হলাম আমরা, কিন্তু তারপর!
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৪১: সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী — গড়িয়োল

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৯৯ : দুই সাপের বিবাদ ও রাজকন্যার গুপ্তধন লাভ! প্রাকারকর্ণের চাণক্য-নীতিতে মুগ্ধ উলূকরাজ
বৃদ্ধ স্যারের চোখের গভীরে পদ্মার পানি। ভাঙা চোয়ালের গর্ভে দন্তহীন ওষ্ঠ কাঁপছে থর থর। আবেগে ভাসছে সর্বহারা জমায়েত। শংকর আনমনে পৌঁছে গিয়েছে সেই দেওয়াল পারের ফেলে আসা ক্লাসরুমে।
তারই মধ্যে হঠাৎ স্যার গলা নামিয়ে একজনকে কাছে ডাকলেন। কথা বলছিলেন গলা নামিয়ে। ফিসফিস করে। কৌতূহল ধরে রাখতে পারছিল না শংকর। কান পেতে শুধু শুনতে পেল, স্যার জিজ্ঞাসা করছেন নিসেন হাটের খবর। নিসেন হাট! নিসেন হাট! স্বরকেন্দ্র ফুলিয়ে দু’বার নিজের মনে শিস দেবার মতো করে উচ্চারণ করল শংকর। নিজের মনে বিড়বিড় করল—
—কি কইসেন সার, কি কইরা জাইনলেন এত্ত সব, নিসেন হাট তো রানাঘাটের কুপার্স ক্যাম্পের বন্দোবস্ত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ কালে মার্কিন বাহিনীর রাইত কাটানোর লোহার খাঁচা দুইখান রেইলের উপর এই পার ওই পারে বসানো দুইখান দরজা, জানালা বিহীন। টাইন্যা দিলেই খাপে খাপে লাইগ্যা বাইক্স বন্দি মানুষ! ভাবা যায়!
তারই মধ্যে হঠাৎ স্যার গলা নামিয়ে একজনকে কাছে ডাকলেন। কথা বলছিলেন গলা নামিয়ে। ফিসফিস করে। কৌতূহল ধরে রাখতে পারছিল না শংকর। কান পেতে শুধু শুনতে পেল, স্যার জিজ্ঞাসা করছেন নিসেন হাটের খবর। নিসেন হাট! নিসেন হাট! স্বরকেন্দ্র ফুলিয়ে দু’বার নিজের মনে শিস দেবার মতো করে উচ্চারণ করল শংকর। নিজের মনে বিড়বিড় করল—
—কি কইসেন সার, কি কইরা জাইনলেন এত্ত সব, নিসেন হাট তো রানাঘাটের কুপার্স ক্যাম্পের বন্দোবস্ত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ কালে মার্কিন বাহিনীর রাইত কাটানোর লোহার খাঁচা দুইখান রেইলের উপর এই পার ওই পারে বসানো দুইখান দরজা, জানালা বিহীন। টাইন্যা দিলেই খাপে খাপে লাইগ্যা বাইক্স বন্দি মানুষ! ভাবা যায়!
আরও পড়ুন:

হ্যালো বাবু!, পর্ব-১২৪: অমিতাভ হত্যারহস্য / ৫

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৪৮: ঘরে চুরি, বাইরে চুরি
শংকরের বিস্ময়ের শেষ নেই। নিসেন হাটে যাবার প্রস্তাব তো কমরেড বদ্যি বিশ্বাস দিয়েছেন তাকে সেই একান্ত গোপন ব্যক্তিগত পত্রে! কিন্তু স্যার জানলেন কীভাবে এই গহন সংবাদ শিয়ালদহ প্ল্যাটফর্মের গাদাগাদি ভিড়ে কুকুর বিড়ালের সঙ্গে রাত্রিবাস করে?—চলবে।
* ধারাবাহিক উপন্যাস (novel): দেওয়াল পারের দেশ (Dewal Parer Desh)। লিখছেন জয়িতা দত্ত (Dr. Jayita Dutta), বাংলা সাহিত্যের অধ্যাপক, হুগলি মহসিন কলেজ।


















