আসা যাক ত্রিপুরার দেবতামুড়া বা ছবিমুড়ার ভাস্কর্যের কথায়। অমরপুর থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে গোমতী নদীর গা ঘেঁষে পাহাড়ের গায়ে পাথরে খোদিত রয়েছে নানা দেবদেবীর মূর্তি। দেবতামুড়ার ভাস্কর্যের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে পঞ্চ দেবতার প্যানেল, মহিষাসুরমর্দিনী, শিব ঠাকুর, নৃত্যরত নরনারীর শোভাযাত্রা ইত্যাদি। পঞ্চ দেবতার প্যানেলে রয়েছে নৃত্যরত নটরাজ শিব, বিষ্ণু, কার্তিক, গণেশ এবং সরস্বতী। এই প্যানেলটি প্রায় দশ মিটার উঁচু।
প্যানেলের কিছু দূরে পাহাড়ের গায়ে পাথরে খোদিত রয়েছে অপর একটি প্যানেল যাতে মূর্তি রয়েছে ৩৭টি। শোভাযাত্রা করে চলেছেন নৃত্যরত নরনারী, তাঁদের কারও হাতে বাদ্যযন্ত্র। এতে রয়েছে ত্রিশূল, ডমরু হাতে শিব ঠাকুরের এক সুন্দর মূর্তিও। এবার এই প্যানেল ছাড়িয়ে গোমতী নদীপথে আরও কিছু দূর গেলেই দেখা মিলবে পাহাড়ের ঢালে পাথরে খোদাই করা মহিষাসুর মর্দ্দিনীর বিরাট মূর্তি। সিংহবাহিনী দেবীর হাতে রয়েছে নানা আয়ুধ। মহিষাসুরকে ত্রিশূল বিদ্ধ করছেন দেবী। ১৩ মিটার উঁচু এই বিগ্রহটি ৭ মিটার চওড়া।
দেবতামুড়ার ভাস্কর্যও ত্রিপুরার খুবই গুরুত্বপূর্ণ প্রত্ন সম্পদ। কিন্তু কারা কবে নদীর কূল ঘেঁষা ঢালু পাহাড়ের গায়ে পাথরে খোদাই করে এমন আশ্চর্য সব ভাস্কর্য তৈরি করেছিল? ‘রাজমালা’তেও এবিষয়ে স্পষ্ট ইঙ্গিত নেই। আর যতটুকু আছে তাও প্রশ্ন চিহ্নের মুখে।’রাজমালা’র ধন্য মাণিক্য খণ্ডে রয়েছে—
‘ছনগাঙ্গ তৈকতান দেবদ্বার নাম।
তার কত বাঁক উজান মাছি ছড়া ধাম।।
তৈতন খাঁ সঙ্গে ছিল যত শিল্পকর।
নির্ম্মাইছে গড় পরে দেব বহুতর।।’
ত্রিপুরা আক্রমণকারী পাঠান সেনাপতি হৈতেন খাঁ এই অঞ্চলে শিবির স্হাপন করেছিলেন।তার সঙ্গের ভাস্কর গণ গোমতীর তীরে পাহাড়ের গায়ে পাথরে অনেক দেবদেবীর মূর্তি খোদাই করেছিল। কিন্তু যুদ্ধ যাত্রায় পাঠান সেনাপতি শিল্পী নিয়ে আসবেন এবং পাঠান সেনাপতির সঙ্গের ভাস্কররা হিন্দু দেবদবীর মূর্তি গড়বেন এটা কতটা বিশ্বাসযোগ্য? উল্লেখ করা যায় যে ধন্য মাণিক্যের (১৪৯০-১৫১৫ খ্রিঃ) সঙ্গে গৌড়েশ্বর হুসেন শাহের বার কয়েক যুদ্ধ হয়েছিল। ‘রাজমালা’র ধন্য মাণিক্য খণ্ডে আরও রয়েছে—
‘আর দেখে নদী তীরে পাষাণ প্রতিমা।
হিন্দু সবে পূজা করে জানিয়া মহিমা।।
সেই স্হানে নাম ছিল মাছি ছা বিখ্যাত।
পুনর্জ্জন্ম নাহি বলে ত্রিপুরা সাক্ষাত।।’
দেবতামুড়ার পূর্ব নাম ‘মাছি ছা’। পাহাড়ের গায়ে দেবদেবীর মূর্তি থাকার জন্য এর নাম হয়েছে দেবতামুড়া। মাছি ছা’র মূর্তি সকলের অনুকরণেই পাঠান সেনাপতির সঙ্গীয় শিল্পীরা মাছি ছড়ায় দেবদেবীর বিগ্রহ খোদাই করেছিল বলে ধারণা করা হয়েছে। মহারাজা বীরবিক্রমের (১৪২৩-৪৭ খ্রি:) পৃষ্ঠপোষকতায় প্রকাশিত ‘শ্রীরাজমালা’র সম্পাদক কালীপ্রসন্ন সেন লিখেছেন (২য় লহর) যে, দেবতামুড়া ত্রিপুরার রাজাদের প্রাচীন কীর্তিচিহ্ণ। তবে কোন সময়ে কি উদ্দেশ্যে পাহাড়ের গায়ে এমন মূর্তি আঁকা হয়েছিল তা জানার উপায় নেই। শ্রীসেন অবশ্য এমন অনুমান করেছেন যে, বৌদ্ধ ধর্ম যাজকগণ যে সময়ে ত্রিপুরার চারদিকে হিন্দুদের বৌদ্ধ ধর্মে দীক্ষিত করছিলেন তখন প্রজাদের হিন্দুধর্মে আকৃষ্ট রাখার উদ্দেশ্যেই ত্রিপুরার ধর্মপ্রাণ নৃপতিগণ গোমতীর কূলে পাহাড়ে পাথরের গায়ে এমন দেবদেবীর মূর্তি খোদাই করিয়েছিলেন।
যাইহোক, ত্রিপুরার ঊনকোটি ও পিলাক নিয়ে যত আলোচনা হয়েছে দেবতামুড়া নিয়ে কিন্তু তেমনটা হয়নি। সাম্প্রতিক কালে পর্যটন ক্ষেত্রে দেবতামুড়া খুবই গুরুত্ব পাচ্ছে। সেখানে ভিড় বাড়ছে পর্যটকদের।দেবতামুড়া আজ ছবিমুড়া নামেই বেশি পরিচিতি লাভ করছে। প্রত্নতত্ত্ববিদরা বলছেন, ঊনকোটির অনেক পরবর্তীকালের সৃষ্টি দেবতামুড়া। ঊনকোটির ভাস্কর্যে অনুপ্রাণিত হয়েই পরবর্তীকালে দেবতামুড়ায় দেবদেবীর মূর্তি খোদাই করা হয়েছিল। অবশ্য ঊনকোটিতে যেমন পাহাড়ের গায়ে পাথরে খোদিত ভাস্কর্যের পাশাশাশি পৃথক বিগ্রহও রয়েছে, দেবতামুড়ায় কিন্তু সেরকম পৃথক বিগ্রহ নেই। শুধু পাহাড়ের গায়ে পাথরে খোদিত মূর্তি সমূহ।প্রত্নতাত্ত্বিকদের কেউ কেউ আবার দেবতামুড়ার ভাস্কর্য দ্বাদশ-ত্রয়োদশ শতকের সৃষ্টি বলে ধারণা করেছেন।যদি তাই হয়,তবে সেটাও ত্রিপুরায় মাণিক্য রাজবংশ প্রতিষ্ঠার অনেক আগেকার সময়ের ঘটনা।’রাজমালা’ও পঞ্চদশ-ষোড়শ শতকের কাহিনির বর্ণনায় প্রাচীনত্বের এমন ইঙ্গিত দেয় যে, নদী তীরের পাষাণ প্রতিমার স্হান ‘মাছি ছা’ নামে আগেই ‘বিখ্যাত’ ছিল। কিন্তু মাণিক্য পূর্ববর্তী রাজাদের পৃষ্ঠপোষকতায় ‘মাছি ছা’ বা দেবতামুড়া সৃষ্টি হলে কে বা কারা ছিলেন তারা? ধোঁয়াশাচ্ছন্ন সেই ইতিহাস।—চলবে।
* ত্রিপুরা তথা উত্তর পূর্বাঞ্চলের বাংলা ভাষার পাঠকদের কাছে পান্নালাল রায় এক সুপরিচিত নাম। ১৯৫৪ সালে ত্রিপুরার কৈলাসহরে জন্ম। প্রায় চার দশক যাবত তিনি নিয়মিত লেখালেখি করছেন। আগরতলা ও কলকাতার বিভিন্ন প্রকাশনা থেকে ইতিমধ্যে তার ৪০টিরও বেশি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। ত্রিপুরা-সহ উত্তর পূর্বাঞ্চলের ইতিহাস ভিত্তিক তার বিভিন্ন গ্রন্থ মননশীল পাঠকদের সপ্রশংস দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। দেশের বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়ও সে-সব উচ্চ প্রশংসিত হয়েছে। রাজন্য ত্রিপুরার ইতিহাস, রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে ত্রিপুরার রাজ পরিবারের সম্পর্ক, লোকসংস্কৃতি বিষয়ক রচনা, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা সঞ্জাত ব্যতিক্রমী রচনা আবার কখনও স্থানীয় রাজনৈতিক ইতিহাস ইত্যাদি তাঁর গ্রন্থ সমূহের বিষয়বস্তু। সহজ সরল গদ্যে জটিল বিষয়ের উপস্থাপনই তাঁর কলমের বৈশিষ্ট্য।
গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম
‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com