প্রিন্স দ্বারকানাথের বিবাহ হয়েছিল পনেরো বছর বয়সে। যশোরের নরেন্দ্রপুর গ্রামের দিগম্বরীর তখনও শৈশবাবস্থা কাটেনি। ছ-বছরের বালিকা। আট বছর পরে পুত্র-লাভ। জ্যেষ্ঠ পুত্র দেবেন্দ্রনাথ। পরে আরও চার পুত্র। নরেন্দ্রনাথ, গিরীন্দ্রনাথ, ভূপেন্দ্রনাথ ও নগেন্দ্রনাথ। দ্বারকানাথের দুর্ভাগ্য, তাঁকে একাধিকবার পেতে হয়েছে পুত্রশোক। দুই পুত্রই মারা গিয়েছিলেন যুবক-বয়সে। সে শোক কতখানি তীব্র হতে পারে, তা সহজেই অনুমেয়। গিরীন্দ্রনাথ মারা যান চৌত্রিশ বছর বয়সে, নগেন্দ্রনাথ ঊনত্রিশে। দ্বারকানাথের সন্তানদের মধ্যে দেবেন্দ্রনাথ দীর্ঘজীবী হয়েছিলেন। দেবেন্দ্রনাথই নানা ক্ষেত্রে কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছিলেন।
রবীন্দ্রনাথের পিতৃদেবের ধর্মপরায়ণতার কথা আমাদের অজানা নয়। ব্রাহ্মধর্মের প্রচার-প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন তিনি। সব সন্তানদের প্রতি দেবেন্দ্রনাথের যে সজাগ দৃষ্টি ছিল, এমন নয়। রবীন্দ্রনাথের প্রতি তাঁর যে বাড়তি মনোযোগ ছিল, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। মহর্ষি পরিবার-জীবনের সঙ্গে খুব যে জড়িয়েছেন, তেমন নয়। পত্নী সারদাসুন্দরীর প্রতি তাঁর উদাসীনতা কখনো কখনো বেশ প্রকট হয়ে উঠেছিল। তাঁর মনে দার্শনিকতা ছিল, আবার বৈষয়িকতাও ছিল। এই পরস্পরবিরোধিতা, বৈপরীত্য ঠিক মেলানো যায় না। বীরভূমের রায়পুরে যেতে যেতে ভুবনডাঙার মাঠে নিসর্গদৃশ্য যাঁকে তীব্রভাবে আকর্ষণ করে, যিনি অতীব ভ্রমণপ্রিয়, দেশে-দেশান্তরে ঘুরে বেড়ান, তিনিই আবার বিষয়-সম্পত্তির ব্যাপারে অত্যধিক সচেতন।
শোনা যায়, সেসময়ের সাময়িকপত্রে ছাপাও হয়েছিল দেবেন্দ্রনাথের শাসনকালে জমিদারিতে প্রজাপীড়নের সংবাদ। নানা বৈপরীত্যের মাঝেও মহর্ষির অনেক সৎগুণ ছিল, মানুষের জন্য কাতর হতে জানতেন তিনি। নানা ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সহমর্মিতার পরিচয় রেখেছেন। প্রিয়জনের বিপন্নতা তাঁকে কষ্ট দিত। জ্যোতিরিন্দ্রনাথের লেখা থেকে জানা যায়, সীতানাথ ঘোষের সঙ্গে দেবেন্দ্রনাথের সৌহার্দ্যময় সম্পর্ক ছিল। বিজ্ঞান নিয়ে সীতানাথের ছিল গভীর কৌতূহল ও অনুসন্ধিৎসা। আবিষ্কার করেছিলেন বস্ত্রবয়ানযন্ত্র। বিজ্ঞানের নানা ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ ব্যবহার করা যায়, এমনকি চিকিৎসাবিদ্যায়। চিকিৎসাবিদ্যায় বিদ্যুতের ব্যবহার নিয়ে তিনি গবেষণা করেছিলেন। ‘বৈদ্যুতিক চিকিৎসা’ নিয়ে মনোজ্ঞ প্রবন্ধ লিখেছিলেন ‘তত্ত্ববোধিনী’ পত্রিকায়। সেই প্রবন্ধ পড়ে মুগ্ধ হয়ে দেবেন্দ্রনাথ তাঁকে পত্রিকার সম্পাদনার কাজে যুক্ত করে নিয়েছিলেন।
জোড়াসাঁকোয় সীতানাথের নিয়মিত যাতায়াত ছিল। রবীন্দ্রনাথের লেখায় আছে, সীতানাথ ঘোষ জোড়াসাঁকোয় এসে নানা যন্ত্রপাতি সহযোগে বিজ্ঞানের বিচিত্র পরীক্ষা করে দেখাতেন। সেসব পরীক্ষা বালক রবীন্দ্রনাথকে তো বটেই, বাড়ির অন্যান্য ছোটদেরও কৌতূহলী করে তুলত। উত্তাপ দিলে পাত্রের নিচের জল হালকা হয়ে ওপরে ওঠে ও ওপরের ভারী জল নিচে নামে, এটা পরীক্ষা করার জন্য কাঁচপাত্রের জলে কাঠের গুঁড়ো দিয়ে, তা বসিয়ে দিতেন আগুনে। আগুনে চড়ানোর পরই স্পষ্ট হয়ে উঠত, তিনি কী বলতে চাইছেন, প্রমাণিত হত তাঁর বক্তব্যের সত্যতা।
দেবেন্দ্রনাথ সীতানাথ ঘোষকে খুব পছন্দ করতেন। কীভাবে তিনি সংকটের দিনে সীতানাথের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, তা জানা যায় জ্যোতিরিন্দ্রনাথের লেখা থেকে। পিতৃদেব তখন দেরাদুনে। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ গিয়েছিলেন তাঁর সঙ্গে দেখা করতে। একথা-সেকথার পরই মহর্ষি একটি পত্র বের করে দেখালেন পুত্রকে। সে চিঠি সীতানাথ ঘোষের। চিঠি দেখিয়ে বললেন, ‘বেচারা বড় কষ্ট পড়েছে।’ চিঠিতে সীতানাথ নিজের সংকটের কথা লিখে কিছু অর্থ সাহায্য চেয়েছিলেন। চিঠি দেখিয়ে মহর্ষি সাত হাজার টাকা তাঁর কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য জ্যোতিরিন্দ্রনাথকে নির্দেশ দিয়েছিলেন।
পিতার নির্দেশ, অবশ্য পালনীয়। যথারীতি সে নির্দেশ জ্যোতিরিন্দ্রনাথ পালন করেছিলেন, পালন করার পর মনে হয়েছিল,’সীতানাথ বাবু অত টাকা পাইবেন বলিয়া আদৌ প্রত্যাশা করেন নাই।’ সত্যিই তো, সাত হাজার টাকা সে সময়ের বিচারে অনেক টাকা! মহর্ষি ছিলেন এমনই দয়ালু। যাঁকে দিতেন তো উজাড় করেই দিতেন। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ পিতৃদেবের এই স্বভাববৈশিষ্ট্য জানতেন। অভিজ্ঞতার আলোকে লিখেছেন, ‘পিতৃদের যখন দান করিতেন, এইরূপেই মুক্তহস্তে দান করিতেন।’
জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ‘প্রবাসী’ পত্রে পিতৃদেবকে নিয়ে যে স্মৃতিকথাটি লিখেছিলেন, সেই স্মৃতিকথায় দয়ালু দেবেন্দ্রনাথের আরও পরিচয় আছে। জ্যোতিরিন্দ্রনাথের ‘বড়োদিদিমা’র একটা বাড়ি ছিল কলকাতা শহরে। তাঁর কোনও সন্তান-সন্ততি ছিল না। এক কন্যাকে নিজের সন্তান হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। সেই পালিত কন্যাই ছিল একমাত্র উত্তরাধিকারী। বাড়ির স্বত্ত্ব দেবেন্দ্রনাথেরও কিছুটা ছিল। তিনি স্বেচ্ছায় সেই অধিকার থেকে সরে এসেছিলেন। চেয়েছিলেন পালিতকন্যারই থাকুক সে বাড়ি। সচেতনভাবে ভুলে থেকেছেন নিজের স্বত্ত্বের কথা। দেবেন্দ্রনাথকে নিয়ে উল্লিখিত রচনায় জ্যোতিরিন্দ্রনাথ লিখেছেন, ‘সেই বাড়ি দখল করিবার কথা উঠিল। আমাদের মধ্যে কাহারও কাহারও সেইবাড়ির উপর লোলুপ দৃষ্টি ছিল। বাড়িটি বেশ বড়। মূল্য ২০ /৩০ হাজারের কম হইবে না। কিন্তু পিতৃদেব ঐ বাড়ি দিদিমার পালিত কন্যাকেই দান করিলেন। এইরূপ তাহার দয়া ও উদারতা ছিল।’
মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের উদারতার পরিচয় জ্যোতিরিন্দ্রনাথ আরও দিয়েছেন। আত্মীয়-স্বজন, পরিবার-পরিজন ও বন্ধু-বান্ধবদের সব সময়ই সাহায্য করতেন। বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়াতেন। দেশের মানুষের মঙ্গল হোক, চাইতেন মনে প্রাণে। দেবেন্দ্রনাথের পিতৃদেব প্রিন্স দ্বারকানাথ এদেশে চিকিৎসাবিজ্ঞানের উন্নতির জন্য বড় আন্তরিকভাবে ভেবেছিলেন। তিনিই এই বিষয়ে প্রথম ভেবেছিলেন। চিকিৎসাবিজ্ঞানের উন্নতিসাধনে তাঁর ভূমিকা ভোলার নয়। কলকাতায় মেডিকেল কলেজ স্থাপনের পর থেকে কী করে কলেজের উন্নতি হয়, সে বিষয়ে নিরন্তর ভেবেছেন। ছাত্রদের উৎসাহিত করার জন্য একাধিক পারিতোষিক চালু করেছিলেন। সে সময় অধিকাংশ মানুষই ছিল অজ্ঞানতার, অশিক্ষার অন্ধকারে, গোঁড়া হিন্দুপরিবার থেকে আগত ছাত্রদের শবব্যবচ্ছেদ নিয়ে বিচিত্র দ্বিধা ছিল।
সংস্কারাচ্ছন্ন ছাত্রদের উৎসাহিত করার তাগিদে দ্বারকানাথ বছরে দু’হাজার টাকা অনুদান দেওয়ার ব্যবস্থা করেছিলেন। চিকিৎসা বিজ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে পড়ুয়ারা আরও আধুনিক ভাবনায় ভাবিত হোক, এমন ভেবে তিনি মেডিকেল কলেজের দু’জন ছাত্রকে নিজের খরচায় পাঠিয়েছিলেন ওদেশে। চিকিৎসাবিজ্ঞান নিয়ে গভীর অধ্যয়নের পর এদেশে ফিরে তাঁরা চিকিৎসাবিজ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবেন, এমনই আশা করেছিলেন দ্বারকানাথ। তাঁদের আসা-যাওয়া, লন্ডনে থাকা, পড়াশোনার যাবতীয় খরচ প্রিন্স দ্বারকানাথই বহন করেছিলেন। পিতৃদেবের এই মহতী দৃষ্টান্ত দেবেন্দ্রনাথ অনুসরণ করেছিলেন। তিনি নিজেও মেডিকেল কলেজের কয়েকজন ছাত্রকে বাড়িতে আশ্রয় দিয়েছিলেন। ডাক্তারিপড়ুয়া সেসব ছাত্ররা কোথায় থাকবে, কী খাবে, তা নিয়ে দেবেন্দ্রনাথের চিন্তা-দুশ্চিন্তা ছিল।
জ্যোতিরিন্দ্রনাথের লেখা থেকে জানা যায়, তাঁদের জন্য ‘উত্তম ঘর ও উত্তম আহারাদির ব্যবস্থা’ করতেন নিয়মিত। যাঁরা এইভাবে উপকৃত হয়েছিলেন, জীবনে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার পর মহর্ষির সঙ্গে শুধু নয়, পরিবারের কারও সঙ্গে দেখা হলেই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতেন । জ্যোতিরিন্দ্রনাথ নিজের অভিজ্ঞতার কথা প্রকাশ করেছেন এভাবে, ‘প্রায় দুই একজন মেডিক্যাল কলেজের ছাত্রকে আমাদের বাড়িতে আশ্রয় দিয়া তাহার শিক্ষার ব্যয়ভার তিনি বহন করিতেন। তন্মধ্যে একজন পরীক্ষোত্তীর্ণ ছাত্র—এখন ডাক্তার— আমাদের সহিত কখনও সাক্ষাৎ হইলেই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করিয়া থাকেন।’
মহর্ষিকে ঠাকুরবাড়ির সকলেই সমীহ করে চলত। তিনি বাড়ি ফিরলে বাড়ির ভৃত্যরাও ‘সশঙ্ক’ থাকত। তাঁকে খুবই ’রাশভারী’ মনে হত। মহর্ষির যে মরমি মন ছিল, ছিল সকলের জন্য কাতরতা, ভালোবাসা, সে খবর অনেকাংশে অজানাই রয়ে গিয়েছে।
* গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি (Tagore Stories – Rabindranath Tagore) : পার্থজিৎ গঙ্গোপাধ্যায় (Parthajit Gangopadhyay) অবনীন্দ্রনাথের শিশুসাহিত্যে ডক্টরেট। বাংলা ছড়ার বিবর্তন নিয়ে গবেষণা, ডি-লিট অর্জন। শিশুসাহিত্য নিয়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে গবেষণা করে চলেছেন। বাংলা সাহিত্যের বহু হারানো সম্পদ পুনরুদ্ধার করেছেন। ছোটদের জন্য পঞ্চাশটিরও বেশি বই লিখেছেন। সম্পাদিত বই একশোরও বেশি।
গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম
‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com