মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ পত্নী বিয়োগের পর সেভাবে আর জোড়াসাঁকোয় থাকেননি। কলকাতায় থাকলে পার্ক স্ট্রিটের ভাড়াবাড়িতে বসবাস করতেন। কখনও-বা চুঁচুড়ায়। পার্ক স্ট্রিটে মহর্ষির সঙ্গে থাকতেন জ্যেষ্ঠা কন্যা সৌদামিনী। কন্যাই তাঁর দেখাশোনা করতেন। সঙ্গে থাকতেন জ্যেষ্ঠ পুত্র দ্বিজেন্দ্রনাথ। পত্নী-বিয়োগের পর দ্বিজেন্দ্রনাথ পিতৃ-সান্নিধ্যে পুত্র দ্বিপেন্দ্রনাথকে নিয়ে থাকতেন। দ্বিপেন্দ্রনাথ ছিলেন মহর্ষির প্রিয় পৌত্র। মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ তখন যথেষ্ট প্রৌঢ়, একা পাহাড়-ভ্রমণে যেতে ভরসা পাচ্ছেন না। কাকে সঙ্গী করবেন! কেন, দ্বিপেন্দ্রনাথকে।
মহর্ষির শারীরিক পরিস্থিতি তখন মোটেই অনুকূল ছিল না। দ্বিপেন্দ্রনাথ সঙ্গে ডাক্তারও নিয়ে গিয়েছিলেন। গিয়েছিলেন ডাক্তার নীলমাধব হালদার। দার্জিলিং-এ মহর্ষিদেব বড়ো ভালো ছিলেন। গাওয়া ঘি দেওয়া অড়হর ডালে রুটি চুবিয়ে আয়েশ করে খেতেন। রুগ্ন, বিবর্ণ চেহারায় জেল্লা ফিরে এসেছিল। কিছুকাল পাহাড়ে কাটিয়ে মহর্ষি ফিরে এসে জোড়াসাঁকোয় যাননি, গিয়েছিলেন পার্ক স্ট্রিটের বাড়িতে। জোড়াসাঁকোয় নিজেকে মানিয়ে নিতে শেষের দিকে অস্বস্তি বোধ করতেন তিনি। বিবাদে না গিয়ে তাই স্বেচ্ছানির্বাসন।
আজকের অভিজাত পার্ক স্ট্রিটের নিরিখে সেযুগের পার্ক স্ট্রিটের কথা ভাবলে অবাক হতেই হয়। মহর্ষির ওই বাড়িতে পোষা গোরুও ছিল। মহর্ষি রোজ গোরুর দুধ খেতেন। গোরুকে নিজের হাতে সৌদামিনী গুড় খাওয়াতেন। নিয়ম করে গুড় খাওয়ানোর কারণ একটাই, গুড় খাওয়ালে দুধ সুস্বাদু ও মিষ্টি হয়। গোরুর গুড়-ভক্ষণ দেখে মজা করতে ছাড়তেন না দ্বিপেন্দ্রনাথ। বলতেন,’দেখেছিস কাণ্ড, আমরা গুড় খেতে পাই নে একটু লুচির সঙ্গে আর কর্তাদাদামশায়ের গোরু দিব্যি কেমন রোজ গাদাগাদা গুড় খাচ্ছে!’
বাড়িছাড়া হয়েও পার্ক স্ট্রিটের ভাড়া বাড়িতে মহর্ষি নিজের মতো করে ভালো ছিলেন। হঠাৎই পার্ক স্ট্রিট ছাড়তে হয় তাঁকে। বাড়ির মালিক বাড়িটি কারও কাছে বিক্রি করতে হঠাৎই তৎপর হয়ে ওঠে। নিরুপায় হয়েই শেষে বাড়ি ছাড়তে হয় মহর্ষিকে। তখন তার যথেষ্ট বয়স হয়েছে। শরীর ভাঙছে। অসুস্থতার বিড়ম্বনা নিত্যসঙ্গী। মহর্ষি বুঝতে পেরেছিলেন, শেষের দিন ঘনিয়ে আসছে। নিজের বাড়িতে থাকাটাই নিরাপদ মনে করে শেষে ফিরে গেলেন জোড়াসাঁকোয়।
মহর্ষি নিজের বাড়িতে ফিরে আসছেন জেনে দ্বিপেন্দ্রনাথ তেতলার ঘর নিজের হাতে সাজিয়েছিলেন। সাহেবদের দোকান থেকে আসবাবপত্র কেনা হয়েছিল। জানলা-দরজায় লাগানো হয়েছিল ভারী পর্দা। টেবিলে ফুলদানি, ফুলদানিতে টাটকা-সতেজ ফুলগুচ্ছ। আরও কত কী! দ্বিপেন্দ্রনাথের সে আয়োজনে, ব্যবস্থাপনায় আপাতভাবে কোনো ত্রুটি ছিল না। অথচ মহর্ষির তা একেবারেই পছন্দ হয়নি।
দ্বিপেন্দ্রনাথ ঘোড়ার গাড়ি করে মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথকে নিয়ে এসেছিলেন বাড়িতে। ভগ্ন স্বাস্থ্য, অসুস্থ শরীর, কোনোভাবে যাতে তাঁর কষ্ট না হয়, সেদিকে ছিল সতর্ক দৃষ্টি। পথের বাধা পেরিয়ে দেবেন্দ্রনাথ জোড়াসাঁকোয় পৌঁছে সোজা তিনতলায় গিয়েছিলেন। সবকিছু দেখে বিরক্তিই প্রকাশ করেছিলেন। মহর্ষির কথায় তখনই দ্বিপেন্দ্রনাথকে পর্দা খুলতে হয়েছিল, ঘরের দেয়ালে যে ঘড়িটি লাগিয়ে ছিলেন তিনি, সেটি অবশ্য মহর্ষির খুব পছন্দ হয়েছিল। ঘড়িটাই রেখেছিলেন ঘরে।
দ্বিপেন্দ্রনাথ অবশ্য মহর্ষির বিরক্তিতে বিরক্ত হননি। বাতিল করা সব জিনিস নিয়ে গিয়ে সাজিয়েছিলেন নিজের বৈঠকখানা। অবনীন্দ্রনাথের লেখা থেকে জানা যায়, বৈঠকখানার আসবাবপত্র দেখিয়ে সবাইকে বলতেন, ‘দাদামশায়ের দেওয়া এসব।’
জোড়াসাঁকোয় এসে মহর্ষি শারীরিকভাবে যে খুব ভালো ছিলেন, তা নয়। সোজা হয়ে একেবারেই বসতে পারতেন না। বাঁদিকে কাত হয়ে বসতে হত তাঁকে। ডাক্তাররা অপারেশন করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। ছোটো অপারেশন। বাড়িতেই হয়েছিল অপারেশনের ব্যবস্থা। অপারেশন কতখানি সফল হয়েছিল, তা নিয়ে পরে সন্দেহ জাগলেও সে মুহূর্তে জাগেনি। তখন আর কে জানতেন, প্রদীপ নেভার আগে জ্বলে উঠেছে! কেউই ভাবতে পারেননি যে, এই সুস্থতা দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার নয়। অবাক হওয়ার মতো ঘটনা, অপারেশনের পরদিনই মহর্ষি রেলিং ধরে হেঁটে হেঁটে সূর্যপ্রণাম করতে গিয়েছিলেন। সে দৃশ্য দেখে কন্যা সৌদামিনী স্বস্তিবোধ করলেও তাঁকে ভাবিয়ে তুলেছিল পিতৃদেবের একটি উক্তি। মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ অসুস্থ শরীরে প্রায়শই বলতেন, দেবদূতরা এসেছেন। তাঁরা এসেছেন তাঁকে নিয়ে যেতে।
পিতার মুখের এসব কথা সৌদামিনী দেবীকে কষ্ট দিয়েছিল। একদিন সে কষ্টের কথা অবনীন্দ্রনাথকে বলেওছিলেন। ‘ঘরোয়া’তে অবনীন্দ্রনাথ লিখেছেন,’সে সময় কর্তাদাদামশায় প্রায়ই বড়োপিসিমাদের বলতেন, তিনি স্বপ্ন দেখেছেন, দেবদূতরা তাঁর কাছে এসেছিলেন। প্রায়ই এ স্বপ্ন তিনি দেখতেন। বড়োপিসিমা ভাবিত হলেন। একদিন আমাকে বললেন, অবন, এ তো বড়ো মুশকিল হল, বাবামশায় প্রায় রোজই স্বপ্ন দেখছেন দেবদূতরা তাঁকে নিতে এসেছিলেন। আমরাও ভাবি, তাই তো, তবে কি এ যাত্রা আর তিনি উঠবেন না।’
অবনীন্দ্রনাথের অনুমান অচিরেই সত্য হয়েছিল। দিনটি ছিল বর্ষণমুখর, দ্বিপেন্দ্রনাথের কাছে মহর্ষির অবস্থা মোটেই ভালো ঠেকেনি। ডাক্তাররাও প্রায় হাল ছেড়ে দিয়েছিলেন। দ্বিপেন্দ্রনাথের কথায় সেদিনই আত্মীয়-স্বজনরা সব এসে জড়ো হয়েছিলেন। বাড়ির সকলে ভিড় করেছিলেন বারান্দায়। এসেছিলেন রবীন্দ্রনাথও। রবিকে দেখে মহর্ষির মধ্যে যে ভাবান্তর দেখা গিয়েছিল, তা শব্দতুলিতে ধরে রেখেছেন অবনীন্দ্রনাথ। ‘ঘরোয়া’র পাতায় আছে,’ আমরা ছেলেরা সবাই বাইরে বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছি, এক-একবার দরজার ভিতরে উঁকি মেরে দেখছি। কর্তাদাদামশায় স্থির হয়ে বিছানায় শুয়ে আছেন। তাঁর ছেলেমেয়েরা এক-এক করে সামনে যাচ্ছেন। রবিকাকা সামনে গেলেন, বড়োপিসিমা কর্তাদাদামশায়ের কানের কাছে মুখ নিয়ে বললেন, রবি এসেছে। তিনি একবার একটু চোখ মেলে হাতের আঙুল দিয়ে ইশারা করলেন রবিকাকাকে পাশে বসতে। কর্তাদাদামশায়ের কৌচের ডান পাশে একটা জলচৌকি ছিল, রবিকাকা সেটিতে বসলে কর্তাদাদামশায় মাথাটি যেন একটু হেলিয়ে দিলেন রবিকাকার দিকে, ডান কানে যেন কিছু শুনতে চান এমনি ভাব। বড়োপিসিমা বুঝতে পারতেন; তিনি বললেন, আজ সকালে উপাসনা হয় নি, বোধ হয় তাই শুনতে চাচ্ছেন, তুমি ব্রাহ্মধর্ম পড়ো। রবিকাকা তাঁর কানের কাছে মুখ নিয়ে আস্তে আস্তে পড়তে লাগলেন।’
খানিক পরেই মহর্ষি মাথা সরিয়ে নিয়েছিলেন। ভাবটা এমন করেছিলেন যে, এটাই বুঝি শুনতে চাইছিলেন। শোনা হয়ে হয়ে গিয়েছে। বিলম্ব না করে তখনই সৌদামিনী দেবী বাটিতে দুধ নিয়ে এসেছিলেন । তাঁর পিতৃদেব দুধ খেতে বড়ো ভালোবাসেন। দুধ খেয়ে সুস্থ হয়ে উঠবেন, এমনই ভেবেছিলেন তিনি। না, সেভাবে দুধ খাওয়াতে পারলেন না তিনি। কোনোরকমে এক চামচ খেয়েই মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ বাইরের দিকে তাকিয়ে থাকলেন। খানিক পরই নিজের মনেই বলে উঠেছিলেন, ‘বাতাস, বাতাস।’সৌদামিনীও হাত পাখায় বাতাস করেছিলেন। তারপরই মহর্ষি-কণ্ঠে শোনা গিয়েছিল, ‘আমি বাড়ি যাব।’
মহর্ষির প্রিয় ঘড়িতে তখনই ঢং ঢং করে বারোটা বেজেছিল, আর ঠিক তখনই পড়েছিল তাঁর শেষ নিঃশ্বাস। অবনীন্দ্রনাথ লক্ষ্য করেছিলেন,’আলোর দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে যেন ঘুমিয়ে পড়লেন।’
দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে মহর্ষিদেবের মৃত্যু-সংবাদ। বহু মানুষ এসে ভিড় করে জোড়াসাঁকোয়। ফুল আর আবির ছড়িয়ে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল নিমতলা শ্মশানঘাটে। শ্মশানের ভেতরে নয়, দ্বিপেন্দ্রনাথের কথায় চিতা সাজানো হয়েছিল শ্মশানঘাট ছাড়িয়ে গঙ্গার পাড়ে। ওপারে তখন সূর্য অস্ত যাচ্ছিল। আকাশে সিঁদুরগোলা রং ছড়িয়ে পড়েছিল।
মুখাগ্নি করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। তেজোদীপ্ত মহর্ষিকে আগুনও স্পর্শ করতে বুঝি ভয় পাচ্ছিল! স্তব্ধ হয়ে অবনীন্দ্রনাথ সব দেখছিলেন। তাঁর মনে হচ্ছিল, আগুনের লকলকে শিখাগুলো ‘কর্তাদাদামশায়’কে স্পর্শ করতে ভয় পাচ্ছে। সে ভয় হয়তো ক্ষণিকের, অচিরেই আগুন গ্রাস করেছে মহর্ষিকে। ঠিক তখনই ওপারে অস্ত গেছে সূর্য।
দাহ করে শোকস্তব্ধ সকলে ফিরে এসেছিলেন জোড়াসাঁকোর বাড়িতে। আসার পরই খাজাঞ্চি যদুনাথ চট্টোপাধ্যায়ের মুখোমুখি হতে হয়েছিল। তাঁর হাতে মহর্ষির দীক্ষার সোনার আংটি। ভিড়ের মাঝে ছিলেন দ্বিপেন্দ্রনাথের স্ত্রী হেমলতা। হেমলতার হাতে আংটিটি দিয়ে সবিনয় জানিয়েছিলেন, কর্তামশায় আংটিটা তাঁকেই দিতে বলে গেছেন। এই আংটি পাওয়ার, পরার তিনিই প্রকৃত অধিকারিনী। মহর্ষির দীক্ষার আংটিটি হাতে নিয়ে ঠাকুরবাড়ির বধূমাতা হেমলতা দেবীর দু-চোখ জলে ভরে উঠেছিল।
* গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি (Tagore Stories – Rabindranath Tagore) : পার্থজিৎ গঙ্গোপাধ্যায় (Parthajit Gangopadhyay) অবনীন্দ্রনাথের শিশুসাহিত্যে ডক্টরেট। বাংলা ছড়ার বিবর্তন নিয়ে গবেষণা, ডি-লিট অর্জন। শিশুসাহিত্য নিয়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে গবেষণা করে চলেছেন। বাংলা সাহিত্যের বহু হারানো সম্পদ পুনরুদ্ধার করেছেন। ছোটদের জন্য পঞ্চাশটিরও বেশি বই লিখেছেন। সম্পাদিত বই একশোরও বেশি।
গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম
‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com