
ছবি: লেখক।
আমরা হেলিকপ্টারে করে হিমবাহ বরাবর অনেকটা উড়ে গেলাম। পাইলট অনেকটা নিচে নামিয়ে এনে হেলিকপ্টার ওড়াচ্ছেন। সে এক অদ্ভুত অনুভূতি। সামনে তাকালে আদিগন্ত প্রসারিত আসমানী নীল রঙের হিমবাহ। সেটা দূরে গিয়ে মিশে গিয়েছে নীল আকাশে মেঘদের সঙ্গে। দু’পাশে সারি সারি উঁচু পাহাড়। তারা যেন আগলে রেখেছে হিমবাহকে। আর তার মধ্যে দিয়ে দিয়ে আমরা এঁকেবেঁকে উড়ে চলেছি।
হিমবাহের মাঝে মাঝে আবার বরফ গলে গিয়ে তৈরি হয়েছে ছোট ছোট শীর্ণকায় অসংখ্য নদী। সেগুলো আরও উজ্জ্বল নীল। হঠাৎ উৎপন্ন হয়ে আবার তারা মিলিয়ে গিয়েছে ওই হিমবাহের মধ্যেই। কখনও সামনে গিয়ে জমে গিয়েছে, আবার কখনও হিমবাহের তলা দিয়ে সুড়ঙ্গ পথে চলে গিয়েছে অন্তঃসলিলা হয়ে। কেউ জানে না কোথায় তাদের গন্তব্য। আমাদের পাইলট ওই শীর্ণকায় নদীর গতিপথ অনুযায়ী এঁকে বেঁকে ওড়াতে লাগলো হেলিকপ্টার।
আরও পড়ুন:

রহস্য রোমাঞ্চের আলাস্কা, পর্ব-৫৮: হেলিকপ্টারে সওয়ার হয়ে চূড়ার কাছাকাছি গিয়ে পাহাড় দেখার রোমাঞ্চটাই আলাদা

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১১৬: রাম যৌথ পরিবারের আদর্শনিষ্ঠ জ্যেষ্ঠ, তাঁর যেন এক ঘরোয়া ভাবমূর্তি
এমন ভাবে উড়তে উড়তে আমরা গিয়ে নামলাম একটা হিমবাহের মধ্যেই গজিয়ে ওঠা একটা হ্রদের ধারে। দেখে মনে হচ্ছে একটা বিরাট বড় জায়গায় কোনও এক অদৃশ্য, ঐশ্বরিক শিল্পী যেন আসমানী নীল রং গুলে রেখেছেন তাঁর রং মেশানোর পাত্রে। ওই নীল দিয়েই বুঝি সদ্য আঁকা হয়েছে আমাদের মাথার ওপরের আকাশ, আর তার আশেপাশে পড়ে থাকা সাদা সাদা বরফ। ওই সাদা রঙে তুলি ডুবিয়েই সেই অদৃশ্য শিল্পী অনবরত রং করে চলেছেন আকাশে ভেসে বেড়ানো পেঁজা তুলোর মতো সাদা সাদা মেঘকে।
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১১৭: আপাতত পরিত্রাণ

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-১০১: মা সারদার মায়িকবন্ধন ত্যাগ
কি অপার্থিব অনুভূতি। আমরা গিয়ে নামলাম ওই নীল হ্রদের ধারে। নীল হ্রদের পারে নীল আকাশের নিচে আমাদের লাল রঙের হেলিকপ্টার যেন আরেকটা অন্য মাত্রা এনে দিয়েছে চারপাশের পরিবেশে। আর কেউ কোথাও নেই। আমি আর আমার স্ত্রী এগিয়ে গেলাম ওই নীল হ্রদের দিকে। সেখানে দাঁড়িয়ে আঁজলা ভরে তুলে নিলাম সে জল। দেখলাম স্বচ্ছতমর চেয়েও বেশি স্বচ্ছ সেই জল। আশ মিটিয়ে পান করলাম। আমি বিবাহবার্ষিকী উদযাপনের জন্য আগে থেকেই নিয়ে রেখেছিলাম কেক এবং লাল ওয়াইন। সেখানেই পরম প্রকৃতি এবং পঞ্চভূতকে সাক্ষী রেখে উদযাপন হল শুভ বিবাহবার্ষিকী। পাইলট তুলে দিলেন অসংখ্য ছবি।
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৮০: রাজনীতিতে সবাই চায় সবলের সঙ্গে বন্ধুত্ব বজায় রাখতে, দুর্বলরা সব সময়ই একা

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১০২: কণ্ঠী ঘুঘু
ওই হ্রদের ধারে আমরা বসেছিলাম অনেকটা সময়। ব্যক্তিগত ভাবে ভাড়া নেওয়া হয়েছিল হেলিকপ্টারটা। কাজেই কোনও তাড়া নেই। আমরা দু’চোখ ভরে দেখলাম প্রকৃতির এই অপরূপ সৃষ্টি। আসলে এই হ্রদগুলো তৈরি হয় গ্রীষ্মকালে হিমবাহের ওপরের স্তরের বরফ কিছুটা গলে গিয়ে। সব জায়গায় হ্রদ তৈরি হয় না। কোনও কোনও জায়গায় যেখানে হিমবাহের উপরিস্তর একটু অবতল (কনকেভ) বা বাটির মতো দেবে গিয়েছে, সেখানেই গলে যাওয়া জল কিছুদিন সঞ্চিত হয়ে যায়। সেটাই এমন অলৌকিক এক নীল হ্রদের রূপ নেয়।
আরও পড়ুন:

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১১৮: কবির ভালোবাসা, কবির জন্য ভালোবাসা

এই দেশ এই মাটি, ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৬১: বাংলা গদ্য-পদ্যের ইতিহাসে ত্রিপুরা
নীল রংটা অবশ্যই সূর্যের আলোর প্রতিফলন ও বিচ্ছুরণের জন্য। সূর্য থেকে যে আলো পৃথিবীতে এসে পৌঁছয় তাতে বিভিন্ন রং মিশে থাকে। একে বলে সূর্যের আলোক বর্ণালী। সূর্যের আলোক বর্ণালীর এই রংগুলোকেই আমরা একসঙ্গে বলি ‘বে-নী-আ-স-হ-ক-লা’, অর্থাৎ বেগুনি, নীল, আকাশি, সবুজ, হলুদ, কমলা, এবং লাল। বৃষ্টির পরে রামধনু উঠলে সূর্যের আলোক বর্ণালীর প্রায় সব রংগুলো দেখা যায়।

ছবি: লেখক।
এখন এই এক একটা রঙের এক একরকম তরঙ্গ দৈর্ঘ্য হয়। ‘বে-নী-আ-স-হ-ক-লা’ —এই ক্রমে দেখলে প্রথম দিকের রংগুলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য সবচেয়ে কম। আর পরের দিকের রঙের তরঙ্গদৈর্ঘ্য বেশি। অর্থাৎ কিনা প্রথম দিকের নীলচে রঙের তরঙ্গ-দৈর্ঘ্য হল সবচেয়ে কম। হিমবাহের ক্ষেত্রে জলের কণাগুলো খুব কাছাকাছি এসে এতো ঘন হয়ে যায় যে, তারা নীলচে রং ছাড়া বাকি প্রায় সমস্ত রঙের আলোক তরঙ্গকে শোষণ করে নেয়। অর্থাৎ একবার আলো ওই হিমবাহের বরফের মধ্যে ঢুকলে আর প্রতিফলিত হয়ে বেরোতে পারে না, যেহেতু তাদের তরঙ্গদৈর্ঘ্য একটু বড়। আর নীলচে রঙের তরঙ্গদৈর্ঘ্য খুব ছোট হওয়ার জন্য তারা ওই ঘন সন্নিবিষ্ট জলকণার মধ্যেকার ফাঁক দিয়ে ঠিক প্রতিফলিত এবং বিচ্ছুরিত হয়ে কোনওভাবে বেরিয়ে আসে। এবার ওই নীলচে রং-ই হ্রদের স্বচ্ছ জলের মধ্যে দিয়ে ঠিকরে বেরিয়ে আসে। তাই হ্রদটাকে ওরকম ঘন নীল দেখায়। —চলবে।
* রহস্য রোমাঞ্চের আলাস্কা (Mysterious Alaska) : ড. অর্ঘ্যকুসুম দাস (Arghya Kusum Das) অধ্যাপক ও গবেষক, কম্পিউটার সায়েন্স, ইউনিভার্সিটি অব আলাস্কা ফেয়ারব্যাঙ্কস।


















