কাকোলূকীযম্
শত্রুরাজ্য আক্রমণের বিভিন্ন সময় অর্থশাস্ত্রে বলা থাকলেও অনুজীবীর মত হল, শত্রুরাজা যদি স্ত্রীব্যসন বা মদের নেশায় আসক্ত থাকে বা কোনও কারণে প্রজাবর্গ যদি সে রাজার উপর ক্ষিপ্ত হয়ে থাকে, সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে যেকোনও সময়ে শত্রুরাজ্য আক্রমণ করতে হয়। বিজয়শ্রীকে পেতে শত্রুরাজ্য আক্রমণের যথার্থ কাল এক অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বলে অর্থশাস্ত্রে বিবেচনা করবার কথা বলা হয়েছে। আভ্যন্তরীণ আর বাহ্যিক সুরক্ষা বজায় রাখার জন্য একজন রাজার উচিত প্রথমে বিশ্বস্ত মহাবল এবং শূরবীর সৈনিকে নিজের দেশকে ভালোভাবে সুরক্ষিত করে তারপর শত্রুদেশে সামগ্রিকভাবে নিজের গুপ্তচরের জাল বিছিয়ে দেওয়া। শত্রুরাজ্য আক্রমণ করা তৃতীয় পদক্ষেপ। পঞ্চতন্ত্রকারের ভাষায়—
স্বস্থানং সুদৃঢং কৃত্বা শূরৈশ্চাপ্তৈর্মহাবলৈঃ।
পরদেশং ততো গচ্ছেৎ প্রণিধিব্যাপ্তমগ্রতঃ।। (কাকোলূকীযম্ ৩৯)
কারণ যে রাজা শত্রুদেশের রাস্তাঘাট কিংবা তাঁর ক্ষমতার বিবিধ উত্স অর্থাৎ শত্রুরাজার সৈন্যবল, মজুত-খাদ্য, পানীয়জলের পরিমাণ সম্পর্কে ভালোভাবে খোঁজ খবর না নিয়েই হঠকারীর মতো শত্রুরাজ্য আক্রমণ করে বসেন, সে রাজা আর শত্রুরাজ্য থেকে নিজের রাজ্যে ফিরতে পারে না। হয় সে শত্রুরাজ্যেই মৃত্যুবরণ করে, না হলে শত্রুরাজার হাতে বন্দী হন। সংক্ষেপে বলতে গেলে, এইটাই পররাষ্ট্রনীতি প্রয়োজনীয়তা। তাই উজ্জীবীর মতে, বায়সরাজ মেঘবর্ণের উচিত হল পালিয়ে যাওয়া। কারণ উলূকরাজ্যের খবর আমাদের কাছেও অজানা। তারা রাতের বেলায় সক্রিয় থাকে। কোথায় তাদের প্রাসাদ সে সম্পর্কেও আমাদের কোনও ধারণা নেই। ফলে এই পরিপ্রেক্ষিতে শত্রুরাজার সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধে না গিয়ে আমাদের এই স্থান ত্যাগ করে অন্যত্র আশ্রয় নেওয়াই শ্রেয়। কারণ আমাদের এই বৃক্ষদুর্গের সব খবর উলূকরাজ অরিমর্দনের কাছে আছে। তাই এই স্থান আর আমাদের জন্য সুরক্ষিত নয়। হে রাজন্! এইরকম পাপী এবং বলশালী শত্রুর সঙ্গে সন্ধি বা প্রত্যক্ষ যুদ্ধ না করে বুদ্ধিমান রাজার দ্বিতীয় প্রকারের যান, অর্থাৎ প্রাণ এবং ধন বাঁচিয়ে শত্রুর নাগালের বাইরে অন্যত্র পালিয়ে কোথাও চলে যাওয়াই শ্রেয়। রাজনীতি শাস্ত্রে দৃষ্টান্ত দিয়ে বলা হয়েছে—
যদপসরতি মেষঃ কারণ তৎ প্রহর্তুং
মৃগপতিরপি কোপাৎ সঙ্কুচত্যুত্পতিষ্ণুঃ।
হৃদযনিহিতভাবা গূঢমন্ত্রোপচারাঃ
কিমপি বিগণযন্তো বুদ্ধিমন্তঃ সহন্তে।। (ঐ, ৪২)
অর্থাৎ ভেড়া যখন পিছনে হাঁটে তখন বুঝতে হবে সে সামনে কাউকে প্রহার করবার জন্যই উদ্যত হচ্ছে। সামনে শিকার দেখলে সেটিকে আক্রমণ করবার জন্য মৃগপতি সিংহও কিন্তু পিছিয়ে গিয়ে নিজেকে সঙ্কুচিত করে নেয় সামনে লক্ষ্যের ঝাঁপ দেওয়ার জন্য। তেমনই মনের কথাকে মনের মধ্যে লুকিয়ে রেখে নিজের বিচার এবং প্রচেষ্টাকে প্রকাশিত না করে বুদ্ধিমান লোক কোনো রকম কোনো রকম মান-অপমানের পরোয়া না করে সবকিছুই সহ্য করে নেন। ভবিষ্যতে সঠিক সময় বুঝে প্রত্যাঘাত করবার জন্য অনেক সময়ে রাজনীতিতে পিছনে সরে আসতে হয়। স্বয়ং বাসুদেব শ্রীকৃষ্ণও মগধরাজ জরাসন্ধের বারংবার আক্রমণে বিপর্যস্ত মথুরাকে রক্ষা করবার জন্য পশ্চিমসমুদ্রের তীরে দ্বারকায় আশ্রয় নিয়েছিলেন। পরে সঠিক সময় বুঝে পাণ্ডবদের সহায়তায় জরাসন্ধকে বধ করতে সমর্থ হয়েছিলেন। মহাভারতের আরও দৃষ্টান্ত স্বয়ং পঞ্চতন্ত্রকারই বলেছেন—যে রাজা তাঁর থেকে বলবান শত্রুর সামনে বীরত্ব নিজের দেখাতে শত্রুকে প্রতিহত করবার চেষ্টা না করে সময় থাকতেই স্বদেশ ত্যাগ করেন, সে জ্যেষ্ঠপাণ্ডব যুধিষ্ঠিরের মতো জীবিত থাকতে পারে। পরে সেই আবার সঠিক সময় বুঝে সেই বলবান শত্রুজে প্রত্যাঘাত করে স্বরাজ্য দখল করে নেয়।
পাশা খেলায় হেরে গিয়ে বাধ্য হয়ে পাণ্ডবরা দেশত্যাগ করে বারো বছরের বনবাসে চলে যান। পরে বিরাটরাজ্যে অজ্ঞাতবাসের শেষে তৃতীয় পাণ্ডব অর্জুন এবং বাসুদেব শ্রীকৃষ্ণের ভোগিনী সুভদ্রার পুত্র অভিমণ্যূর সঙ্গে বিরাট রাজকন্যা উত্তরার বিবাহে ভারতবর্ষের সকল রাজাদের মিলিত সহায়তায় বলবান হয়ে তাঁরা রাজ্য লাভের জন্য কুরুক্ষেত্রের রণাঙ্গণে কৌরবদের মুখোমুখি হন। রাজনীতিতে জিততে গেলে মাঝে মাঝে পিছনেও হাঁটতে হয়। কিন্তু যে শক্তিহীন রাজা অভিমানের বশে নিজের থেকে শক্তিশালী রাজার সঙ্গে যুদ্ধ করে, সে আসলে সেই শক্তিশালী রাজারই মনোবাঞ্ছাকে পূর্ণ করে। কারণ একজন শক্তিশালী রাজা এইটাই চান যে তাঁর প্রতিপক্ষ যেন দুর্বল হয়, যাতে তাকে দ্রুত জয় করে নেওয়া যায়। এই বোকামির ফল হচ্ছে সপরিবারে বিনাশ পাওয়া। এইজন্যে বলবান শত্রু’র আক্রমণে আমাদের এখন উচিত হলে এখান থেকে অন্যত্র কোথাও চলে যাওয়া। এটা সন্ধি করার বা বিগ্রহ করবার অনুকূল সময় নয়—“ন সন্ধের্বিগ্রহস্য চ”। এইভাবে অনুজীবী অপসারণ বা যানের সপক্ষে নিজের অভিমত জানালেন।
অনুজীবীর কথা শেষ হলে বায়সরাজ মেঘবর্ণ এবার প্রজীবীকে জিজ্ঞাসা করলেন, “ভদ্র! ত্বমপ্যাত্মনোঽভিপ্রাযং বদ”—হে ভদ্র! আপনিও এবার আপনার অভিপ্রায় বলুন।
প্রজীবী বললেন, “দেব! মম সন্ধিবিগ্রহযানানি ত্রীণ্যপি ন প্রতিভান্তি। বিশেষতশ্চাসনং প্রতিভাতি।” —হে রাজন্! আমার মতে এই সময়ে শত্রুরাজার সঙ্গে সন্ধি করা বা তার সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধে নেমে যাওয়া কিংবা বলবান শত্রুর আক্রমণের ভয়ে নিজের জায়গা ছেড়ে যাওয়া অন্যত্র চলে যাওয়া—কোনওটাই সঠিক উপায় হবে না। এই সময়ে “আসন” অর্থাৎ দুর্গ-প্রভৃতি তৈরি করে বা অন্যান্য বলবান রাজার সঙ্গে সন্ধি করে তাদের সহায়তা নিয়ে এবং সেইসঙ্গে নিজের আত্মরক্ষার যাবতীয় প্রস্তুতি নিয়ে নিজের জায়গা না ছেড়ে শত্রু রাজার পরবর্তী পদক্ষেপের অপেক্ষায় অবস্থান করাই শ্রেয়। প্রকৃতির দৃষ্টান্ত দিয়েও বলা যেতে পারে যে কুমির বা ঘড়িয়াল নিজের জায়গায় অর্থাৎ জলের মধ্যে অবস্থান করে হাতিকে পর্যন্ত টেনে নিয়ে যেতে পারে। কিন্তু সেই একই কুমির যদি নিজের জায়গা ছেড়ে অর্থাৎ জল ছেড়ে ডাঙায় উঠে এলে একটা সমান্য কুকুরের কাছেও কিন্তু সে পরাজিত হয়ে যায়। তাই নিজের স্থান কখনও ছাড়া উচিত নয়—
নক্রঃ স্বস্থানমাসাদ্য গজেন্দ্রমপি কর্ষতি।
স এষ প্রচ্যুতঃ স্থানাচ্ছুনাপি পরিভূযতে।। (ঐ, ৪৫)
শুধু তাই নয়, বলবান শত্রুর দ্বারা আক্রান্ত হলে রাজার নিজেকে সযত্নে রক্ষা করা উচিত এবং সে কারণেই কেল্লার মধ্যে সুরক্ষিত পরিসরে থাকাটাই সমীচীন। আর সেখানেই সাহায্যের জন্য বন্ধু-রাজাকে ডাকাটা হলো যথার্থ নীতি। কিন্তু যে রাজা তার উল্টোটা করেন? মানে শত্রু আসছে শুনে ভয়ে ব্যাকুল হয়ে নিজের জায়গা ছেড়ে অন্যত্র চলে যান সে আর নিজের রাজ্যে প্রবেশ করতে পারেন না। বিষদাঁত ছাড়া সাপ কিংবা মদমত্ততাহীন হাতিকে যেমন সকলেই বশ করে নিতে পারে, তেমনই নিজের রাজ্যহীন রাজাকে যে কোনও সামান্য লোকেও নিজের অধীন করে নিতে পারে। রাজ্যহীন রাজার এ জগতে কোনও দাম নেই। নিজের জায়গায় দুর্গতে অবস্থা করে একজন মানুষ একলাই একশো জনের সঙ্গে লড়াই করতে পারে। তাই নিজের জায়গা ছেড়ে যাওয়াটা সঠিক সিদ্ধান্ত হবে না। তাই দুর্গকে চারিদিক থেকে দৃঢ় এবং সুরক্ষিত করে সৈন্যদের জন্য পর্যাপ্ত খাদ্যদ্রব্য দুর্গের মধ্যে মজুত রেখে দুর্গের প্রাকারকে পরিখায় ঘিরে সেখানে অস্ত্র সাজিয়ে যুদ্ধের জন্য তৈরি হয়ে বসে থাকতে হবে। কারণ যদি সে বেঁচে যায় তবে রাজ্য পাবে আর যদি মরেও যায় তবে স্বর্গপ্রাপ্তি তাঁর নিশ্চিত। প্রবল ঝড়ের দাপটে একসঙ্গে মিলেমিশে থাকা লতাগুচ্ছকে বায়ু যেমন উত্খাত করতে পারে না, ঠিক তেমনই রাজা যদি নিজের জায়গা না ছেড়ে মিত্ররাজপক্ষের সঙ্গে মিলেমিশে অবস্থান করে, তবে সে অত্যন্ত দুর্বল হলেও, বলবান শত্রু তার কিছুই করতে পারে না।
প্রান্তর মধ্যে একলা দাঁড়িয়ে থাকা শক্তিশালী বৃক্ষকে সামান্য বায়ুও ফেলে দিতে পারে, কিন্তু সেই গাছই যদি জঙ্গলের মধ্যে স্বজাতীয় অন্যান্য বন্ধুবৃক্ষের সঙ্গে দলবদ্ধভাবে থাকে, তাহলে প্রবল বায়ুও তার কিছুই করতে পারে না। সেই বৃক্ষদল একসঙ্গে সেই বায়ুপ্রবাহকে সহজেই ঠেকিয়ে দিতে পারে। তাই বীরত্ব থাকলেও একলা শত্রুর বিরুদ্ধে সংগ্রামে যাওয়াটা ঠিক নয়। বায়ু যেমন একলা বৃক্ষকে উপড়ে দিতে পারে, শত্রুও তেমন সহায়হীন রাজাকে সহজেই পরাভূত করতে পারে। তাই শক্তিশালী হলেও রাজা যদি একা হন তাহলে শত্রু তাকে পরাজিত করতে পারেন, কিন্তু মিত্রশক্তি সহায় হলে সে রাজা হয়ে যান অপ্রতিরোধ্য। ফলে আমার অভিমত হল “আসন” অর্থাৎ নিজের জায়গা ছেড়ে না গিয়ে দুর্গের মধ্যে নিজেকে সুরক্ষিত রেখে, সেখানে মিত্রপক্ষকে সহায়তার জন্য আহ্বান জানিয়ে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়ে থাকা।
প্রজীবীর কথা শেষ হলে বায়সরাজ মেঘবর্ণ চিরঞ্জীবীকে জিজ্ঞাসা করলেন, হে ভদ্র! আপনিও আপনার অভিপ্রায় বলুন। – “ভদ্র! ত্বমপি স্বাভিপ্রাযং বদ।”—চলবে।
* পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি (Panchatantra politics diplomacy): ড. অনিন্দ্য বন্দ্যোপাধ্যায় (Anindya Bandyopadhyay) সংস্কৃতের অধ্যাপক, কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়।
গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম
‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com