মঙ্গলবার ১০ মার্চ, ২০২৬


অপরূপ শোভা। ছবি: লেখক।

রাস্তার মাঝেই খানিকক্ষণ গাড়ি দাঁড় করিয়ে এদিক-ওদিক দেখে আবার গাড়ি করে একটু এগিয়ে গেলাম। পরের বাঁক ঘুরে যা দেখলাম, তা আরও বিস্ময়কর। হ্রদটা এখানে এসে একটা নদী হয়ে গিয়েছে। রাস্তার ধার দিয়েই কুলকুল শব্দে বয়ে চলেছে। নদীর মধ্যে ভাঙা ভাঙা পাতলা বরফের আস্তরণ। একে বলে প্যানকেক আইস। সামনেই একটা পাহাড়ের মাথা থেকে নেমে এসেছে বিশাল এক হিমবাহ, সেটা গলেই তৈরি হয়েছে ওই নদী। আর ওই নদীটাই গিয়ে মিশে গিয়েছে একটু আগে পেরিয়ে আসা ওই হ্রদে।
আচ্ছা, এই নদীর বদলে কি পাহাড়টা কিনে নেওয়া যায় সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কবিতার মতো: ‘কে না জানে পাহাড়ের থেকে নদীর দামই বেশি। পাহাড় স্থানু, নদী বহমান।…’ সে যাই হোক, আমি আর আমার স্ত্রী কিছুটা সময় কাটিয়েছিলাম ওই নদীটার সঙ্গে। উঠে আসতে ইচ্ছা করছিল না কিছুতেই। আমার স্ত্রী তো বলে বসলো, ওই নদীর ধরেই বিবাহ বার্ষিকীর কেক কাটা হোক। আর বেশিদূর গাড়ি চালিয়ে গিয়ে কী হবে! আমি দেখলাম মহা মুশকিল। এদিকে তাকে সারপ্রাইস দেওয়ার চক্করে হেলিকপ্টার চড়ার টাকা পয়সা সব দিয়ে বসে আছি। আমাদের কাব্যিক দর কষাকষির জেরে পুরো হেলিকপ্টারের টাকা পয়সা-সহ তাকে চমক দেওয়ার পুরো পরিকল্পনাটাও ভেস্তে যাওয়ার জোগাড়। কাজেই তাকে বোঝানো হল, পরে আরও সুন্দর সব জায়গা আছে। কাজেই একবার গোটা রাস্তাটা ঘুরে নেওয়াই ভালো।
আরও পড়ুন:

রহস্য রোমাঞ্চের আলাস্কা, পর্ব-৫৫: সর্বত্র বরফ, কোত্থাও কেউ নেই, একেবারে গা ছমছম করা পরিবেশ

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-৯৪: ‘মহেশ্বরের অনন্ত ধৈর্য’

আরও কিছুটা এগিয়ে একটা ছোট পাহাড়ের ওপরে উঠতেই হঠাৎ চোখে পড়ল ট্রান্স-আলাস্কান অয়েল পাইপলাইন। এর কিছুটা অংশ ফেয়ারব্যাঙ্কস শহরের ওপর দিয়েও পার হয়েছে। আলাস্কার একদম উত্তরে উত্তর মহাসাগরের উপকণ্ঠে প্রুডহো-বে (Prudhoe Bay) শহর থেকে শুরু করে রাজ্যের একদম দক্ষিণে প্রশান্ত মহাসাগরের উপকূলে ভ্যালদেজ শহর পর্যন্ত বিস্তৃত এই পাইপ লাইন। প্রায় ৮০০ মাইল লম্বা। এই সুবিশাল পাইপলাইনের মাধ্যমে উত্তর মহাসাগর থেকে উৎপন্ন হওয়া খনিজ তেল (পেট্রোলিয়াম অয়েল) সোজা চলে আসে ভ্যালদেজ বন্দরে। আর সেখান থেকে জাহাজে তেল ভরে প্রশান্ত মহাসাগর পেরিয়ে চলে যায় যুক্ত রাষ্ট্রের অন্যান্য রাজ্যে।
আরও পড়ুন:

সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-৯৭: পাতি সরালি

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১১০: বনবাসী রামের নিরাসক্ত ভাবমূর্তির অন্তরালে, ভাবি রামরাজ্যের স্রষ্টা দক্ষ প্রশাসক রাম

রিচার্ডসন হাইওয়ের এই ছোট পাহাড়ের ওপর থেকে ওই পাইপলাইন বহুদূর পর্যন্ত দেখা যায়। উত্তরে একটা বিরাট উঁচু পর্বতশৃঙ্গের পাশ থেকে বেরিয়ে একটা বিশাল সরীসৃপের মতো নীচে নেমে এসেছে সেটা। তারপরে পাহাড়ের পাদদেশে বিরাট সমতল ভূমি অতিক্রম করে দক্ষিণে আবার একটা উঁচু পর্বতশৃঙ্গ ঘেঁষে ডান দিকে বেঁকে গিয়েছে। তার বিশালত্ব দেখে সত্যিই গায়ে কাঁটা দেয়। একদিকে শ্বাসরুদ্ধকর প্রাকৃতিক দৃশ্যপট, আর অন্যদিকে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির এক অনন্য নজির। ঈশ্বর, প্রকৃতি, আর মানুষের সৃষ্টির কি অভূতপূর্ব মেলবন্ধন। রিচার্ডসন হাইওয়ের পুরো রাস্তাটাই এরকম সুন্দর। পাহাড়, নদী, হ্রদ, হিমবাহ, ট্রান্স আলাস্কান পাইপলাইন—সব মিলিয়ে একটা শ্বাসরুদ্ধকর দৃশ্যপট পেরোতে না পেরোতেই আরেকটা এসে হাজির হয়।
আরও পড়ুন:

অসমের আলো অন্ধকার, পর্ব-৪৯: পান-সুপারি ছাড়া অসম্পূর্ণ অসমীয়া খাবারের থালি

পর্ব-১৪: আকাশ এখনও মেঘলা

এ ভাবে প্রায় দুশো তিরিশ মাইল মতো গাড়ি চালানোর পর আসে গাকোনা বলে একটা জায়গা। এখানে এসে রিচার্ডসন হাইওয়ে এসে মিশেছে গ্লেন হাইওয়েতে। এখান থেকে আমাদের গন্তব্যে পৌঁছতে গেলে গ্লেন হাইওয়ে ধরে যেতে হবে আরও নব্বই মাইল মতো রাস্তা। এখানে দুটো রাস্তার মিলনস্থলে একটা বড় দোকান এবং তেল নেওয়ার জায়গা রয়েছে। সবাই এখানে এসে একবার তেল ভরে নেয়। আমরা যখন সেখানে পৌঁছলাম তখন সকল প্রায় সাতটা। অবশ্য সূর্য তখন বেশ উজ্জ্বল। দেখে মনে হবে অনেক বেলা হয়ে গিয়েছে। আমরা সেখানে দাঁড়িয়ে প্রাতঃরাশ সেরে নিলাম। তারপরে আবার যাত্রা শুরু।
আরও পড়ুন:

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৬৯: সে এক স্বপ্নের ‘চাওয়া পাওয়া’

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৭৭: পৃথিবীতে এমন কেউ নেই, যাঁর জীবনের আকাশে কখনও শত্রুতার মেঘ জমেনি

এ বার চলেছি গ্লেন হাইওয়ে ধরে। সামনেই রয়েছে গ্লেন অ্যালেন শহর। সেখান থেকে রাস্তাটা দু’ভাগে ভাগ হয়ে গিয়েছে। আমরা যাবো সোজা গ্লেন হাইওয়ে ধরে। বাঁ দিকে বেঁকে গিয়েছে একটা পাথুরে রাস্তা। সেটা ধরে সোজা চলে গেলে পৌঁছে যাওয়া যায় চিটিনা জাতীয় উদ্যানে। আমার এখনও সেখানে যাওয়া হয়নি। পরে সেখানে গেলে তার সম্পর্কে লেখা যাবে। আমরা এখন চললাম শিপ পর্বতমালার উদ্দেশ্যে। —চলবে।
* রহস্য রোমাঞ্চের আলাস্কা (Mysterious Alaska) : ড. অর্ঘ্যকুসুম দাস (Arghya Kusum Das) অধ্যাপক ও গবেষক, কম্পিউটার সায়েন্স, ইউনিভার্সিটি অব আলাস্কা ফেয়ারব্যাঙ্কস।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content