কলকাতায় বৃষ্টি

ঘরচিতি। ছবি : সংগৃহীত।

কিছুদিন আগে আমার পরিচিত এক শিক্ষিকা রাতে হোয়াটসঅ্যাপে একটি ছবি পাঠিয়ে আমাকে ফোন করে জানতে চাইলেন, যে সাপের ছবিটি তিনি পাঠিয়েছেন সেটি কী সাপ। সাপটি সন্ধেবেলায় তাঁর ঘরের মধ্যে দেখা গিয়েছে। বাড়ির সবাই আতঙ্কিত। তার কিছুদিন আগে আমার প্রাক্তন ছাত্র, বর্তমানে সরকারি হাসপাতালে শিক্ষানবিশ চিকিৎসক হিসেবে কর্মরত, হোয়াটসঅ্যাপে একটি মৃত সাপের ছবি পাঠিয়ে আমার কাছে সাপটির পরিচয় জানতে চাইল। সর্পদংশিত এক রোগী হাসপাতালে এসেছে এবং বাড়ির লোক সাপটিকে মেরে এনেছে। এমন ঘটনা আরও ঘটেছে অসংখ্যবার। প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে দুটি মিল দেখেছি। প্রত্যেক ক্ষেত্রে মানুষ সাপটিকে ভয়ংকর বিষধর শিয়রচাঁদা বা কালাচ ভেবে আতঙ্কিত হয়েছে এবং সাপের ছবি দেখে কিংবা স্বচক্ষে দেখে আমাকে বলতে হয়েছে যে এটি নির্বিষ ও মানুষের জন্য সম্পূর্ণ বিপদহীন সাপ ঘরচিতি।
ঘরচিতি সাপের গায়ের রং বাদামি বা তামাটে। পেটের দিকের রং সাদা বা হলুদাভ সাদা। এদের পিঠের দিকে সাদা বা হলুদ রঙের পটি বা ব্যান্ড থাকে। পটিগুলি সমব্যাসযুক্ত নয়। কোনওটা দেহের দু’দিক পর্যন্ত বিস্তৃত, আবার কোনওটা অসম্পূর্ণ। পটিগুলি দেহের সামনের দিকে যতটা স্পষ্ট পিছনের দিকে ততটা নয়। পটিগুলি কখনও কখনও শাখাযুক্ত হয়। এদের ঘাড়ের কাছে কলারের মতো সাদা বা হলদেটে একটা ব্যান্ড বা পটি থাকে। এর আকার উল্টানো V-এর মতো।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৬৭: চন্দ্রবোড়া

শারদীয়ার গল্প/২ : কনটেন্ট

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৮৮: প্রতিপক্ষ অন্ধকার

মহালয়া

এদের মাথার পিছনের দিক ঘাড়ের থেকে অনেকটা চওড়া হলেও দেহের আকারের সাথে মানানসই, কিন্তু চ্যাপ্টা। উপরের ঠোঁট সাদা কিংবা সাদার উপরে বাদামি ছোপযুক্ত। দুটো চোখ কালো ও ছোট পুঁতির দানার মতো। এদের চোয়ালের সামনের দাঁতগুলো নেকড়ের দাঁতের মতো খুব তীক্ষ্ণ। সম্ভবত এই কারণে এদের ইংরেজি নাম হল ‘Common Wolf Snake’। বিজ্ঞানসম্মত নাম ‘Olygodon venustus’ (Lycodon capucinus)। সরু লিকলিকে ধরণের এই সাপটির দৈর্ঘ্য ৫০ থেকে ৭৫ সেন্টিমিটার। স্ত্রী ও পুরুষ উভয় ঘরচিতি সমদৈর্ঘ্যসম্পন্ন হয়।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৭৯: রাজসূয়যজ্ঞে চেদিপতি শিশুপাল ও কুরুপ্রধান ভীষ্মের কথোপকথনে সদর্থক ও নঞর্থক চিন্তার সংঘাত,মহাকাব্যে প্রতিফলিত জীবনবোধ

শারদীয়ার গল্প/১ : ষষ্ঠীর সন্ধ্যা

ঘরচিতি সাপ পশ্চিম সুন্দরবন এলাকার মানুষের কাছে কেঁথোচিতি নামে বেশি পরিচিত। কাঁথ শব্দের অর্থ হল মাটির বাড়ির দেওয়াল। মাটির বাড়ির দেওয়ালের ফাটলে বা ফাঁকফোকরে এদের বেশি দেখা যায় বলেই এমন নাম। তবে সুন্দরবন অঞ্চলে যেহেতু মিশ্র সংস্কৃতি দেখা যায় তাই সুন্দরবনের অন্যান্য অংশে এই সাপের আরও বেশ কিছু নাম প্রচলিত, যেমন ঘরবোড়া, ঘরমনি, ঘরগিন্নি, গাউনি, চিতি, চিতিবোড়া, চালবোড়া, চালচাউনি, কেঁথোবোড়া, বোড়া (পূর্ব মেদিনীপুরের উচ্চারণে ‘বড়া’), কেঠোবোড়া ইত্যাদি। সুন্দরবনের আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষ এই সাপকে ‘উচুন্তি’ সাপ বলেন।
কলকাতায় বৃষ্টি

ঘরচিতি: পিঠ বাদামি ও পেট সাদা। ছবি : সংগৃহীত।

আগেই বলেছি, এরা মাটির বাড়ির দেওয়ালের ফাটল বা ফাঁকফোকরে থাকে। তাছাড়া কাঠের অব্যবহৃত বা ভাঙা আসবাবপত্র, খাটের নিচে রাখা জিনিসপত্রের আড়ালে, লেপ কাঁথা ও কম্বলের ভিতরে, খড়ের চালে, বাড়ির চালে বাঁশের কাঠামোতে বাঁশের ভিতরে ফাঁপা অংশে, গাছের কোটরে এদের আশ্রয়স্থান। সন্ধের পর এরা শিকারের সন্ধানে বের হয় অর্থাৎ এরা নিশাচর। টিকটিকি, গিরগিটি, অঞ্জন, ব্যাঙ, ইঁদুর, আরশোলা, ফড়িং ইত্যাদি এদের প্রিয় খাবার। কখনও কখনও পাখির ডিম খায়। গ্রীষ্ম ও বর্ষাকালে ব্যাঙের পিছনে পিছনে তাড়া অনেক সময় ঘরে ঢুকে যায়। রান্নাঘর ও বাথরুমের মধ্যে আরশোলা ও টিকটিকির সন্ধানে প্রায়শই ঘুরঘুর করতে দেখা যায়। মাটির বাড়িতে অনেক সময় খড়ের চাল থেকে ঝুপ করে খসে পড়ে। তখন বাড়ির লোকজন মারাত্মক ভয় পেয়ে যায়।
আরও পড়ুন:

জন্মশতবর্ষে উত্তমকুমার : শতফুল বিকশিত হোক

শ্রদ্ধাঞ্জলি : সঙ্গীতই আমার ফার্স্ট লাভ : শচীন দেববর্মণ

ঘরচিতি সাপ নির্বিষ সাপ, তবে ভীষণ বদমেজাজি। সামান্য আঘাত পেলেই ভয়ঙ্কর রেগে যায় এবং ভীষণ ক্ষিপ্রতার সঙ্গে দংশন করে দ্রুত লুকিয়ে পড়ে। দংশন করার সময়ে যেভাবে লাফ দেয় তাতে দেখে মনে হতে পারে ভয়ংকর বিষাক্ত সাপ। নির্বিষ সাপ কামড়ালে যেমন অনেকগুলো দাঁতের দাগ পড়ে এদের ক্ষেত্রেও তেমনটা হয়। দাগগুলো অর্ধচন্দ্রাকারে বিন্যস্ত থাকে। অনেক সময় আঁচড়ের মতো দাগও হয়। তবে বেশ জোরে দংশন করে বলে রক্তপাতের সম্ভাবনা থাকে। ক্ষতস্থান ফুলেও যায়। তবে তাতে বিপদের কোনও সম্ভাবনা নেই। জীবাণুনাশক বা ঠান্ডা পানীয় জল দিয়ে ক্ষতস্থান ধুয়ে দিলেই চলে। কয়েকদিনের মধ্যে আপনা থেকেই ফোলা ও ব্যথা কমে যায়, ক্ষতস্থানও শুকিয়ে যায়।
আরও পড়ুন:

দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৯ : নয়া ভুবনের প্রজাপতি

মহালয়া

সাধারণত মার্চ-এপ্রিল মাস হল এদের প্রজননকাল। এই সময় স্ত্রী ও পুরুষ ঘরচিতি সাপ জোড় বাঁধে। তবে এদের যৌন মিলনের সময় খুবই স্বল্পস্থায়ী। যৌন মিলনের প্রায় দু’মাস পর স্ত্রী ঘরচিতি সাপ ডিম পাড়ে। সাধারণত যেসব জায়গায় গাছের পাতা ফুল ফল পড়ে জমে থাকে ও পচন শুরু হয় তার মধ্যে ডিম পাড়ে কারণ সেখানে পচনের কারণে উষ্ণতা বেশি হয়। ডিম ফোটার জন্য এই উষ্ণতা প্রয়োজন। একটা স্ত্রী ঘরচিতি একবারে গড়ে ৬-৮টি ডিম পাড়ে। ডিমগুলি সাদা, নরম ও সামান্য লম্বাটে।

সাধারণত ২.৫ সেন্টিমিটার লম্বা হয়। ভেজা আবহাওয়ায় আর্দ্রতা শুষে নিয়ে ডিমের আকার প্রস্থের দিকে সামান্য বড় হতে পারে। ডিম ফুটে বাচ্চা বেরিয়ে আসার জন্য আকারের এই বৃদ্ধি পাওয়া জরুরি। সাধারণত ৫৬ দিন পর ডিম ফুটে বাচ্চা বেরোয়। বাচ্চাদের গায়ের রং হয় হালকা বাদামি আর পিঠের ওপর পটিগুলি থাকে খুব অস্পষ্ট।
কলকাতায় বৃষ্টি

ঘরচিতির কলার পটি-সহ মাথা। ছবি : সংগৃহীত।

মানুষের উপদ্রবকারী পোকামাকড় খেয়ে ঘরচিতি সাপ মানুষের উপকার করে। কিন্তু মানুষ অজ্ঞতার কারণে বেশিরভাগ সময় এদের শিয়রচাঁদা বা কালাচ ভেবে মেরে ফেলে। উভয়ের মধ্যে প্রধান মিল হল এদের রং, সাদা পটি এবং ফণার অনুপস্থিতি। কিন্তু পার্থক্য রয়েছে যথেষ্টই। যেমন ঘরচিতির ঘাড়ের কাছে যে ‘V’ আকৃতির কলার থাকে তা কালাচের নেই। ঘরচিতির ক্ষেত্রে সাদা পটি ঘাড়ের পর থেকে শুরু হয়েছে এবং লেজের দিকে ক্রমশ অস্পষ্ট হয়ে গিয়েছে। কালাচের ক্ষেত্রে ঘাড়ের বেশ কিছুটা পর থেকে সাদা পটি শুরু হয়েছে এবং লেজ পর্যন্ত এই পটি স্পষ্ট। ঘরচিতির ক্ষেত্রে পটিগুলি অনেকটা ফাঁকা ফাঁকা এবং এককভাবে থাকে। কালাচের ক্ষেত্রে পটিগুলি ঘন ঘন ও জোড়ায় জোড়ায় থাকে। আকৃতিগত এই বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করে সহজেই কালাচ ও ঘরচিতি সাপের পৃথকীকরণ করা সম্ভব। আর তাহলে অকারণে প্রকৃতির এই সুন্দর, উপকারী ও নিরীহ প্রাণীটিকে বেঘোরে প্রাণ হারাতে হয় না।—চলবে।
* সৌম্যকান্তি জানা। সুন্দরবনের ভূমিপুত্র। নিবাস কাকদ্বীপ, দক্ষিণ ২৪ পরগনা। পেশা শিক্ষকতা। নেশা লেখালেখি ও সংস্কৃতি চর্চা। জনবিজ্ঞান আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত। বিজ্ঞান জনপ্রিয়করণের জন্য ‘দ্য সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশন অফ বেঙ্গল ২০১৬ সালে ‘আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু মেমোরিয়াল অ্যাওয়ার্ড’ এবং শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞান লেখক হিসেবে বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদ ২০১৭ সালে ‘অমলেশচন্দ্র তালুকদার স্মৃতি সম্মান’ প্রদান করে সম্মানিত করেছে।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content