রবিবার ৮ মার্চ, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি

পিতা-পুত্র।

“মেরি জিহ্বা পর হো অন্তিম বস্তু ন গঙ্গাজল, হালা/
মেরে হোঠোঁ পর হো অন্তিম বস্তু ন তুলসীদল, প্যালা/
দেঁ বে মুঝকো কন্ধা জিনকে পগ ডগ-মগ ডগ-মগ
করতে হোঁ/
অউর জলূঁ উস ঠৌর জহাঁ পর কভি রহি হো মধুশালা”।


“মৈঁ নিজ মন কে উদ্গার লিয়ে ফিরতা হুঁ,
মৈঁ নিজ উর কে উপহার লিয়ে ফিরতা হুঁ”।
—ড. হরিবংশ রায় বচ্চন।


প্রথম স্ত্রীর বিয়োগের পাঁচ বছর অতিক্রান্ত, কিন্তু শোক তখনও কাঁচা। সময় ভুলতে দেয়নি তাঁর শ্যামাকে। ভয়ঙ্কর ক্ষয়রোগ শেষ করে দিয়েছিল তাঁদের দশ বছরের বিবাহিত জীবনকে। নিজেকে উজাড় করে দেওয়া আত্মজীবনীর প্রথম খণ্ড, ‘ক্যা ভূলূঁ, ক্যা যাদ করূঁ’ তে লিখেছিলেন সেই নিঃস্ব, রিক্ত সময়ের আখ্যান— “অসফল সভি ব্যাপার মেঁ, কিতনা অকেলা আজ মৈঁ! / কিতনা অকেলা আজ মৈঁ/ খোয়া সভী বিশ্বাস হৈ,/ ভূলা সভী উল্লাস হৈ,/ কুছ খোজতী হর সাঁস হৈ, কিতনা অকেলা আজ মৈঁ!/ কিতনা অকেলা আজ মৈঁ!”

‘ধর্মযুগে’র সম্পাদক ধর্মবীর ভারতী বলেছিলেন, হিন্দিতে এমন আত্মকথন বিরল, না নিজেকে লুকানোর প্রয়াস, না ছদ্মকথন কারণ তিনি ছিলেন হরিবংশ রায় বচ্চন। সাল ১৯২৬ থেকে ১৯৩৬, এই সময়ে তিনি ক্রমশ অন্ধকারের পথযাত্রী হন। প্রথম স্ত্রীর রোগের ভয়ঙ্করতা এবং আরোগ্যের সম্ভাবনা নেই জেনে কবি নিজেকে অন্তর্মুখী করে নেন, কিন্তু নিষ্ফলা হন নি, বরং নিজের সর্বোৎকৃষ্ট কাব্যোপলব্ধির প্রকাশ ঘটান ‘নিশা নিমন্ত্রণ’ (১৯৩৮) এবং ‘একান্ত সংগীতে’র (১৯৩৯) মাধ্যমে—”কিতনি রাতোঁ কো মন মেরা,/ চাহা, করদূঁ চিখ সবেরা,/পর মৈঁনে আপনি পীড়া কো চুপচাপ অশ্রুকণোঁ মেঁ ঘোলা/ মধ্য নিশা মেঁ পঞ্ছি বোলা।”
অন্ধকার বেশি দিন স্থায়ী হয়নি, ১৯৪১ সালে গায়িকা তথা রঙ্গমঞ্চের অভিনেত্রী তেজি সূরীর সঙ্গে হরিবংশ রায় বচ্চনের এক কবিসম্মেলনে প্রথম দেখা। সেই সন্ধ্যায় কবির বেদনাময় কাব্য পাঠ শুনে তেজি সূরী শুধু বিহ্বল নন, কাতরও হয়ে ওঠেন। মিস সূরীর অবিরাম চোখের জল কবিরও কণ্ঠরোধ করেছিল সেই রাত্রিকালীন আসরে। একদম অচেনা মানুষ ক্রমশ কবির নিজের হন। দ্বিতীয়বার (১৯৪১) সব কিছুর শুরু উপলক্ষে তিনি লিখেছিলেন, ‘নীড় কা নির্মাণ ফির’। নীড় কা নির্মাণ ফির ফির, নেহ কা আহ্বান ফির ফির-এ বচ্চন নিরাকার প্রেম, সৌন্দর্যের জয় এবং নতুন জীবনের আগমন ধ্বনি শুনিয়েছেন। খুব উৎফুল্ল শব্দে তিনি নিজের মন স্থিতির চিত্রণ করেন, ” ক্রুদ্ধ নভ কে বজ্র দন্তো মে উষা হৈ মুস্করাতী/ ঘোর গর্জনময় গগনকে কণ্ঠ মে খগ পংক্তি গাতী।” স্বামী-স্ত্রী দু’জনেই জাতিভেদের বিরোধী ছিলেন তাই ছদ্মনাম ‘বচ্চন’ (বাচ্চাদের মতো) ব্যবহার করে কবির সব কৃতিগুলি প্রকাশিত হয়েছিল। ঈর্ষণীয় জনপ্রিয়তার অধিকারী তিনি হরিবংশ রায় শ্রীবাস্তব থেকে হয়ে ওঠেন হিন্দি সাহিত্যের অপরিহার্য কবি হরিবংশ রায় বচ্চন।
আরও পড়ুন:

উত্তম কথাচিত্র পর্ব-৭৩ : ‘খেলাঘর’

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-১৫ : Twoকি!

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৪২: কুইক অ্যাকশন

হ্যালো বাবু! পর্ব-১০৭: ডেসডিমোনার রুমাল/৬

শুরুতে তাঁর রচনা ছিল আত্মানুভূতি, আত্মসাক্ষাৎকার ও আত্মাভিব্যক্তির পূর্ণ প্রকাশরূপ। হিন্দি কাব্যের জগতে বচ্চনের ব্যক্তিত্ব অদ্ভুত বিশেষতা এবং মহত্ব রাখে। তিনি মানব-হৃদয়-মর্মজ্ঞ, রসসিদ্ধ গায়ক ও এমন একজন কবি ছিলেন যিনি যুগান্তরের সন্দেশ বাহক, তিনি যখন সাহিত্যচর্চায় আসেন তখন হিন্দি সাহিত্যে ছায়াবাদী, রহস্যময়, রোমান্টিক কবিতার (১৯১৮-১৯৩৬) যুগ। ছায়াবাদী ব্যক্তিচেতনা মানুষের আত্মাকে ছুঁয়ে যেত। কবি জয়শঙ্কর প্রসাদ, সূর্যকান্ত ত্রিপাঠী নিরালা, সুমিত্রানন্দন পন্ত এবং মহাদেবী বর্মা ছিলেন ছায়াবাদের চার স্তম্ভ। এই প্রস্থান বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে হিন্দি কবিতার গতিশীল বিবর্তনের সূচনা করে সামাজিক প্রগতিবাদের উত্থানের মাধ্যমে শেষ হয়েছিল। শুধু রোমান্টিক সংবেদনা নয়, সেই সংবেদনার আড়ালে দেশকে ব্রিটিশ শাসন মুক্ত করার অঙ্গীকার, জাতীয়তাবাদ ও সামাজিক সংস্কারের মতো বিষয়বস্তু আলোচিত হয়েছিল এই প্রস্থানের কাব্যিক প্রকাশে। ছায়াবাদ আধুনিক হিন্দি কবিতাকে এক গরিমাময় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য প্রদান করলেও এর গতানুগতিকতার কারণে হরিবংশ রায় বচ্চন তাঁর কর্মজীবনের শেষের দিকে ছায়াবাদের প্রতি অত্যধিক সমালোচনাপ্রবণ হয়ে ওঠেন।
কলকাতায় বৃষ্টি

কবি ও সুমিত্রানন্দন পন্ত।

হিন্দি কবিতার ইতিহাসে ছায়াবাদোত্তর কালে কাব্য সংবেদনার পরিচয় পাওয়া যায় কবিতার ভাষায়। যেখানে ছায়াবাদী কবিরা সংস্কৃতনিষ্ঠ, তৎসম, শব্দাবলীর অধিক ব্যবহার করতেন সেখানে ছায়াবাদোত্তর কালের কবিরা (১৯৩৩-৪০) তৎসম এবং ক্লিষ্ট শব্দাবলীর প্রয়োগ ত্যাগ করে সরলতম শব্দের ব্যবহার শুরু করেন। এই ব্যক্তিবাদী কবিতা ছিল সামগ্রিকতার বিচারে ছায়াবাদ অপেক্ষা বেশি সহজ, সাধারণ ও লৌকিক। সরলতম শব্দাবলী আপন করে সামান্যজনের কণ্ঠ হয়ে ওঠা কবিদের মধ্যে হরিবংশ রায় বচ্চন ছিলেন অন্যতম। ভারতীয় সাহিত্যের ইতিহাসে তাঁর মতো উচ্চকোটির কবি বিরল। ভাষার স্বরমাধুর্য, বিশেষত তাঁর ‘মধুশালা’র পদগুলির স্বরমাধুর্যের চৌম্বকীয় শক্তির দ্বারা পাঠক হৃদয়ের অন্তঃস্থলকেও তিনি নিজের প্রতি আকর্ষিত করতে পারতেন —”রাহ পকড় এক চলাচল তু পা জায়েগা মধুশালা”, “ধ্যান কিয়ে জা মন মেঁ সুমধুর-সুখকর সুন্দর সাকি কা/ মুখ সে তু অবিরত কহতা জা, মধু মদিরা-মাদক হালা”।
আরও পড়ুন:

সুন্দরবনের বারোমাস্যা, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১২৬: সুন্দরবনের পাখি: গুলিন্দা বাটান

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৪১: ঘটি চেয়ে বঁটি

বচ্চন যখন সেইসব পদগুলি গান করে শোনাতেন, তাঁর স্বরের সাম্য, শব্দ-বিন্যাস তথা সংবেদনা মিলিয়ে এমন রসায়ন সৃষ্টি হতো যে পাঠক মন সেই জাদুর বশীভূত হতো। সহজ, সরল, শুদ্ধ-সাহিত্যিক, খড়ি বোলি ভাষা ছিল তাঁর গগনচুম্বী সাফল্যের চাবিকাঠি—”তুম গা দো মেরে গান অমর হো জায়”, “মিট্টি কা তন/ মস্তী কা মন/ ক্ষণ ভর জীবন/ মেরা পরিচয়”। কবিতাগুলি লাইব্রেরী ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সীমিত ক্ষেত্র ছেড়ে বিশাল জনসমুদায়ের অন্তঃস্থল ছুঁতে পারে এমন কৃতিতে পরিণত হয়— “আহ জীবন কি মদিরা জো হমে বিবশ হোকর পিনি পড়ি হৈ, কিতনি কড়বি হৈ? কিতনি? যহ মদিরা উস মদিরা কে নশে তো উতার দেগী, জীবন কী দুখ দামিনী চেতনা কো বিস্মৃতি কে গর্ত মেঁ গিরায়গী তথা প্রবল দৈব, দুর্দমকাল, নির্মমকর্ম অউর নির্দয় নিয়তি কে ক্রুর, কঠোর, কুটিল আঘাতোঁ সে রক্ষা করেগি”। হরিবংশ রায় বচ্চনের কাব্য সংসারে কৃত্রিমতার কোনও প্রবেশ ছিল না, কাব্য যাত্রার প্রারম্ভিক স্তরে তাঁর যুবামন যেমন উল্লসিত হতো তেমনই জীবনের স্বাভাবিক গতি মেনে বিষাদ, মিলন, এবং একাকিত্বের যন্ত্রণা পাঠক মনকে ছুঁয়ে যেত—”তন কে সৌ সুখ/ সৌ সুবিধা মেঁ/ মেরা মন বনবাস লিয়ে সা”, “ভাগ্য-পটল পর বিধি নে লিখ দি/ কবি কী জটিল কহানী”।
কলকাতায় বৃষ্টি

সপরিবারে।

হিন্দি সাহিত্যের বায়রন হিসেবে পরিচিত তাঁর তিন বিখ্যাত কৃতি ‘মধুশালা'(১৯৩৫), ‘মধুকলশ’ (১৯৩৭), ‘মিলন যামিনী’ (১৯৫০) এমন সহজ, সরল ভাষায় প্রকাশিত হয়েছিল যে, হিন্দি কবিতা প্রথম বারের জন্য ব্যাপক প্রচার প্রসার লাভ করেছিল; মধুকাব্যের সুখ-দুঃখ, আশা-নিরাশা, সংঘর্ষ-ক্রান্তি তথা আস্থা, বিশ্বাস এবং শান্তিপূর্ণ কল্পনার সম্মোহন পাঠককে আশ্চর্যচকিত, শোভামুগ্ধ এবং প্রেমনিমগ্ন করেছিল। সাহিত্য ও জনজীবন কাছাকাছি এসেছিল, সঠিক পথের হদিস দিয়েছিল তাঁর কবিতা। সুখে-দুঃখে পাঠক গুনগুন করেছিল তাঁর কবিতা; শুধু তাই নয় সেইসব কবিতায় মানবসমাজ প্রতিবিম্বিত হয়েছিল হাড়মাংস সমেত, দৈহিক সৌন্দর্যের আড়ালে জীবনের কুঁড়ে কুঁড়ে খাওয়া যন্ত্রণা নিয়ে। এত কিছুর পরেও তাঁর দ্বারা সূচিত প্রস্থান হালাবাদের বিরুদ্ধে সেইসময় অভিযোগ উঠেছিল পলায়নবাদী মনোবৃত্তিকে প্রশ্রয় দেওয়ার, কিন্তু ব্চ্চন নৈতিকতার কঠোর বন্ধনের প্রতি বিরোধ করে শুধু প্রণয়ানুভূতি অথবা হালকাভাবে সমাজ দর্শানোর চেষ্টা কখনও করেননি, বরং স্বাধীনতার জন্য সংগ্রামরত এক রাষ্ট্র, সেইসময় মহাত্মা গান্ধীর পথে চলা এক রাষ্ট্র (খাদি কে ফুল); সমাজজীবনের অসহায়তা ও রাজনৈতিক জীবনের বিশ্বাসভঙ্গুর পরিবেশে থাকতে থাকতে তিনি প্রয়াগ বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্যে এমএ ক্লাসে ভর্তি হলেও অসহযোগ আন্দোলনে যোগদান করার জন্য সেইসময় পড়াশোনা ছেড়ে দেন। পরে ১৯৩৯ সালে আবার কাশী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিটিসি ডিগ্রি লাভ করেন এবং এরপর এম.এ. উপাধি লাভ করার পর ১৯৪২-৫২ সাল পর্যন্ত প্রয়াগ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে অধ্যাপনা করেন।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৩৬: এক অনন্য অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ রামচন্দ্রের অরণ্যবাস

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৮৩: ত্রিপুরা : ঊনকোটির বহু মূর্তি ধ্বংস হয়ে গিয়েছে

হরিবংশ রায় বচ্চনের জন্ম হয়েছিল ২৭ নভেম্বর ১৯০৭ সালে প্রয়াগে, উত্তরপ্রদেশের এক সাধারণ কায়স্থ পরিবারে। তাঁর পারিবারিক পদবী ছিল শ্রীবাস্তব। প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত করেছিলেন মিউনিসিপ্যাল স্কুল, কায়স্থ পাঠশালা তথা সরকারি স্কুল থেকে। সেই সাধারণ ছাত্রই কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে (১৯৫২-১৯৫৪) ডব্লিউবি ইয়েটসের উপর পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। বহু প্রশংসিত হয়েছিল সেই কাজ। ইংল্যান্ড থেকে ফিরে এসে ১৯৫৫ সালে তিনি ভারত সরকারের বিদেশ মন্ত্রণালয়ে হিন্দি বিশেষজ্ঞের পদে নিযুক্ত হন। বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক কাজকর্মের পাশাপাশি জীবনের অন্তিম সময় পর্যন্ত স্বতন্ত্র লেখক হিসেবে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। ১৯৬৮ সালে ‘দো চট্টানেঁ’ কবিতা-সংগ্রহের জন্য বচ্চন সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার পান; সফল জীবন কথা ‘ক্যা ভূলূঁ ক্যা যাদ করূঁ’, ‘নীড় কা নির্মাণ ফির’, ‘বসেরে সে দূর’, আর ‘দশদ্বার সে সোপান তক’-এর জন্য তিনি সরস্বতী সম্মান লাভ করেন। তাঁর অনন্য প্রতিভা এবং সাহিত্য সেবার জন্য তাঁকে ১৯৭৬ সালে পদ্মভূষণ সম্মান দেওয়া হয়। তাঁর প্রসিদ্ধ কৃতিগুলির মধ্যে অন্যতম হল মধুশালা, মধুবালা, মধুকলশ, নিশা নিমন্ত্রণ, একান্ত সংগীত, মিলন যামিনী, প্রণয় পত্রিকা, দো চট্টানেঁ, বচপন কে সাথ ক্ষণ ভর, খৈয়াম কী মধুশালা, মেকবেথ, জনগীতা, উমর খৈয়াম কী রুবাইয়া, ভাষা অপনি ভাব পরায়ে, প্রবাস কী ডায়রি, নেহরু: রাজনৈতিক জীবনচিত্র এবং অগ্নিপথ। এছাড়া হরিবংশ রায় বচ্চন যেমন উমর খৈয়ামের অনুবাদক হিসেবে তেমন শেক্সপিয়ার, ম্যাকবেথ ও ভগবদ্গীতার অনুবাদক হিসেবে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন।
কলকাতায় বৃষ্টি

প্রেসিডেন্ট জাকির হুসেনের সঙ্গে।

বচ্চনের কবিতার এমন মহত্ব ছিল যে, যে পাঠকবৃন্দের কবিতার প্রতি কোনও রুচি ছিল না, তাঁরাও তাঁর কবিতা পড়তে শুরু করেন ও কাব্যসংসারের নিয়মিত পাঠক হয়ে যান। নিজস্ব পড়াশোনায় তিনি শাস্ত্র অথবা খুব অধ্যবসায় সহকারে ব্যাকরণ পড়ার সুযোগ পাননি কিন্তু আম ভারতীয়ের ভাষা তিনি জানতেন। বচ্চনের ভাষা সাহিত্যিক হলেও সাধারণ কথোপকথনের অনুরূপ ছিল। ছায়াবাদী কবিতার ভাষার মতো অলঙ্কৃত, সৌন্দর্যদৃপ্ত, কল্পনাক্লিষ্ট, ধ্বনিযুক্ত নয়, সেই ভাষা সহজ, রসযুক্ত, প্রেরণাস্পর্শী, অর্থযুক্ত, ব্যথামথিত ও আনন্দগন্ধী। আর বলতেন, “ছপ চুকি মেরি কিতাবেঁ……দেশ অউর পরদেশ-দোনোঁ কে স্বরোঁ মেঁ…..।” ইংরেজি সাহিত্যের সেই বিখ্যাত অধ্যাপকের কাব্যে যেমন উমর খৈয়ামের কল্পনাশীলতা, প্রেমানুভূতির দর্শন হয়, তেমন উর্দু কবি মীরের প্রভাবও পরিলক্ষিত হয়। ব্যক্তিগত অনুভূতির ভাণ্ডার পূর্ণ ছিল কবির, তাই অপ্রতিম জীবনবোধ প্রতিফলিত হয়েছে তাঁর কাব্যের ছত্রে ছত্রে—”মৈঁ জগজীবন কা ভার…তার লিয়ে ফিরতা হুঁ।” যিনি কখনও মদিরা ছুঁয়ে দেখেননি তাঁর প্রবর্তিত হালাবাদ ও মধুশালা কাব্যপ্রেমীদের কাছে খুব জনপ্রিয় হয়—হৈ পড়া তুঝে বননা জ্ঞানী/ হৈ পড়া তুঝে বননা প্যালা/ হো মদিরা কা অভিমানী/ সংঘর্ষ যহাঁ কিতনা কিসসে/ যহ তো সব খেল তমাশা হৈ/ যহ দেখ, যবনিকা গিরতী হৈ/ সমঝা, কুছ আপনী নাদানী,” ছোটে সে জীবন মেঁ কিতনা প্যার করূঁ, পী লূঁ হালা/ আনে কে হী সাথ জগত মেঁ কহলায়া জানেবালা/ স্বাগত কে হী সাথ বিদা কী হোতী দেখী তৈয়ারী/ বন্ধ লগি হোনে খুলতে হি মেরি জীবন-মধুশালা”।
আরও পড়ুন:

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-৯: শো-কেস শহর, উপসাগরীয় শিস এবং গোরার দিনরাত্রি

রহস্য রোমাঞ্চের আলাস্কা, পর্ব-৬৫: একদিকে জল, অন্যদিকে পাহাড় সিউয়ার্ডের রাস্তা যেন স্বর্গদ্বার!

হালার অর্থ যদিও মদ, মদিরা, সুরা, মধু, সোম; কিন্তু হরিবংশ তাঁর কবিতায় একে প্রিয়তম, গঙ্গাজল, হিমজল, সুখের অভিরাম স্থল, জীবনের কঠোর সত্য, ক্ষণভঙ্গুরতা ইত্যাদি প্রতীক রূপে প্রয়োগ করেছিলেন, রচনা করতে চেয়েছিলেন এক ধর্মনিরপেক্ষ ও জীবনেসাপেক্ষ দৃষ্টিকোণ যা অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়েছিল। তৎকালীন সমাজের যথার্থ অভিব্যক্তি যদি কোথাও হয়ে থাকে তাহলে সেটা অবশ্যই হয়েছে বচ্চনের কাব্যে। হালাবাদী কাব্য ইরানী সাহিত্যের দ্বারা প্রভাবিত ছিল, প্রভাব এসেছিল অনূদিত সাহিত্যের মাধ্যমে। ১৯৩২ সালে ‘পায়োনিয়র’ পত্রিকার সংবাদদাতা হিসেবে হরিবংশ রায় বচ্চন নিজের কর্মজীবন শুরু করেছিলেন, সেখানে থাকাকালীন কবিতা রচনার প্রতি তাঁর আগ্রহ জন্মায়। তাঁর প্রথম রচনা ছিল ‘তেরা হার’ (১৯৩২)। সারাজীবন কাব্যসংসারের সেবী তিনি ২০০৩ সালে ১৮ জানুয়ারি মুম্বাইতে তাঁর মৃত্যুর পূর্বে স্ত্রীকে বলেছিলেন, “ইস পার প্রিয় মধু হৈ, তুম হো, উস পার ন জানে ক্যা হোগা!/ যহ চাঁদ উদিত হোকর নভ মেঁ কুছ তাপ মিটাতা জীবন কা,/ …উস পার মুঝে বহলানে কা উপচার ন জানে ক্যা হোগা!/ ইস পার প্রিয় মধু হৈ, তুম হো, উস পার ন জানে ক্যা হোগা!” ছায়াবাদী যুগের বিখ্যাত কবি এবং বচ্চনের বন্ধুবর সুমিত্রানন্দন পন্ত বলতেন, “মধুশালা কি মাদকতা অক্ষয় হৈ”।
অক্ষয় থেকেছে তাঁর রচিত গানও—”রঙ্গ বরসে ভীঁগে চুনর বালি রঙ্গ বরসে”, “কোই গাতা মৈঁ সো জাতা” ইত্যাদি। হিন্দি সাহিত্যের খ্যাতনামা ঔপন্যাসিক হাজারী প্রসাদ দ্বিবেদী হালাবাদী কাব্যকে “মস্তি, উমঙ্গ অউর উল্লাস কী কবিতা” বলেছেন।
কলকাতায় বৃষ্টি

আম জনতার বোধগম্য সহজ, সরল ভাষার ব্যবহারই ছিল তাঁর সাফল্যের ইউইসপি।

বচ্চনের যুগ ছিল সন্দেহের। রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই সময় ছিল নতুন সক্রিয়তার কাল আর সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি ছিল শোধনের। সামাজিক ক্রান্তির উত্তোলনের কারণে উনি পেয়েছিলেন পচা-গলা নৈতিকতাকে প্রশ্ন করার, চিন্তার প্রবাহকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রেরণা। সামাজিক আড়ম্বরতার বিরোধ করেছেন চিরকাল, জীবনের সমস্ত নিরসতাকে স্বীকার করলেও তার থেকে কখনও মুখ ঘুরিয়ে নেননি বরং নিজের কাব্যসাধনার মাধ্যমে প্রয়াস করেছেন নিরাসতাকে সরসতা প্রদানে। হিন্দি সাহিত্যের প্রমুখ কবি, গীতিকার তিনি ভারতীয় সাহিত্য জগতকে দিয়েছেন ‘মধুকলশে’র মতো অদ্ভুত রচনা। কবি নিজে হালাবাদের সমর্থক হলেও সমকালীন কবি, সাহিত্যিকদের সঙ্গে সুসম্পর্কে ছিলেন। তৎকালীন সাহিত্যধারায় ছায়াবাদের অন্যতম স্তম্ভ এবং হিন্দি সাহিত্যের উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থ হিসেবে খ্যাত কবি সুমিত্রানন্দন পন্তের সঙ্গে হরিবংশ রায় বচ্চনের গভীর বন্ধুত্ব ছিল। বিভিন্ন সাহিত্যসভা উপলক্ষে কবির এলাহাবাদের বাড়িতে সুমিত্রানন্দনের যাতায়াত লেগেই থাকতো। সেইসব সাহিত্যসভায় কবির বালক পুত্রেরও অবাধ প্রবেশাধিকার ছিল। সকলের আদরের মুন্নার নাম কবি ‘ইনকিলাব’ রাখবেন বলে স্থির করেছেন জানতে পেরে সুমিত্রানন্দন পন্ত তৎক্ষণাৎ সেই নাম পরিবর্তন করে রেখেছিলেন ‘অমিতাভ’! সেই পুত্র পরবর্তীতে সুবিশাল খ্যাতি ও জনপ্রিয়তার অধিকারী হলেও তাঁর কবি পিতার ঔজ্জ্বল্য কখনও কমেনি।

কৃতজ্ঞতা স্বীকার:
ড. রিঙ্কু ঘোষ
ড. সন্ধ্যাকুমারী সিংহ
ড. তনুজা চৌধরী
ড. রশ্মি কুমার
ড. কৃষ্ণা চট্টোপাধ্যায়
ড. জ্যোতি মিশ্র
ড. বসুধা গাডগিল
ড. ধীরেন্দ্র শুক্ল

* ড. বিদিশা মিশ্র বিগত ষোলো বছর ধরে সরকারি কলেজে, বর্তমানে কলকাতার লেডি ব্রেবোর্ন কলেজে অধ্যাপনার সঙ্গে যুক্ত। তাঁর বিষয়— সংস্কৃত ভাষা ও সাহিত্য। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃতী ছাত্রী বিদিশা স্নাতক ও স্নাতকোত্তর উভয় পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে তৃতীয় হন। তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল —বাঙালি নৈয়ায়িক চিরঞ্জীব ভট্টাচার্যের গ্রন্থ ‘কাব্যবিলাস’। তাঁর এই গবেষণা ২০২১ সালে কর্ণাটকের আইএনএসসি পাবলিশিং হাউস থেকে ‘দ্য কাব্যবিলাস অফ চিরঞ্জীব ভট্টাচার্য — এ ক্রিটিক্যাল স্টাডি’ শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছে। দেশের বিভিন্ন প্রদেশের পত্রিকায় তাঁর শোধপত্রগুলি প্রকাশিত হয়েছে। বর্তমানে তাঁর তত্ত্বাবধানে একাধিক স্কলার গবেষণার কাজ শেষ করেছেন। বিভিন্ন সরকারি কাজকর্ম ও অধ্যাপনার পাশাপাশি তিনি গুরুজি বিপ্লব মুখোপাধ্যায়ের কাছে হিন্দুস্থানি ক্লাসিক্যাল শিক্ষারতা। ভ্রমণপিপাসু বিদিশা দেশ-বিদেশের বিভিন্ন স্থান ঘুরেছেন, সেইসব অভিজ্ঞতা তাঁকে সমৃদ্ধ করেছে বলে তিনি মনে করেন।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content