শনিবার ৭ মার্চ, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি

খেলাঘর। ছবি: সংগৃহীত।

একঝলকে

● সিনেমা : খেলাঘর
● প্রেক্ষাগৃহ : রূপবাণী, অরুণা ও ভারতী
● পরিচালনা : অজয় কর
● ছবির নায়িকা : মালা সিনহা
● অভিনীত চরিত্রের নাম : গৌতম
● মুক্তির তারিখ : ০৪. ০৯. ১৯৫৯

মূল ধারার বাণিজ্যিক ছবির মুকুটে আরও একটি পালক উত্তমকুমারের। আসলে সে সময় উত্তম কুমার যেটাতে হাত দিয়েছেন সেটাতেই সোনা ফলেছে। এবার আবার অজয় করের পরিচালনা। যাঁর পরিচালনায় একের পর এক সুপার ডুপার হিট। ‘হারানো সুর’-র মাদকতা খানিকটা না মেলাতে মেলাতেই আবার শুরু হয়েছে ‘সপ্তপদী’-র মতো ব্লকবাস্টার ছবি। সেই পরিস্থিতিতে একটি মিষ্টি মধুর ছবির চিন্তাভাবনা অজয়বাবু উপস্থাপন করলেন।

এ ছবির বড় সম্পদ প্রত্যেকটা ইউনিটে বাঘা বাঘা মানুষের অংশগ্রহণ। চিত্রনাট্য এবং কাহিনিতে সলিল সেনগুপ্ত, সম্পাদনায় অর্ধেন্দু চট্টোপাধ্যায়, শিল্পনির্দেশনায় সত্যজিৎ রায় খ্যাত বংশী চন্দ্রগুপ্ত, শব্দ গ্রহণে দেবেশ ঘোষ, রূপসজ্জায় মদন পাঠক। সংগীত পরিচালনার দায়িত্বে অবধারিতভাবে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। আর পরিচালনার সঙ্গে সঙ্গে যিনি ক্যামেরার পিছনে দাঁড়াতে ভুলতেন না সেই সর্বজনশ্রদ্ধেয় অজয় কর।
‘খেলাঘর’ ছবির প্রধান শর্ত ছিল মানুষের জৈবিক তাড়নাকে গৌণ করে মননের সমুদ্রমন্থনে অমৃত খুঁজে পাওয়া। আসলে সেসময়ে উত্তম কুমার ছাড়াও অন্যান্য ছবিতে যে প্রেম দেখানো হতো সেখানে শরীরের কলকব্জা খুব বেশি থাকতো না। মা-বাবা পরষ্পরকে কতটা ভালোবাসেন সেটা একটা গবেষণার বিষয় ছিল। ওঁদের প্রেমটা মাইক্রোস্কোপিক নকশার মতো। শরীর নেই। কেবল কিছু নম্র ছুঁয়ে যাওয়া। ওটুকুই সবটুকু। উত্তম কুমার দায়িত্ব নিয়ে শিখিয়েছিলেন প্রেম হল আশ্রয়।

প্রেম হলে মাথার ভিতরেও চার দেওয়াল আর ছাদ তৈরি হয়। তাই উত্তম কুমারের প্রেমে ঠোঁটের চাইতেও চোখকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। কারণ ওঁরা তখন ছিলেন জাত রোমান্টিক। তাকানো তো একটা মস্ত বড় শিল্প। আজকের প্রজন্ম অবধি যারা, তাঁদের বিনিময়কে ছোট থেকে দেখেছে আলোর মতো একেকটা জেশ্চারে। সেক্স নয়, বরং সেক্সের বহু বহু আগে যে ছেলেটা রোজ সকালে রাধাচূড়ার নীচে ঠায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করত প্রেমিকার জন্য, কেবল ওই অপেক্ষাটুকু নিয়েই পাতার পর পাতা ভরিয়েছেন তাঁরা। কবির ভাষায়, “ক্ষণকালের আভাস হতে চিরকালের তরে এসো…”।
আরও পড়ুন:

উত্তম কথাচিত্র,পর্ব-৭২ : গলি থেকে রাজপথ

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-৭: কেমন আছেন সুনীতি, নদীর নরম ছেড়ে সমুদ্রের নুনে!

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৩৮: পার্ক স্ট্রিট থেকে মহর্ষি ফিরে এসেছিলেন জোড়াসাঁকোয়

হ্যালো বাবু! পর্ব-১০৭: ডেসডিমোনার রুমাল/৬

উত্তমবাবু জাপটে ধরেছেন এ প্রার্থনাকে। নায়কের জবানীতে তিনি গান করছেন “নীড় ছোট ক্ষতি নেই,আকাশ তো বড়…”। এভাবেই প্রেম বা সম্পর্কের একটা কাঠামো তৈরি হয়। আগ্রাসন নয়, একটা পেলব মায়াবী নম্রতাকে যুগ যুগ ধরে ভালোবাসতে শেখা। তাঁর হাত ধরেই আটপৌরে মানুষ সোজা সাপ্টা কাছে-আসা উদযাপন করেছে। কিন্তু এর মানে কি আমাদের সাবেকি প্রেমবোধে শরীর ছিল না? আলবাত ছিল। আমাদের উঠোনের কোণে একটা শিউলি গাছ যেভাবে থাকত, ঠিক সেভাবেই আছে। ভোরবেলায় মাটি জুড়ে ছড়িয়ে থাকত শিউলি ফুল। গোটা ঘটনাকে আমরা প্রকৃতি বলি। শরীরবোধটাও ঠিক সেরকম। শরীরের সবটুকু নিংড়ে একটা শরৎকাল বানাই আমরা। ওটার নাম দিই আদর। আমাদের প্রিয় গান “মধুর তোমার শেষ যে না পাই…”।
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৪১: কারুর কেউ নই-কো আমি…

সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১২৫: সুন্দরবনের পাখি: বিলের বালুবাটান

“খেলাঘর” ছবিতে প্রেমের প্রতিভূ হিসাবে যা হেড লাইন। উত্তমকুমার সেসময়ের ছবিতে কোনোদিন নায়িকাকে চুমু খাননি, চটজলদি বিছানায় যাননি। সেলুলয়েডি মস্তানি দিয়ে তিনি ভাবতে বাধ্য করেছেন ওগুলো সব পরের কথা, আগে আলোর মতো এসে দাঁড়াতে হয়, তারপর গাইতে হয়, ” নীড় ছোট ক্ষতি নেই,আকাশ তো বড়..”। কত লোক কেবল সেরকম ব্যথা পেলো না বলে শিল্পী হতে পারল না। কত মানুষ প্রেমিক হতে পারল না অযথা তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে। জ্ঞান হওয়ার পরেই যেন আমরা বুঝে যাই ভালোবাসলে একসঙ্গে থাকাটাই নিয়ম, মা-বাবা যেমনটা থাকে। একসঙ্গে থাকাটাকে সংসার বলে। সংসারে প্রচুর জাঁতাকল থাকলেও দিনের শেষে ভোরের অপেক্ষা থাকে।

আসলে সিনেমার কাহিনিতে যে অংশের বার্তা মানুষের মনোগ্রাহী হয়, খুব কম নায়ক -নায়িকাই সেটাকে হৃদয়ঙ্গম করে দর্শক-মননে রোপন করতে পারেন। ‘খেলাঘর’ সিনেমা ছিল সে সময়ের দুটো প্রজন্মের সেতুবন্ধন।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৩৬: এক অনন্য অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ রামচন্দ্রের অরণ্যবাস

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৮২: ত্রিপুরা : উত্তর-পূর্ব ভারতের অন্যতম প্রত্নভূমি ঊনকোটি

এক প্রজন্মের মানুষ সবে অসহায় হতে শুরু করেছে। রাষ্ট্রযন্ত্রের দাপটে প্রেম আর দাম্পত্যের মাঝে আইন ঢোকানো হয়েছে৷ মানুষ শিখছে বৈধ আর অবৈধ বলে দুটো বিষয় আছে। এত উন্নত আর আধুনিক হয়েও মানুষ বুঝল না যে ভালোবাসা নিজেই একটি আইন। যে আইনে অবৈধ বলে কিছু নেই। আমাদের ছোট ঘর, ছোট উঠোন, আমাদের বাড়ির সেই মেয়ে বিড়াল, শিউলি গাছ, গীতবিতান, আমাদের সাদা কালো ছবির রঙিন চাহনি,দু হাত বাড়ানো আদরের পেলবতা, সারাজীবন বিয়ে না করে একলা থেকে যাওয়া কল্যাণী মাসি, আমাদের ডায়েরি, কবিতা, ঘুলঘুলি, রোদ, মাটি, নদী,অঘ্রাণর ক্ষেত…সবকিছু দূরে সরে যেতে লাগল।

কেউ কখনও একটুও শেখাতে চাইলেন না প্রণয় মৃত্যুর চেয়েও গোপন একটি রহস্য। আমরা জানতেই পারলাম না ভালোবাসলে সবদিকেই সুর্যোদয় হয়, ওসব পূর্ব-পশ্চিম সব বাজে কথা! ছবির কারিগররা কুশীলবের মাধ্যমে এই দুটি প্রজন্মের সত্তাকেই যেন অলিখিতভাবে মেলানোর চেষ্টা করেছিলেন।
আরও পড়ুন:

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-১৪ : প্রতিদ্বন্দ্বী-গণশত্রু: অন্তর্লোকের অ্যানাটমি

রহস্য রোমাঞ্চের আলাস্কা, পর্ব-৬৫: একদিকে জল, অন্যদিকে পাহাড় সিউয়ার্ডের রাস্তা যেন স্বর্গদ্বার!

এরপর আসে ছবির প্লেয়ার কাস্টিং। ছবি বিশ্বাস এবং অসিত বরণের পারস্পরিক দ্বৈরথ, মনে করিয়ে দিয়েছিল তাঁরা ছাড়া উত্তম কুমারের মহানায়ক নির্মাণ অসম্পূর্ণ। অন্যদিকে সবিতাবব্রত দত্তের মত অভিনেতা সুশীল দত্তের সঙ্গে যে নৈকট্য তৈরি করেছিলেন তা, যে কোন দেশের একটি সারস্বত সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হবে।

ছবির গান নিয়ে হেমন্ত মুখার্জীর অবিস্মরণীয় চেষ্টা বিশেষত বোম্বে ঘরানাকে প্রাধান্য দিয়ে হেমন্ত বাবুর যে এগিয়ে থাকা প্রতি ছবিতে বাধ্যতামূলকভাবে থাকতো এ ছবিও তার ব্যতিক্রম ছিল না।

সবদিক জরিপ করে বলা যায়, একটি সময়ের পূর্ণাঙ্গ দলিল এ ছবির পরতে পরতে জড়িয়ে আছে এবং উত্তম কুমারের মতো ক্ষণজন্মা অভিনেতা, নায়িকা মালা সিনহাকে কখনোই বুঝতে দেননি যে, ক্যামেরার সামনে ছবি তোলানো তাঁর পক্ষে বোধগম্য হওয়া কতটা কঠিন।—চলবে।

* উত্তম কথাচিত্র (Uttam Kumar–Mahanayak–Actor) : ড. সুশান্তকুমার বাগ (Sushanta Kumar Bag), অধ্যাপক, সংস্কৃত বিভাগ, মহারানি কাশীশ্বরী কলেজ, কলকাতা।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content