
ছবি: প্রতীকী।
“অহো! অকারণং বৈরম্ আসাদিতং মযা, কিমিদং ব্যাহৃতম্—হায় হায়! এ আমি কী বলে ফেললাম! অকারণে পেঁচাটিকে আমার শত্রু বানিয়ে ফেললাম। আমার কথার জন্যই ও আর রাজাসনে বসতে পারলো না।”
কাকের বুকের ভিতরটা তখন অনুতাপে ভরে উঠল। সে ভাবতে লাগল—“রাজনীতি শাস্ত্রেই তো বলা আছে—যে মানুষ অকারণে নিজের দেশ, কাল, কিংবা সময়ের বিরোধিতা করে, অথবা অযথা নিজের লঘুতা প্রকাশ করে ভবিষ্যতে দুঃখদায়ক কটু কথা বলে ফেলে—তার সে কথা তখন আর কথা থাকে না, বরং বিষের মতো প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে। বুদ্ধিমানরা যত শক্তিশালীই হোক না কেন, কাউকে অকারণে শত্রু বানায় না। যেমন, ঘরে চিকিৎসক আছে—এই ভরসায় তো কেউ ইচ্ছে করে বিষ খায় না! বুদ্ধিমান লোকও তেমনি অকারণে সর্বনাশ ডেকে আনে না—ভিষক্ মমাস্তি বিচিন্ত্য ভক্ষযেৎ অকারণাৎ কো হি বিচক্ষণো বিষম্?”
কাক আরও ভাবতে লাগল—“কখনওই সভার মাঝে, প্রকাশ্যে কাউকে নিন্দা করা উচিত নয়। এমনকি সত্য কথাও বলা উচিত নয় যদি সেই সত্য ভবিষ্যতে কষ্ট আর অশান্তির কারণ হয়। আসল বুদ্ধিমান সে-ই, যে বিশ্বস্ত বন্ধুদের সঙ্গে পরামর্শ করে, বারবার চিন্তা করে, সতর্কভাবে পদক্ষেপ নেয়। সেই মানুষই শেষ পর্যন্ত সম্মান, কীর্তি আর ঐশ্বর্য পায়।”
এইসব চিন্তা করতে করতে ভগ্নহৃদয়ে মাথা নিচু করে সেই কাকটিও সেখান থেকে চুপিচুপি উড়ে চলে গেল।
১ম কাহিনি সমাপ্ত
মেঘবর্ণ চিন্তিত হয়ে জিজ্ঞেস করল,“হে তাত, এই অবস্থায় তাহলে এখন আমাদের করণীয় কী?”
স্থিরজীবী বললেন —“বৎস, রাজনীতিতে কেবলমাত্র ‘ষাড্গুণ্য’ অর্থাৎ সন্ধি, বিগ্রহ, যাত্রা, আসন, দ্বিধীভাব আর আশ্রয়—এই ছয়টি নীতি দিয়েই সবসময় জয় পাওয়া যায় না। এর বাইরেও আরও এক মহাশক্তি আছে—তা হল ছলনা।
আমার মতে এই মুহূর্তে আমাদের সেই পথেই হাঁটা উচিত। ছলনার আশ্রয় নিয়ে শত্রুর কাছে যেতে হবে, ওকে প্রতারিত করে শেষ করতে হবে। এই পরিস্থিতিতে ষাড্গুণ্যের থেকে ছলনাই অনেক কার্যকরী হবে।”
এরপর তিনি এক শ্লোক আবৃত্তি করলেন—
“বহুবুদ্ধিসমাযুক্তাঃ সুবিজ্ঞাতা বলোত্কটান্।
শক্তা বঞ্চযিতুং ধূর্তা ব্রাহ্মণং ছাগলাদিবঃ।।” —(কাকোলূকীযম্ ১১৬)
তার ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বললেন—
“অর্থাৎ, যেসব মানুষ নানা বুদ্ধি আর কৌশলে পটু, সাম-দান-ভেদ-দণ্ডের নীতি ভালোভাবে বোঝে, তারা ছলনার জোরে প্রবল শক্তিশালী মানুষকেও ধোঁকা দিতে পারে। যেমন ধূর্ত কয়েকজন মিলে একদিন নিরীহ এক ব্রাহ্মণকে ঠকিয়েছিল!”
মেঘবর্ণ আগ্রহভরে সামনে ঝুঁকে বলল—“কথমেতৎ? ঘটনাটা আসলে কেমন?”

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৮৭: শুধু মুখে ধর্মের বুলি আওড়ালেই কেউ ধার্মিক হয়ে যায় না

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১২৮: রাখে হরি, মারে কে?

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১২৯: চেন টেনে উমাচরণের জেল হয়েছিল

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১১৩: শকুন
০৪: ধূর্ত, ব্রাহ্মণ আর ছাগলের গল্প
কোনও এক নগরে মিত্রশর্মা নামে এক ব্রাহ্মণ বাস করতেন। তিনি ছিলেন সাগ্নিক অগ্নিহোত্রী, অর্থাৎ যিনি বেদপ্রদত্ত নিয়ম মেনে প্রতিদিন গার্হপত্য অগ্নিতে হোম বা আহুতি দেন। সহজভাবে বলতে গেলে, অগ্নিহোত্র ছিল এক প্রাচীন বৈদিক আচার—যেখানে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তে পবিত্র অগ্নিতে ঘৃত বা আহুতি নিবেদন করা হতো। বিশ্বাস ছিল, এর মাধ্যমে গৃহস্থের সংসারকল্যাণ, প্রকৃতির ভারসাম্য এবং দেবশক্তির আশীর্বাদ অর্জিত হয়।
মিত্রশর্মা তাঁর স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে প্রতিদিন গৃহের গার্হপত্য অগ্নিতে অগ্নিহোত্র পালন করতেন, যেমন সাধারণ মানুষ প্রতিদিন ঘরে প্রদীপ জ্বালায় বা প্রার্থনা করে, সেই রকম। এটি ছিল তাঁদের প্রতিদিনের ধর্মীয় কর্তব্য এবং সামাজিকভাবে মর্যাদার প্রতীক। দিন কাটছিল এমনভাবেই।
একবার একদিন—মাঘ মাসের কনকনে শীতের ভোরে, যখন হালকা বাতাস বইছে আর ঝিরঝির করে বৃষ্টিও পড়ছে—মিত্রশর্মা গৃহকার্যের পর গ্রামান্তরে যাত্রা করলেন। উদ্দেশ্য, আসন্ন যজ্ঞের জন্য যজমানের কাছ থেকে পশুদানের আবেদন করা। গ্রামান্তরে এক যজমানের বাড়িতে গিয়ে মিত্রশর্মা বললেন, “ওহে যজমান! আগামী অমাবস্যায় একটি যজ্ঞ করব স্থির করেছি। তাই আমাকে একটি পশুদিন—তত্ দেহি মে পশুম্ একম্।”

আকাশ এখনও মেঘলা/পর্ব-৩১

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৭০: ত্রিপুরায় বারবার দেশের ইংরেজ শাসন বিরোধী মানসিকতার প্রতিফলন ঘটেছে
ফেরার রাস্তায় হঠাৎ মিত্রশর্মার দিকে চোখ পড়ল তিনজন অচেনা মানুষের—তিনজনেই অতি ধূর্ত, ঠকবাজ। তাদের অবস্থা ছিল অত্যন্ত করুণ—চোখ দেবে গেছে, গাল বসে গেছে, বহুদিন যেন কোনও ভালো খাবার তাদের পেটে যায়নি। ক্ষুধার যন্ত্রণা শরীরকে নিস্তেজ করে দিয়েছে, গলাও কাঁপছে দুর্বলতায়।
ঠিক সেই মুহূর্তে তারা দেখতে পেল মিত্রশর্মাকে। দেখল একজন ব্রাহ্মণ, কাঁধে তুলে নিয়ে চলেছে একেবারে মোটা-তাজা, চকচকে লোমওয়ালা এক ছাগল!
একে মাঘ মাসের কামড়ানো শীত, তার সঙ্গে ধারালো হাওয়া আর অবিরাম ঝিরঝিরে বৃষ্টি—এমন সময় ছাগলটাকে দেখে তাদের মুখে জল চলে এল। তারা একে অপরের দিকে তাকাল, আর সেই দৃষ্টিতে স্পষ্ট হয়ে উঠল না-বলা এক সিদ্ধান্ত—আজ এই ছাগলটা তাদের চাই-ই চাই।

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১২৬: চিত্রকূটে রামচন্দ্রের প্রতি তপস্বীদের অনাস্থাপ্রকাশ এবং অত্রিপত্নী অনসূয়ার উপদেশের কোনও প্রাসঙ্গিকতা আছে?

রহস্য রোমাঞ্চের আলাস্কা, পর্ব-৬৩: অগত্যা আমার গাড়িতে বন্ধুদের নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম আলাস্কা ভ্রমণে
শাস্ত্রে বলে—কুকুর কিংবা কুক্কুট বা মুরগীকে স্পর্শ করা চণ্ডাল বা ডোমের মতো নীচ ব্যক্তিকে স্পর্শ করার সমান। সেই রকম গাধা আর উটকে স্পর্শ করাটাও নিতান্ত অপবিত্র বলে শাস্ত্রে বলা হয়েছে। তাই এগুলো স্পর্শ করা উচিত নয়। অথচ আপনি একজন অগ্নিহোত্রী হয়ে অপবিত্র এই কুকুরটিকে কাঁধে করে নিয়ে চলেছেন।
তিন ধূর্তের পরিকল্পনা মতোই, প্রথম জন একটু সাজগোজ পাল্টে পাশের গলি দিয়ে এগিয়ে এলো। আচমকা সামনে এসে দাঁড়াল ব্রাহ্মণ মিত্রশর্মার। মুখে আশ্চর্যরকম গম্ভীর ভঙ্গি, আর কণ্ঠে ভর করে তিরস্কারের সুর—
—“এই যে, ওহে ও মূর্খ অগ্নিহোত্রি! আপনি কী আশ্চর্য রকম কাণ্ড করছেন বলুন তো? এভাবে লোকজনের সামনে হাস্যকর কাজ ঘটাচ্ছেন কেন—কিম্ এবং জনবিরুদ্ধং হাস্যকার্যম্ অনুষ্ঠীযতে? দেখতেছেন না, আপনি তো কাঁধে একেবারেই নোংরা একটা কুকুর নিয়ে ঘুরছেন! —যদেষঃ সারমেযোঽপবিত্রঃ স্কন্ধারূঢো নীযতে?”

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-৯ : মণিহারা: করিডর, সেজবাতি আর…

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-১১০: মা সারদার মানবীলীলার অবসান
লোকটার মুখভঙ্গি আর চোখ-মুখে এমন স্পষ্ট ঘৃণা ফুটে উঠেছিল যে ব্রাহ্মণ মিত্রশর্মা মুহূর্তেই কিছুটা দোদুল্যমান হয়ে গেলেন। মনে হল, সত্যিই কি এরা ভুল দেখছে না তো? তবু তিনি কাঁধের ছাগলটাকে আরও শক্ত করে আঁকড়ে ধরলেন। তারপর বিরক্তি আর রাগ একসঙ্গে মিশে গলা উঁচু করে চেঁচিয়ে উঠলেন— “অহো! কিমন্ধো ভবান্, যত্ পশুং সারমেযং প্রতিপাদযসি?—ওহে ভাই! আপনি কি অন্ধ? এই পশুকে দেখে আপনার কুকুর মনে হচ্ছে।”
ধূর্ত লোকটি যেন ঠিক এই উত্তরটাই প্রত্যাশা করেছিল। সে আর ঝগড়ায় না জড়িয়ে, বড় ভদ্রতার সুরে হেসে হাতজোড় করে বলল — “আহা, রাগ করবেন না মশাই। থাক, থাক, আপনি যেদিকে যাচ্ছিলেন যান—আমিও চলি।”
এমনি সহজ ভঙ্গিতে কথাগুলো বলে সে পাশ কাটিয়ে হেঁটে চলে গেল।
অন্যদিকে মিত্রশর্মা ভাবলেন—‘লোকটা তো ভারি অদ্ভুত! কেউ ছাগলকে দেখে কুকুর ভাবে হয় নাকি?’ মাথা একটু নাড়লেন, ভ্রু কুঁচকালেন, তারপর নিজের বিশ্বাস বজায় রাখতে কাঁধের ছাগলটিকে আঁকড়ে ধরলেন। বুকের ভেতরে রাগ জমে থাকলেও তিনি আবার হাঁটা শুরু করলেন, বাড়ির পথেই। —চলবে।


















