বৃহস্পতিবার ১৮ জুন, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি

দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর।

তাঁর ছিল একটা পোষা ঘোড়া। যত্নে পালিত সেই ঘোড়া নিয়ে মঞ্চে অবতরণ, নাট্যাভিনায়ে অংশগ্রহণ, বিস্ময়কর হলেও এসব ষোলআনা সত্যি। কতই বা তাঁর বয়স, বালকের সারল্য চোখে মুখে। সেই সারল্য ম্লান হয়ে যেতো দস্যুর কাঠিন্যে। তিনি সেজেছিলেন ‘দস্যুবালক’। দস্যু সেজে মঞ্চে যার অবতরণ, অভিনয়ের সূচনাকালে প্রশস্তি ও প্রশংসালাভ, তিনি আর কেউ নন,দিনেন্দ্রনাথ। রবীন্দ্রনাথের পৌত্র তিনি। দ্বিপেন্দ্রনাথ ও সুশীলার একমাত্র পুত্র। অকালে মারা গিয়েছিলেন সুশীলা। দিনেন্দ্রনাথের তখন বছর ন’য়েক বয়েস। তিনি ভালো গান গাইতেন, ভালো অভিনয় করতেন। সেকালে পুরুষরা নারীর ভূমিকায় অভিনয় করতেন। দিনেন্দ্র-মাতাও করেছেন পুরুষের ভূমিকায় অভিনয়। ইন্দিরা দেবীর লেখা থেকে জানা যায়, ঠাকুরবাড়িতে সুপ্রভার বিবাহ-উপলক্ষে ‘বিবাহ উৎসব’ নামে একটি নাটক অভিনীত হয়। সে নাটকে পুরুষবেশী সুশীলা নায়িকার দিকে মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে গান ধরেছিলেন,’ওই জানালার পাশে বসে আছে করতলে রাখি মাথা…।’
গান ও অভিনয়ের ‌ক্ষমতা দিনেন্দ্রনাথ তাঁর মায়ের থেকে পেয়েছিলেন। শিশুকালেই তাঁর সংগীত-প্রতিভার বিচ্ছুরণ। অল্প বয়সে তিনি গাইতেন দ্বিজেন্দ্রলালের হাসির গান। পরে রবীন্দ্রনাথের গানের চর্চাতেই নিজেকে নিবেদন করেছিলেন। রবীন্দ্রগান কণ্ঠে ধারণ ও সুর সংরক্ষণের ক্ষেত্রে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ তাঁকে উদ্দেশ করে বলেছিলেন,’আমার সকল গানের ভাণ্ডারী।’
আরও পড়ুন:

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৩৩: মহর্ষিকে অনুসরণ করে তাঁর পত্নীও বাড়ির পুজোতে যোগ দিতেন না

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৩৫ ন হন্যতে

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২: মালা বেঁধে দিল বন্ধনহীন গ্রন্থি

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১১৯: হাট্টিমা

রবীন্দ্রগানে দিনেন্দ্রনাথ নিজেকে নিবেদন করেছিলেন। যেভাবে তিনি সংগীতের চর্চা করেছেন, সেভাবে অভিনয়ের চর্চা করেননি। তাঁর অভিনয়প্রতিভা যে সহজাত, পারদর্শিতা প্রশ্নাতীত, তা বারবার মঞ্চে প্রমাণিত হয়েছে। রবীন্দ্রনাথের ‘বাল্মীকি প্রতিভা’য় দিনেন্দ্রনাথের অভিনয়-জীবনের সূচনা। সে অভিনয়ে চমক ছিল,স্বকীয়তা ছিল, অভিভূত হয়েছিলেন দর্শকাসনে বসে থাকা ঠাকুরবাড়ির সকলে। ছোটো ছেলে, ততোধিক ছোটো চরিত্র, অথচ কী সাবলীল ও স্বতঃস্ফূর্ত অভিনয়! অবনীন্দ্রনাথ তাঁর মুগ্ধতা প্রকাশ করেছেন এই ভাবে, ‘দিনু তখন ছোট, ওর একটা পোষা ঘোড়া ছিল, রোজ ঘোড়ায় চড়ত। সেই ঘোড়ার পিঠে আমাদের লুঠের মাল বোঝাই ক’রে দিনু স্টেজে এল। আমরা সব লুঠের মাল ভাগ করলুম, একজন আবার গিয়ে ঘোড়াকে একটু ঘাসটাসও খাওয়ালে।’
কলকাতায় বৃষ্টি

গিরীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

সেই শুরু, পরে দিনেন্দ্রনাথ প্রাণের আনন্দে কত অভিনয় করেছেন। ঠাকুরবাড়িতে আনন্দ-লাভের রকমারি আয়োজন ছিল। গান-বাজনায় আনন্দ ছিল, তবে অধিক আনন্দ ছিল বোধহয় ওই নাটকে। নাটকের ক্ষেত্রে প্রস্তুতিপর্ব থেকেই অনাবিল আনন্দ। রিহার্সাল ঘিরে আনন্দ, মঞ্চ সাজানো নিয়ে আনন্দ, অভিনয়কালে ছোটোখাটো নানা ঘটনাতও কত আনন্দ! এই আনন্দের সন্ধান প্রথম বোধহয় ঠাকুরবাড়ির গিরীন্দ্রনাথ পেয়েছিলেন। গিরীন্দ্রনাথের দুই পুত্র গণেন্দ্রনাথ ও গুণেন্দ্রনাথ, উভয়ই নাট্যাভিনয়ে অতিশয় উৎসাহী ছিলেন। গুণেন্দ্রনাথের পুত্র গগনেন্দ্রনাথ ও অবনীন্দ্রনাথও চমৎকার অভিনয় করতেন। জ্যোতিরিন্দ্রনাথের অভিনয়-দক্ষতা বারবার প্রমাণিত হয়েছে। রবীন্দ্রনাথের অভিনয়ও অতুলনীয়। দিনেন্দ্রনাথও ভালো অভিনয় করতেন। সংগীত-প্রতিভা বহুদূর বিস্তৃত থাকায় তাঁর অভিনয়-ক্ষমতা সেভাবে আলোচনার আলোয় আসেনি। যখনই তিনি সুযোগ পেয়েছেন, অভিনয়েও যে কতখানি দক্ষ, তার প্রমাণ রেখেছেন।
আরও পড়ুন:

উপন্যাস: আকাশ এখনও মেঘলা, পর্ব-৩৭: আকাশ এখনও মেঘলা

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-১১ : অরিন্দম কহিলা বিষাদে

ঠাকুরবাড়িতে একসময় দিনেন্দ্রনাথকে বাদ দিয়ে নাট্যাভিনায়ের কথা ভাবা যেত না। কোনও কোনো ক্ষেত্রে তিনি যে অপরিহার্য, তা ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। যেমন, ‘শারদোৎসব’ অভিনীত হবে, ঠাকুরদার চরিত্রে কে অভিনয় করবেন, কেন ক্ষিতিমোহন সেন! সবাই মেনে নিল সে প্রস্তাব। পণ্ডিত মানুষ, সর্বজনপ্রিয় এই আশ্রমিককের প্রস্তাবিত নামের বিরোধিতা করার কেউ ছিলেন না। অচিরেই রিহার্সালও শুরু হয়। ঠাকুরদাকে বালকদলের সঙ্গে অনেক গান গাইতে হবে, আর কেউ বুঝুন, না বুঝুন, বুঝলেন ক্ষিতিমোহন সেন। মানে মানে তিনি সরে দাঁড়িয়েছিলেন। তৎক্ষণাৎ প্রস্তাবিত হয় দিনেন্দ্রনাথের নাম। তিনি একের পর এক গান গেয়ে, ভারি সুন্দর অভিনয় করে সকলের মন জয় করেছিলেন। তাঁর কণ্ঠে শোনা যেত, ‘আজ ধানের খেতে রৌদ্রছায়ায় লুকোচুরি খেলা’, ‘আমরা বেঁধেছি কাশেরগুচ্ছ, আমরা গেঁথেছি শেফালিমালা’—এমন কত না গান।
কলকাতায় বৃষ্টি

গুণেন্দ্রনাথ ঠাকুর।

একবার শান্তিনিকেতনে ‘রাজা’ অভিনীত হয়েছিল। সে অভিনয়ের সাক্ষী ছিলেন রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের কন্যা সীতা দেবী। দিনেন্দ্রনাথ চরিত্রের সঙ্গে কতখানি মিশে যেতেন, কেমন মর্মস্পর্শী অভিনয় করতেন, সে বর্ণনা আছে সীতা দেবীর লেখায়। তাঁর ‘পুণ্যস্মৃতি’ বই থেকে জানা যায়,’দিনেন্দ্রনাথ কালিঝুলি মাখিয়া, আলখাল্লার উপর নানা রঙের ন্যাকড়ার ফালি ঝুলাইয়া, রঙ্গমঞ্চে প্রবেশ করিলেন। তিনি পাগল সাজিয়াছিলেন। তাঁহার চেহারা দেখিয়া দুই-তিনটি শিশু কাঁদিয়া উঠিল।’ দিনেন্দ্রনাথের পাগল-সাজ কতখানি বাস্তবোচিত হয়েছিল, তা ওই দুই শিশুর কান্নার মধ্য দিয়ে বোঝা যায়। সরল-নির্মল দুই শিশুমন ভেবেছিল, সত্যিই বুঝি পাগলের আবির্ভাব ঘটেছে। আশ্রমশিক্ষক জীবনময় রায় দিনেন্দ্রনাথের অভিনয় দেখে কতখানি মোহিত হয়েছিলেন, তা তার স্বীকারোক্তিতেই স্পষ্ট। তিনি মুগ্ধতা প্রকাশ করেছেন এভাবে, ‘তন্ময় হইয়া প্রতিটি অভিনেতার অভিনয় দেখিতেছিলাম, এমন সময় আলুথালু কেশ, শতছিন্ন বিস্রস্ত বেশ পাগলের সাজে দিনেন্দ্রনাথ গান গাহিতে গাহিতে রঙ্গমঞ্চে আসিয়া আবির্ভূত হইলেন। লম্ফঝম্ফ নাই, চিৎকার নাই, পাগলামি দেখাইবার দুর্দমনীয় দুশ্চেষ্টা নাই, ভাবেভোলা অতীন্দ্রিয় অরূপরতনের সন্ধানে নিরুদ্দেশের পানে উধাও হইয়া যাওয়া দুইটি আয়তচক্ষুর দিশাহারা দৃষ্টি এবং আকুল কণ্ঠের আকূতিপূর্ণ সেই সঙ্গীত…। আমারও বুকের ভিতরটায় যেন উদ্বেল করিয়া তুলিল।’‌
আরও পড়ুন:

আমার দুর্গা: বিজ্ঞানী রাজেশ্বরী চট্টোপাধ্যায়

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৩২: লৌকিকও অলৌকিকের টানাপোড়েনের বিনির্মাণ—ঋষিকবির মহাকাব্য রামায়ণ

রবীন্দ্রনাথও ‘রাজা’য় অভিনয় করেছিলেন। ‘কবিবরের নৃত্য’ সেদিনের দর্শক আসনে থাকা সীতা দেবীকে মুগ্ধ করেছিল। তিনি ‘অতি সুন্দর নৃত্য’ করতে পারতেন, বাস্তব অভিজ্ঞতার নিরিখেই সেকথা জানিয়েছেন সীতা দেবী, তাঁর ‘পুণ্যস্মৃতি’ বইতে।

দিনেন্দ্রনাথ রবীন্দ্রনাথের আরও অনেক নাটকেই অভিনয় করেছেন। কখনো শান্তিনিকেতনে, কখনো কলকাতায়। কলকাতায় অভিনয় করেছেন এম্পায়ার থিয়েটারে, জোড়াসাঁকো-বাড়ির নিজস্ব প্রাঙ্গণে। ‘বিসর্জন’ নাটকে দিনেন্দ্রনাথ রঘুপতির ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন। অসাধারণ মর্মস্পর্শী অভিনয়। জলদগম্ভীর কণ্ঠস্বরে ব্রাহ্মণের দম্ভ ও ক্রোধ মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল। আবার সেই কণ্ঠস্বরে অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে বুকফাটা হাহাকার শোনা গিয়েছিল।
কলকাতায় বৃষ্টি

হেমেন্দ্রকুমার রায়।

সেদিন দর্শকাসনে থাকা যাঁরা দিনেন্দ্রনাথের সেই অভিনয়ের সাক্ষী ছিলেন, তাঁরা সকলেই পঞ্চমুখে দিনেন্দ্রনাথের প্রশংসা করেছিলেন। হেমেন্দ্রকুমার রায় প্রথম জীবনে বড়োদের লেখা লিখতেন। ঠাকুরবাড়ির ‘ভারতী’তেই সেসব লেখা অধিকাংশ ছাপা হত। দর্শকাসনে থাকা হেমেন্দ্রনাথ দিনেন্দ্রনাথের ‘মর্মভেদী অভিনয়ের’ প্রশংসা করেছেন মুক্তকণ্ঠে। বলেছেন, দিনেন্দ্রনাথের ‘বিপুল দেহ’ নাটকের চরিত্রের সঙ্গে কতখানি মানানসই হয়ে উঠেছিল, সে কথা। দিনেন্দ্রনাথের ওই ‘বিপুল দেহ’ রবীন্দ্রনাথকেও বিব্রত করেছিল, বিপাকে ফেলেছিল।
আরও পড়ুন:

রজনীর রবি

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-১১০: মা সারদার মানবীলীলার অবসান

একটি নাট্যদৃশ্যে ‘বিরাট দেহ’ নিয়ে রঘুপতি আছড়ে পড়েছিলেন জয়সিংহরূপী রবীন্দ্রনাথের উপর। জয়সিংহের অবস্থা সহজেই অনুমেয়! রবীন্দ্রনাথ ঠাট্টা করে বলেছিলেন, ‘দিনু, তুই চাস নে আমি বেঁচে থাকি?’ রবীন্দ্রনাথ যুবক জয়সিংহের ভূমিকায় অভিনয় করলেও তখন তাঁর বয়স ষাটোর্ধ্ব। একটি দৃশ্যে জয়সিংহ নত হয়ে রঘুপতিকে প্রণাম করে। প্রণাম করতে গিয়ে বড়ো ফ্যাসাদে পড়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। কোনোরকমে ধরে তাঁকে উঠিয়ে দিয়েছিলেন দিনেন্দ্রনাথ। বিপদমুক্ত রবীন্দ্রনাথ নাটক শেষে বলেছিলেন, ‘দিনু, তুই-ই আমাকে রক্ষা করেছিস।’
কলকাতায় বৃষ্টি

অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

শারীরিক ক্ষিপ্ততা হারালেও রবীন্দ্রনাথের মনের জোর ছিল অপরিসীম। দাপটের সঙ্গে অভিনয় করেছিলেন ‘বিসর্জন’-এ। অভিনয়ে দিনেন্দ্রনাথও কম পারদর্শী ছিলেন না। অভিনয়কালে রঘুপতি সাজা দিনেন্দ্রনাথের গলার রুদ্রাক্ষমালা ছিঁড়ে গিয়েছিল। দর্শকদের দিকে রুদ্রাক্ষগুলো ছুঁড়ে দেওয়ার পরও কারও মনে হয়নি, এভাবে সামাল নিলেন দিনেন্দ্রনাথ। এমনই সাবলীল ভাবে সে কাজ করেছিলেন যে, মনে হয়েছিল, সবই অভিনয়েরই অঙ্গ।

* গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি (Tagore Stories – Rabindranath Tagore) : পার্থজিৎ গঙ্গোপাধ্যায় (Parthajit Gangopadhyay) অবনীন্দ্রনাথের শিশুসাহিত্যে ডক্টরেট। বাংলা ছড়ার বিবর্তন নিয়ে গবেষণা, ডি-লিট অর্জন। শিশুসাহিত্য নিয়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে গবেষণা করে চলেছেন। বাংলা সাহিত্যের বহু হারানো সম্পদ পুনরুদ্ধার করেছেন। ছোটদের জন্য পঞ্চাশটিরও বেশি বই লিখেছেন। সম্পাদিত বই একশোরও বেশি।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content