বুধবার ১১ মার্চ, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি

ছবি: প্রতীকী।

পৌরাণিক ভূবর্ণনায় মেরুপর্বতের উল্লেখ আছে। মেরুপর্বত আকারে বিপুল। এর আকার প্রকারের বর্ণনা উচ্চকিত, পৃথিবীর ঠিক মাঝখানটিতে অবস্থান করে ভূ-ভারের সাম্য নাকি বজায় রাখে এই পর্বত। সংস্কৃত কাব্যে অত্যুচ্চ, অতিমানবিক বিষয়ের প্রসঙ্গ আসলে মেরুপর্বতের অনুষঙ্গ টানা হয়। প্রবল চরিত্রগুণ, অমানুষিক বল কিংবা দেবতুল্য মহিমার আধার যাঁরা তাঁরা একমাত্র তুলনীয় হতে পারেন এই পর্বতের সঙ্গে। এই পর্বতের অস্তিত্ব বোধহয় মানুষের কল্পনায়, এদেশের পূর্বজ মানুষ ঠিক কোন পর্বতমালাকে দেখে মেরুপর্বতের প্রতিষ্ঠা দিয়েছিলেন তা নিয়ে নানা মত, বিতর্ক। আজকের কাহিনি এই মেরুপর্বত নিয়ে, তার নানা আশ্চর্য বৈশিষ্ট্যের মধ্যে একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য নিয়েই কাহিনীর উপস্থাপনা।

মেরু পর্বত নাকি সোনার তৈরি, হিরণ্যময়। সোনার বহুমূল্যতার প্রভাব তো মানুষের লোকব্যবহারে, সামাজিক বোধ আর বিশ্বাসে যুগের পর যুগ অটল, অটুট। সোনা মহার্ঘ্য, সোনার ছেলে, সোনার দেশ, সোনার হরিণ, সোনার ফসল, সোনার ডিম, সোনার সংসার, স্বর্ণযুগ ইত্যাদি শব্দবন্ধ বলতে চায় যে, মানবীয় আদর্শে যা কিছু শ্রেষ্ঠ, অত্যুন্নত, অভ্রান্ত, পার্থিব ও আধ্যাত্মিক ঐশ্বর্যে মণ্ডিত, দুষ্প্রাপ্য, কখনও অপ্রাপ্য-ও বটে, তা-ই সোনা, স্বর্ণতুল্য। আজকের জাতক-কাহিনিটি এখান থেকেই শুরু করা যাক।
বোধিসত্ত্ব সেই জন্মে বারাণসীতে সোনার হাঁস হয়ে জন্মেছেন। তাঁর কনিষ্ঠ ভাইটির সঙ্গে তিনি চিত্রকূট পর্বতে বাস করতেন, হিমালয়ের পার্বত্যপ্রদেশে তাঁরা যেতেন পর্বতের আনাচে কানাচে জন্মানো শালিধান খাওয়ার জন্য। এমন করেই একদিন হিমালয় থেকে চিত্রকূটে ফিরতে ফিরতে তাঁরা দেখতে পেলেন কাঞ্চনবর্ণ মেরুপর্বত, তার শিখরদেশে গিয়ে বসলেন দুজনে।

পর্বতের চারপাশে বহুবিস্তৃত চারণভূমি। নানা পশুপাখি সেখানে বিচরণ করে, নানা বর্ণ তাদের। কিন্তু যেই তারা মেরুপর্বতে প্রবেশ করে তখনই তারা সোনারবরণ হয়ে পড়ে পর্বতপ্রভায়, এ এক আশ্চর্য বটে!

বোধিসত্ত্বের ছোট ভাইটি এতশত জানতো না। বেজায় অবাক হয়ে সে এর কারণ জানতে চাইল। কাক কোকিল থেকে পক্ষিকূলের উত্তম (অর্থাৎ পক্ষিরাজ গরুড়) কিংবা বাঘ সিংহ থেকে অধম পশু শেয়াল পর্যন্ত এর আশ্রয়ে এসে হেমপ্রভ হয়ে যাচ্ছে, এ কোন্ পর্বত দাদা? এ হল পর্বতশ্রেষ্ঠ মেরু, সকলেই এই নগরাজের সংস্পর্শে স্বর্ণময় হয়।
আরও পড়ুন:

গল্পবৃক্ষ, পর্ব-৩০: গজকুম্ভ জাতক— চরৈবেতি

মুভি রিভিউ: সত্যিই তো, সবার নিজের নিজের মতো করে সবটাই নর্মাল

রহস্য রোমাঞ্চের আলাস্কা, পর্ব-৬১: রাস্তায় গাড়ির তেল শেষ হয়ে গেলে দুর্গতির কোনও সীমা থাকবে না

এরপর কনিষ্ঠ হংস যা বলবে, তা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। বোঝা যাবে, এই গল্পটি সেই ময়ূরপুচ্ছ কাকের গল্পের না বলা কথাটুকু।

সজ্জন মানুষকে অপমান করে অসাধু যেখানে মাননীয়, এমন বিচিত্র প্রথা যেখানে প্রচলিত, সেই স্থান ক্ষণিকের জন্য-ও বাসযোগ্য নয় হে। যেখানে ভীরুর সম্মান বীরের সমতুল, যেখানে সচল ও জড়, সজ্জন আর দস্যু সকলেই সমান সম্মান পাবে সেই স্থান কি আদৌ সাধুজনের বাসযোগ্য, এই পর্বতের তো দেখছি উচ্চ-নীচ জ্ঞান নেই, উত্তম-অধম, মধ্যমের ভেদবিচারের শক্তি নেই, এমন পর্বত নিন্দনীয়। এখানে বাস অনুচিত। এই দুটি হংস স্বর্ণবর্ণ, অর্থাৎ অন্যের থেকে বিশিষ্ট। মেরুপর্বতের আশ্রয়ে তাদের কোনও পরিবর্তন না এলেও, যারা বৈশিষ্ট্যে অনুজ্জ্বল, মেরুপর্বতে এলেই তারাও সোনার রঙে ঝকঝকে হয়ে উঠছে।

এ কেমন কথা? এতে যে খাঁটি সোনা তার কোনও মূল্য থাকছে না, যারা সোনা নয়, নিখাদ নয়, যাদের সোনার রঙ ক্ষণস্থায়ী তারাও যেন একই সারিতে এসে পড়ছে না? এই সমপর্যায়ভুক্তির নানা ইতি নেতি ব্যাখ্যা থাকবে, সামাজিক সত্যাসত্য তার সঙ্গে যুক্ত হবে। ঔচিত্যবোধের যে প্রশ্নটি উঠবে তার ন্যায্যতা প্রশ্নের মুখে পড়লেও, প্রসঙ্গটি অমূলক বলা যাবে না হয়তো, বৃহত্তর স্বার্থেই।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১০৬: বাজ

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-১০৪: মা সারদার নিত্যলীলা

তারপর তাঁরা দুই ভাই উড়ে যায় চিত্রকূটের দিকে। কিন্তু কিছু প্রশ্ন রেখে যায়। এই বৌদ্ধ কাহিনি এভাবেই বহুবিদিত বহু-আকাঙ্ক্ষিত মেরুপর্বতকে একেবারে নস্যাৎ করে অন্যতর তাত্ত্বিক পরিসর ও আদর্শকে প্রতিষ্ঠা দিয়েছে।

মনে রাখতে হবে, গণতন্ত্রের পৃথিবীতে সাম্যের যে আদর্শ, নীতি, নিয়ম, তাকে অনুসরণ করার দায় এই সুপ্রাচীন কাহিনির নেই। তাই অক্লেশে উচ্চ-নীচ, ছোট-বড় সবকিছুর মধ্যে একটা বৈষম্যের স্বীকৃতি যেন এখানে প্রতিষ্ঠিত। এই কাহিনীর উপলক্ষ্য তো মানুষ, তাহলে মানুষে মানুষে ভেদতত্ত্ব কি এখানে প্রতিপাদ্য? তা হলে এ কাহিনি আজকের যুগে কোন্ আদর্শ বা তাত্পর্য বহন করতে পারে?

খেয়াল করতে হবে, স্পষ্ট ভেদবাদের মধ্যেও সজ্জন বা সাধুজনের উল্লেখটি যেন চোখ এড়িয়ে না যায়। এখানে যে কথাটি বলতে চাওয়া হয়েছে তা হল মুড়ি মিছরির একদর হওয়া সঙ্গত নয়। তাহলে যোগ্য ও অযোগ্যের ভেদটুকু থাকে না। তাতে আঘাত আসে সজ্জনের উপরেই, ধীমান, মহান, উদারচেতা, প্রতিভাধর তার যোগ্য মর্যাদাটুকু না পেলে যে সমষ্টিজীবনের ক্ষতি হয় তার ইঙ্গিত ওই হাঁসটির কথায় ধ্বনিত হয়।
আরও পড়ুন:

পর্দার আড়ালে, সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-৪: রিলেটিভিটি ও বিরিঞ্চিবাবা

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১২২: মহর্ষির নির্দেশে ঘণ্টা বাজত জোড়াসাঁকোয়

মিছরির সঙ্গে মুড়ির, মুক্তোর মালার সঙ্গে বানরের এই ব্যবধানটুকু স্বীকার করে নিলে আখেরে সমাজ উন্নত হয়। এই কাহিনির সিদ্ধান্ত এমন নয় যে দুটি সত্তার মধ্যে মূলগত ভেদস্বীকারের মধ্য দিয়ে মনুষ্যত্বের অপমান কিংবা দুর্বলের স্বার্থহানির স্বীকৃতিই এখানে প্রতিপাদ্য। জগতের সবকিছুই এই পরশপাথরের স্পর্শে সোনা হয়ে গেলে সোনার মর্যাদাটুকু আর থাকে না এটুকু বুঝি স্বীকার না করে উপায় নেই। এই সোনা হয়ে ওঠাটুকু ক্ষণস্থায়ী যদিও হয়, তাও তা হানিকর।

তার্কিক হয়তো বলবেন, পরমের সান্নিধ্যলাভ ত্রিগুণাতীতের ঘটে, অহং, আত্ম-পরের জ্ঞান, নিজের বৈশিষ্ট্য অর্থাৎ সীমাটুকুকে অতিক্রম না করলে কি মহতের স্বাদ পাওয়া যায়? তবে মনে হয়, এই কাহিনীর প্রতিপাদ্য নেহাত্ জাগতিক ও বৌদ্ধিক, সেভাবে দেখতে গেলে একে স্বার্থনিষ্ঠ বললেও ক্ষতি কি? সমষ্টির স্বার্থ তো এখানে যুক্ত আছেই।
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৮২: যে রাজাকে দেখলে প্রজারা ভয় পান, সেই রাজা ভালো প্রশাসক হতে পারেন না

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১২০: সত্য ও ন্যায় পরস্পরের সম্পূর্ণ বিরোধী নয়, তবে? ঔজ্জ্বল্য বেশি কার?

চাণক্যশ্লোকে তো বলাই হয় যে, অসীম ক্ষমতাধর রাজার স্বীকৃতি, প্রতিপত্তি, হাঁকডাক, মানমর্যাদা, তর্জন-গর্জন তাঁর দেশের সীমাটুকুতেই। কিন্তু বিদ্বান মানুষের আদর বহুবিদিত, বহুবিস্তৃত, সর্বত্র। আর শুধু কি মেরুর বুকে আশ্রিত নানা বৈশিষ্ট্যের সমতুল হয়ে পড়ার আপত্তিটুকুই এখানে আছে? মেরুর প্রতি কিঞ্চিত বিদ্রুপ কি নেই? যার সংস্পর্শে এসে অপর সত্তার স্বাতন্ত্র্য ব্যাহত কিংবা নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়, তার মহিমায় একটি কালখণ্ড আলোকিত ও ধন্য হলেও তা নিতান্তই ব্যক্তির মর্যাদাটুকুতেই আবদ্ধ থাকে, সমষ্টির নয়। যা কিছু “বহুজন হিতায়, বহুজন সুখায়” নয় তার মহিমা সত্য, স্বীকৃত ও আদর্শ হলেও সংশয়াতীত, অবিসংবাদী নয়। যে সর্বোন্নত মেরুপর্বতের মণিময় মুকুরে, আদর্শে একটি জাতি তার বিপুল মহিমার বোধকে চিনেছে, জেনেছে, মেনেছে, এই বৌদ্ধ কাহিনীটি তার সেই অত্যুজ্জ্বল মহিমার বিপ্রতীপে একটি নিরালোক কোণে আলোকপাত করেছে।
* ড. অভিষেক ঘোষ (Abhishek Ghosh) সহকারী অধ্যাপক, বাগনান কলেজ। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগ থেকে স্নাতকস্তরে স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত। স্নাতকোত্তরের পর ইউজিসি নেট জুনিয়র এবং সিনিয়র রিসার্চ ফেলোশিপ পেয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগে সাড়ে তিন বছর পূর্ণসময়ের গবেষক হিসাবে যুক্ত ছিলেন। সাম্বপুরাণের সূর্য-সৌরধর্ম নিয়ে গবেষণা করে পিএইচ. ডি ডিগ্রি লাভ করেন। আগ্রহের বিষয় ভারতবিদ্যা, পুরাণসাহিত্য, সৌরধর্ম, অভিলেখ, লিপিবিদ্যা, প্রাচ্যদর্শন, সাহিত্যতত্ত্ব, চিত্রকলা, বাংলার ধ্রুপদী ও আধুনিক সাহিত্যসম্ভার। মৌলিক রসসিক্ত লেখালেখি মূলত: ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে। গবেষণামূলক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়ে চলেছে বিভিন্ন জার্নাল ও সম্পাদিত গ্রন্থে। সাম্প্রতিক অতীতে ডিজিটাল আর্ট প্রদর্শিত হয়েছে আর্ট গ্যালারিতে, বিদেশেও নির্বাচিত হয়েছেন অনলাইন চিত্রপ্রদর্শনীতে। ফেসবুক পেজ, ইন্সটাগ্রামের মাধ্যমে নিয়মিত দর্শকের কাছে পৌঁছে দেন নিজের চিত্রকলা। এখানে একসঙ্গে হাতে তুলে নিয়েছেন কলম ও তুলি। লিখছেন রম্যরচনা, অলংকরণ করছেন একইসঙ্গে।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content