মঙ্গলবার ১০ মার্চ, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি

মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর।

ঠাকুরবাড়িতে দু’জন ছিল ফ্যামিলি ফিজিশিয়ান। একজন এদেশের, অন্যজন ওদেশের। এদেশের নামজাদা ডাক্তার ডি গুপ্ত। তাঁর নামের এই সংক্ষিপ্তকরণই মুখে মুখে ঘুরত। পুরো নাম যে দ্বারকানাথ গুপ্ত, তা অনেকেই ভুলে গিয়েছিলেন। ডাঃ গুপ্ত ম্যালেরিয়ার প্রতিষেধক আবিষ্কার করে দেশ-বিদেশে খ্যাতি পেয়েছিলেন। ডানলপ পেরিয়ে বেলঘরিয়ার কাছে তাঁর একটি বাগানবাড়ি ছিল। সে বাড়িতে রবীন্দ্রনাথও কিছুদিন ছিলেন। শেষজীবনে অবনীন্দ্রনাথ এখানে স্থায়ীভাবে থাকতেন, এই বাড়িতেই মৃত্যু হয়েছিল তাঁর। ডাঃ দ্বারকানাথের এই বাগানবাড়িটি অবশ্যই পরবর্তীকালের। আমরা যে সময়ের কথা বলছি, তখন চিকিৎসক হিসেবেও নবীন তিনি। থাকতেন জোড়াসাঁকোর অদূরে।
এ তো গেল এ দেশের চিকিৎসকের কথা, ওদেশ থেকে আসা বেলিসাহেবও ছিলেন ঠাকুরবাড়ির ফ্যামিলি ফিজিশিয়ান। ডাক পড়লেই ছুটে আসতেন। বেলিসাহেব তাঁর স্বভাব-বৈশিষ্ট্যর জন্য সাধারণ মানুষের কাছে খুবই জনপ্রিয় ছিলেন। তাঁর সহৃদয়তার, মানুষের জন্য কাতরতার কোনও তুলনা হয় না। বেলিসাহেবের গাড়িতে সবসময় রকমারি ওষুধ মজুত থাকত। অসুস্থ হয়ে পড়া গরিব মানুষজনদের বিনা পয়সায় ওষুধ দিতেন। রাস্তায় বের হলেই অসুস্থ মানুষ তাঁকে ঘিরে ধরত। বেলিসাহেবের ওপর সকলেরই ছিল খুব আস্থা, জানতেন তাঁর ওষুধে ভালো হয়ে উঠবেন।
কলকাতায় বৃষ্টি

গিরীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

ঠাকুরবাড়িতে অসুস্থ যোগমায়াকে বেলিসাহেব দেখতে আসার পর এক কাণ্ড ঘটেছিল। যোগমায়া দেবী দ্বারকানাথ ঠাকুরের দ্বিতীয় পুত্র গিরীন্দ্রনাথের পত্নী। রবীন্দ্রনাথের ‘মেজকাকিমা’ তিনি। অবনীন্দ্রনাথ তাঁর এই ‘দিদিমা’র কথা ‘ঘরোয়া’তে শুনিয়েছেন। দিদিমাকে তিনি চোখে দেখেননি। ছবি দেখারও সুযোগ হয়নি। কেউ তাঁর ছবি তুলে রাখেননি। অবনীন্দ্রনাথ শুধুই তাঁর গল্প শুনেছিলেন। যোগমায়া দেবীর কিছু গয়নাগাটি অবনীন্দ্রনাথের মা সৌদামিনী দেবীর কাছে রাখা ছিল। তার মধ্যে ছিল একটি ‘সাতনরী’ হার। সেকালে এ ধরনের গয়নায় আতর মাখিয়ে রাখা হত। অবনীন্দ্রনাথ সেই গয়না মাঝেমধ্যেই শুঁকে দেখতেন। আতরের গন্ধ পেতেন।
আরও পড়ুন:

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৪০: বেচারা বড় কষ্টে আছে, মহর্ষি সাহায্য পাঠিয়েছিলেন সাত হাজার টাকা

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-১৫ : Twoকি!

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৪১: কারুর কেউ নই-কো আমি…

হ্যালো বাবু! পর্ব-১০৭: ডেসডিমোনার রুমাল/৬

অবনীন্দ্রনাথ তাঁর এই দিদিমাকে চোখে দেখেননি। পিসিদের মুখে গল্প শুনেছিলেন। ভারি মজাদার এক ঘটনার কথা তাঁদের মুখ থেকেই জেনেছিলেন। যোগমায়া দেবী একবার খুব অসুস্থ হয়েছিলেন। একেবারে শয্যাশায়ী। সারাক্ষণ বিছানায় শুয়ে থাকতেন। রুগ্ন-বিধ্বস্ত শরীরে হাঁটাচলা করতে পারতেন না। বিছানায় শুয়ে শুয়েই সংসার-তত্ত্বাবধান করতেন। দাসীদের দিয়ে মাছ-তরকারি কাটাতেন। কী রান্না হবে, ছেলেরা কী খাবে, সেসব নিয়ে ওই শুয়ে শুয়েই ভাবতেন, নির্দেশ দিতেন।
কলকাতায় বৃষ্টি

ডাঃ দ্বারকানাথ গুপ্ত।

মাঝেমধ্যে ডাক্তার এসে অসুস্থ যোগমায়া দেবীকে দেখে যেতেন। সেদিন এসেছিলেন বেলিসাহেব। বাইরে থেকে এসেছেন, হাত ধুয়ে তবেই রোগীকে স্পর্শ করবেন, দেখবেন। তাই বাড়ির কাজের লোককে একঘটি জল আনতে বললেন। বাংলাতেই বললেন। সাহেবি-উচ্চারণে সুন্দর বাংলা বলতেন তিনি। বলার মধ্যে নিজস্বতা ছিল। কাজের লোক ‘ঘটি’কে শুনলো ‘বঁটি’। এক মুহূর্ত দেরি না করে সাততাড়াতাড়ি সে মাছ কাটার বঁটি নিয়ে এসে হাজির হয়। এমন যে ঘটতে পারে, তা সাহেব-ডাক্তার আন্দাজ করতে পারেননি। বিছানায় শুয়ে থাকা রোগীর দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে ওঠেন, বঁটি নিয়ে আপনার দাসী এলো, আমার গলা কাটবে নাকি!
আরও পড়ুন:

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-৮: সুনীতির পথ জন্মান্তরে

সুন্দরবনের বারোমাস্যা, সুন্দরবনের বারোমাস্যা পর্ব-১২৬: সুন্দরবনের পাখি: গুলিন্দা বাটান

কাজের লোকটি এক মুহূর্ত দেরি না করে তখুনই ছুটে পালিয়ে গিয়েছিল। বেলিসাহেব হো হো করে হেসেছিলেন। দৃশ্যটি কল্পনা করে আমাদেরও মুখের কোণে বোধহয় হাসির আভা খেলে যাবে।
বেলি সাহেব যখন যোগমায়া দেবীকে পরীক্ষা করে দেখছিলেন তখন সামনে দাঁড়িয়েছিলেন ডাক্তার ডি.গুপ্তও। ছিলেন একজন দোভাষী, দোভাষী ব্যক্তিটি যোগমায়া দেবীকে বাংলা করে বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন। ডাক্তার বেলি জানালেন, রোগী ‘এনিমিক’ হয়েছেন। বাংলা করে এই কথাটা যোগমায়া দেবীকে বোঝানো হয়, ‘বেলিসাহেব বলছেন, আপনি কিঞ্চিৎ বি-রক্ত হয়েছেন।’ ‘এনিমিক’ শব্দের বাংলা প্রতিশব্দ কেউ যদি ‘বি-রক্ত’ করেন, তাহলে যে কী হতে পারে, তা সহজেই অনুমেয়। ‘বিরক্ত’ হয়েছেন শুনে যোগমায়া দেবী তো থ। বললেন, ‘সে কি কথা, উনি হলেন আমাদের এতদিনের ডাক্তার, আমি ওর উপরে বিরক্ত হব কেন!’ সাহেবকে তিনি একই কথা বারবার বলতে থাকেন। বোঝান, ‘না না, সে কি কথা, আমি একটুও বিরক্ত হইনি।’
কলকাতায় বৃষ্টি

গুণেন্দ্রনাথ ঠাকুর।

যোগমায়া দেবী যতবার এ কথা বলেন, ততবারই বাংলায় ভাষান্তরিত করে যাঁর বলার দায়িত্ব, তিনি বলতে থাকেন, ‘আপনি কিঞ্চিৎ বি-রক্ত হয়েছেন।’ দিদিমা প্রতিবাদ করে বলে ওঠেন, ‘আমি একটুও বিরক্ত হইনি, মিছেমিছি কেন বিরক্ত হব, আপনি সাহেবকে তা ভালো করে বুঝিয়ে দিন।’
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৩৬: এক অনন্য অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ রামচন্দ্রের অরণ্যবাস

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৮২: ত্রিপুরা : উত্তর-পূর্ব ভারতের অন্যতম প্রত্নভূমি ঊনকোটি

কিছু একটা ঘটেছে বুঝতে পারলেও বেলিসাহেব সবটা বুঝতে পারছিলেন না। অবনীন্দ্রনাথের লেখা থেকে জানা যায়, তাঁর জ্যাঠামশাই তখন স্কুলে পড়েন, ভালো ইংরেজি জানেন। তিনি বেলিসাহেবকে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, এনিমিকের বাংলা তর্জমা করতে গিয়ে দোভাষী বি-রক্ত করেছেন। আসলে তিনি একটুও বিরক্ত হননি। এ কথা শুনে স্বভাবসুলভভাবে বেলিসাহেব হো হো করে হেসে উঠেছিলেন। হাসতে হাসতে বলেছিলেন, ‘ওকে তুমি একটু বুঝিয়ে দাও। উনি রক্তহীন হয়েছেন।’
কলকাতায় বৃষ্টি

গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর।

এসবই যোগমায়া দেবীর বৃদ্ধ-বয়সের কথা। তখন তিনি শয্যাশায়ী। একসময় যোগমায়া ছিলেন খুবই কর্মতৎপর। বাড়ির ছোটোদের তিনিই দেখাশোনা করতেন। ছোটোদের প্রতি তাঁর গভীর ভালোবাসা ছিল। রবীন্দ্রনাথের বড়দিদি সৌদামিনী লিখেছেন, ‘আমার মা বহুসন্তানবতী ছিলেন। এই জন্য তিনি আমাদের সকলকে তেমন করিয়া দেখিতে পারিতেন না — মেজকাকীমার ঘরে আমাদের সকলের আশ্রয় ছিল।’ রবীন্দ্রনাথের মেজদা সত্যেন্দ্রনাথ তাঁর ‘আমার বাল্যকথা’ বইতে একই কথা বলেছেন। তাঁর লেখায় আছে, ‘মেজকাকীমার ঘর’ তাঁদের কাছে ছিল ‘শিক্ষালয়’, ছিল ‘বিশ্রামস্থান’। লেখাপড়ার ব্যাপারে যোগমায়া দেবীর উৎসাহ ছিল। বিশেষ করে বাংলা ভাষাটি আয়ত্ত করেছিলেন। তাই সত্যেন্দ্রনাথ তাঁকে বলেছেন, ‘একপ্রকার শিক্ষয়িত্রী ছিলেন।’
আরও পড়ুন:

উত্তম কথাচিত্র,পর্ব-৭২ : গলি থেকে রাজপথ

রহস্য রোমাঞ্চের আলাস্কা, পর্ব-৬৫: একদিকে জল, অন্যদিকে পাহাড় সিউয়ার্ডের রাস্তা যেন স্বর্গদ্বার!

জোড়াসাঁকোর যে ভাগাভাগি, দুই বাড়িতে পৃথক পৃথক বসবাস, তা কবে, কীভাবে সূচনা হয়েছিল, সে বিষয়ে অনুসন্ধান করতে বসলে যোগমায়া দেবীর নামটি চলে আসে। এমন ঘটার জন্য তিনিই দায়ি, এরকম অবশ্য ভেবে নেওয়ার কোনো কারণ নেই। তাঁর নামটি এই ঘটনার সঙ্গে কেন জড়িয়ে গেল, কী এমন ঘটেছিল, অনুসন্ধান করতে গিয়ে আসল তথ্যটি আমাদের জানা হয়। মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ব্রাহ্মধর্ম গ্রহণের পর দৈনন্দিন জীবনে লক্ষ্মী- জনার্দনের নিত্যপূজা বন্ধ করতে চেয়েছিলেন। যোগমায়া বধূ হয়ে আসা থেকে ঠাকুরবাড়িতে নিত্যপূজা দেখে আসছেন। মহর্ষির মনোবাসনা বাস্তবায়িত করার ক্ষেত্রে তাই প্রবলভাবে বাধা দিয়েছিলেন। নিজের কথার স্বপক্ষে অনেক যুক্তি দিয়েছিলেন। তাঁর কথায়, বাধায় কাজ হয়নি। মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ নিজের সিদ্ধান্তেই অবিচল থেকেছেন। যোগমায়াও মহর্ষির সিদ্ধান্ত মেনে নেননি। শেষে যোগমায়া দেবী গৃহদেবতা লক্ষ্মী-জনার্দনের বিগ্রহ নিয়ে, দুই পুত্র ও দুই কন্যাকে নিয়ে পৃথকভাবে বসবাস শুরু করেছেন দ্বারকানাথের বৈঠকখানায়।
কলকাতায় বৃষ্টি

অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

মহর্ষি-পরিবার থাকত ছ’ নম্বর বাড়িতে। পৃথক বসবাস শুরু হলেও মনের দূরত্ব তৈরি হয়নি। মহর্ষির সঙ্গে যথেষ্টই সুসম্পর্ক ছিল। সে সম্পর্ক পরেও বজায় থেকেছে। যোগমায়ার স্বামী গিরীন্দ্রনাথ ছিলেন গগনেন্দ্রনাথ-অবনীন্দ্রনাথের পিতামহ, দু-জনেই গুণেন্দ্রনাথের পুত্র। রবীন্দ্রনাথ তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্রদের মধ্যে অবনীন্দ্রনাথকে বোধ হয় সব থেকে বেশি স্নেহ করতেন। লেখার জগতে কবিই এনেছিলেন তাঁর প্রিয় ভ্রাতুষ্পুত্রকে। গগনেন্দ্রনাথের সঙ্গেও রবীন্দ্রনাথের মধুর সম্পর্ক ছিল। কবি যে জোব্বা-পোশাকটি পরতেন, যে জপোশাকে পৃথিবীর মানুষ তাঁকে চিনেছিল, সে পোশাকের পরিকল্পক তো ছিলেন স্বয়ং গগনেন্দ্রনাথ।

* গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি (Tagore Stories – Rabindranath Tagore) : পার্থজিৎ গঙ্গোপাধ্যায় (Parthajit Gangopadhyay) অবনীন্দ্রনাথের শিশুসাহিত্যে ডক্টরেট। বাংলা ছড়ার বিবর্তন নিয়ে গবেষণা, ডি-লিট অর্জন। শিশুসাহিত্য নিয়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে গবেষণা করে চলেছেন। বাংলা সাহিত্যের বহু হারানো সম্পদ পুনরুদ্ধার করেছেন। ছোটদের জন্য পঞ্চাশটিরও বেশি বই লিখেছেন। সম্পাদিত বই একশোরও বেশি।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content