বুধবার ১১ মার্চ, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি

মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর।

মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ সম্পর্কে আমাদের যে ধারণা, সে ধারণার সঙ্গে তরুণ দেবেন্দ্রনাথকে মেলানো যায় না। যে পথে তিনি পরিণত বয়সে হেঁটেছেন, তরুণ-বয়সে সে পথে নয়, বেপথেই ছিল তাঁর চলাচল, বিচরণ। তিনি যে বিপথগামী হয়ে পড়েছিলেন, সে তথ্য আছে তাঁর আত্মজীবনী যিনি সম্পাদনা করেছিলেন, সেই সতীশচন্দ্র চক্রবর্তীর লেখায়। সতীশচন্দ্র জানিয়েছেন, ‘এই সময় হইতে তাঁহাকে (দ্বারকানাথকে) ব্যবসায়ের সুবিধার জন্য দেশীয় ও য়ুরোপীয় পদস্থ লোকদিগকে লইয়া নাচ ও ভোজের ব্যবস্থা করিতে হইত… অনেক সময় সামাজিকতার খাতিরে পুত্রদিগকে এই সকল প্রমোদ-সভায় খানা খাওয়া বাইনাচ ও সুরাপানের সংশ্রবে লইয়া যাইতে হইত। কিশোর দেবেন্দ্রনাথ এইরূপে প্রলোভনের অনলে নিক্ষিপ্ত হইলেন।’ মহর্ষিদেব নিজেও স্বীকার করেছেন, ‘এতদিন আমি বিলাসের আমোদে ডুবিয়া ছিলাম।’
একটি মৃত্যু, দিদিমা অলকা দেবীর মৃত্যু মহর্ষির জীবনে পরিবর্তন এনেছিল। বলা যায়, বোধোদয় হয়েছিল। বুঝেছিলেন, ওই পথ তাঁর নয়। মন দিয়েছিলেন জ্ঞানচর্চায়। পরবর্তীকালে,মহর্ষির ওপর পারিবারিক দায়দায়িত্ব পড়েছে, সংসারী হয়েছেন তিনি, সে সময় বারবার নানা ঘটনায় স্পষ্ট হয়েছে, তাঁর বিচক্ষণতা। মহর্ষি চরিত্রে দার্শনিকতা ছিল, আবার বৈষয়িকতাও ছিল। ধর্মবোধে উদারতা, জনহিতকর কর্মে সদিচ্ছা, ন্যায়পরায়ণতা— তাঁর চরিত্রের এমন সব উজ্জ্বল দিক আমাদের অভিভূত করে।
আরও পড়ুন:

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১২১: মহারাজ অফ শান্তিনিকেতন

মুভি রিভিউ: সত্যিই তো, সবার নিজের নিজের মতো করে সবটাই নর্মাল

রহস্য রোমাঞ্চের আলাস্কা, পর্ব-৬০: পাহাড়ের চূড়ায় বসে দেখলাম হিমবাহের সেই অপরূপ শোভা

প্রথম জীবনে তিনি খানিক বিশৃঙ্খল ছিলেন সত্য, পরবর্তীকালে নিজেকে যেভাবে শুধরে নিয়েছিলেন, জীবনে শৃঙ্খলা এনেছিলেন, তা অবাক করার মতোই ঘটনা। প্রবল ব্যক্তিত্বের অধিকারী, মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের সেই অসাধারণ ব্যক্তিত্বের কাছে পরিবারের সদস্যদের তো বটেই, কাজের লোকদেরও নতজানু হতে হয়েছে, সমীহ করে চলতে হয়েছে। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ লিখেছেন কতখানি ‘রাশভারী’ ছিলেন তিনি। তাঁর লেখায় আছে,’তিনি যখন বাড়িতে থাকিতেন, বাড়ি গমগম করিত। পাছে কোনও কর্তব্যের ত্রুটি হয় চাকরবাকর সর্বদাই সশঙ্ক থাকিত।… তিনি কাহাকেও শাসন করিতেন না অথচ সমস্ত কাজ সুশৃঙ্খল রূপে নির্বাহ হইত।’
কলকাতায় বৃষ্টি

জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর।

মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের ছিল সময়-বাঁধা জীবন। মহর্ষির ব্যবস্থাপনাতেই জোড়াসাঁকোয় রুটিন মেনে দৈনন্দিন কাজ যথাসময়ে সম্পাদিত হত। নিজে করতেন, অন্যদের দিয়েও করাতেন। জোরাজুরি করে ‘বাধ্য’ করা নয়, বাড়িতে তিনি এমন এক সুশৃঙ্খল-আবহ তৈরি করেছিলেন যে, পরিবারের সকলেরই, এমনকি কাজের লোকজনরাও যে কাজ করার কথা, তা করত যথা সময়ে। না করে কৈফিয়ত পেশ করার কোনও সুযোগ ছিল না।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১০৬: বাজ

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-১০৪: মা সারদার নিত্যলীলা

শুনলে হয়তো অবাক হতে হবে, শৃঙ্খলা মেনে ঠিক সময় ঠিক কাজটি করার জন্য বাড়িতে মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঘণ্টার ব্যবস্থা করেছিলেন। সময়ানুবর্তিতার এমন দৃষ্টান্ত অন্তত বঙ্গজীবনে সচরাচর দেখা যায় না। বাঙালি মাত্রই একটু এলোমেলো, সময় না মেনে চলায় অভ্যস্ত, এমনই তো সকলের মনে হয়। প্রচলিত এই ধারণা মহর্ষির জীবনযাপনের সঙ্গে মেলানো যায় না। বাড়িতে তিনি ‘পেটাঘড়ি’-র ব্যবস্থা করেছিলেন। বাড়ির সবকিছুই ঘড়ি মেনে চলত, নড়চড় হওয়ার উপায় ছিল না। সে-সবের প্রত্যক্ষ সাক্ষী মহর্ষি-কন্যা সৌদামিনী দেবী। তিনি নিজেও ভুক্তভোগী, ইচ্ছায় অনিচ্ছায় এসব মেনে চলতে হয়েছে। তাঁর লেখা থেকেই জানা যায়, সাতসকালে, ঠিক ছ’টার সময় ঘণ্টা বেজে উঠত। এ ঘণ্টাধ্বনি জানিয়ে দিত, ‘বিছানা ছেড়ে ওঠার সময় হয়েছে, উঠে পড়ো। ঘণ্টাই যেন বলে দিত, ‘এবার মুখ-হাত ধোয়ার সময় হয়েছে।’ সাতটায় পুনরায় ঘণ্টা বাজত। সে ঘণ্টা কীসের? দালানে গিয়ে প্রাত্যহিক উপাসনায় যোগ দেওয়ার। বেলা দশটায় আবার ঘণ্টা বেজে উঠত। সে ঘণ্টা জানিয়ে দিত, স্নান করার সময় হয়েছে। দশটার ঘণ্টা বাজামাত্র কাছারিতে কর্মচারীরা এসে কাজে যোগ দিত। বারোটায় আবারও ঘণ্টা বেজে উঠত। ঘণ্টা বুঝি স্মরণ করিয়ে দিত, ‘আহারের সময় হয়েছে, খেতে বসে পড়।’
কলকাতায় বৃষ্টি

সৌদামিনী দেবী।

মাঝে কিছুটা বিরতি। চারটের সময় পুনরায় ঘণ্টা। ঘণ্টা বাজার কারণ একটাই, এবার ছেলেরা স্কুল থেকে ফিরবে, আহার করবে। চলত সে প্রস্তুতি। পাঁচটার সময় বাজত কাছারি বন্ধ হওয়ার ঘণ্টা। এরপর একটানা অনেকক্ষণ ঘণ্টা বাজার বিরতি। ঘণ্টা বাজানো হত রাত দশটায়।ঘণ্টা বাজামাত্র শুরু হয়ে যেত রাতের আহার। আহারান্তে ঘুমানোর জন্য ডাকাডাকি। ছোটোদের বাবা-বাছা বলে ঘুম পাড়ানো চলত। বড়রাও বুঝতেন, সময় হয়েছে এবার ঘুমিয়ে পড়তে হবে।

জোড়াসাঁকোয় তো ছিল ‘ভৃত্যরাজক তন্ত্র’, রবীন্দ্রনাথই এ কথা বলেছেন। ‘শ্যাম’ নামে এক গৃহভৃত্য ছিল,‘ঈশ্বর’ নামেও এক গৃহভৃত্য ছিল। তারা মূলত রবীন্দ্রনাথকে দেখাশোনা করত। এই ভৃত্য প্রসঙ্গে সৌদামিনী দেবী লিখেছেন, ‘তাঁহার (মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের) ভৃত্যদের মধ্যে কর্মবিভাগ ছিল। যাহার প্রতি যে কর্মের ভার থাকিত, কেবল সেইটের সম্বন্ধেই তাহার দায়িত্ব সম্পূর্ণ ছিল। এলোমেলো দায়িত্ববিহীনভাবে কাজ হইবার জো ছিল না।’
আরও পড়ুন:

পর্দার আড়ালে, সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-৪: রিলেটিভিটি ও বিরিঞ্চিবাবা

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১২১: খেলা শুরুর প্রস্তুতি

মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ যে অত্যন্ত নিয়মনিষ্ঠ ছিলেন, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। অতীব সাধারণ পোশাকআশাক পরতেন তিনি। চালচলন, আদবকায়দায় বিন্দুমাত্র আভিজাত্য ছিল না। সন্তান-সন্ততিদের সেভাবেই মানুষ করেছিলেন। বিলাসিতা স্পর্শ করেনি, খুবই সাধারণভাবে বড় হয়েছেন তাঁরা। সকলেই পিতৃদেবকে খুব সমীহ করতেন। জোব্বা পরে, মার্জিতভাবে পুত্ররা পিতার কাছে যেতেন। মুখে পান থাকলে তা বাইরে ফেলে তবেই তাঁর মুখোমুখি দাঁড়াতেন। শিবনাথ শাস্ত্রী তাঁর লেখায় নিজের চোখে দেখা একটি ঘটনার কথা লিখেছেন। রাজনারায়ণ বসুর সঙ্গে মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের সখ্য ছিল। তাঁরা দু-জনে কথা বলছেন, গল্প করছেন, গল্প করতে করতে হেসে উঠছেন, এমন এক দৃশ্যের সাক্ষী ছিলেন শিবনাথ শাস্ত্রী। অদূরেই দাঁড়িয়েছিলেন মহর্ষির জ্যেষ্ঠপুত্র দ্বিজেন্দ্রনাথ।
কলকাতায় বৃষ্টি

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

হাসি তো সংক্রমক। এক মুখ থেকে আরেক মুখে ছড়িয়ে পড়ে। না, দ্বিজেন্দ্রনাথের মুখে এক ফোঁটাও হাসি দেখা যায়নি। আসলে পিতার সামনে বসা বা হাসা দুইই ছিল অনুচিত। দ্বিজেন্দ্রনাথ তাই দূরে ঠায় দাঁড়িয়েছিলেন। এ দৃশ্য শিবনাথ শাস্ত্রী স্বচক্ষে দেখেছেন। জ্যোতিরিন্দ্রনাথের ‘জীবনস্মৃতি’তে আছে, ‘একদিন আমাদের বাড়ির পাঠশালায় গুরুমহাশয়ের সম্মুখে বসিয়া তালপাতায় ক, খ, প্রভৃতি অক্ষরে দাগা বুলাইতেছিলাম। বোধহয় আমার বয়স তখন পাঁচ বৎসর—সেই সময় পিতৃদেব আমাদের পাশ দিয়া যাইতেছিলেন। গুরুমহাশয় উঠিয়া দাঁড়াইলেন। আমি দাঁড়াইলাম না। তিনি ফিরিয়া আসিয়া আমাকে দাঁড়াইতে বলিলেন। আদব-কায়দার প্রতি এমনি তাহার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ছিল।’
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৮২: যে রাজাকে দেখলে প্রজারা ভয় পান, সেই রাজা ভালো প্রশাসক হতে পারেন না

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১২০: সত্য ও ন্যায় পরস্পরের সম্পূর্ণ বিরোধী নয়, তবে? ঔজ্জ্বল্য বেশি কার?

রবীন্দ্রনাথ ও অবনীন্দ্রনাথের লেখাতেও আছে মহর্ষিদেবকে বাড়ির সকলে কতখানি সমীহ করতেন সে কথা। মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ বাড়ি থাকলে সকলে সমঝে চলতেন। ভ্রমণ-শেষে হয়তো জোড়াসাঁকোয় ফিরেছেন তিনি, রবীন্দ্রনাথের লেখায় আছে মহর্ষির ঘরে ‘উঁকি মারিতে আমাদের সাহস হয় না।’ উপনয়নের পর পিতার সঙ্গে বেরিয়ে এক নিদারুণ কাণ্ড ঘটেছিল। ন্যাড়া মাথায় রবীন্দ্রনাথের টুপি পরতে ইচ্ছে করত না। পিতৃদেব বললে অমান্য করে কার সাধ্যি! গাড়িতে উঠেই মহর্ষি বলেছেন, ‘মাথায় টুপি পরো।’ ঘোরতর অনিচ্ছাতেও রবীন্দ্রনাথকে টুপি পরতে হয়েছিল।
কলকাতায় বৃষ্টি

অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

মহর্ষি জোড়াসাঁকোয় উপস্থিত থাকলে গৃহ-পরিবেশই পাল্টে যেত। হল্লা করলে বিপদ অনিবার্য। তাই কেউ ভুলেও গোলমাল করতেন না। বাড়ির কাজের লোকেরা সারাক্ষণ সতর্ক থাকত। ছোটোরা খালি পায়ে আছে কিনা, ময়লা পোশাক পরেছে কিনা, সে সব দিকে বাড়ির কাজের লোকদের নজর থাকত। মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ বাড়িতে থাকলে বাড়ির ‘ঢিলেঢালা ঝিমন্ত ভাব’ উধাও হত। অবনীন্দ্রনাথেরও মনে হয়েছিল সবাই ‘যেন সজাগ হয়ে উঠত।’

মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের এই ব্যক্তিত্ব জোড়াসাঁকোয় শৃঙ্খলা এনেছিল। এত বড় পরিবারটি নিয়মের মধ্যে রাখা, সুশৃঙ্খল করে তোলা, সহজ কাজ ছিল না। মহর্ষি তা পেরেছিলেন।
* গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি (Tagore Stories – Rabindranath Tagore) : পার্থজিৎ গঙ্গোপাধ্যায় (Parthajit Gangopadhyay) অবনীন্দ্রনাথের শিশুসাহিত্যে ডক্টরেট। বাংলা ছড়ার বিবর্তন নিয়ে গবেষণা, ডি-লিট অর্জন। শিশুসাহিত্য নিয়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে গবেষণা করে চলেছেন। বাংলা সাহিত্যের বহু হারানো সম্পদ পুনরুদ্ধার করেছেন। ছোটদের জন্য পঞ্চাশটিরও বেশি বই লিখেছেন। সম্পাদিত বই একশোরও বেশি।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content