মঙ্গলবার ১০ মার্চ, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি
উত্তরের কালাপাহাড়ের পাদদেশে ছিল এক খরস্রোতা নদী। নাম তার রঙ্গিত। কালাপাহাড়ের কালো পর্দা ভেদ করে যখন সূর্যের কিরণ খরস্রোতা রঙ্গিতের স্বচ্ছ জলে আঁকিবুকি কাটত তখন মনে হতো বিধাতা যেন প্রকৃতির জলতরঙ্গে সুরের জাল বুনছে। বয়ে যাওয়া রঙ্গিতের একধারে যেমন রয়েছে কালাপাহাড় তেমনি অন্য আল থেকে শুরু হয়েছে এক সুদূরপ্রসারী গভীর অরণ্য। জঙ্গলের কোলজুড়ে রয়েছে ছোট্ট একটি গ্রাম, নাম তার ছাতিমডাঙ্গা। পাহাড়-নদী-জঙ্গলের সীমানা ঘেরা এই গ্রামে থাকতো মারমা উপজাতি সম্প্রদায়ের লোকজন।

ছাতিমডাঙ্গায় ছিল না কোনও পাকা বাড়ি। ছিল ইতস্তত বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে থাকা গুটিকয়েক তালপাতা ও হেঁতাল পাতায় ছাওয়া ঝুপড়ি। ওর একটি ঝুপড়িতে থাকতো কাঠুরিয়া হারাধন ও তার ছোট্ট মেয়ে কুসুমকলি। কুসুম যখন বছর চারেকের তখন দুরারোগ্য যক্ষারোগ, তার মাকে কেড়ে নেয়। কুসুম বড় হতে থাকে বিধবা পিসির শাসনে। সারাদিন পিসির হাতে হাতে কাজ করে, বিকেলে চারটে ছাগল নিয়ে জলার ধারে চরাতে যায়। আর তারই ফাঁকে একটু আধটু সময় পেলেই পড়তে বসে ধারাপাত ও বর্ণপরিচয় নিয়ে। বছর দু’য়েক আগে বাবা হারাধন গঞ্জে গিয়ে মেয়ের জন্য বই দুটো কিনে এনেছিল; যেগুলো রোজই নিয়ম করে কুসুম দুলে দুলে আওড়ে যেত সেই চেনা বুলি। তারই মাঝে যদি পিসির হাঁক ডাকে সেই সুরের ছন্দপতন হতো তাহলে ছোট্ট কুসুম ভীষণ রেগে যেত। প্রতিদিন সূর্যাস্তের ঠিক আগে বাবা একরাশ ক্লান্তি নিয়ে যখন বাসায় ফিরতো তখন কুসুম দু’চোখ ভরা কৌতূহল নিয়ে বাবাকে জড়িয়ে ধরত। তার মনে একটাই প্রশ্ন থাকতো যে আজ তার বাবা জঙ্গলে কোন বুনো হাতি বা হরিণের মুখোমুখি হয়েছে কিনা।
এমনই এক সন্ধ্যায় বাবা ফিরলে পিসি ওদের খেতে দিল লাল আটার রুটি আর ভেলি গুড়। খাবার সঙ্গে চলতো বাবার গল্প। বাবা বলত লতাপাতার সঙ্গে গাছেদের বন্ধুত্বের কথা,পাখিদের নানান দেশে ঘোরার কথা আর হাতি-হরিণ-বানর-কাঠবেড়ালিদের দুষ্টু মিষ্টি বন্ধুত্বের গল্পকথা। খাওয়া শেষ করে কুসুম ঝুপড়ির জানালা দিয়ে চাঁদের দিকে তাকিয়ে থাকত, শিশুমনে ভাবত যে সে যদি কোন হরিণ বা পাখি হত তাহলে হারিয়ে যেত সেই ঘন সবুজের মাঝে। আর ভাবতে ভাবতে মায়ের বানানো কাঁথাটা গায়ে টেনে পাড়ি দিত ঘুমের দেশে। স্বপ্নরানীর মায়াজালে কুসুম তখন এক রঙিন তোতা। সবেমাত্র পাওয়া রঙিন ডানা দুটো ঝাপটে, সে উড়ে চলেছে এক অচেনার সন্ধানে।

বেলা শেষে উড়ে এসে বসলো নীলপাহাড়ের পাদদেশে থাকা একটি গাছে। কুসুমতোতা দেখলো ছোট্ট এক রঙিন পাখি এসে বসলো তারই ডালে, নাম তার পরিপাখি। কথায় কথায় বন্ধুত্ব হল দুই পাখির। তারপর গরম ঝর্ণার জল খেতে গেল দুই বন্ধু। তখন সন্ধ্যা প্রায় হব হব, ফিরে এসে দুই বন্ধু বসলো গাছের ডালে। পাখিরা ডালে বসে কেউ পিঁপড়ে-পোকা ধরে খাচ্ছে, কেউবা বিশ্রাম নিচ্ছে আবার কেউ নিজের মনে গান ধরেছে।কুসুমতোতা বলল “বন্ধু, তোমার জীবনের গল্প শুনি”। পরিপাখি বলল, “আমরা একদল পাখি বসন্তের আগমনে উত্তরের দ্বীপে উড়ে যাচ্ছি। আমি যখন খুব ছোট তখন বাবা মার সাথে থাকতাম দক্ষিণের এক ঘন জঙ্গলে।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৩৬: এক অনন্য অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ রামচন্দ্রের অরণ্যবাস

হ্যালো বাবু! পর্ব-১০৭: ডেসডিমোনার রুমাল/৬

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৩৮: পার্ক স্ট্রিট থেকে মহর্ষি ফিরে এসেছিলেন জোড়াসাঁকোয়

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৮২: ত্রিপুরা : উত্তর-পূর্ব ভারতের অন্যতম প্রত্নভূমি ঊনকোটি

একদিন রাতে সবাই যখন ঘুমোচ্ছিল ডালে ডালে, তখনই একটি হুতুম প্যাঁচা গলা উঁচিয়ে জানান দিল প্রাকৃতিক দুর্যোগের আগাম সংকেত। সব পাখিরা নিজেদের ডাল ছেড়ে উঠে ডানা ঝটাপটি লাগিয়ে দিল। অন্ধকার আকাশ কাঁপিয়ে হু হু শব্দে ছুটে আসতে লাগলো আগুনের লেলিহান শিখা। মায়ের অনুরোধে হুতুম পেঁচা আমায় মুখে তুলে নিয়ে চলল অনেক উপরে। গাছের ডালে ডালে ধেয়ে এলো জলন্ত অগ্নিশিখা। ভয়ংকর আওয়াজে ডালপালাগুলো ভেঙ্গে পড়ল,আপন আপন প্রাণের ভয়ে ছোটাছুটি লাগালো পশু পাখির দল। দাবাগ্নির রক্তে রাঙা হলো প্রাণের আর্তনাদ।”

কথাগুলো বলতে বলতেই পরিপাখির দুচোখ জলে ভরে উঠলো। তখন কুসুমতোতা বন্ধুকে সান্ত্বনা দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিল। কিন্তু নতুন বন্ধু পাওয়ার আনন্দে কুসুমতোতা নিজে দুচোখের পাতা এক করতে পারল না,মনে একটা সুন্দর ভালোলাগা তৈরি হলো,এর নামই কি বন্ধুত্ব। তারপর হঠাৎই তীব্র বেগে ধেয়ে এল ঘূর্ণিঝড়।
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৪০: কেঁচো খুঁড়তে কেউটে

উত্তম কথাচিত্র,পর্ব-৭২ : গলি থেকে রাজপথ

প্রচণ্ড ঝড়ের দাপটে এদিক-ওদিক ছিটকে পড়ল পাখির দল, বনের জন্তুরাও প্রাণরক্ষার তাগিদে ছোটাছুটি লাগিয়ে দিল, গাছের উঁচু উঁচু ডালগুলো ভেঙে পড়ল মড়মড় শব্দে। কুসুমতোতা চিৎকার করে ডাকল “কোথায় তুমি, বন্ধু?” কিন্তু বন্ধুর কোনও সাড়াশব্দ পেল না কুসুমতোতা। সে নিজেও ছিটকে গিয়ে পড়ল মাটিতে।প্রায় ঘণ্টা দুয়েক পর যখন ঝড় বৃষ্টি থামল তখন সবেমাত্র ভোরের আকাশের আলো ফুটেছে। অনেকক্ষণ খোঁজার পর কুসুমতোতা দেখল পরিপাখির নিথর দেহ পড়ে রয়েছে একটা ভাঙ্গা গাছের ডালের নিচে। “বন্ধু” বলে চিৎকার করে কেঁদে উঠল কুসুমতোতা। ঘুম ভাঙল ছোট্ট মেয়ে কুসুমকলির। বন্ধুকে হারানোর দুঃস্বপ্নে কেঁদে ডুকরে উঠলো।পাশে শুয়ে থাকা পিসি তখন তাকে বুকে জড়িয়ে ধরল। বাবাও ঘুম ভেঙে উঠে মেয়েকে ভোলানোর চেষ্টা করতে থাকল। বাবা বলল সে গঞ্জ থেকে লজেন এনে দেবে, নতুন বই কিনে দেবে, মেলা বসলে কাঁচের চুড়ি কিনে দেবে কিন্তু মেয়ের কান্না কিছুতেই থামছিল না। তারপর হঠাৎই কাঠুরিয়া বলে ফেলল “মা, তুই যদি কান্না থামাস তাহলে একদিন তোকে কালাপাহাড়, রঙ্গীত নদী আর জঙ্গল দেখাতে নিয়ে যাব।” বাপের কথা শুনে মেয়ের তখন ঠোঁটের কোণায় হাসির ঝিলিক দেখা দিল। দু’হাত দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে বলে উঠল তাহলে সে আজই যাবে জঙ্গল দেখতে।
আরও পড়ুন:

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-৭: কেমন আছেন সুনীতি, নদীর নরম ছেড়ে সমুদ্রের নুনে!

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-১৩ : জনঅরণ্য: সরস্বতী না লক্ষ্মী?

ভোরের আলো ফুটতেই কুসুম তৈরি হল বাবার সঙ্গে যাওয়ার জন্য। বিধবা পিসি কাপড়ের পুঁটুলিতে বেশ খানিকটা মুড়ি-বাতাসা বেঁধে দিল ওদের জন্য। প্রায় দু-মাইল হাঁটার পর তারা পৌঁছাল গভীর অরণ্যের মাঝে। একদিন কুসুম শুধুই ভেবেছিল কিন্তু আজ প্রথম সে দেখল উঁচু উঁচু গাছের সারি, এ গাছ থেকে ওগাছে রঙিন পাখিদের আনাগোনা, দলবেঁধে হাতিদের হেঁটে চলা, লম্বা লম্বা পা ফেলে হরিণের এগিয়ে চলা আর রামধনু রঙের প্রজাপতিদের উড়ে এসে গায়ে মাথায় বসা। সবকিছু দেখতে দেখতেই কুসুম এগিয়ে চলল রঙ্গিত নদীর কাছে। সে আনন্দে লাফিয়ে উঠে বাবাকে বলল, “বাবা,বাবা, ওই দেখো হাতিগুলো কেমন নদীতে নেমে চান করছে আর শুঁড়ে করে জল ছিটিয়ে বাচ্চা হাতিটাকে চান করাচ্ছে।”প্রায় ঘন্টাখানেক পর কুসুমের অপেক্ষার অবসান ঘটলো। জলকেলি শেষ করে হাতির দল নদী পার করে কালা পাহাড়ের দিকে চলল। কুসুম তখন ছোট ছোট পা ফেলে এসে একটা বড় পাথরের ওপর বসলো, নিজের পা দুটো জলে ডুবিয়ে আপন মনে গুনগুনাতে লাগল।
আরও পড়ুন:

সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১২৫: সুন্দরবনের পাখি: বিলের বালুবাটান

রহস্য রোমাঞ্চের আলাস্কা, পর্ব-৬৫: একদিকে জল, অন্যদিকে পাহাড় সিউয়ার্ডের রাস্তা যেন স্বর্গদ্বার!

মা-হারা মেয়েকে এর আগে এত খুশি হারাধন কখনও দেখেনি। কাজের দেরি হবে জেনেও মেয়ের আনন্দের জন্য বাবা অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলো নদীর ধারে। তারপর দু’জনে মিলে মুড়ি-বাতাসা খেয়ে ফিরে এলো আবার জঙ্গলের মাঝে। তখন উঁচু উঁচু গাছগুলোর মাথা ভেদ করে সূর্যের আলো ঝিলিক দিচ্ছিল জঙ্গলের ভিতরে। এবার শুরু হল বাবার কাঠ কাটার আর কুসুমের শুকনো পাতা কুড়ানোর পালা। হঠাৎ একটা বাচ্চা হরিণ তাদের দিকে ছুটে আসতে আসতে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। হরিণ ছানার এক পায়ে তীরবেঁধা। দেখে কুসুমের মায়া হল। বাবা বলে উঠল, “শিকারির লোভী চোখ বাচ্চা হরিণটাকেও ছাড়লো না।”

কুসুম ছুটতে গিয়ে হরিণ ছানাকে জড়িয়ে ধরে তীরটা তুলল, আর কাঁদতে কাঁদতে বাবাকে বলল যে আজ হরিণ ছানাটাকে বাঁচাতেই হবে। বাবা তখন তাড়াতাড়ি কোমর থেকে গামছাটা খুলে আঘাতপ্রাপ্ত হরিণটাকে পিঠে বেঁধে উঁচু গাছের মগডালে উঠে পড়ল আর বাবারই কথামতো কুসুম অন্য একটি ডালে উঠল। খানিকক্ষণ পর শিকারী এসে ঝোপঝাড়গুলো ভালো করে খুঁজতে লাগল কিন্তু তীরবেঁধা হরিণকে সে আর পেল না। প্রায় ঘণ্টা দু’য়েক পর হরিণ ছানাকে নিয়ে বাবা ও কুসুম গাছ থেকে নামল। তখন প্রায় বেলা শেষ তাই তাড়াতাড়ি জঙ্গল থেকে বেরোতে হবে নইলে ঘন অন্ধকারে চারিদিক ছেয়ে যাবে। হরিণ ছানাকে বাঁচানোর আনন্দে ছোট্ট কুসুম বড় বড় পায়ে এগিয়ে চলল বাবার সঙ্গে।

সন্ধ্যার পর দু’জনে হরিণকে নিয়ে ফিরল নিজেদের ঝুপড়িতে। পিসি চিন্তায় ঝুপড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল। কুসুম ঝুপড়িতে ঢুকেই হরিণের পা জল দিয়ে ধুয়ে দিল আর পিসি বাচ্চা হরিণের ক্ষতস্থানে বুনো গাছের পাতার রস লাগিয়ে একটা ছেড়া কাপড় বেঁধে দিল। তারপর কুসুম নিজের হাতে হরিণছানাকে রুটি খাইয়ে নিজেরাও খেয়ে নিল। ছোট্ট কুসুম হরিণ ছানাটাকে বুকে জড়িয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়ল। গতরাতে স্বপ্নে কুসুমতোতা তার প্রাণের বন্ধু পরিপাখিকে হারালেও আজ রাতে কুসুমকলি পেল তার নতুন বন্ধু হরিণ ছানাকে। এই ভাবেই কুসুমকলি আর হরিণ ছানার বন্ধুত্ব হল।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content