বুধবার ১১ মার্চ, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি
সেদিন গুরুদেবের রাজবেশ। জড়ির সরুপার দেওয়া গেরুয়া ধুতি চাদর। মাথায় কল্কা আঁকা রক্তিম পাগড়ি। কি অপূর্ব মূর্তি! সুধা বিস্ময়ে চেয়ে আছে। ওর নজর গুরুদেবের গলার মোটা মালাগুলোর দিকে। জুঁই আর রজনীগন্ধার গোড়মালা, লাল টকটকে গোলাপ লাগানো। শিয়ালদা স্টেশনের পাশে ফুলের দোকানে আজই ও আসবার পথে দেখেছে। যে সিংহাসনটায় বসে আছেন গুরুদেব সেটাও আগে থেকেই চেনা।

এই পুজো দালানের কোণে মখমলের ঢাকনা পরিয়ে রাখা থাকে। প্রতিদিন নরম কাপড় দিয়ে মোছা হয়। সন্ধেবেলা নাম সংকীর্তনের সময় সেই ফাঁকা সিংহাসনকেই সবাই প্রণাম করে। ছোটদের নিষেধ করা আছে ওই সিংহাসনে কেউ হাত দেবে না। শুধু গুরুদেব এলে বসবেন। সুধা কোনওদিন কাউকে বলতে পারবে না তার একটা গোপন অপরাধের কথা। একদিন ভর দুপুরে সবার অলক্ষে সে লুকিয়ে ঢাকনা তুলে সিংহাসনটায় বসেছিল। কি নরম, কি আরাম! এমনকি ওই তুলতুলে পেল্লাই আসনে সে গুটিসুটি মেরে একটু শুয়েও নিয়েছিল। সবাই বলে বিশেষ করে তার মা, যে গুরুদেব নাকি অন্তর্যামী, সব নাকি তিনি আগে থাকতেই দেখতে পান। তাঁর কাছে লুকানো বলে নাকি কিছু নেই। কই সুধার অপকীর্তির হদিস তো তিনি পাননি!
নিজের চিন্তায় একটু বিভোর হয়ে গিয়েছিল সুধা। হঠাৎ মায়ের আলতো ধাক্কায় সম্বিত ফিরে চটপট তাকিয়ে দেখে সকলে তার দিকেই চেয়ে আছে। আর গুরুদেব স্বয়ং ভুবন ভোলানো হাসি মুখে হাতছানি দিয়ে সোজা তাকেই ডাকছেন। অন্তরাত্মা আঁতকে উঠেছে। সতরঞ্চি মুঠোয় চেপে সে একেবারে পাথরের পুতুল। সবাই বিগলিত হয়ে বলেছেন, যাও যাও গুরুদেব ডাকছেন। মায়ের মুখে এত প্রশান্তির হাসি ও কতদিন দেখেনি। শুধু সুধার চোখে জল, বুকে ভয়ের ঢাক। গিদিম গিদিম। পা টিপে টিপে এগিয়ে গিয়েছে আসনের সামনে। মাথা নিচু। গুরুদেব বকেননি।
আরও পড়ুন:

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-১: সুধারানির কথা

শারদীয়ার গল্প-৬: দুর্গা রাগ

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৩২: কবিকন্যা মীরার স্বামী রবীন্দ্রনাথকে ভর্ৎসনা করেছিলেন

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১১৯: হাট্টিমা

গুরুদেব আশ্চর্য স্পর্শে সুধার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়েছেন। নিজে হাতে করে তুলে নিয়ে কোলে বসিয়েছেন। কেউ না শুনতে পাবার মত ফিসফিস আদর কণ্ঠে বলেছেন, কি চাই তোর? সুধা নিরুত্তর। আবারো জিজ্ঞাসা করছেন গুরুদেব। সুধা মাথা নেড়ে জানায়, কিছু চাই না তার। গুরুদেব হাসেন, কিছুই কি লাগব না? এই সিংহাসনে বসবি একবার? এ বার সজোরে মাথা নাড়ছে সুধারানি। কক্ষনো না, কোনওদিন না। ওদের কাণ্ড দেখে দালান জুড়ে হাসির রোল। সুধা এবার একটু সাহসী। পৃথিবীর আলো দেখবার আগে থেকেই হয়তো বা যাঁর নাম কানের ভিতর দিয়ে মরমে পুরে দিয়েছিল তার মা সেই গুরুদেবের কোলে বসে এবার ওই মেয়ে চেয়ে নিয়েছে লাল তাজা গোলাপ বসানো সবচেয়ে মোটা রজনীগন্ধার মালাটা। গুরুদেব মালা খুলে সুধার গলায় পরিয়ে দিলেন। গমগমে গলায় বললেন, এই রে, আমাগো যে বিয়া হইয়া গেল! হল জুড়ে উচ্চ হাসি। কারা আবার শঙ্খ বাজিয়ে দিয়েছে। গুরুদেব বললেন, আজ থেকে তরে আমি গিন্নি ডাকুম! সেদিনকার সভায় সুধা সকলের চোখের মণি। গুরু ভাইবোনেরা তার মাকে ঘিরে নানা কথা বলছেন।
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৩৪: অনুসরণ

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-১১ : অরিন্দম কহিলা বিষাদে

অনেকেই এসে সুধার গাল টিপে দিচ্ছেন। একজন বয়স্কা বসে বসে বললেন, মেয়ে যে ভারী রূপসী হয়েছে সুনীতি। বাপের মুখ পেয়েছে না? মানুষের বেয়াক্কেল দেখলে স্তম্ভিত হয়ে যায় সুধা। কোথায় একটু প্রসাদ পাবে! চারপাশে ভোগের ম ম গন্ধ। খিচুড়ি লুচি পায়েসের অফুরন্ত সুবাস।‌ সুধা খিদে তেষ্টায় কাতর সেটা কি কেউ বুঝবে না? ডায়মন্ড হারবারের বাড়িতে কিছু থাক না থাক বাইরের লোক এলেই তাকে আগে রেকাব সাজিয়ে নাড়ু মোয়া নিদেনপক্ষে বাতাসাটুকু মা দেবেই। আর এখানে!
আরও পড়ুন:

আমার দুর্গা: বিজ্ঞানী রাজেশ্বরী চট্টোপাধ্যায়

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৩২: লৌকিকও অলৌকিকের টানাপোড়েনের বিনির্মাণ—ঋষিকবির মহাকাব্য রামায়ণ

ভক্তরা এখন আবার খোল করতাল বাজিয়ে গান ধরেছেন! এই গান তো সন্ধ্যেবেলায় ওদের বাড়িতেও হয়। এখন যে ভর দুপুর! হায় কপাল মাও‌ সেই গানের দলে গলা মেলালো। ‘হরি হরয়ে নম কৃষ্ণ যাদবায় নমো, যাদবায় মাধবায় কেশবায় নম’! এই কি গানের সময়! আর কি করবে সুধা। মায়ের আঁচলের গিঁট খুলে যে দুটো পয়সা আগে থেকে বার করে নিয়েছিল তাই দিয়ে নিচের দোকান থেকে এবার সে ভাবছে কিছু মুড়ি মুড়কি কিনে আনবে। এখানে কিছু প্রসাদ মিলবে বলে মনে হচ্ছে না। কিন্তু মিলল। মহা সমারোহে। মেলালেন সেই অন্তর্যামী।‌
আরও পড়ুন:

রজনীর রবি

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-১১০: মা সারদার মানবীলীলার অবসান

সুধা সবে অভিমানে মুখ ফুলিয়ে কিনতে যাচ্ছিল মুড়কি তখনই হাত নেড়ে আহ্বান। ওদিকে পুজোর ঘরে হই হই করে গুরুদেবের বহুব্যঞ্জন ভোগের ব্যবস্থা হয়েছে। সুনীতি ও আছেন সেই দলে। গুরুদেব ডেকে নিলেন সুধাকে। শিষ্যদের বললেন, গিন্নি মুখে কিছু না দিলে আমি খাই কি কইরা? আমার পাশেই অর বসার পিঁড়িখান পাত। গুছায়ে খাইতে দাও। আবার হল জুড়ে হাসির রোল। উলুধ্বনি। গুরু-কুশাসনের পাশে পড়ল ছোট্ট পিঁড়ি। গুরুদেবের ভোগের থালার পাশে সুধারানির পঞ্চব্যঞ্জন কাঁসার থালা। মেজদা মেজ বৌদিও আছেন। সকলের মুখে উদ্বেল হাসি। আর মায়ের চোখে আনন্দাশ্রু। স্পষ্ট দেখেছে সুধা। — চলবে

* ধারাবাহিক উপন্যাস (novel): দেওয়াল পারের দেশ (Dewal Parer Desh)। লিখছেন জয়িতা দত্ত (Dr. Jayita Dutta), বাংলা সাহিত্যের অধ্যাপক, হুগলি মহসিন কলেজ।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content