বুধবার ১১ মার্চ, ২০২৬


খাবার সংগ্রহে ব্যস্ত ঘুঘু দম্পতি। ছবি: লেখক।

খুব ছোটবেলায় বাবা ও মায়ের কাছে শুনতাম পঞ্চতন্ত্রের গল্প। প্রচুর গল্পের মধ্যে কিছু গল্প মনের মধ্যে ভীষণ দাগ কাটত। আজ লিখতে বসে সেগুলোর মধ্যে একটি গল্প মনে পড়ল। গল্পটা হল—এক ঝাঁক ঘুঘু পাখি উড়তে উড়তে যাচ্ছিল। অনেকটা পথ ওড়ার পর যখন তাদের খুব খিদে পেল তখন তাদের দলনেতা দূরে একটা গাছের নিচে বিছিয়ে থাকা শস্য দানা দেখতে পেয়ে সবাইকে নামার নির্দেশ দিল। ওরা ভেবেছিল শস্যদানা খেয়ে পেট ভরে গেলে আবার উড়ে যাবে। কিন্তু শস্য দানা খাওয়া শুরু করতেই তাদের ওপর এসে পড়ল একটা বিরাট জাল।
পাখি শিকারীরা বন্দি করে ফেলল তাদের। প্রাণভয়ে ভীত ঘুঘু পাখিরা যখন বাঁচার আর কোনও উপায় দেখতে পেল না তখন তাদের নেতা ঘুঘু পাখি সবাইকে একসাথে ঠোঁটে জালটি ধরে ওড়া শুরু করতে নির্দেশ দিল। সবাই একসঙ্গে ওড়া শুরু করতেই জালসহ তারা আকাশে উড়ে গেল। তারপর তারা দূরে একটা পাহাড়ে গিয়ে নামল যেখানে নেতা ঘুঘুর বন্ধু ইঁদুর জাল কেটে তাদের মুক্ত করল। গল্পটা প্রায় সবাই জানে। তবুও বললাম কারণ নেতা ঘুঘুর এই বুদ্ধি আমাদের জীবনের কাছে একটা বড় শিক্ষা। দেশজুড়ে যখন হিংসা আর বিভেদ আমাদের একতাকে ক্রমশঃ দুর্বল করে চলেছে সেখানে ঘুঘুর এই গল্প আমাদের সবার কাছে স্মরণযোগ্য।
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১১৫: গেমপ্ল্যান

বিখ্যাতদের বিবাহ-বিচিত্রা, পর্ব-১৭: একাকিত্বের অন্ধকূপ/২: অন্ধকারের উৎস হতে

এই গল্পটাকে ভীষণভাবে জীবনে সম্পর্কযুক্ত করতে পারতাম খুব ছোট থেকে কারণ আমাদের গ্রামের মাটির বাড়ির চালে ঘুঘু পাখিরা সারা বছর বসে বসে ক্রক কক ক্র… ক্রক কক ক্র কিংবা কুক ক্রু ক্রুউউউ … কুক ক্রু ক্রুউউউ করে ডাকত। ওদের বাসা ছিল আমাদের গোয়াল ঘরের মাচায়। পরে আমাদের পাকা বাড়ি তৈরি হওয়ার পর ভেন্টিলেটরের ফোকরে নিয়মিত ওরা বাসা বানাত। শুধু বাড়ির চালে নয়, সামনে থাকা আম গাছে, পেয়ারা গাছে কিংবা অর্জুন গাছে ওরা বসে একইভাবে বসে ক্রক কক ক্র… ক্রক কক ক্র করে ডাকত। আর কেবল আমাদের বাড়ির কথা বলি কেন, অন্যান্যদের বাড়িতেও দেখতাম ওদের। আমাদের বাড়ি থেকে সামান্য দূরে যে হরিমন্দির ছিল সেখানেও বরাবর ছিল ঘুঘু পাখিদের বাসা। এখন আমার স্কুলেও কড়ি-বরগার উপর ও ভেন্টিলেটরে রয়েছে ওদের বাসা। রাস্তাঘাটে গাছের ডালে, ছাদের প্যারাপেটে, ইলেকট্রিকের তারে কিংবা টেলিফোনের কেবলের ওপর ওদের সর্বত্র বসে থাকার দৃশ্য নজরে পড়ে। আবার কখনও কখনও দেখি রাস্তায় লোকজন কম থাকলে মাটিতে নেমে দানাশস্য খুঁটে খুঁটে খায়। ছাদে গম, চাল, ডাল ইত্যাদি রোদে শুকোতে দিলে হাজির হয়ে যায় জোড়ায় জোড়ায়। আর অলস দুপুরে শুয়ে শুয়ে আজও ওদের ডাক শুনতে পাই- ক্রক কক ক্র… ক্রক কক ক্র।

ছিট ঘুঘু। ছবি: লেখক।

যে ঘুঘুর কথা এতক্ষণ ধরে বলছি আসলে এই ঘুঘুকে বাংলায় বলে ছিট ঘুঘু, ইংরেজিতে ‘Spotted Dove’। অনেকে একে তিলা ঘুঘুও বলে। পায়রার নিকটাত্মীয় এই পাখিটির বিজ্ঞানসম্মত নাম ‘Spilopelia chinensis’। পায়রার থেকে একটু ছোট আকারের হলেও স্বভাবে এবং আকৃতিতে পায়রার মতোই। ছিপছিপে গড়নের এই পাখির বিশেষত্ব হল এদের পিঠ ও ডানায় বাদামি-গোলাপি রঙের উপর রয়েছে সাদা ছোপ। আসলে বেশিরভাগ পালকের প্রান্ত সাদা ও গোড়ার দিক ধূসর। আর পালকের মাঝামাঝি আগার দিকে রয়েছে কালো রঙের দাগ। তবে এই ঘুঘুর ঘাড়ের উপর রয়েছে দাবা খেলার বোর্ডের মতো কালোর উপর সাদা ছিট। এই কারণেই এই ঘুঘুর বাংলা নাম ছিট ঘুঘু বা ইংরেজিতে ‘Spotted Dove’।
আরও পড়ুন:

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-৯৮: মা সারদার জন্মতিথিতে তাঁর অপূর্ব অমানবীয় রূপ ফুটে উঠল

রহস্য রোমাঞ্চের আলাস্কা, পর্ব-৫৭: আলাস্কায় এমন অপরূপ দৃশ্যও দেখা যায়, যেখানে পাহাড়-সমুদ্র-হিমবাহ একসঙ্গে বিরাজমান

সারা গায়ের রং গোলাপি-বাদামি হলেও পেটের দিকের রং কিছুটা ফিকে বা ধূসর। ছিট ঘুঘুর পায়ের রং গোলাপি-লাল। পায়ের ওপরে আড়াআড়ি সাদা রঙের সরু সরু ব্যান্ড স্পষ্ট বোঝা যায়। ঠোঁটের রঙ কালো বা কালচে-ধূসর। উপরের ঠোঁটের গোড়ার দিকে লম্বা নাসারন্ধ্র অস্পষ্ট বোঝা যায়। চোখ দুটো ভারি সুন্দর। কালো মণির চারিদিকে কমলা রঙের গোল বর্ডার। ছিট ঘুঘু আমি কয়েকবার হাতে ধরে দেখেছি। ফাঁদে আটকে পড়া ঘুঘুকে মুক্ত করতে গিয়ে হাতে ধরতে হয়েছিল। পালকগুলো কী মোলায়েম! যখনই ওদের সামনাসামনি দেখি মনে হয় হাতে নিয়ে একটু আদর করি! অবশ্য ছিট ঘুঘুরা মানুষের সান্নিধ্য থেকে খুব একটা দূরে যায় না কারণ মানুষের কাছাকাছি থাকলেই ওরা খাবার এবং বাসার ব্যাপারে নিশ্চিন্ত। আশেপাশে ক্ষেতখামার আর জলের উৎস থাকলে ছিট ঘুঘুদের দেখা যাবেই। মানুষের সান্নিধ্যে থাকতে থাকতে ওদের মানুষের ওপর খুব বিশ্বাস জন্মে গেছে। তাই ভয়ডর বেশ কম। অবশ্য এটাই ওদের আবার বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায় কখনো কখনো। মানুষের প্রতি ওদের বিশ্বাসের মূল্য মানুষ অনেক সময় দেয় না। শহরাঞ্চলে গ্রীষ্মকালে ঘুঘুদের জলকষ্ট এক বড় সমস্যা। বাড়ির ছাদে যদি কয়েকটি জলের পাত্র জল ভরে রেখে দেওয়া যায় তাহলে ওদের তেষ্টা নিবারণ হয়।
আরও পড়ুন:

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১১৬: শান্তিনিকেতনে কবির প্রথম জন্মোৎসব

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১১৪: জীবনের নশ্বরতা ও আত্মানুসন্ধান বিষয়ে রামের উপলব্ধি যেন এক চিরন্তন সত্যের উন্মোচন

ঘুঘু পাখি সাধারণত জোড়ায় জোড়ায় বেশি দেখা যায়। অবশ্যই স্ত্রী ও পুরুষ ছিট ঘুঘুর জোড়। কিন্তু বাইরে থেকে দেখে কোনটি স্ত্রী আর কোনটি পুরুষ চেনা যায় না। সারা বছর ধরেই এদের প্রজনন হলেও সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর মাসের মধ্যে প্রজননের হার বেশি। একটা স্ত্রী ও পুরুষ ছিট ঘুঘুর জোড় স্থায়ী হয়। অর্থাৎ কোনও জোড়ের একটি স্ত্রী বা পুরুষ পাখি, একাধিক সঙ্গী বা সঙ্গিনীর সঙ্গে প্রজননে লিপ্ত হয় না। পুরুষ ছিট ঘুঘু বোঝা যায় আচার-আচরণ দেখে। প্রজনন ঋতুতে পুরুষটি স্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষনের জন্য নানারকম অঙ্গভঙ্গি করে। যেমন ঝপ ঝপ করে ডানায় শব্দ তুলে সোজা উপরের দিকে কিছুটা উড়ে যায়। ৩০ থেকে ৪০ মিটার সোজা উপরে উড়ে যাওয়ার পর ডানা ঝাপটানো বন্ধ করে দুই ডানা বাতাসে মেলে ধরে আর সঙ্গে লেজের পালকগুলোকে ফোল্ডিং হাতপাখার মতো ছড়িয়ে দেয়। আর তারপর দ্রুত নিচের দিকে নেমে এসে যেখান থেকে ওড়া শুরু করেছিল সেখানে এসে বসে। আবার কখনও কখনও সে ঘাড়ের কাছে দাবার বোর্ডের ছকের মতো ছিটছিট পালকগুলোকে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে এবং মাথাটাকে ক্রমাগত উপরের নিচে ওঠানামা করতে করতে স্ত্রী ঘুঘুর দিকে দ্রুত পায়ে এগিয়ে যায়। এই সময় গলা ও ঘাড় ফুলিয়ে সে ক্রক-ক্র ক্রক-ক্র আওয়াজ করে। পুরুষ যখন এইসব করতে থাকে তখন দেখি স্ত্রী ঘুঘু দিব্যি পাত্তা না দিয়ে কাছাকাছি নির্বিকার চিত্তে বসে থাকে কিংবা খাবার সংগ্রহে ব্যস্ত থাকে। এই দৃশ্য যখনই আমার নজরে পড়ে দেখে খুব হাসি পায়।

স্ত্রী ঘুঘুর মন জেতার চেষ্টায় গলা ও ঘাড় ফুলিয়ে পুরুষ ঘুঘু। ডিম-সহ ছিট ঘুঘুর বাসা। ছবি: সংগ্রহীত।

স্ত্রী ও পুরুষ ছিট ঘুঘু দুজনে মিলে বাসা বাঁধে। শুকনো সরু কাঠি ঘাস ও শেকড় হল বাসার প্রধান উপকরণ। খুব একটা পাকাপোক্ত বাসা এরা বাঁধতে পারে না। বাসা নির্মাণে কোনও সৌন্দর্যবোধও নেই। সাধারণত বাসায় স্ত্রী ঘুঘু দুটি সাদা রঙের ডিম পাড়ে। স্ত্রী ও পুরুষ মিলিয়ে পালা করে প্রায় ১৪ থেকে ১৬ দিন ডিমে তা দেওয়ার পর ডিম ফুটে বাচ্চারা বেরোয়। প্রায় দু’ সপ্তাহ ধরে বাবা ও মা বাচ্চাদের ভরণপোষণের দায়িত্ব নেয়। ততদিনে বাচ্চাদের ওড়ার পালক গজিয়ে যায়। তখন আবার নতুন করে ডিম পাড়ার উদ্যোগ নেয় স্ত্রী ঘুঘু।
আরও পড়ুন:

গীতা: সম্ভবামি যুগে যুগে, পর্ব-২২: সন্ন্যাস

সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১০০: নীল কটকটিয়া

এমনিতে ঘুঘু পাখিরা সুন্দরবন অঞ্চল কিংবা সারা ভারতে বিপন্ন বলে জানা যায়নি। কিন্তু ঘুঘু পাখির শিকারীরা সবসময়ই তক্কে তক্কে থাকে। প্রায়শই ফাঁদ পেতে সহজে এদের শিকার করে। ঘুঘু পাখির মাংস নাকি পায়রার মাংসের মতো সুস্বাদু। খুব ছোটবেলায় আমাদের গ্রামের বাড়ির এক পরিচারক ফাঁদ পেতে কয়েকটি ঘুঘু ধরে এনেছিল এবং সেগুলিকে আমার বাবার অনুপস্থিতিতে হত্যা করে রান্না করা হয়েছিল। খুব ছোট ছিলাম বলে সেই স্মৃতি এখন অনেকটাই অস্পষ্ট। শুধু মনে আছে মাংসের রং ছিল প্রায় টকটকে লাল।

বাড়ির সামনে ইলেকট্রিক কেবলে বসে ঘুঘু। দেয়াল পাখার উপর ছিট ঘুঘুর বাসা। ছবি: সংগ্রহীত।

যতদূর মনে পড়ে সেই মাংস খেয়েছিলাম এবং আদৌ ভালো লাগেনি। পরে আর কোনওদিন ঘুঘুর মাংস খাইনি। শৈশবে সেইএকবার ঘুঘুর মাংস খেয়েছিলাম বলে আজও এক অপরাধবোধে ভুগি। ঘুঘু শিকারীরা আজও রয়েছে। আবার গ্রামেগঞ্জে মাটির বাড়ির সংখ্যা কমছে, বাড়ছে পাকা বাড়ির সংখ্যা। দুদিকে জাফরি বসানো ভেন্টিলেটর থাকছে পাকা বাড়িগুলোতে। ফলে বাড়িতে ছিট ঘুঘুর বাসা আজকাল খুব কম দেখা যায়। স্টেশনগুলোর প্লাটফর্মে শেডের নিচে কিংবা স্কুল বিল্ডিংগুলোতে অবশ্য ছিট ঘুঘু পাখিদের এখনও যথেষ্ট পরিমাণে বাসা বাঁধতে দেখি। তাই সুন্দরবন অঞ্চলে ঘুঘুদের এখনও মনে হয় ততটা বিপদ ঘনায়নি। আর তাই এখনও “এখানে ঘুঘুর ডাকে অপরাহ্নে শান্তি আসে মানুষের মনে”। (জীবনানন্দ দাশের কবিতা ‘এখানে ঘুঘুর ডাকে অপরাহ্নে)’ —চলবে।
* সৌম্যকান্তি জানা। সুন্দরবনের ভূমিপুত্র। নিবাস কাকদ্বীপ, দক্ষিণ ২৪ পরগনা। পেশা শিক্ষকতা। নেশা লেখালেখি ও সংস্কৃতি চর্চা। জনবিজ্ঞান আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত। বিজ্ঞান জনপ্রিয়করণের জন্য ‘দ্য সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশন অফ বেঙ্গল ২০১৬ সালে ‘আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু মেমোরিয়াল অ্যাওয়ার্ড’ এবং শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞান লেখক হিসেবে বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদ ২০১৭ সালে ‘অমলেশচন্দ্র তালুকদার স্মৃতি সম্মান’ প্রদান করে সম্মানিত করেছে।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content