
শিকার ধরতে উদ্যত লাউডগা। ছবি: এআই সহায়তায় তৈরি।
তখন আমি স্কুলে পড়ি। আমাদের বাড়িতে একটা বকফুলের গাছ ছিল। বেসন দিয়ে বকফুলের ভাজা খেতে খুব ভালো লাগে। আর তাই সকালবেলা বকফুল পাড়তে গিয়েছিলাম। আঁকশি দিয়ে যেই না টান দিয়েছি অমনি গাছ থেকে কী যেন একটা সবুজ লতার মতো ছিটকে এসে পড়েছিল আমার গায়ে। প্রথমটায় ঘাবড়ে গিয়ে লাফিয়ে উঠে গা থেকে ঝেড়ে ফেলে দিয়েছিলুম। তারপর দেখি মাটিতে সবুজ রঙের একটা সাপ। কিছুক্ষণের জন্য থমকে গিয়ে সে পাশেই কেঁউ গাছের জঙ্গলে ঢুকে গেল। সাপটাকে আগেও অনেকবার দেখেছি বাগানের গাছে কিন্তু গায়ে এসে পড়া সেই প্রথম। ছোট থেকেই বাবার কাছ থেকে জেনেছিলাম যে এই সাপের বিষ নেই। তাই ভয় পাওয়ার প্রশ্নই ওঠেনি। আর তাছাড়া সে কামড়ায়ওনি। এরা গেছো সাপ। সবসময় গাছেই ঘোরে, পাতার আড়ালে থাকে। তাই বকফুল পাড়তে গিয়ে বুঝতে পারিনি সে গাছে পাতার আড়ালে ছিল। গাছের শাখায় হঠাৎ জোর ঝাঁকুনিতে ভয় পেয়ে পড়ে গিয়েছে। সে যাইহোক, এর আগে বা তারপরেও বহুবার দেখেছি। সুন্দরবন অঞ্চলের জনবসতি এলাকায় লাউডগা সাপ প্রায় সর্বত্রই দেখা যায়।
সরু লিকলিকে সবুজ রঙের সাপ। অনেকটা লাউ ডাঁটার মতো সরু। মনে হয় এই কারণেই ওর বাংলা নাম হয়েছে লাউডগা। ইংরেজিতে এই সাপের নাম হল ‘Common Green Whip Snake’। চাবুকের মতো সরু বলে নাম হয়েছে ‘Whip’। ইংরেজিতে আরও একটা নাম আছে ‘Vine snake’। লতার মতো সরু বলেই এই নাম। বিজ্ঞানসম্মত নাম ‘Ahaetulla nasuta’। এদের গড় দৈর্ঘ্য ১.৩ মিটার। পুরুষদের দৈর্ঘ্য স্ত্রী লাউডগার থেকে কম। গায়ের রং কচি কলাপাতা বা টিয়াপাখির গায়ের মতো সবুজ। তবে পিঠের দিকে সাদা ও কালো পর্যায়ক্রমিক ছিট দাগ দেখা যায়। দেহের সামনের দিকে দাগগুলো পেছনের তুলনায় বেশি স্পষ্ট। পেটের দিকের রং হালকা সবুজ।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৭০ : কালনাগিনী

রহস্য উপন্যাস: হ্যালো বাবু! পর্ব-১৫৯: হার্ড ড্রাইভ হত্যারহস্য

বিশেষ নিবন্ধ : মুকুন্দ দাস: স্বদেশ জাগরণের চারণকবি

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৯২: সেদিনের একটি সংকেত
লাউডগা সাপের মাথা ভারি অদ্ভুত। তিনকোনা মাথার সামনের দিকটা অনেকটা সূচালো। আসলে এদের নাক বেশ লম্বা। নাকের আগায় রয়েছে ছোট্ট একটা নরম মাংসপেশি। লেজটা বেশ লম্বা এবং গোল। তবে শরীরের সামনের দিক অনেকটা তিনকোনা (প্রস্থচ্ছেদে)। মাথা অনেকটা চওড়া হওয়ায় গলা স্পষ্ট বোঝা যায়। মাথার দুপাশে একটু উঁচুতে রয়েছে দুটো বড় বড় চোখ। চোখের ওপরে ভ্রূর মতো একটা উঁচু অংশ রয়েছে যা সুপ্রা অকুলার শিল্ড থেকে তৈরি। চোখের তারা বেশ বড় এবং কনীনিকা লম্বা ও অনুভূমিক ভাবে বিস্তৃত। কনীনিকা ঘিরে একটা হালকা হলুদ রঙের দাগ রয়েছে। নাসারন্ধ্র সূচালো, নাকের ঠিক পেছনে, চোখের থেকে অনেকটাই এগিয়ে অবস্থান করছে। হাঁ করলে লাউডগা সাপের মুখটা বেশ বড় দেখায়। এদের উপরের চোয়ালে ১২-১৫ টি দাঁত রয়েছে। দুই প্রান্তে দুটি শেষ দাঁত একটু বড় এবং ভেতরে নালিযুক্ত। এই দুটি হল বিষদাঁত। কিন্তু দাঁত দুটি আকারে ছোট এবং পেছনের দিকে বাঁকা হওয়ায় কাউকে দংশন করলে সহজে এই দুটি দাঁত দংশিত স্থানে গাঁথে না। তাছাড়া এদের বিষথলিতে অতি সামান্য পরিমাণ বিষ থাকে।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৮১: শিশুপালের মৃত্যু, এক সাধারণের নির্মম পরিণতি

শারদীয়া স্পেশাল, রাজীব হত্যা : অমীমাংসিত প্রশ্নচিহ্ন অনিন্দ্য ভুক্ত
দেখা গেছে, একটা ১৫ গ্রাম ওজনের টিকটিকিকে কামড়ানোর পর মুখ থেকে ছাড়িয়ে নিলে টিকটিকিটি দিব্যি বেঁচে যায়। এ থেকেই বোঝা যায় এদের বিষক্রিয়ার জোর!! যদিও বা মানুষকে কখনো কামড়ে দেয়, তাহলে ক্ষতস্থানে নির্বিষ সাপের মতো দংশন দাগ তৈরি হয়। সেই দাগ অনেকটা অর্ধচন্দ্রাকার এবং আঁচড়ে যাওয়ার মতো সামান্য ক্ষত। যদি রক্তপাত হয় তাহলে দু-তিন মিনিটের মধ্যেই বন্ধ হয়ে যায়। সামান্য যন্ত্রণাদায়ক অনুভূতি এবং ক্ষতস্থান সামান্য ফুলে ওঠা ছাড়া আর কিছু হয় না। ক্ষতস্থানে সামান্য জীবাণুনাশক দিয়ে পরিষ্কার করে দিলেই চলে। ৪-৫ দিনের মধ্যেই আপনাআপনি ক্ষতস্থান শুকিয়ে যায়।

সতর্ক লাউডগা। ছবি: এআই সহায়তায় তৈরি।
লাউডগা সাপ গাছে গাছেই ঘোরে। খুব প্রয়োজন না হলে এরা মাটিতে নামে না। এক গাছ থেকে আর এক গাছে বা এক শাখা থেকে আর এক শাখায় লাফ দিয়ে যেতে পারে। যদি একটি গাছ থেকে আরেকটি গাছের দূরত্ব কিছুটা বেশি হয় তাহলে মাটিতে নেমে আসতে পারে। আবার অনেক সময় গাছ থেকে লাফিয়ে মাটিতে নেমেও শিকার ধরে। একেবারে গেরিলা কায়দায় লাউডগা শিকার ধরে। পাতার আড়ালে দেহের রঙের কারণে নিজেকে চমৎকার লুকিয়ে রাখতে পারে। তারপর সুযোগ বুঝে ঝাঁপিয়ে পড়ে শিকারের উপর। এদের খাদ্য তালিকায় রয়েছে টিকটিকি, গিরগিটি, গেছো ব্যাঙ, ছোট ইঁদুর, পাখির বাচ্চা বা ছোট পাখি, আরশোলাসহ নানা পোকামাকড় ইত্যাদি।
আরও পড়ুন:

দশমী

শারদীয়ার গল্প/২ : কনটেন্ট
শোনা যায় কখনও কখনও অন্য সাপের বাচ্চা ধরেও খায়। এরা শিকারকে কামড়ে ধরার পর যতক্ষণ না শিকার নিস্তেজ হয়ে যায় ততক্ষণ এরা তাকে গেলে না। এরা দিবাচর সাপ। গ্রীষ্মকালে সকালের দিকে আর শীতকালে বেলা বাড়লে আস্তানা থেকে বেরিয়ে এসে শিকার করে। এদের আস্তানা হল গাছের কোটর নয়তো পাতার ঘন ঝোপ। এরা অনেক সময় গাছের শাখা লেজে পেঁচিয়ে নিচের দিকে মাথা করে ঝোলে বা এই ভঙ্গিমায় থেকে দোল খেয়ে অন্য গাছে বা শাখায় যায়। এরা জোরে ছুটতে পারে না, কিন্তু তিড়িং তিড়িং লাফাতে পারে! কুন্ডলী পাকাতে তেমন দেখা যায় না। বিপদ বুঝলে বা ধরতে গেলে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে কম, বরং কামড়ানোর ভয় দেখায় বা কামড়ে দেয়। অনেক সময় জোরে জোরে ফোঁসফোস করে শ্বাস নেয় আর শরীরটাকে সামান্য ফুলিয়ে দেয়। এদের দৃষ্টিশক্তি অন্যান্য সাপের তুলনায় অনেক বেশি। হয়তো দূরে থেকে শিকারকে লক্ষ্য করার জন্য এদের এমন অভিযোজন হয়েছে। সুন্দরবন অঞ্চলের বহু মানুষকে বলতে শোনা যায় লাউডগা সাপ মানুষের চোখ তুলে নেয়। এটি একেবারেই ভ্রান্তবিশ্বাস। লাউডগা সাপের বড় বড় চোখ এবং ভয় পেলে বড় হাঁ করে ভয় দেখানোর ভঙ্গিমা থেকেই সম্ভবত এই ভ্রান্তবিশ্বাসের জন্ম।
আরও পড়ুন:

দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৯ : নয়া ভুবনের প্রজাপতি

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-১১৩ : ত্রিপুরায় আহোম রাজদূতের গুপ্তচর নিয়োগ/১
লাউডগা সাপ সাধারণত দু’বছর বয়সে প্রজননে সক্ষম হয়। জানুয়ারি ফেব্রুয়ারি মাস হল এদের প্রজনন ঋতু। স্ত্রী লাউডগা সাপ ডিম পাড়ে না, বাচ্চা প্রসব করে। যৌন মিলনের ৬০-৭০ দিন পর ১৫-১৬টি বাচ্চার জন্ম দেয়। আসলে এদের ডিম পেটের মধ্যেই থেকে যায়, আর সেখানেই ডিম ফুটে বাচ্চাদের জন্ম হয়। সদ্য জন্মানো বাচ্চারা চলতে পারে এবং নিজেই খাবার সংগ্রহ করতে পারে।

পাতার রঙের সাথে মিশে লাউডগা। ছবি: এআই সহায়তায় তৈরি।
শোনা যায় লাউডগা সাপের চমৎকার রঙ ও রূপের জন্য বেদেরা বা সাপের চোরাকারবারিরা লাউডগা সাপ ধরে বিক্রি করে। সরু কঞ্চির মাথায় ফাঁস তৈরি করে তা দিয়ে গাছ, লতাপাতা ও ঝোপঝাড় থেকে লাউডগা সাপ ধরে। জঙ্গল গাছগাছালি ঝোপঝাড় সাফ করে সুন্দরবন অঞ্চলের যত জনবসতি গড়ে উঠছে ততই এরা খাদ্য ও বাসস্থান হারাচ্ছে। যদিও প্রকৃতির এই সুন্দর প্রাণীটি এখন বিপদগ্রস্ত নয় তবুও আমাদের সচেতন থাকতে হবে ও ওদের ভালবাসতে হবে যাতে আদূর ভবিষ্যতে বিপন্ন না হয়ে পড়ে।—চলবে।
* সৌম্যকান্তি জানা। সুন্দরবনের ভূমিপুত্র। নিবাস কাকদ্বীপ, দক্ষিণ ২৪ পরগনা। পেশা শিক্ষকতা। নেশা লেখালেখি ও সংস্কৃতি চর্চা। জনবিজ্ঞান আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত। বিজ্ঞান জনপ্রিয়করণের জন্য ‘দ্য সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশন অফ বেঙ্গল ২০১৬ সালে ‘আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু মেমোরিয়াল অ্যাওয়ার্ড’ এবং শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞান লেখক হিসেবে বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদ ২০১৭ সালে ‘অমলেশচন্দ্র তালুকদার স্মৃতি সম্মান’ প্রদান করে সম্মানিত করেছে।


















