
ছবি: প্রতীকী।
যুধিষ্ঠির-আয়োজিত রাজসূয়মহাযজ্ঞের আসরে আহূত রাজা শিশুপাল কৃষ্ণের অর্চনার বিরোধিতা করলেন। কুরুপিতামহ ভীষ্মের পরামর্শ অনুযায়ী, রাজা যুধিষ্ঠির কৃষ্ণকে অর্ঘ্যদান করেছিলেন। তাই শিশুপালের আক্রমণের লক্ষ্য হলেন ভীষ্ম। বহু সমালোচনায় বিদ্ধ প্রবীণতম কুরুপ্রধান ভীষ্ম অবশেষে জানালেন, যজ্ঞসভায় উপস্থিত কৃষ্ণকে পাণ্ডবরা অর্ঘ্য প্রদান করেছেন সেই কৃষ্ণ স্বয়ং উপস্থিত রয়েছেন। তাঁর বিরুদ্ধে শিশুপালসহ সমবেত রাজাদের যুদ্ধে আহ্বান জানালেন ভীষ্ম। এষ তিষ্ঠতি গোবিন্দঃ পূজিতোঽস্মাভিরচ্যুতঃ। যস্য বা ত্বরতে বুদ্ধির্মরণায় স মাধবম্।। কৃষ্ণমাহ্বয়তামদ্য যুদ্ধে চক্রগদাধরম্। যাবদস্যৈব দেবস্য দেহং বিশতু পাতিতঃ।। যাঁর মরণের ইচ্ছা জেগেছে তিনি যুদ্ধে চক্র ও গদাধারণকারী কৃষ্ণকে আহ্বান জানান। কৃষ্ণের হাতে মৃত্যু বরণ করলে তাঁর দেহে লীন হয়ে যাবেন।
ভীষ্মের কথা শুনে, বিশ্বব্যাপী যাঁর পরাক্রম সেই কৃষ্ণের বিরুদ্ধে যুদ্ধে উৎসুক শিশুপাল, বাসুদেবকে রণে আহ্বান জানালেন। আহ্বয়ে ত্বাং ময়া সার্দ্ধং রণং গচ্ছ জনার্দ্দন!। যাবদদ্য নিহন্মি ত্বাং সহিতং সর্ব্বপাণ্ডবৈঃ।। জনার্দ্দন তোমাকে আহ্বান জানাই, যুদ্ধ কর। আজই আমি সমস্ত পাণ্ডবসহ তোমায় হত্যা করব। পাণ্ডবরা কেন তাঁর আক্রমণের লক্ষ্য? কারণ সমস্ত রাজাদের অগ্রাহ্য করে, তাঁরা কৃষ্ণকে অর্চনা করেছেন। শিশুপাল কৃষ্ণকে বললেন, পাণ্ডবরা (কংসের) দাস, রাজা নয়, দুর্বুদ্ধি, সম্মানের অযোগ্য ব্যক্তিকে, পূজ্য মানুষের মতো শৈশব থেকেই পূজা করে আসছেন। তাই আমার ধারণা, পাণ্ডবরা বধযোগ্য। এই বলে রাজা শিশুপাল ক্রুদ্ধ বাঘের মতো গর্জন করতে লাগলেন। শিশুপালের বক্তব্য শেষ হলে, বীর্যবত্তায় শিশুপালের সমকক্ষ কৃষ্ণ, সমস্ত রাজাদের, প্রথমে কোমলস্বরে বললেন, নির্মমপ্রকৃতির সাত্ত্বতীপুত্র শিশুপাল,অপকার করেননি যে আমরা যাদবরা, তাঁদের সঙ্গে অত্যন্ত শত্রুতায় লিপ্ত হয়েছি। আরও বিশদে বর্ণনা করলেন কৃষ্ণ, আমরা প্রাগ্জ্যোতিষপুরে চলে গিয়েছি জেনে, পিসতুতো ভাই হয়েও শিশুপাল নিষ্ঠুরের মতো দ্বারকানগরী দগ্ধ করেছিলেন। তিনি, রৈবতকপর্বতে ক্রীড়ারত দলবল-সহ ভোজরাজকে হত্যা করে ও বেঁধে নিজের নগরে এনেছিলেন। কৃষ্ণ জানালেন, এই পাপিষ্ঠ শিশুপাল যজ্ঞে বিঘ্ন সৃষ্টি করতে কৃষ্ণের পিতার রক্ষিপরিবৃত অশ্বমেধের ঘোড়াটিকে অপহরণ করেছিলেন। যশস্বী বভ্রূর স্ত্রী, এই দ্বারকা থেকে যখন সৌবীরদেশে যাচ্ছিলেন, তখন এই শিশুপাল সেই কামনাহীন (সরলা) মহিলাকে হরণ করেন। নিজের রূপ গোপন করে, এই শিশুপাল, নৃশংসের মতো করূষদেশের রাজার জন্য মাতুলকন্যা এবং বিশালরাজমহিষী অসহায়া ভদ্রাকে অপহরণ করেছিলেন। কৃষ্ণ তাঁর ক্ষোভ প্রকাশ করলেন, পিসিমার জন্যে আমি গভীর দুঃখ সহ্য করেছি, শিশুপালের সৌভাগ্য, তিনি আজ এই রাজাদের কাছেই বিরাজ করছেন। পিতৃষ্বসুঃ কৃতে দুঃখং সুমহন্মর্ষয়াম্যহম্। দিষ্ট্যা ত্বিহ মহীপানাং সন্নিধাবদ্য বর্ত্ততে।।
ভীষ্মের কথা শুনে, বিশ্বব্যাপী যাঁর পরাক্রম সেই কৃষ্ণের বিরুদ্ধে যুদ্ধে উৎসুক শিশুপাল, বাসুদেবকে রণে আহ্বান জানালেন। আহ্বয়ে ত্বাং ময়া সার্দ্ধং রণং গচ্ছ জনার্দ্দন!। যাবদদ্য নিহন্মি ত্বাং সহিতং সর্ব্বপাণ্ডবৈঃ।। জনার্দ্দন তোমাকে আহ্বান জানাই, যুদ্ধ কর। আজই আমি সমস্ত পাণ্ডবসহ তোমায় হত্যা করব। পাণ্ডবরা কেন তাঁর আক্রমণের লক্ষ্য? কারণ সমস্ত রাজাদের অগ্রাহ্য করে, তাঁরা কৃষ্ণকে অর্চনা করেছেন। শিশুপাল কৃষ্ণকে বললেন, পাণ্ডবরা (কংসের) দাস, রাজা নয়, দুর্বুদ্ধি, সম্মানের অযোগ্য ব্যক্তিকে, পূজ্য মানুষের মতো শৈশব থেকেই পূজা করে আসছেন। তাই আমার ধারণা, পাণ্ডবরা বধযোগ্য। এই বলে রাজা শিশুপাল ক্রুদ্ধ বাঘের মতো গর্জন করতে লাগলেন। শিশুপালের বক্তব্য শেষ হলে, বীর্যবত্তায় শিশুপালের সমকক্ষ কৃষ্ণ, সমস্ত রাজাদের, প্রথমে কোমলস্বরে বললেন, নির্মমপ্রকৃতির সাত্ত্বতীপুত্র শিশুপাল,অপকার করেননি যে আমরা যাদবরা, তাঁদের সঙ্গে অত্যন্ত শত্রুতায় লিপ্ত হয়েছি। আরও বিশদে বর্ণনা করলেন কৃষ্ণ, আমরা প্রাগ্জ্যোতিষপুরে চলে গিয়েছি জেনে, পিসতুতো ভাই হয়েও শিশুপাল নিষ্ঠুরের মতো দ্বারকানগরী দগ্ধ করেছিলেন। তিনি, রৈবতকপর্বতে ক্রীড়ারত দলবল-সহ ভোজরাজকে হত্যা করে ও বেঁধে নিজের নগরে এনেছিলেন। কৃষ্ণ জানালেন, এই পাপিষ্ঠ শিশুপাল যজ্ঞে বিঘ্ন সৃষ্টি করতে কৃষ্ণের পিতার রক্ষিপরিবৃত অশ্বমেধের ঘোড়াটিকে অপহরণ করেছিলেন। যশস্বী বভ্রূর স্ত্রী, এই দ্বারকা থেকে যখন সৌবীরদেশে যাচ্ছিলেন, তখন এই শিশুপাল সেই কামনাহীন (সরলা) মহিলাকে হরণ করেন। নিজের রূপ গোপন করে, এই শিশুপাল, নৃশংসের মতো করূষদেশের রাজার জন্য মাতুলকন্যা এবং বিশালরাজমহিষী অসহায়া ভদ্রাকে অপহরণ করেছিলেন। কৃষ্ণ তাঁর ক্ষোভ প্রকাশ করলেন, পিসিমার জন্যে আমি গভীর দুঃখ সহ্য করেছি, শিশুপালের সৌভাগ্য, তিনি আজ এই রাজাদের কাছেই বিরাজ করছেন। পিতৃষ্বসুঃ কৃতে দুঃখং সুমহন্মর্ষয়াম্যহম্। দিষ্ট্যা ত্বিহ মহীপানাং সন্নিধাবদ্য বর্ত্ততে।।
কৃষ্ণ সমবেত রাজাদের বললেন, কৃষ্ণের প্রতি যে সব নিন্দাসূচক আক্রমণ সেগুলি তাঁরা দেখেছেন এবং শিশুপাল তাঁর প্রতি পরোক্ষে যে সব আচরণ করেছেন, সেগুলিও জেনেছেন। কৃষ্ণ জানালেন, এখন তাঁর নিজের প্রতি শিশুপালের এই অসম্মানজনক নিন্দা অসহনীয় হয়ে উঠেছে। ঔদ্ধত্যপূর্ণ গর্বহেতু ক্ষমার অযোগ্য ইনি বধের যোগ্য হয়েছেন। এই মূর্খ মৃত্যুকামী রুক্মিণীকে কামনা করেছিলেন। শূদ্র যেমন বেদবিদ্যা লাভ করতে পারে না, এই মূর্খও রুক্মিণীক লাভ করতে পারেননি। বাসুদেব কৃষ্ণের বক্তব্য শুনে, রাজারা সকলে মিলে চেদিপতি শিশুপালের নিন্দা করতে লাগলেন। কৃষ্ণের কথা শুনে, পরাক্রমশালী শিশুপাল সশব্দে হেসে উঠে বললেন, শিশুপালের প্রার্থিতা ছিলেন রুক্মিণী এই কথা প্রকাশ্যসভায়, বিশেষভাবে রাজাদের সামনে, বলতে কৃষ্ণের লজ্জা বোধ হল না কেন? কৃষ্ণ ভিন্ন আর কোন পুরুষ আছেন কি যিনি নিজের স্ত্রীকে অন্যের কামনার বস্তু মনে করেও সেটা (সগর্বে) ঘোষণা করেন?
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৭৯: রাজসূয়যজ্ঞে চেদিপতি শিশুপাল ও কুরুপ্রধান ভীষ্মের কথোপকথনে সদর্থক ও নঞর্থক চিন্তার সংঘাত,মহাকাব্যে প্রতিফলিত জীবনবোধ

উপন্যাস, পর্ব-৯৩ : আকাশ এখনও মেঘলা

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৭০ : কালনাগিনী

শারদীয়ার গল্প/১ : ষষ্ঠীর সন্ধ্যা
শিশুপাল কৃষ্ণের কথা গ্রাহ্য করলেন না। তিনি জানালেন, কৃষ্ণ ইচ্ছানুসারে শিশুপালকে ক্ষমা করতে পারেন বা নাও পারেন। কৃষ্ণ তাঁর প্রতি ক্রুদ্ধ হলে বা প্রসন্ন হলে তার কি আর হবে?শিশুপাল এই সব কথা বলতে থাকলেন, সেই অবস্থায় ভগবান মধুসূদন,চক্র দিয়ে মহাবাহু শিশুপালের মাথা তাঁর দেহ হতে হরণ করলেন। মহাবলশালী শিশুপাল,বিদ্যুৎস্পৃষ্ট পর্বতের মতো পড়ে গেলেন। উপস্থিত রাজারা দেখলেন চেদিপতির শরীর থেকে শ্রেষ্ঠ তেজ, আকাশে স্থিত সূর্যের তেজের মতো হয়ে নির্গত হল। তার পরে সেই তেজ পদ্মপাতার মতো যাঁর চোখ, ত্রিলোকপূজ্য, কৃষ্ণকে বন্দনা করে তাঁর শরীরে প্রবেশ করল। মহাবাহু পুরুষোত্তমের শরীরে প্রবেশরত তেজ দেখে, সমস্ত রাজারা অদ্ভুত বলে মনে করলেন। কৃষ্ণের হাতে নিহত হলেন শিশুপাল। সেই সময়ে মেঘবিহীন আকাশ হতে ধারাবর্ষণ হল, প্রজ্বলিত বজ্রপাত হল, কেঁপে উঠল পৃথিবী। সেই অবর্ণনীয় সময়ে, জনার্দনকে দেখতে দেখতে কোনও কোনও রাজার মুখে কথা ফুটল না। কথাবার্তার আর সময় না থাকায়,অন্য ক্রোধান্ধ রাজারা,রাগে হাতের আঙুল ঘষতে লাগলেন, দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়ে ধরে জনার্দনকে দেখতে লাগলেন।গোপনে কেউ কৃষ্ণের প্রশংসা করলেন,কেউ ক্রুদ্ধ হলেন, কেউ বা মধ্যস্থতা (বিবাদনিষ্পত্তির জন্যে) করতে আগ্রহী হলেন। সন্তুষ্ট হয়ে, স্তুতিরত মহর্ষি, মহান ব্রাহ্মণ এবং মহাবলবান রাজারা কৃষ্ণের কাছে গেলেন। কৃষ্ণের পরাক্রম দেখে নিশ্চিন্ত হয়ে সকলে প্রশংসা করতে লাগলেন। জ্যেষ্ঠ পাণ্ডব যুধিষ্ঠির, সাদরে ভাইদের বললেন, অবিলম্বে দমযোধের বীরপুত্র শিশুপালের অন্তিম সংস্কার সম্পন্ন কর। দমযোধাত্মজং বীরং সৎকারয়ত চিরম্। তখন ভাইরা জ্যেষ্ঠর আদেশ পালন করলেন। পৃথাপুত্র যুধিষ্ঠির, রাজাদের সঙ্গে মিলিত হয়ে, রাজা শিশুপালের পুত্রকে চেদিরাজ্যে অভিষিক্ত করলেন। কুরুরাজের সব কাজে সমৃদ্ধিহেতু রাজসূয়যজ্ঞ আনন্দদায়ক বিশাল উৎসবে পরিণত হল। কেশবের সুরক্ষায় সমস্ত বিপদ অপসারিত হয়ে, সুখে আরম্ভ হল সেই যজ্ঞ। সেই যজ্ঞ হল প্রভূত ধন, ধান্য, অন্ন এবং নানাপ্রকার ভোজ্যে পরিপূর্ণ। যুধিষ্ঠির রাজসূয়যজ্ঞ সম্পন্ন করলেন।যজ্ঞানুষ্ঠানের শেষ পর্যন্ত রাজা শূরের বংশজাত,মহাবীর, মহান কৃষ্ণ, শার্ঙ্গনামে ধনুক, সুদর্শন চক্র এবং কৌমোদকী নামে গদা ধারণ করে সেই যজ্ঞ রক্ষা করলেন। বিশাল রাজসূয়যজ্ঞের সমাপনান্তে, রাজা যুধিষ্ঠির আনুষ্ঠানিক অবভৃত নামক পুণ্যস্নান করলেন। পৃথিবীবাসী ক্ষত্রিয়রা যুধিষ্ঠিরকে বললেন, সৌভাগ্যক্রমে রাজা যুধিষ্ঠিরের উন্নতি হয়েছে। তিনি সাম্রাজ্য লাভ করেছেন। রাজা অজমীঢ়ের বংশধর আজমীঢ় যুধিষ্ঠির, অজমীঢ়বংশের যশ বৃদ্ধি করেছেন। রাজারা প্রস্থানের অনুমতি প্রার্থনা করলেন, রাজশ্রেষ্ঠ যুধিষ্ঠির এই যজ্ঞ করে, সুমহান ধর্মকাজ সম্পন্ন করেছেন, রাজাদের সমস্ত কামনা পূরণ করে তাঁদের সম্মানিত করেছেন। স্বরাষ্ট্রাণি গমিষ্যামস্তদনুজ্ঞাতুমর্হসি নিজরাজ্যে ফিরে যাব, আপনার অনুমতি প্রয়োজন। তাঁদের অনুরোধ শুনে ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির, রাজাদের যথাযোগ্য সমাদরসহ পূজা করে, ভাইদের নির্দেশ দিলেন, সানন্দে আমাদের কাছে এসেছেন এই রাজারা। যুধিষ্ঠিরকে জিজ্ঞাসা করে তাঁরা নিজেদের দেশে ফিরে যাচ্ছেন। রাজ্যের শেষ প্রান্ত পর্যন্ত তাঁদের অনুগমন করতে নির্দেশ দিলেন যুধিষ্ঠির।
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৯১: কেন পান্থ, চঞ্চলতা!

শারদীয়া স্পেশাল, রাজীব হত্যা : অমীমাংসিত প্রশ্নচিহ্ন অনিন্দ্য ভুক্ত
পরিশেষে তিনি মঙ্গল কামনা করলেন, ভদ্রং (অস্তু) বো। তোমাদের কল্যাণ হোক।জ্যেষ্ঠর আদেশানুসারে ধার্মিক পাণ্ডবরা, প্রধান রাজাদের মধ্যে এক এক জন রাজার অনুগমন করলেন। প্রতাপশালী ধৃষ্টদ্যুম্ন বিরাটরাজার এবং ধনঞ্জয় অর্জুন মহান মহারথ দ্রুপদরাজ যজ্ঞসেনের অনুসরণ করলেন। মহাবলশালী ভীমসেন ভীষ্ম ও ধৃতরাষ্ট্রের, যুদ্ধবিশারদ সহদেব সপুত্র বীর দ্রোণাচার্যের, নকুল রাজা সুবলের অনুগমন করলেন। সুভদ্রাপুত্র অভিমন্যু-সহ দ্রৌপদীর পুত্ররা পার্বত্য রাজাদের এবং ক্ষত্রিয়শ্রেষ্ঠরা অন্যান্য ক্ষত্রিয়দের অনুসরণ করলেন। এইভাবে সুসম্মানিত হাজার হাজার ব্রাহ্মণ ফিরে গেলেন। সমস্ত রাজশ্রেষ্ঠ ও ব্রাহ্মণদের বিদায়ের পরে বাসুদেব যুধিষ্ঠিরকে বললেন, সৌভাগ্যক্রমে আপনি যজ্ঞশ্রেষ্ঠ রাজসূয় সম্পন্ন করেছেন। হে কুরুনন্দন, আমি দ্বারকায় যাব, আপনার অনুমতি প্রার্থনা করছি। আপৃচ্ছে তাং গমিষ্যামি দ্বারকাং কুরুনন্দন!। রাজসূয়ং ক্রতুশ্রেষ্ঠং দিষ্ট্যা ত্বং প্রাপ্তবানসি।। যুধিষ্ঠির জনার্দনকে তাঁর কৃতজ্ঞতা জানালেন, তব প্রসাদাদ্ গোবিন্দ! প্রাপ্তঃ ক্রতুবরো ময়া।। তোমার কৃপায় আমি শ্রেষ্ঠ যজ্ঞ সম্পন্ন করেছি। কৃতজ্ঞ যুধিষ্ঠির বললেন, শুধু কৃষ্ণের অনুগ্রহে তিনি ক্ষত্রিয়দের বশীভূত করেছেন। তাঁরা শ্রেষ্ঠ উপহার-সহ যুধিষ্ঠিরের কাছে এসেছিলেন। সস্নেহে যুধিষ্ঠির বললেন, হে নিষ্পাপ, তোমায় বিদায়ের জন্য আমার অনুমতি? কেন? ওহে বীর, তোমায় ছাড়া আমার আনন্দ কোথায়? কথং ত্বদ্ গমনার্থং মে বাণী বিতরতেঽনঘ!।ন হ্যহং ত্বামৃতে বীর! রতিং প্রাপ্নোমি কর্হিচিৎ।। যুধিষ্ঠির জানালেন, অবশ্যই কৃষ্ণ দ্বারকাপুরীতে ফিরে যাবেন। বিশালকীর্তির অধিকারী হরি তখন ধর্মাত্মা যুধিষ্ঠিরের সঙ্গে সানন্দে উপস্থিত হলেন পিসিমা পৃথা কুন্তীর কাছে। পিসিমাকে, তাঁর পুত্রদের সাম্রাজ্যলাভ, কাজে সাফল্য, আর্থিক সমৃদ্ধি প্রভৃতি বিষয়ে অবহিত করলেন। কৃষ্ণ আরও জানালেন, কুন্তীর অনুমতি নিয়ে তিনি দ্বারকায় ফিরে যেতে উদগ্রীব হয়েছেন। কৃষ্ণ, মধুর আলাপচারিতায় দ্রৌপদী ও সুভদ্রাকে সন্তুষ্ট করে, যুধিষ্ঠির-সহ অন্তঃপুর থেকে বেরিয়ে এলেন। স্নান, জপ ইত্যাদি সম্পন্ন করে ব্রাহ্মণদের স্বস্তিবচন পাঠান্তে, সারথি দারুক, মেঘনীলবরণ সুসজ্জিত রথ নিয়ে উপস্থিত হল। গরুড়ধ্বজ রথ প্রস্তুত দেখে, মহামনা কৃষ্ণ, ডানদিকে আরোহণ করে দ্বারকাপুরীতে প্রস্থান করলেন। লক্ষ্মীমন্ত যুধিষ্ঠির, ভাইদের সঙ্গে নিয়ে পায়ে হেঁটে মহাবলশালী বাসুদেবের পিছনে যেতে লাগলেন। মুহূর্তের জন্যে রথ থামালেন হরি। পুণ্ডরীকাক্ষ কৃষ্ণ, কুন্তীপুত্র যুধিষ্ঠিরকে বললেন, হে কুরুমুখ্য, সর্বদা সতর্ক হয়ে প্রজাপালন করবেন। প্রাণীরা যেমন মেঘের ভরসায় থাকে, পাখিরা মহীরুহের আশ্রিত, দেবতারা সহস্রাক্ষ ইন্দ্রের শরণ নিয়ে থাকেন, তেমনই বন্ধুরা আপনাকেই আশ্রয় করে জীবন যাপন করেন। অপ্রমত্তঃ স্থিতো নিত্যং প্রজাঃ পাহি বিশাংপতে!। পর্জ্জন্যমিব ভূতানি মহাদ্রুমমিব দ্বিজাঃ। বান্ধবাস্ত্বোপজীবন্তুসহস্রাক্ষমিবামরাঃ।। কৃষ্ণ ও পাণ্ডব পরস্পর সম্ভাষণ সেরে,একে অন্যের সম্মতি নিয়ে নিজেদের ভবনের উদ্দেশে যাত্রা করলেন। কৃষ্ণ গেলেন দ্বারকায়। একমাত্র রাজা দুর্যোধন এবং সুবলপুত্র শকুনি সেই দিব্য সভায় বসে রইলেন।
আরও পড়ুন:

দশমী

শারদীয়ার গল্প/২ : কনটেন্ট
যুধিষ্ঠির-আয়োজিত রাজসূয়যজ্ঞে শিশুপাল, পাণ্ডবদের পরম শ্রদ্ধেয় মাননীয় কৃষ্ণের অর্ঘ্যদানের বিরোধিতা করলেন। কথাসূত্রে তিনি প্রবীণ কুরুপিতামহ ভীষ্মের প্রতি অপমানজনক মন্তব্য করতেও ছাড়েননি। কারণ, ভীষ্মের অনুরোধে কৃষ্ণকে সম্মানসূচক অর্ঘ্য দান করা হয়েছিল। যজ্ঞসভায় শিশুপাল ছিলেন একজন আমন্ত্রিত অতিথিমাত্র। তাঁর এই আচরণ অধিকারবহির্ভূত বলে মনে হতে পারে। আয়োজকদের অনুষ্ঠানের অঙ্গ এই অর্ঘ্যদান।তার সমালোচনা করে শিশুপাল বোধ হয় শালীনতাবোধের সীমা লঙ্ঘন করেছিলেন।
শিশুপাল আমাদের দৈনন্দিন আটপৌরে জীবনের যেন নিতান্ত ছাঁপোষা এক সাধারণ জনপ্রতিনিধি, যিনি সহজেই তাঁর তাৎক্ষণিক আবেগপ্রসূত মানসিক প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করে নিজের বিপদ ডেকে আনেন। অদূরদর্শী সাধারণ মানুষ, কোনও শুভ উদ্যোগে সামিল হয়ে স্থান, কাল, পাত্র বিবেচনা না করে গতানুগতিক ত্রুটি বা ছিদ্র অন্বেষণে তৎপর হন। তাঁরা ভুলে যান প্রত্যেকটি বিদ্বেষপূর্ণ আচরণের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে এবং সেই প্রতিক্রিয়ার ফল খুব শুভ নয়। যেমন শিশুপালের একক বাগ্-যুদ্ধে বিদ্বেষমিশ্রিত শাণিত বাক্যবাণ, বুমেরাং হয়ে তাঁর কাছে ফিরে এসেছিল অব্যর্থ সুদর্শন চক্রাকারে, অন্যরূপে। শিশুপালের আক্রমণের মধ্যে ছিল সত্য-অপলাপের প্রচেষ্টা। যাঁরা কোন বিঘ্ন বা গোলযোগ সৃষ্টি করতে ইচ্ছুক তাঁরা যে কোন ঘটনার অপব্যাখ্যা করে উপস্থিত জনমানসে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে সচেষ্ট হন। রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে এই চাপানউতর চলতেই থাকে। তবে বক্তার ভাবমূর্তির নিরিখে ঘটনার যুক্তিগ্রাহ্যতা গৃহীত হয়ে থাকে। রাজসূয়মহাযজ্ঞের আয়োজক ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির। ধর্মাচরণে তাঁর সুখ্যাতির ব্যাপ্তি অপার। কুরুপ্রধান ভীষ্ম তাঁর ভয়ঙ্কর বিবাহবর্জনের সিদ্ধান্তের কারণে তিনি প্রবাদপ্রতিম ব্যক্তিত্ব। এই দুজনের শ্রদ্ধার পাত্র হলেন যদুবংশীয় কৃষ্ণ। তাঁদের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে শিশুপাল নিজেই হয় তো ঘৃণ্য প্রমাণিত হয়েছেন।
শিশুপাল আমাদের দৈনন্দিন আটপৌরে জীবনের যেন নিতান্ত ছাঁপোষা এক সাধারণ জনপ্রতিনিধি, যিনি সহজেই তাঁর তাৎক্ষণিক আবেগপ্রসূত মানসিক প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করে নিজের বিপদ ডেকে আনেন। অদূরদর্শী সাধারণ মানুষ, কোনও শুভ উদ্যোগে সামিল হয়ে স্থান, কাল, পাত্র বিবেচনা না করে গতানুগতিক ত্রুটি বা ছিদ্র অন্বেষণে তৎপর হন। তাঁরা ভুলে যান প্রত্যেকটি বিদ্বেষপূর্ণ আচরণের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে এবং সেই প্রতিক্রিয়ার ফল খুব শুভ নয়। যেমন শিশুপালের একক বাগ্-যুদ্ধে বিদ্বেষমিশ্রিত শাণিত বাক্যবাণ, বুমেরাং হয়ে তাঁর কাছে ফিরে এসেছিল অব্যর্থ সুদর্শন চক্রাকারে, অন্যরূপে। শিশুপালের আক্রমণের মধ্যে ছিল সত্য-অপলাপের প্রচেষ্টা। যাঁরা কোন বিঘ্ন বা গোলযোগ সৃষ্টি করতে ইচ্ছুক তাঁরা যে কোন ঘটনার অপব্যাখ্যা করে উপস্থিত জনমানসে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে সচেষ্ট হন। রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে এই চাপানউতর চলতেই থাকে। তবে বক্তার ভাবমূর্তির নিরিখে ঘটনার যুক্তিগ্রাহ্যতা গৃহীত হয়ে থাকে। রাজসূয়মহাযজ্ঞের আয়োজক ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির। ধর্মাচরণে তাঁর সুখ্যাতির ব্যাপ্তি অপার। কুরুপ্রধান ভীষ্ম তাঁর ভয়ঙ্কর বিবাহবর্জনের সিদ্ধান্তের কারণে তিনি প্রবাদপ্রতিম ব্যক্তিত্ব। এই দুজনের শ্রদ্ধার পাত্র হলেন যদুবংশীয় কৃষ্ণ। তাঁদের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে শিশুপাল নিজেই হয় তো ঘৃণ্য প্রমাণিত হয়েছেন।
আরও পড়ুন:

দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৯ : নয়া ভুবনের প্রজাপতি

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-১১৩ : ত্রিপুরায় আহোম রাজদূতের গুপ্তচর নিয়োগ/১
শিশুপালের আচরণ নিঃসন্দেহে অনায্য এবং অন্যায়। যেহেতু কৃষ্ণ শিশুপালের অন্যায় আচরণের সহনশীলতার একটি মাত্রা নির্ধারণ করেছিলেন। সেটি হল ক্ষমার যোগ্য শত অপরাধ। অপরাধের যদিও গণনা অনুসারে কোন মাত্রা হয় না। অপরাধের গুরুত্ব অনুযায়ী শাস্তির মাত্রা নির্দ্ধারিত হয়ে থাকে।নিজের স্ত্রী নিন্দামূলক আলোচনার বিষয় হলে কোন পুরুষ হয় তো সেটি সহ্য করতে পারেন না। কৃষ্ণও স্ত্রী রুক্মিণীবিষয়ক আলোচনা সহ্য পারেননি। শিশুপাল নিজের দুষ্কর্মের বৃত্তান্ত গোপন করেছিলেন। তাঁর সীমাহীন নৃশংসতার প্রকাশ — পরস্ত্রীহরণ। কীর্তিমান এক যাদবের বিবাহিতা স্ত্রীকে অপহরণ করে তিনি নিজেকে দুর্বৃত্তরূপে প্রমাণ করেছেন। এই বিষয়ে বোধ হয় তিনি রামায়ণের রাবণের সমপর্যায়ভুক্ত, বলেই মনে হয়।শুধুমাত্র এই একটি ঘটনা নয়। শিশুপালের নিষ্ঠুরতার প্রমাণ রয়েছে আরও। তিনি কপটতার আশ্রয় নিয়ে, ছদ্মবেশে, করূষরাজের জন্যে নির্দিষ্ট মাতুলকন্যাকে এবং বিশালরাজমহিষী অসহায়া ভদ্রাকে অপহরণ করেছিলেন। তঞ্চকতার একাধিক উদাহরণ সৃষ্টি করে শিশুপাল, রাবণের থেকেও কয়েক মাত্রা এগিয়ে রয়েছেন। কৃষ্ণের প্রতি শিশুপালের নিন্দনীয় প্রত্যক্ষ অবমাননার প্রকাশ, অতীতের ঘটনার উল্লেখ করে পরোক্ষে বিদ্বেষপূর্ণ ব্যবহার, সমবেত অতিথি রাজারা জেনেছেন এবং শুনেছেন। শিশুপাল, তাঁর ক্ষমাহীন ঔদ্ধত্যের শাস্তি লাভ করেছেন। ইমং ত্বস্য ন শক্ষ্যামি ক্ষন্তুমদ্য ব্যতিক্রমম্। অবলেপাদ্বধার্হস্য সমগ্রে রাজমণ্ডলে।।
তোমার ক্ষমার অযোগ্য অবমাননা সহ্যের সীমা অতিক্রম করেছে। আজই এর শাস্তি হল উপস্থিত রাজমণ্ডলের সামনে হত্যারূপ মৃত্যুদণ্ড। কৃষ্ণের এই ঘোষণা ব্যর্থ হয়নি। এই হুঙ্কার বা সতর্কবার্তার পরেও শিশুপাল অক্লেশে তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলেছেন, কৃষ্ণ, তুমি ক্রুদ্ধ হলে বা প্রসন্ন হলে, তোমার থেকে আমার কি আর হবে? ক্রুদ্ধাদ্বাপি প্রসন্নাদ্বা কিং মে ত্বত্তো ভবিষ্যতি। এই অভিব্যক্তি প্রাকৃত বেপরোয়া সাধারণের, যাঁদের স্বয়ংসৃষ্ট অবিমৃষ্যকারিতার ফলে নির্মম ভবিতব্যের বিনির্মাণ হয় আবহমান যুগান্তরেও। উভয়ের সাদৃশ্য কোথাও আছে কি?—চলবে।
তোমার ক্ষমার অযোগ্য অবমাননা সহ্যের সীমা অতিক্রম করেছে। আজই এর শাস্তি হল উপস্থিত রাজমণ্ডলের সামনে হত্যারূপ মৃত্যুদণ্ড। কৃষ্ণের এই ঘোষণা ব্যর্থ হয়নি। এই হুঙ্কার বা সতর্কবার্তার পরেও শিশুপাল অক্লেশে তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলেছেন, কৃষ্ণ, তুমি ক্রুদ্ধ হলে বা প্রসন্ন হলে, তোমার থেকে আমার কি আর হবে? ক্রুদ্ধাদ্বাপি প্রসন্নাদ্বা কিং মে ত্বত্তো ভবিষ্যতি। এই অভিব্যক্তি প্রাকৃত বেপরোয়া সাধারণের, যাঁদের স্বয়ংসৃষ্ট অবিমৃষ্যকারিতার ফলে নির্মম ভবিতব্যের বিনির্মাণ হয় আবহমান যুগান্তরেও। উভয়ের সাদৃশ্য কোথাও আছে কি?—চলবে।
* মহাকাব্যের কথকতা (Epics monologues of a layman): পাঞ্চালী মুখোপাধ্যায় (Panchali Mukhopadhyay) অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপিকা, সংস্কৃত বিভাগ, যোগমায়া দেবী কলেজে।


















