
ছবি : প্রতীকী।
চাণূক নিহত হল।
রাজা কংস এবং তাঁর অমাত্যকুলের পরিকল্পনায় মল্লযুদ্ধ দেখতে অসিতাঞ্জন নগরের বিপুল জনতা উপস্থিত হয়েছে। মহা উত্তেজনায় তারা কম্পমান। এর নেপথ্যের গূঢ় কারণটি তাদের জানা নেই হয়তো, কিন্তু স্বয়ং নিয়তিই বুঝি সেই রঙ্গভূমির নেপথ্যে চালকের আসনে ছিলেন।
তাই দশভেয়ে দশভাই সেখানে এসে পৌঁছল। তারাই যে একমাত্র লক্ষ্য! রাজানুগ্রহপুষ্ট দুর্জয় দুই মল্লযোদ্ধা চাণূক ও মুষ্টিক তাদের বিনাশ করার জন্য-ই নিয়োজিত। কিন্তু নিয়তির সুগূঢ় অভিপ্রায় স্বয়ং তাঁর-ই জানা ছিল বুঝি!
রাজা কংস এবং তাঁর অমাত্যকুলের পরিকল্পনায় মল্লযুদ্ধ দেখতে অসিতাঞ্জন নগরের বিপুল জনতা উপস্থিত হয়েছে। মহা উত্তেজনায় তারা কম্পমান। এর নেপথ্যের গূঢ় কারণটি তাদের জানা নেই হয়তো, কিন্তু স্বয়ং নিয়তিই বুঝি সেই রঙ্গভূমির নেপথ্যে চালকের আসনে ছিলেন।
তাই দশভেয়ে দশভাই সেখানে এসে পৌঁছল। তারাই যে একমাত্র লক্ষ্য! রাজানুগ্রহপুষ্ট দুর্জয় দুই মল্লযোদ্ধা চাণূক ও মুষ্টিক তাদের বিনাশ করার জন্য-ই নিয়োজিত। কিন্তু নিয়তির সুগূঢ় অভিপ্রায় স্বয়ং তাঁর-ই জানা ছিল বুঝি!
তাই বলদেব সামান্য বলপ্রয়োগেই চাণূক নামের মহাবলীটিকে হত্যা করলেন। এবার সামনে কেবল মুষ্টিক। নামেই অনুমান করা যায় যে মুষ্টিবলে এই যোদ্ধাটি বিশেষ বলীয়ান বোধহয়। রাজা আদেশ দিলেন। মুষ্টিক আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়াল এবার। লম্ফন, গর্জন ও বাহুস্ফোটনে ত্রাস সৃষ্টির চেষ্টা করল। যাঁদের পুরোধা পুরুষটি কালের দুর্বার গতিপথে ক্রমে ক্রমে ধরা প্রকম্পিত করবেন, কিংবা করবেন ভূভারহরণ অথবা ধর্মস্থাপন করবেন “পরিত্রাণায় সাধূনাং বিনাশায় চ দুষ্কৃতাং”, তাঁদের জয় করার সাধ্য কী মুষ্টিকের!
আরও পড়ুন:

উপন্যাস, পর্ব-৮৮ : আকাশ এখনও মেঘলা

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৮৫: আইসিইউ কেবিন নং ২০৪

এআই যুগেও উপনিষদের আবেদন অমলিন, কেন?

বিদ্যাসাগর
যে বিচিত্রকর্মা বলদেব পরবর্তিকালে হলকর্ষণের লাঙল কাঁধে নিয়ে আবির্ভূত হবেন পুরাণেতিহাসের পথে, তিনি এবার-ও মুখোমুখি হলেন মুষ্টিকের। তিনি বলদেব, অমিতবলে বলীয়ান, শৌর্যে সর্বাতিশায়ী। একটি আঘাতেই তিনি মুষ্টিকের দুটি চোখ বিনষ্ট করলেন, পরের আঘাতটিতেই তার শরীরের সকল অস্থি চূর্ণ করে দেওয়ার জন্য উদ্যত হলেন।
বসুন্ধরা বীরভোগ্যা। দ্বৈরথের ভূমি, যুদ্ধের ক্ষেত্র থেকে পলায়ন নাকি কাপুরুষোচিত কাজ। সম্মুখসমর ধর্মযুদ্ধে যোদ্ধার মৃত্যু হলে তার প্রশংসায় শাস্ত্র মুখর হয়েছেন। মুষ্টিক এই প্রবল পরাক্রমের সামনে সিংহমুখে পতিত মুষিকের মতোই আড়ষ্ট হয়ে বারংবার বলতে লাগল “আমি মল্ল নই, আমি মল্ল নই!”
বসুন্ধরা বীরভোগ্যা। দ্বৈরথের ভূমি, যুদ্ধের ক্ষেত্র থেকে পলায়ন নাকি কাপুরুষোচিত কাজ। সম্মুখসমর ধর্মযুদ্ধে যোদ্ধার মৃত্যু হলে তার প্রশংসায় শাস্ত্র মুখর হয়েছেন। মুষ্টিক এই প্রবল পরাক্রমের সামনে সিংহমুখে পতিত মুষিকের মতোই আড়ষ্ট হয়ে বারংবার বলতে লাগল “আমি মল্ল নই, আমি মল্ল নই!”
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৭৭: শিশুপালের একশত অপরাধ ক্ষমার যোগ্য, কেন? এর কোন তাৎপর্য আছে কি?

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-১০৮: স্তাবক-পরিবেষ্টিত রাজা কেবল অন্ধই হন না, নিজের দুর্গেই জ্যান্ত সেদ্ধ হন!
মল্লঃ মল্লায় অলম্, মল্লের সঙ্গে মল্লের-ই যুদ্ধ হতে পারে। মুষ্টিক কি প্রাণভিক্ষা চাইল, নাকি এ এক অসম দ্বৈরথ এমনটাই বলতে চাইল সে?
বলদেব এসব কথায় কর্ণপাত করলেন না। ইনি উগ্র, করুণাঘন নন। তাই “তুমি মল্ল না অমল্ল তা আমার জেনে কাজ নেই” একথা বলেই তার প্রাণহরণ করলেন। হাত দুটি বেঁধে ভূতলে প্রবল এক আছাড়ে-ই মুষ্টিকের ভবলীলা সাঙ্গ করলেন।
বলদেব এসব কথায় কর্ণপাত করলেন না। ইনি উগ্র, করুণাঘন নন। তাই “তুমি মল্ল না অমল্ল তা আমার জেনে কাজ নেই” একথা বলেই তার প্রাণহরণ করলেন। হাত দুটি বেঁধে ভূতলে প্রবল এক আছাড়ে-ই মুষ্টিকের ভবলীলা সাঙ্গ করলেন।
আরও পড়ুন:

জন্মশতবর্ষে উত্তমকুমার : শতফুল বিকশিত হোক

এই দেশ এই মাটি, ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-১১১ : কবি রাজার বিবসনা রমণীর চিত্রাঙ্কন / ৪
মৃত্যুর আগে মুষ্টিক তার শেষ প্রার্থনাটি জানিয়েছিল, হয়তো সেই নিয়তিকেই। তিনি তখন অলক্ষ্যে বসে হাসছিলেন। মুষ্টিক মুক্তির প্রার্থনা করেনি, জীবনের প্রতি নিদারুণ আকর্ষণে সে মরণের পরে যক্ষ হয়ে হত্যাকারীর মাংসভক্ষণের অভিলাষ পোষণ করল।
তার মৃত্যু হল। বলদেব দেহটি নিক্ষেপ করলেন মণ্ডলবৃতির বাইরে। পাঠক হয়তো বিস্ময়ে ভাববেন এখানে দুর্জন কে? দশভেয়ে এই কাহিনিতে দুরাচারী নিপীড়ক। অথচ মল্লভূমির রঙ্গমঞ্চে পেশীবলে তাঁরাই বীরোত্তম হয়ে উঠলেন। শরণাগত শত্রুর প্রাণরক্ষার আকুতিটুকুও এখানে রক্ষিত হয় না। তবে পুরাণেতিহাসে এর নিদর্শন বিরল নয়। রাজনীতি ও ধর্মরক্ষার পথ সরল ও সুগম নয়। তার পদে পদে বিচিত্র বাঁক, জটিল আবর্ত। তাই মুষ্টিককে মরতেই হল। মুষ্টিকদের মরতেই হয়।
তার মৃত্যু হল। বলদেব দেহটি নিক্ষেপ করলেন মণ্ডলবৃতির বাইরে। পাঠক হয়তো বিস্ময়ে ভাববেন এখানে দুর্জন কে? দশভেয়ে এই কাহিনিতে দুরাচারী নিপীড়ক। অথচ মল্লভূমির রঙ্গমঞ্চে পেশীবলে তাঁরাই বীরোত্তম হয়ে উঠলেন। শরণাগত শত্রুর প্রাণরক্ষার আকুতিটুকুও এখানে রক্ষিত হয় না। তবে পুরাণেতিহাসে এর নিদর্শন বিরল নয়। রাজনীতি ও ধর্মরক্ষার পথ সরল ও সুগম নয়। তার পদে পদে বিচিত্র বাঁক, জটিল আবর্ত। তাই মুষ্টিককে মরতেই হল। মুষ্টিকদের মরতেই হয়।
আরও পড়ুন:

দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৯ : নয়া ভুবনের প্রজাপতি

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৬৬: শাঁখামুটি
মুষ্টিক মরে যক্ষ হল। তা-ই সে হতে চেয়েছিল। প্রতিশোধস্পৃহার মহাকাব্যিক ব্যাপ্তি যুগ থেকে যুগান্তরে আবর্তিত হয় কেবল। মুষ্টিক এই নতুন সত্তায় জন্ম নিল কালমাটি নামের একটি বনে। এদিকে, এবার তবে কার পালা? যে আগুন জ্বলে উঠেছে তা কি এখানেই নির্বাপিত হবে নাকি লেলিহান হয়ে ভস্মীভূত করবে গৃহস্থকেই?
অদ্ভুতকর্মা বলদেবের এই ভীষণমূর্তি দেখে ত্রস্ত হয়ে নিরূপায় কংস নির্দেশ দেন — “তোমরা দাঁড়িয়ে দেখছো কী! এখনই দাস দশভেয়েদের বন্দী করো।”
এবার বাসুদেব সক্রিয় হলেন। চক্র প্রয়োগ করে কংস ও উপকংসের মুণ্ডচ্ছেদ করলেন তৎক্ষণাৎ। রাজা-ই যদি না থাকেন তবে রাজাদেশের মূল্য থাকে না। এই ভয়াল পরিস্থিতি সমবেত সকলকেই ত্রস্ত করে তুলল। জনতা ভীত, আতঙ্কিত হয়ে বাসুদেবের শরণাগত হল এবার।
অদ্ভুতকর্মা বলদেবের এই ভীষণমূর্তি দেখে ত্রস্ত হয়ে নিরূপায় কংস নির্দেশ দেন — “তোমরা দাঁড়িয়ে দেখছো কী! এখনই দাস দশভেয়েদের বন্দী করো।”
এবার বাসুদেব সক্রিয় হলেন। চক্র প্রয়োগ করে কংস ও উপকংসের মুণ্ডচ্ছেদ করলেন তৎক্ষণাৎ। রাজা-ই যদি না থাকেন তবে রাজাদেশের মূল্য থাকে না। এই ভয়াল পরিস্থিতি সমবেত সকলকেই ত্রস্ত করে তুলল। জনতা ভীত, আতঙ্কিত হয়ে বাসুদেবের শরণাগত হল এবার।

ছবি : প্রতীকী।
কালের বিচিত্র চক্রাবর্ত কোন অজানার কুলে দুর্জ্ঞেয় সন্ধি আর বিচ্ছেদের নানা গাথা গ্রন্থনা করে রেখে কাকে কখন প্রকট করে তা কে জানে! রাজনীতির রণাঙ্গনেও সেই একই সূত্র। যা এককালে ভবিষ্যতের গর্ভে নিহিত ছিল কেবল, তা অগোচরেই অঙ্কুরিত হয়ে মহীরূহ কিংবা বিষবৃক্ষ হয়ে ওঠে, পটপরিবর্তন হয়ে চলে কেবল। নিয়তি অলক্ষ্যে বসে তাঁর লীলাকে আরো রহস্যঘন করেন। এই বিপুল কালতরঙ্গে যারা কেবল ক্রীড়নক, তাদের মধ্য থেকেই জেগে উঠে ভাবীকালের নিয়ন্তা বলবেন “মামেকং শরণং ব্রজ”।
সমবেত ভয়ার্ত জনতা আজ এই রাষ্ট্রবিপ্লবের কালে বাসুদেবের শরণাগত হল। অসিতাঞ্জন নগর এখন বুঝি পদক্ষেপ করল এক ক্রান্তিকালে। কী হবে এরপর? দেখা যাবে, পরবর্তী পর্বে। —চলবে।
সমবেত ভয়ার্ত জনতা আজ এই রাষ্ট্রবিপ্লবের কালে বাসুদেবের শরণাগত হল। অসিতাঞ্জন নগর এখন বুঝি পদক্ষেপ করল এক ক্রান্তিকালে। কী হবে এরপর? দেখা যাবে, পরবর্তী পর্বে। —চলবে।
* ড. অভিষেক ঘোষ (Abhishek Ghosh) সহকারী অধ্যাপক, বাগনান কলেজ। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগ থেকে স্নাতকস্তরে স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত। স্নাতকোত্তরের পর ইউজিসি নেট জুনিয়র এবং সিনিয়র রিসার্চ ফেলোশিপ পেয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগে সাড়ে তিন বছর পূর্ণসময়ের গবেষক হিসাবে যুক্ত ছিলেন। সাম্বপুরাণের সূর্য-সৌরধর্ম নিয়ে গবেষণা করে পিএইচ. ডি ডিগ্রি লাভ করেন। আগ্রহের বিষয় ভারতবিদ্যা, পুরাণসাহিত্য, সৌরধর্ম, অভিলেখ, লিপিবিদ্যা, প্রাচ্যদর্শন, সাহিত্যতত্ত্ব, চিত্রকলা, বাংলার ধ্রুপদী ও আধুনিক সাহিত্যসম্ভার। মৌলিক রসসিক্ত লেখালেখি মূলত: ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে। গবেষণামূলক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়ে চলেছে বিভিন্ন জার্নাল ও সম্পাদিত গ্রন্থে। সাম্প্রতিক অতীতে ডিজিটাল আর্ট প্রদর্শিত হয়েছে আর্ট গ্যালারিতে, বিদেশেও নির্বাচিত হয়েছেন অনলাইন চিত্রপ্রদর্শনীতে। ফেসবুক পেজ, ইন্সটাগ্রামের মাধ্যমে নিয়মিত দর্শকের কাছে পৌঁছে দেন নিজের চিত্রকলা। এখানে একসঙ্গে হাতে তুলে নিয়েছেন কলম ও তুলি। লিখছেন রম্যরচনা, অলংকরণ করছেন একইসঙ্গে।


















