কলকাতায় বৃষ্টি

উজ্জ্বল কৈলাসহর। ছবি : সংগ্রহীত।

একদিকে মণুর মতো পবিত্র এক নদী এবং অপরদিকে রয়েছে ঊনকোটির মতো এক ভাস্কর্যের পাহাড়। মাঝের জনপদটি যে তাই শিক্ষা-সংস্কৃতির ঐতিহ্যের আলোয় উদ্ভাসিত থাকবে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না!

কৈলাসহর ত্রিপুরার এক প্রাচীন জনপদ। সুদূর অতীতে ত্রিপুরার রাজাদের রাজপাট ছিল এখানে। এই অঞ্চলের প্রাচীনত্বের অন্যতম নিদর্শন হচ্ছে প্রত্নতাত্ত্বিক পীঠভূমি ঊনকোটি। সুদূর অতীতে কে কবে এই পাহাড়ের গায়ে পাথর কেটে তৈরি করেছিল আশ্চর্য সব বিগ্রহ তা আজও প্রায় অনাবিষ্কৃত। ঊনকোটি যেন সন্নিহিত অঞ্চলটিতে প্রাচীন এক সভ্যতার সাক্ষ্যই বহন করছে। জনপদের পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে পুণ্য সলিলা মণু।

ত্রিপুরার রাজাদের কীর্তি কাহিনি নির্ভর প্রাচীন কাব্য গাঁথা ‘রাজমালা’-তে উল্লেখিত ‘ছাম্বুলনগর’কেই প্রাচীন কৈলাসহর বলে নির্দেশ করেছেন কেউ কেউ। ত্রিপুরার ঐতিহাসিক যুগের অনেক আগেকার রাজা বিমারের পুত্র কুমার ছাম্বুলনগরে শিবের আরাধনা করেছিলেন বলে সংস্কৃত ও বাংলা ‘রাজমালা’তে উল্লেখ পাওয়া যায়। মণু নদী প্রসঙ্গে ‘রাজমালা’-তে রয়েছে মহর্ষি মণু এই নদীর তীরে তপস্যা করার পর থেকেই মণু নদী এক পবিত্র নদীতে পর্যবসিত হয়।
কৈলাসহরে এক সময় ত্রিপুরার রাজধানী থাকার কথা জানা যায়। ‘শ্রীরাজমালা’র সম্পাদক কালীপ্রসন্ন সেনও এখানে দীর্ঘদিন রাজধানী প্রতিষ্ঠার কথা লিখেছেন। কিন্তু ঠিক কোন সময়ে ছিল সে রাজধানী? ঐতিহাসিক যুগের আগেকার কাহিনি প্রসঙ্গে ‘রাজমালা’ অনুসারে শ্রীসেন লিখেছেন, “…তখন মহারাজ প্রতীত রমণীকে লইয়া হেড়ম্ব রাজ্য পরিত্যাগ পূর্ব্বক খলংমায় আসিয়াছিলেন। কাছাড়পতি সসৈন্যে পশ্চাদনুসরণ করায় এই সময়ই প্রতীত খলংমায় রাজধানী পরিত্যাগ করিয়া ধর্ম্মনগরে এক নূতন রাজধানী স্হাপন করিয়েছিলেন। ইহার পরে কৈলাসহরে,তথা হইতে কৈলারগড়ে (কসবায়) রাজধানী পরিবর্তিত হয়।…” উল্লেখ করা যায় যে, ‘রাজমালা’ অনুসারে সুপ্রাচীন কালে রাজা ত্রিলোচনের সময় পর্যন্ত ত্রিবেগই ছিল রাজধানী। ভ্রাতৃবিরোধের ফলে ত্রিলোচন পুত্র দাক্ষিণ এই রাজধানী পরিত্যাগ করে বরবক্র (বরাক) নদীর তীরে ‘খলংমা’ নামক স্হানে স্হাপন করেছিলেন নতুন রাজপাট। প্রতীতের সময় খলংমা রাজধানী পরিত্যক্ত হয়েছিল। ‘রাজমালা’র বিবরণের পাশাপাশি অপেক্ষাকৃত আধুনিক কালের ঐতিহাসিকগণও উল্লেখ করেছেন যে, ত্রিপুরার রাজাগণ ক্রমে ক্রমে দক্ষিণ দিকে তাদের রাজ্য বিস্তার ঘটিয়েছিলেন। দক্ষিণ দিকে রাজধানী স্থানান্তরের পর্বে কোনও এক সময়ে কৈলাসহরে রাজধানী প্রতিষ্ঠা হয়েছিল। কৈলাসচন্দ্র সিংহ তাঁর সুবিখ্যাত ‘রাজমালা বা ত্রিপুরার ইতিহাস’ গ্রন্হে লিখেছেন, “… কাছাড়পতিগণ যে রূপ দিমাপুর পরিত্যাগ করিয়া দক্ষিণ দিকে অগ্রসর হইতেছিলেন, ত্রিপুরাপতিগণও সেই রূপ দক্ষিণ দিকে আপনাদের রাজ্য বিস্তারের জন্য যত্নবান হইয়াছিলেন। এই সময় মণু নদীর নিকটবর্তী স্হানে ত্রিপুরার রাজপাট সংস্থাপিত ছিল। তদনন্তর তাহা কৈলারগড়ে উঠিয়া আসে। প্রাচীন মুসলমান ইতিহাসে কৈলারগড় ‘জাজীনগর’ আখ্যায় আখ্যাত হইয়াছে।…”
এই সব অবশ্য ঐতিহাসিক যুগের আগে প্রাক মাণিক্য যুগের কথা। উল্লেখ করা যায় যে,মুদ্রার সাক্ষ্য সহ অন্যান্য ঐতিহাসিক বিবরণাদি অনুসারে পঞ্চদশ শতকে ত্রিপুরায় মাণিক্য রাজবংশের প্রতিষ্ঠা হয়। মাণিক্য যুগেও একাধিকবার কৈলাসহর সহ সন্নিহিত অঞ্চলে ত্রিপুরার রাজাদের অস্হায়ী রাজপাট স্হাপনের কথা জানা যায়। যাইহোক, ‘রাজমালা’-তে যেমন রয়েছে, তেমনই পরবর্তীকালেও ঐতিহাসিকগণ কৈলাসহরে ত্রিপুর নৃপতিদের রাজপাট প্রতিষ্ঠার উল্লেখ করে গেছেন। ত্রিপুরার অপেক্ষাকৃত আধুনিক কালের নৃপতি রাধাকিশোর মাণিক্যের (১৮৯৬-১৯০৯ খ্রি:) সভাপণ্ডিত চন্দ্রোদয় বিদ্যাবিনোদ কৈলাসহরের ইতিহাস লিপিবদ্ধ করে গিয়েছেন তাঁর ‘শ্রীশ্রী যুতের কৈলাসহর ভ্রমণ’ পুস্তিকায়। তাতেও তিনি উল্লেখ করেছেন অতীতে কৈলাসহরে ত্রিপুরার রাজধানী ছিল। কৈলাসহরের রাজবাড়ি সম্পর্কে তিনি লিখেছেন, “এই রাজবাটী প্রাচীন মণু নদীর পূর্ব্ব তীরে অবস্থিত, অধুনা মণু প্রায় এক মাইল পশ্চিমে সরিয়া গিয়াছে।…রাজবাটীর দক্ষিণ ও পূর্ব্বদিকে একটি বিল। এক সময় ইহা একটি গভীর হ্রদ ছিল, বেশ বুঝা যায়।”

কৈলাসহরের অদূরে প্রত্নভূমি ঊনকোটিও এক সুদীর্ঘ ঐতিহ্য আর সমৃদ্ধ অতীতের সাক্ষী হয়ে আছে। স্বাভাবিকভাবেই এমনটা ধারণা করা যায় যে, রাজন্য পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া দুর্গম পাহাড়ে এমন সৃষ্টি প্রায় অসম্ভব। কিন্তু পঞ্চদশ শতকে শুক্রেশ্বর ও বাণেশ্বর কর্তৃক রচিত ‘রাজমালা’ ঊনকোটির ভাস্কর্যের নির্মাণ কার্য্য সম্পর্কে আশ্চর্যজনক ভাবে নীরব! এ থেকে ধারণা হয় যে, মাণিক্য যুগের পূর্ববর্তী নৃপতিদের পৃষ্ঠপোষকতায় হয়তো ঊনকোটির ভাস্কর্য সমূহ নির্মিত হয়েছিল। অনুমান করা যায়, কৈলাসহরে যখন রাজধানী ছিল তখনই সম্ভবত তদানীন্তন রাজার পৃষ্ঠপোষকতায় শুরু হয়েছিল ঊনকোটির নির্মাণ কাজ।

যাইহোক, প্রাচীন কৈলাসহরের কোনও ধারাবাহিক ইতিহাস না পাওয়া গেলেও এটি যে খুব সমৃদ্ধ জনপদ ছিল তা জানা যায় বিভিন্ন লেখকদের বিবরণ থেকেও। ১৯২৭ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত ‘ত্রিপুরা রাজ্যে ত্রিশ বৎসরঃকৈলাসহর বিভাগ’ গ্রন্থে ব্রজেন্দ্র চন্দ্র দত্ত লিখেছেন যে, কৈলাসহরের প্রাচীন ইতিহাস ঊনকোটি এবং শ্রীহট্ট ও ময়মনসিংহের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িত বলে মনে করা যেতে পারে। তিনি লিখেছেন, ‘এই স্হান বিশেষ সমৃদ্ধপূর্ণ ছিল বলে অনুমিত হয়।’

প্রাচীন জনপদ কৈলাসহরের সুস্পষ্ট ধারাবাহিক অতীত ইতিহাস জানা না গেলেও প্রায় দেড়শ বছর আগেই যে এই অঞ্চলে শিক্ষার আলো প্রজ্জ্বলিত হয়েছিল তা বোঝা যায়। মহারাজ বীরচন্দ্রের রাজত্বকালে ১৮৭২ খ্রিস্টাব্দে ত্রিপুরায় প্রথম উপবিভাগের সৃষ্টি হয়েছিল কৈলাসহরে। বাবু দুর্গাপ্রসাদ গুপ্ত নিযুক্ত হয়েছিলেন এর তত্ত্বাবধায়ক। তিনি কৈলাসহর এসে রাস্তাঘাট নির্মাণ, অফিস স্হাপন ইত্যাদি কাজের পাশাপাশি ‘যুবরাজ স্কুল’ নামে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ও স্হাপন করেন। এটা মনে করা হয় যে,সেদিনের ‘যুবরাজ স্কুল’টিই পরবর্তীকালে আরকেআই-তে পরিণত হয়।

১৯০৩ সালে মহারাজ রাধাকিশোর মাণিক্য তাঁর কৈলাসহর সফরকালে বুনিয়াদী বিদ্যালয়কে হাইস্কুলে উন্নীত করার ঘোষণা দেন। ততদিনে অবশ্য ‘যুবরাজ স্কুল’ বুনিয়াদী স্তরে উন্নীত হয়ে গিয়েছিল। মহারাজের ঘোষণার পর হয় হাইস্কুল এবং নামকরণ হয় ‘রাধাকিশোর ইনস্টিটিউশন’। ১৯০২ সালের ত্রিপুরা এডমিনিস্ট্রেশন রিপোর্ট অনুসারে জানা যায় যে,সে সময়ে রাজ্যে মোট ৭৩টি বিদ্যালয় ছিল এবং ছাত্র সংখ্যা ছিল ২৪১৯। সে সময়ে রাজ্যের মোট বিদ্যালয়ের মধ্যে আগরতলায় ছিল ২৪টি এবং কৈলাসহরে ছিল ১৮টি। ১৯০৫-০৬ সালের এডমিনিস্ট্রেশন রিপোর্ট অনুসারে ত্রিপুরায় ১৯০৪ সালে পাঠশালা সহ সর্ব স্তরের বিদ্যালয় ছিল মোট ১০৪টি এবং ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা ছিল ৩,৭২৭। সে সময় রাজ্যে দু’টি ইংরেজী বিদ্যালয় ছিল। এর মধ্যে একটি আগরতলায় এবং অপরটি ছিল কৈলাসহরে। এই সব তথ্য থেকে এটা বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে এবং বিংশ শতাব্দীর শুরুতে কৈলাসহরের শিক্ষা চিত্রটা রাজধানীর প্রায় অনুরূপ ছিল।
আরও পড়ুন:

বিচিত্রের বৈচিত্র, গল্পবৃক্ষ, পর্ব-৬৮ : ঘটজাতক/৩ : দশে মিলে?

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৭৫: কৃষ্ণবিরোধিতার প্রসঙ্গে ভীষ্মের বিরূপ সমালোচনা সত্ত্বেও কে স্মরণীয়? শিশুপাল? না ভীষ্ম?

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৬৫: শিয়রচাঁদা

রহস্য উপন্যাস: হ্যালো বাবু! পর্ব-১৫১: হার্ড ড্রাইভ হত্যারহস্য / ৩১

কৈলাসহরে নানা ভাষাভাষি ও নানা ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মানুষের বসবাস ছিল। কিন্তু অতীত কাল থেকেই সকলের মধ্যে সম্প্রীতির বন্ধন ছিল অটুট। সোয়াশো বছর আগেই সেখানে কুকি রাজার বাড়িতে হয়েছিল বাংলা শেখানোর স্কুল। অতীতে একদা কৈলাসহর অঞ্চলে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কুকি সম্প্রদায়ের মানুষের বসবাস ছিল। কয়েকজন সামন্ত কুকি রাজাও ছিলেন। ব্রজেন্দ্র চন্দ্র দত্ত তাঁর গ্রন্হে লিখেছেন, “…কুকি রাজাদের মধ্যে বান বামপাই রাজা,লাল জয় ছইয়া রাজা, মুরছুঙ্গা রাজা ও লালবুং ধরা রাজা বিশেষ সম্মানিত ও প্রসিদ্ধ ছিলেন। এই কয়েকটি কুকি রাজার বাড়ীতে ১৩০২ত্রিং (১৮৯২ খ্রি:) পূর্ব হইতে বাঙ্গালা শিক্ষা দেওয়ার উদ্দেশ্যে শ্রীযুক্ত সরকার হইতে প্রথমত কয়েকটি পাঠশালা স্হাপিত হইয়াছিল।…” স্বাধীনোত্তর পর্বে রাজ্যের শিক্ষা চিত্রটা অবশ্য আমূল পাল্টাতে শুরু করে। ব্যতিক্রম নয় কৈলাসহরও। ১৮৭৪-৭৫ সালে যেখানে ত্রিপুরাতে মাত্র দুটি বিদ্যালয় ছিল, সেখানে ১৯৭৪-৭৫ সালে রাজ্যে সর্বস্তরের বিদ্যালয়ের সংখ্যা দাঁড়ায় ১৮৯০। ত্রিপুরার ভারতভুক্তির পর কৈলাসহরেও নতুন নতুন বিদ্যালয় স্হাপিত হতে থাকে। ১৯৫০ সালে রামকৃষ্ণ মিশনের উদ্যোগে কৈলাসহরে প্রতিষ্ঠিত হয় রামকৃষ্ণ মহাবিদ্যালয়। এ সব থেকে ধারণা করা যায় যে, রাজধানী আগরতলার প্রায় কাছাকাছি সময়ে কৈলাসহরে ছড়িয়ে পড়েছিল শিক্ষার আলোকবর্তিকা। এমনকি বিদ্যালয় শিক্ষার মতো উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রেও মফস্বল ত্রিপুরায় কৈলাসহর এক অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিল।
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৮৩: জোড়া আন্তোনিওর রহস্য

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-১০৮: স্তাবক-পরিবেষ্টিত রাজা কেবল অন্ধই হন না, নিজের দুর্গেই জ্যান্ত সেদ্ধ হন!

অতীত দিনের শিক্ষাচিত্রের পাশাপাশি এবার কৈলাসহরের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে কিছুটা আলোকপাত করা যাক। কোনও জনপদকে সঠিক ভাবে জানতে হলে তার সাংস্কৃতিক তৎপরতা সম্পর্কেও অবহিত হওয়া প্রয়োজন। প্রাচীন জনপদ কৈলাসহরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যও কম দিনের নয়! কিন্তু সুদূর অতীতের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের বিবরণ লিপিবদ্ধ করা প্রায় অসম্ভব ব্যাপার। এমনকি পঞ্চাশের দশকে কৈলাসহরে শুরু হওয়া সাংস্কৃতিক তৎপরতা ধারাবাহিক ভাবে লিপিবদ্ধ করাও দুরূহ বিষয়। কারণ সেদিনের ঘটনা সমূহের মুদ্রিত রূপ নেই বললেই চলে। আর যদি কিছু লেখা হয়েও থাকে তবে তা আজ বলা যায় দুষ্প্রাপ্য। তাই পঞ্চাশের দশকের পর থেকে কৈলাসহরের সাংস্কৃতিক তৎপরতার আভাস পেতে হলে এলাকার প্রবীণ নাগরিকদের স্মৃতির উপর নির্ভর করতে হবে। এই উদ্দেশ্যে প্রায় দেড় দশক আগে একদিন হাজির হয়েছিলাম কৈলাসহর তথা ত্রিপুরার অন্যতম সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রবীন্দ্র ভট্টাচার্যের কাছে। উদ্দেশ্য ছিল কৈলাসহর নিয়ে আমার একটি বই’র জন্য তথ্য সংগ্রহ। স্মৃতিচারণ করে তিনি বলছিলেন, এক সময় কৈলাসহরে যাত্রার রমরমা ছিল। কলকাতার নানা বিখ্যাত যাত্রা দল নিয়মিত কৈলাসহর আসত। স্হানীয় ভাবেও যাত্রা মঞ্চস্থ হতো। এমনকি কৈলাসহরের যাত্রাভিনেতাদের কেউ কেউ কলকাতার দলেও অভিনয় করতেন। তাদের কেউ কেউ আবার কলকাতায় নিজেরাও দল গড়ে তুলেছিলেন। রবিদা বলে চললেন সেদিনের কৈলাসহরের স্বর্ণালী দিনের কথা। তখন কৈলাসহর টাউন মাঠে যাত্রার আসর বসতো। এ ছাড়া ছিল কৈলাসহরের স্হানীয় যাত্রা দল। পঞ্চাশের দশকে ইছবপুরের জয় কুমার সিংহের একটি দল ছিল।ছিল কাচরঘাটের বিপিনচন্দ্র পালের একটি দল। কৈলাসহরে নৃপেন্দ্র দাসেরও (টেকই দাস) একটি যাত্রা দল ছিল।শ্রীদাসের সহযোগী ছিলেন নিতাই ব্যানার্জি, পুতাই বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ। কৈলাসহরের পাইতুরবাজারেও একটি ভাল যাত্রা দল ছিল। নাম ত্রিপুরেশ্বরী নাট্য সংস্থা।
আরও পড়ুন:

জন্মশতবর্ষে উত্তমকুমার : শতফুল বিকশিত হোক

এই দেশ এই মাটি, ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-১১১ : কবি রাজার বিবসনা রমণীর চিত্রাঙ্কন / ৪

তদানীন্তন কালে কলকাতার যাত্রা দলের অভিনেতারাও কৈলাসহরের বিশিষ্ট যাত্রাভিনেতাদের যথেষ্ট সমীহ করতেন। কৈলাসহরে যাত্রার আসরের ক্ষেত্রে চা বাগান সমূহের এক উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল। গোলকপুর ও মূর্ত্তিছড়া চা বাগানে স্হায়ী যাত্রা দল ছিল। চা বাগান ছাড়াও মাঝে মাঝে শহরে এসেও তারা পালা মঞ্চস্থ করতো। দুর্গা পূজার সময় সব চা বাগানেই যাত্রা পালা মঞ্চস্থ হতো।বাগান গুলোতে যাত্রার পোশাকও মজুত থাকত।এমনকি শহরে যাত্রা পালার জন্যও চা বাগান থেকে ড্রেস ভাড়া করে নিয়ে আসা হতো। যাত্রা পালার পর রবিদা নাটক প্রসঙ্গ আরও বললেন নাট্যাভিনয়ের ক্ষেত্রে কৈলাসহরের রয়েছে এক দীর্ঘ ঐতিহ্য। পঞ্চাশের দশকে শহরের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা মিলে বছরে এক-দু’বার নাটক মঞ্চস্থ করতেন। ষাটের দশকে তা আরও ব্যাপকতা লাভ করে। ষাটের দশকে ‘ছদ্মবেশী থিয়েটার’ নামে একটি নাট্য সংস্থা গড়ে উঠেছিল কৈলাসহরে।১৯৬১ সালে রবীন্দ্র জন্ম শতবার্ষিকীতে কৈলাসহরে নাটক মঞ্চায়নের ঢল নামে। কবির জন্ম শতবার্ষিকী উদযাপনকে কেন্দ্র করে স্কুল-কলেজে নাট্য চর্চার প্রবণতা বাড়তে থাকে। ষাটের দশকের মাঝামাঝি কৈলাসহরে গড়ে উঠে নবারুণ নাট্য সংস্থা। ১৯৬৯ সালে জন্ম নেয় নর্থ ত্রিপুরা কালচারেল অর্গানাইজেশন বা এনটিসিও।তারা কৈলাসহর সহ রাজ্যের উত্তরাঞ্চলে নাটক মঞ্চায়ন সহ নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করতে থাকে। প্রায় সমসাময়িক কালে সৃষ্টি হয় পঞ্চপ্রদীপ নাট্য সংস্থা, বহুরূপী নাট্য সংস্থা। সব মিলিয়ে কৈলাসহরে তখন নাট্য চর্চার এক জোয়ার আসে বলা যায়। সত্তর দশকের শেষ দিকে কৈলাসহরের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে গণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। পরবর্তীকালে জন্ম নেয় সন্দীপন সাংস্কৃতিক সংস্থা, নির্ঘোষ নিক্কন। এই অঞ্চলের সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে তারা।নাটকের পর রবিদা কৈলাসহরে অতীত দিনের সঙ্গীত শিক্ষার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বললেন, পঞ্চাশের দশকে কৈলাসহরে প্রথম সঙ্গীত শিক্ষা শুরু হয় ব্যক্তিগত উদ্যোগে।ষাটের দশকে সঙ্গীত শিক্ষায় উৎসাহী ছেলেমেয়েদের মধ্যে আগ্রহ বেড়ে যায়। গুণী শিল্পী সঙ্গীত শিক্ষকগণ তখন শহরের উৎসাহী ছেলেমেয়েদের গান শেখাতেন। পরবর্তী সময়ে তা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। গড়ে উঠে মিউজিক কলেজ, সংগীত কলা কেন্দ্র। কৈলাসহরে সঙ্গীত শিক্ষার প্রসার ঘটতে থাকে। আত্মপ্রকাশ ঘটে অনেক গুণী শিল্পীর।
আরও পড়ুন:

দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৯ : নয়া ভুবনের প্রজাপতি

এআই যুগেও উপনিষদের আবেদন অমলিন, কেন?

আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, সেদিনের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের বিবরণ আজ লিপিবদ্ধ করা দুরূহ। নিজের স্মৃতির উপর আস্হা রেখেও রবিদা সেদিন বলেছিলেন,কিছু অপূর্ণতা থেকে যেতে পারে স্মৃতিচারণে। বলাই বাহুল্য এটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। তবে রবিদার কথা থেকে পঞ্চাশ-ষাট দশকে কৈলাসহরের সাংস্কৃতিক চর্চার একটা আভাস পাওয়া যায়।সত্তর দশকের পর থেকে সাম্প্রতিক কাল পর্যন্ত কৈলাসহরের সাংস্কৃতিক চর্চা নিয়ে আরও বিস্তৃত লেখার অবকাশ থাকলেও বর্তমান নিবন্ধের সীমিত পরিসরে তা সম্ভব নয়। পরবর্তী সময় অন্য কারও কলমে তা ফুটে উঠবে এই প্রত্যাশা রাখছি। শুধু সংস্কৃতি চর্চা নয়,ষাটের দশক থেকে কৈলাসহরে নিরবচ্ছিন্ন ভাবে সাহিত্য চর্চাও চলছে। সাহিত্য আলোচনাচক্র সহ সময়ে সময়ে বের হয়েছে নানা লিটল ম্যাগাজিন। স্হানীয় সংবাদপত্রের শারদ সংখ্যাও বের হচ্ছে। সব মিলিয়ে ত্রিপুরার সাহিত্য চর্চার ক্ষেত্রকে পুষ্ট করছে কৈলাসহর। সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চার মতো রাজ্যের ক্রীড়া ক্ষেত্রেও কৈলাসহরের যথেষ্ট অবদান রয়েছে। জাতীয় পর্যায়ের খেলায় অংশ নিচ্ছে কৈলাসহরের ক্রীড়াবিদরা। ফুটবলকে বাদ দিয়ে অতীত দিনের কৈলাসহরের কথা যেন ভাবাই যায় না। এক সময়ে ফুটবলে খুবই জমজমাট ছিল কৈলাসহর। এখানের অনেক ফুটবলার রাজ্যদলে যেমন অংশ নিয়েছেন, তেমনই কেউ কেউ খেলেছেন বহির্রাজ্যের ফুটবল দলেও।

এই ভাবে শিক্ষা, সাহিত্য-সংস্কৃতি ও ক্রীড়া ক্ষেত্রে সুদীর্ঘকাল ব্যাপী ঐতিহ্য বয়ে নিয়ে চলেছে কৈলাসহর। সর্বোপরি বলতে হয় যে জনপদের কাছে রয়েছে ঊনকোটির মতো ভাস্কর্যের পাহাড়, যা কিনা গড়ে উঠতে শুরু করেছিল অষ্টম-নবম শতাব্দী থেকে, সেখানে শিক্ষা-সংস্কৃতির ঐতিহ্য তো বহমান থাকবেই! এখনও যেমন ঊনকোটির বিগ্রহ বলয় থেকে মাঝে মাঝে আবিষ্কৃত হয় বিগ্রহ, প্রসঙ্গ উঠে এই অঞ্চলের ইতিহাস পুনর্নির্মাণের, তেমনই অতীতের কৈলাসহর নিশ্চিত আরও অনুসন্ধান সহ আরও গবেষণার দাবি রাখে!—চলবে।
* ত্রিপুরা তথা উত্তর পূর্বাঞ্চলের বাংলা ভাষার পাঠকদের কাছে পান্নালাল রায় এক সুপরিচিত নাম। ১৯৫৪ সালে ত্রিপুরার কৈলাসহরে জন্ম। প্রায় চার দশক যাবত তিনি নিয়মিত লেখালেখি করছেন। আগরতলা ও কলকাতার বিভিন্ন প্রকাশনা থেকে ইতিমধ্যে তার ৪০টিরও বেশি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। ত্রিপুরা-সহ উত্তর পূর্বাঞ্চলের ইতিহাস ভিত্তিক তার বিভিন্ন গ্রন্থ মননশীল পাঠকদের সপ্রশংস দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। দেশের বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়ও সে-সব উচ্চ প্রশংসিত হয়েছে। রাজন্য ত্রিপুরার ইতিহাস, রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে ত্রিপুরার রাজ পরিবারের সম্পর্ক, লোকসংস্কৃতি বিষয়ক রচনা, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা সঞ্জাত ব্যতিক্রমী রচনা আবার কখনও স্থানীয় রাজনৈতিক ইতিহাস ইত্যাদি তাঁর গ্রন্থ সমূহের বিষয়বস্তু। সহজ সরল গদ্যে জটিল বিষয়ের উপস্থাপনই তাঁর কলমের বৈশিষ্ট্য।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content