
ছবি : প্রতীকী। সংগৃহীত।
রামের হাতে লঙ্কাধিপতি রাবণ ও শূর্পনখার ভাই খর নিহত হয়েছে। রাক্ষস অকম্পন জনস্থান থেকে দ্রুত ছুটে গেল লঙ্কায়। সে রাবণকে হৃদয়বিদারক সংবাদ দিলেন, খর-সহ জনস্থানবাসী বহু রাক্ষস যুদ্ধে নিহত হয়েছে। কথঞ্চিদহমাগতঃ। কোনও উপায়ে আমি এখানে এসেছি। ক্রুদ্ধ দশানন রাবণ রক্তচক্ষু হয়ে, তেজে অকম্পনকে দগ্ধ করে বলল,কে মরণ প্রার্থনা করে আমার ভয়ঙ্কর জনস্থান ধ্বংস করেছে? কেন ভীমং জনস্থানং হতে মম পরাসুনা। এর কঠোর পরিণতি ঘোষণা করল রাবণ — সে কে? ত্রিলোকের কোথাও তার জায়গা হবে না।রাবণের অপ্রিয় কাজ করে, ইন্দ্র, কুবের, যম কেউ সুখে থাকতে পারেননি। কালরূপী যমের কালতুল্য যম হলেন রাবণ নিজে। অগ্নিকেও সে দগ্ধ করতে সক্ষম। মৃত্যুকে মৃত্যুধর্মের সঙ্গে যুক্ত করে সে নিজে। রাবণের ক্ষমতা এতটাই, ক্রুদ্ধ রাবণ তেজোবলে বায়ুবেগ বিনষ্ট করতে পারে, সূর্য ও অগ্নিকেও দগ্ধ করতে পারে।
অকম্পন,ভয়ে শঙ্কাপূর্ণ ভাষায়, করজোড়ে, ক্রুদ্ধ দশাননের কাছে অভয় প্রার্থনা করল। রাক্ষসশ্রেষ্ঠ রাবণ তাকে অভয় দিল। আশ্বস্ত হয়ে নিঃশঙ্ক অকম্পন বলল, রাজা দশরথের এক পুত্র আছে। তার নাম রাম, যার দেহসৌষ্ঠব সিংহের মতো। সে যুবক। তার কাঁধ বিশাল, বাহুদুটি সুন্দর গোলাকার ও দীর্ঘ। সে শ্যামবর্ণ, অতি গভীর তার যশ। শ্রীমানের বলবিক্রম অতুলনীয়। জনস্থানে খর ও দূষণ তার হাতে নিহত হয়েছে। অকম্পনের কথা শুনে,রাক্ষসরাজ রাবণ নাগরাজের মতো দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বলল, অকম্পন, বল দেখি, সেই রাম, ইন্দ্র ও দেবতাদের সঙ্গে জনস্থানে এসেছে কি? স সুরেন্দ্রেণ সংযুক্তো রামঃ সর্ব্বামরৈঃ সহ। উপযাতো জনস্থানং ব্রূহি কচ্চিদকম্পন।। মহাত্মা রাবণের কথা শুনে,অকম্পন আবারও তার (রামের) বল ও বিক্রমের বিষয়ে বলতে লাগল। রাম মহাতেজস্বী, ধনুর্দ্ধারীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ। দিব্যাস্ত্রের গুণসম্পন্ন রাম, যুদ্ধের পরম ধর্ম বা ন্যায়নীতিসম্বন্ধে অবগত আছেন। তার মতোই বলশালী, তার কনিষ্ঠ লক্ষ্মণ। রক্তচক্ষু, দুন্দুভিতুল্য যার কণ্ঠস্বর, সেই লক্ষ্মণের মুখটি পূর্ণিমার চাঁদের মতো।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৬৭: রাজসূয়যজ্ঞ কী শুধু একচ্ছত্র ক্ষমতার প্রদর্শনী? না স্বতঃস্ফূর্ত গণসমর্থনলাভের উদ্যোগ?

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৯৬ : উত্তরায়ণ

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৫৯: মেঠো ইঁদুর

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৭৫ : শেষের খুব কাছে
বায়ু-সহ আগুন যেমন, তেমনই শ্রীমান, রাজশ্রেষ্ঠ রাম লক্ষ্মণের সঙ্গে মিলিত হয়ে, জনস্থানে এসে পড়েছে। সে কোনও দেবতা কিংবা মানুষ কি না সেটি বিচার্যবিষয় নয়। রামের নিক্ষিপ্ত বাণগুলি ছিল স্বর্ণপালকযুক্ত (স্বর্ণপুঙ্খ) উড়ন্ত ঘুড়ির মতো। সেগুলি যেন পঞ্চমুখ সাপ হয়ে রাক্ষসদের গ্রাস করল। আতঙ্কিত রাক্ষসরা যেদিকেই পালাল সেখানেই সম্মুখে বিরাজমান রামকে দেখতে পেল।অকম্পন জানাল, হে নিষ্পাপ, এভাবেই সে আপনার জনস্থান ধ্বংস করল। ইত্থং বিনাশিতং তেন জনস্থানং তবানঘ। অকম্পনের কথা শুনে রাবণ ঘোষণা করল, গমিষ্যামি জনস্থানং রামং হন্তুং সলক্ষ্মণম্। লক্ষ্মণ-সহ রামকে বধ করবার জন্যে আমি জনস্থানে যাব। রাবণ এমন কথা বললে, অকম্পন প্রত্যুত্তরে রামের শৌর্যসম্বন্ধে আভাস দিল। শৃণু রাজন্ যথাবৃত্তং রামস্য বলপৌরুষম্। হে রাজন্, রামের কিরকম বল ও বীরত্ব, তা শুনুন। মহাযশস্বী রাম ক্রুদ্ধ হলে, কারও তাকে শৌর্য প্রকাশ করে পরাজিত করবার সাধ্য নেই। সে শরের মাধ্যমে নদীবেগকে প্রতিহত করতে পারে। গ্রহণক্ষত্র-সহ আকাশকে অবনমিত করতে পারে সে। ওই শ্রীমান রাম নিমজ্জিত পৃথিবীকে উদ্ধার করেতে পারে।মহাশক্তিমান সে, সমুদ্রের বেলাভূমি ভেদ করে সমগ্র লোক প্লাবিত করতে পারে। তার বাণ, বায়ু ও সমুদ্রের উচ্ছ্বাস রুদ্ধ করতে সক্ষম। মহাকীর্তিমান রাম, নিজের পরাক্রমে সমস্ত লোক সংহার করে আবারও সেই শ্রেষ্ঠ পুরুষ প্রাণীদের সৃষ্টি করতে পারে।অকম্পন রাবণকে সতর্ক করলেন, হে দশানন, পাপী যেমন স্বর্গে যেতে পারে না, তেমন আপনি এবং সমস্ত রাক্ষস যুদ্ধে রামকে পরাস্ত করতে অক্ষম। ন হি রামো দশগ্রীব শক্যো জেতুং রণে ত্বয়া। রক্ষসাং বাপি লোকেন স্বর্গঃ পাপজনৈরিব।। অকম্পন মনে করেন, রাম সকল দেবতা ও অসুরদের অবধ্য। সে জানাল, রামের একমাত্র বধের উপায় তার জানা আছে। রাবণ একমনে শুনুন। কী সেই উপায়? অকম্পন বললেন, সীতা নামে রামের স্ত্রী। সেই সীতা এই পৃথিবীতে সর্বোত্তমা, সে সুমধ্যমা, শ্যামা, তার অঙ্গগুলি সুবিন্যস্ত, রত্নমণ্ডিতা সীতা জগতে স্ত্রীরত্নবিশেষ।
আরও পড়ুন:

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-১০৪ : ত্রিপুরার রাজপরিবারে সতীদাহ প্রথা /৩

আকাশ এখনও মেঘলা, পর্ব-৭৭: আকাশ এখনও মেঘলা
দেবী, গন্ধর্বী, অপ্সরা, সর্পিনী কোনও নারী তার তুল্যা নয়। মানবীর তো কথাই নেই। অকম্পনের পরামর্শ — সেই মহারণ্য হতে আপনি সীতাকে অপহরণ করুন। সীতার বিরহে রাম বাঁচবে না। তস্যাপহর ভার্যাং ত্বং তং প্রমথ্য মহাবনে।সীতয়া রহিতো রামো ন চৈব হি ভবিষ্যতি।। অকম্পনের পরামর্শটি রাক্ষসরাজ রাবণের ভাল লাগল। মহাবীর রাবণ, চিন্তা করে অকম্পনকে বলল, ভালো কথা, আমি কালই সারথিকে সঙ্গে নিয়ে একাকী যাব। পরমানন্দে বৈদেহীকে এই মহানগরীর নিয়ে আসব। বাঢ়ং কাল্যং গমিষ্যামি হ্যেকঃ সারথিনা সহ। আনেষ্যামি চ বৈদেহীমিমাং হৃষ্টো মহাপুরীম্।। এই বলে রাবণ, খরকে নিয়ে, সূর্যবর্ণ রথে আরোহণ করে, প্রস্থান করল। তার রথ, সব দিক উদ্ভাসিত হয়ে প্রকাশমান হল। নক্ষত্রের পথ ধরে চলমান, রাক্ষসশ্রেষ্ঠ রাবণের মহারথ, যেন মেঘের মধ্যে চাঁদের শোভা হয়ে দেখা দিল। দূরে তারকারাক্ষসীর পুত্র মারীচের আশ্রমে গিয়ে উপস্থিত হল রাবণ। মারীচ তাকে মানুষের নয় এমন ভোজ্যদ্রব্যে অর্চনা করল। মারীচ স্বয়ং তাকে আসন জল প্রভৃতি দিয়ে সম্মানিত করে, অর্থপূর্ণ কথা বলল। মারীচ রাক্ষসাধিপতি রাবণের রাজ্যের কুশলসংবাদবিষয়ে প্রশ্ন করে জানতে চাইলেন, আপনার দ্রুত উপস্থিতির কারণ আমি জানি না, তাই আশঙ্কা হচ্ছে। আশঙ্কে নাধিজানে ত্বং যতস্তূর্ণমুপাগতঃ। মারীচ মহীতেজস্বী রাবণকে তার প্রতিক্রিয়া জানালে, কথায় পটু রাবণ বলল, অক্লান্ত রাম আমার রক্ষীদের হত্যা করেছে। জনস্থানের অবধ্যদের সকলকে যুদ্ধে নিকেশ করেছে সে। কথাশেষে রাবণের প্রস্তাব — রামের ভার্যাপহরণে আমায় তুমি সাহায্য কর। আরক্ষো মে হতস্তাত রামেণাক্লিষ্টকারিণা। জনস্থানমবধ্যং তৎ সর্বং যুধি নিপাতিতম্।। তস্য মে কুরু সাচীব্যং তস্য ভার্যাপহরণে।
আরও পড়ুন:

গল্পবৃক্ষ, পর্ব-৬৩ : অস্থান-জাতক—অসম্ভবের ছন্দ

সরস্বতীর লীলাকমল, পর্ব-৩৮: নন্দিতা কৃপালনি— বিশ শতকের বিদুষী
রাক্ষসশ্রেষ্ঠর কথা শুনে মারীচ বলল, মিত্ররূপে কোনও শত্রু রাবণকে সীতার কথা বলেছে? এমন কে আছে যাকে রাক্ষসশ্রেষ্ঠ আনন্দ দিয়েছেন, অথচ সে আদৌ সন্তুষ্ট নয়। সন্দিগ্ধ মারীচ স্পষ্টভাষায় তার উদ্বেগের কারণ জানিয়ে বলল, ‘সীতাকে এখানে নিয়ে এস’ — এ কথা কে বলেছে? আমাকে বলুন। কে রাক্ষসজগতের শৃঙ্গ উচ্ছেদ করতে ইচ্ছুক? সীতামিহানয়স্বেতি কো ব্রবীতি ব্রবীহি মে। রক্ষোলোকস্য সর্ব্বস্য কঃ শৃঙ্গং ছেত্তুমিচ্ছতি।। রাবণের উৎসাহদাতা নিঃসন্দেহে, তার শত্রু। সাপের মুখ থেকে রাবণ কি দাঁত উপড়ে ফেলতে চাইছেন? মারীচ তার সন্দেহ প্রকাশ করলেন—এই কাজ করে, কে আপনাকে কুপথে চালনা করছে? সুখনিদ্রায় আচ্ছন্ন আপনার মাথায় কে আঘাত করছে? কর্ম্মণানেন কেনাসি কাপথং প্রতিপাদিতঃ। সুখসুপ্তস্য তে রাজন্ প্রহৃতং কেন মূর্দ্ধনি।। তার (রামের) পবিত্র বিশুদ্ধ বংশ ঠিক হাতির শুঁড়ের মতো, তার সুগঠিত বাহুদুটি যেন দুই গজদন্ত, তার তেজস্বিতা যেন হাতির মদজল। হে রাবণ, সেই মদজলের গন্ধযুক্ত রাঘবরূপ হাতির সঙ্গে যুদ্ধ তো দূরের কথা তার দিকে দৃষ্টিপাত করাও যে দুরূহ। উদীক্ষিতুং রাবণ নেহ যুক্ত স সংযুগে রাঘবগন্ধহস্তী।। ওই রাম যুদ্ধের অন্ধিসন্ধি (অবস্থান ও সন্ধিবিষয়ে) জানে। এই নরসিংহ, রণনিপুণ। সে রাক্ষসরূপ পশুদের হত্যা করেছে। তার শররূপ অঙ্গ পূর্ণ, শাণিত অসি যেন তার দাঁত। ঘুমন্ত সেই নৃসিংহকে জাগিয়ে তোলা আপনার উচিত নয়। সুপ্তস্ত্বয়া বোধয়িতুং ন শক্য:। মারীচ রামের অপরিসীম শক্তিমত্তা বর্ণনা করলেন— হে রাক্ষসরাজ, রামের ধনুক হল কুমীর, বাহুর বেগ যেন পাঁক, শরগুলি তার তরঙ্গমালা, আছে যুদ্ধজোয়ারের গভীর আকর্ষণ, পাতাল পর্যন্ত অতলান্ত গভীরতা যার সেই রামরূপ মহাসাগরে ঝাঁপিয়ে পড়া আপনার উচিত হবে না। ন রামপাতালমুখেঽতিঘোরে প্রস্কন্দিতুং রাক্ষসরাজ যুক্তম্। মারীচ রাবণকে ফিরে যাবার জন্য অনুনয় করলেন, রাক্ষসাধিপতি প্রসন্ন মনে লঙ্কায় ফিরে যান। নিজের স্ত্রীদের সঙ্গে নিত্য আনন্দে থাকুন। রামও সস্ত্রীক অরণ্যে বিহার করুন। মারীচের কথা শুনে দশানন রাবণ লঙ্কায় ফিরে গেল এবং উত্তমগৃহে প্রবেশ করল।
আরও পড়ুন:

দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৯ : নয়া ভুবনের প্রজাপতি

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-১০৫: পদ বা ক্ষমতা পেলেই কি ভিতরের স্বভাব বদলে যায়? পঞ্চতন্ত্রের অমোঘ শিক্ষা
রাক্ষস অকম্পন রাক্ষসরাজ রাবণকে দুঃসংবাদ জানিয়েছে, বহু রাক্ষস-সহ রাবণের ভাই খর,রামের হাতে নিহত হয়েছে। ক্রুদ্ধ দশানন তাৎক্ষণিক বিধ্বংসী প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করল। রাবণের ক্রোধ শুধুমাত্র জাগতিক পরিমণ্ডলে সীমাবদ্ধ নয়। তার সম্মুখে একজন মানুষ শত্রু, তিনি হলেন দশরথপুত্র রাম। রাবণ প্রবল অহমিকায় দম্ভভরে জানিয়েছে, তার প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে সে মহাজাগতিক শক্তিপুঞ্জকেও প্রতিস্পর্ধা দেখাতে পারে। রাবণ বায়ু, অগ্নি, সূর্য, মৃত্যুকে প্রতিহত করতে সক্ষম। ক্রোধের পরিমিতিবোধ থাকা যে কোনও ক্ষমতার অধিকারী প্রশাসকের প্রয়োজন। বিরুদ্ধশক্তিকে অবদমিত করতে প্রাকৃতিক নিয়মকে প্রতিহত করবার যে উদাহরণগুলি রাবণ বলেছে সেগুলি আধুনিক পৃথিবীর যুদ্ধের আবহে বৃহৎ ক্ষমতার অধিকারী শক্তিমান দেশগুলির প্রতিপক্ষের প্রতি রণহুঙ্কারের মধ্যে প্রতিধ্বনিত হয় আজও।রাবণের আস্ফালন এবং আধুনিক যুদ্ধবাজদের প্রতিপক্ষের উদ্দেশ্যে জল, আকাশসীমা, বায়ুর স্বচ্ছতা রুদ্ধ করে মৃত্যুর আগাম বার্তা ঘোষণা, দুই মানসিকতা এক সমান্তরাল রেখায় যুক্ত করা যায়। পার্থক্য রয়ে যায় শুধু সময়ের ব্যবধানের। প্রতিপক্ষকে ছোট করবার জন্যে মহাজাগতিক প্রাকৃতিক শক্তিকে অগ্রাহ্য করবার ফল যে মারাত্মক, সে কথা অতীতের বিশ্বব্যাপী যুদ্ধগুলির সুদূরপ্রসারী কুপ্রভাবের কথা মনে করিয়ে দেয়।

ছবি : প্রতীকী। সংগৃহীত।
রাক্ষস অকম্পন রামের অপ্রতিহত ক্ষমতা ব্যাখ্যা করে, রামকে দমনের সর্বশেষ উপায় নির্দেশ করেছেন, সে রামের স্ত্রী সীতাকে অপহরণের পরামর্শ দিয়েছে। রাবণ প্রস্তাবটি সাগ্রহে গ্রহণ করেছেন। সে তৎক্ষণাৎ একাকী যাত্রা করেছে। পথে মারীচের আশ্রমে এসে রাক্ষস মারীচের উপদেশে রাবণের বোধোদয় হয়েছে। কিন্তু তার স্থায়িত্ব কত ক্ষণিক রামায়ণকার ঋষি পরবর্তী পর্যায়ে তা জানিয়েছেন। যুদ্ধের আবহ যখন পারিবারিক পরিমণ্ডলে সম্মানহানিকর পরিস্থিতির সূচনা করে তখন সেটি বীরত্ব ছাপিয়ে ব্যক্তিগত সম্পর্কের জটিল আবর্তে ঘেরা জীবনালেখ্যর মর্মান্তিক পরিণতি হয়ে ওঠে। কোনও নারীকে বল প্রয়োগ করে অপহরণের মধ্যে স্পর্ধার প্রকাশ আছে, আছে সামাজিক নিয়মকে অস্বীকার ও লঙ্ঘন। এ ছাড়াও, একজনের বিশ্বস্তা এবং প্রিয় স্ত্রীকে হরণ করে,তাকে মানসিক শাস্তি দেওয়ার মধ্যে আর যা হোক বীরত্ব জাহির করবার মতো কিছু নেই, এই কথা যিনি নিজের বীরত্বের বড়াই করে প্রাকৃতিক তথা দৈবশক্তিকে চ্যালেঞ্জ করতে পারেন তার মনে হয়নি। সহজলভ্য প্রস্তাবটি মনঃপুত হয়েছে। রামচন্দ্রকে সম্মুখযুদ্ধে পরাজিত করে রাক্ষসস্বজনহত্যার প্রতিশোধগ্রহণে নয়, রাবণ মানসিক আঘাত হেনে, প্রতিশোধগ্রহণের আধুনিক পরিভাষায় যাকে বলে ব্ল্যাকমেলিং তার আশ্রয় নিয়েছে। তবে সেই মানসিক আঘাত যে মানুষকে বৃহত্তর যুদ্ধে প্রাণিত করে, এই বোধ হয়তো রাবণের ছিল না, ছিল মারীচের। সে রাবণকে প্রতিহত করতে সদুপদেশ দিয়েছে। সাময়িকভাবে সেটি কার্যকর হয়েছে। একটি হৃদয়াবেগে আঘাত, বৃহত্তর প্রত্যাঘাতের সূচনা করে। রামায়ণের এই ঘাতপ্রতিঘাতের যুদ্ধ কত নির্মম মৃত্যু ডেকে এনেছিল,সুকুমারবৃত্তি পরিণত হয়েছিল কঠোর কর্তব্যনিষ্ঠায়, অপমৃত্যু হল দাম্পত্যপ্রেমের। সব কিছুর মূলে রয়ে গেল রাবণের নারী অপহরণের সিদ্ধান্ত।—চলবে।
* মহাকাব্যের কথকতা (Epics monologues of a layman): পাঞ্চালী মুখোপাধ্যায় (Panchali Mukhopadhyay) অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপিকা, সংস্কৃত বিভাগ, যোগমায়া দেবী কলেজে।


















