
জলদূষনের বলি এই গঙ্গার শুশুক। ছবি : সংগৃহীত।
কাকদ্বীপের হারউড পয়েন্ট থেকে সাগরদ্বীপের কচুবেড়িয়া ফেরিঘাটের মধ্যে কিংবা হারউড পয়েন্ট থেকে ঘোড়ামারা দ্বীপে যাওয়ার সময় যাত্রীরা মাঝে মাঝেই দেখতে পান একপ্রকার জলজ প্রাণী জল থেকে খাড়া ভাবে লাফিয়ে উঠে শরীরটা ধনুকের মতো বেঁকিয়ে ফের জলে ডুব দেয়। মুড়িগঙ্গা নদীর তীরে যে কোনও জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকলে এ দৃশ্য মাঝেমাঝেই দেখা যায়। তবে আজ থেকে ৪০-৫০ বছর আগে এই নয়নমনোহর দৃশ যে পরিমাণ দেখা যেত এখন তার সিকিভাগও দেখা যায় না। শুধু মুড়িগঙ্গা নয়, গঙ্গা নদী এবং তার বিভিন্ন শাখা নদীতেও এই দৃশ্য ছিল একসময় খুব সাধারণ ঘটনা। এখন গঙ্গার শাখা নদীগুলিতে এই দৃশ্য আর দেখা যায় না বললেই চলে। প্রাণীটির নাম হল শুশুক। হিন্দিতে শুশু। ইংরেজিতে গ্যাঞ্জেটিক ডলফিন (Gangetic Dolphin)। বিজ্ঞানসম্মত নাম: ‘Platanista gangetica’।
এই শুশুকরা হল সমুদ্র শুশুক বা ডলফিনের জাতভাই। তিমির মতো শুশুকরা হল জলজ স্তন্যপায়ী প্রাণী। তাই শুশুকরাও তিমির সাথে একই বর্গের (Cetadae) অন্তর্গত। এই বর্গের অন্তর্গত ওডোনটোসেটি (Odontoceti) গোষ্ঠীতে দাঁত যুক্ত বর্তমানে নয়টি গোত্রের মধ্যে প্ল্যাটানিসটিডি (Platanistidae) গোত্রের অন্তর্গত হল শুশুক বা ডলফিন। ডলফিনের চল্লিশটির বেশি প্রজাতি পৃথিবীর বিভিন্ন অংশে পাওয়া গেলেও এদের মধ্যে মিষ্টি জলের প্রজাতি হল মাত্র চারটি। একটি হল চিনা নদীর ডলফিন যা চিনের ইয়াংৎস নদীতে পাওয়া যায়। আর একটি হল সিন্ধু নদের ডলফিন যা মেলে পাকিস্তানে। একটি মেলে দক্ষিণ আমেরিকার আমাজন নদীতে। আর চতুর্থটি মেলে গঙ্গা নদী ও তার শাখানদীতে, যাকে আমরা বলি গঙ্গার শুশুক।
এই শুশুকরা হল সমুদ্র শুশুক বা ডলফিনের জাতভাই। তিমির মতো শুশুকরা হল জলজ স্তন্যপায়ী প্রাণী। তাই শুশুকরাও তিমির সাথে একই বর্গের (Cetadae) অন্তর্গত। এই বর্গের অন্তর্গত ওডোনটোসেটি (Odontoceti) গোষ্ঠীতে দাঁত যুক্ত বর্তমানে নয়টি গোত্রের মধ্যে প্ল্যাটানিসটিডি (Platanistidae) গোত্রের অন্তর্গত হল শুশুক বা ডলফিন। ডলফিনের চল্লিশটির বেশি প্রজাতি পৃথিবীর বিভিন্ন অংশে পাওয়া গেলেও এদের মধ্যে মিষ্টি জলের প্রজাতি হল মাত্র চারটি। একটি হল চিনা নদীর ডলফিন যা চিনের ইয়াংৎস নদীতে পাওয়া যায়। আর একটি হল সিন্ধু নদের ডলফিন যা মেলে পাকিস্তানে। একটি মেলে দক্ষিণ আমেরিকার আমাজন নদীতে। আর চতুর্থটি মেলে গঙ্গা নদী ও তার শাখানদীতে, যাকে আমরা বলি গঙ্গার শুশুক।
ডলফিনদের নিয়ে মানুষের আগ্রহ চিরন্তন। সুদূর অতীতকাল থেকে ডলফিনদের প্রতি মানুষের আকর্ষণের প্রমাণ পাওয়া যায়। মহাভারতে গঙ্গার শুশুকের উল্লেখ মেলে। পুরাণে স্বর্গ থেকে মর্তে ভগীরথের গঙ্গা আনয়নের কাহিনিতে দেখা যায় ভগীরথের পিছনে যে বিরাট মিছিল নেমে এসেছিল তাতে গঙ্গার সঙ্গে সঙ্গে মাছ, কচ্ছপ, ব্যাঙ আর শুশুকরাও ছিল। সুতরাং গঙ্গা নদী এইসব প্রাণীর যে নিরাপদ বাসস্থান ছিল সুদূর প্রাচীনকাল থেকে তা বোঝা যায়। ২৭৪ থেকে ২৩২ খ্রিস্টপূর্বাব্দে তৈরি সম্রাট অশোকের পুপুটক প্রস্তর খোদাইয়ে শুশুকের ছবি পাওয়া গিয়েছে। ১৫৯৮ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট বাবরের আত্মজীবনী ‘বাবরনামা’তেও শুশুকের চিত্র আঁকা রয়েছে।
‘বাবরনামা’তে গঙ্গার শুশুককে পারসি ভাষায় ‘খাক আবি’ অর্থাৎ জল শুকর নামে অভিহিত করা হয়েছে। ২.৫ কোটি বছর আগে এদের পূর্বপুরুষরা ছিল সমুদ্রবাসী প্রাণী। মধ্য মায়োসিন যুগে এদেরই এক গোষ্ঠী সিন্ধু-গঙ্গা সমভূমি অঞ্চলে চলে আসে। পরবর্তীকালে সমুদ্রের জলস্তর নেমে গেলে এরা গঙ্গা ও সিন্ধু নদীতে থেকে যায়। তারপর কালক্রমে অভিযোজিত হয়ে বর্তমান প্রজাতিতে রূপান্তরিত হয়েছে। গঙ্গার শুশুকের এ পর্যন্ত যত জীবাশ্ম আবিষ্কৃত হয়েছে তার মধ্যে সবথেকে পুরনোটি প্রায় ১২০০০ বছর আগের।
ডলফিন বা শুশুকদের নিয়ে মানুষের আগ্রহ যত না বেশি ততটাই কম জানা গিয়েছে এই অদ্ভুত স্তন্যপায়ী প্রাণীটির বিচিত্র আচরণ সম্পর্কে। আর তাই বোধহয় এদের নিয়ে মানুষের এত কৌতূহল। ডলফিনের পূর্বপুরুষরা ছিল স্থলবাসী, অন্যান্য স্তন্যপায়ী প্রাণীদের মতো। কিন্তু স্থলের পরিবেশ কোনও এক অজানা কারণে ওদের বসবাসের উপযুক্ত না থাকায় তিমির মতো এরাও ডাঙ্গা থেকে ওদের পূর্বপুরুষ মাছেদের সঙ্গে সহাবস্থানের জন্য জলে নেমে যায়। জলজ পরিবেশে অভিযোজনের জন্য এদের অগ্রপদ দুটো সাঁতার কাটার উপযোগী অঙ্গ ফ্লিপারে রূপান্তরিত হয় এবং পশ্চাৎপদ লুপ্ত হয়, আর মাছেদের মতো তৈরি হয় পুচ্ছ পাখনা।
লম্বায় একটা পুরুষ শুশুক ২.১২ মিটার পর্যন্ত এবং স্ত্রী শুশুক ২.৭ মিটার পর্যন্ত লম্বা হয়। অর্থাৎ পুরুষদের থেকে স্ত্রী শুশুকরা আকৃতিতে একটু বড়সড় হয়। এদের দেহের সামনের ও পেছনের দিকটা সরু, আর মাঝখানটা মোটা। ওজন হয় পুরুষদের ক্ষেত্রে ৪০ থেকে ৬০ কেজি আর স্ত্রীদের ক্ষেত্রে ৫০ থেকে ৮০ কেজি।
এদের গড়নটা বেশ আঁটোসাটো। সামুদ্রিক শুশুক ঘাড়হীন হলেও গঙ্গার শুশুকের ছোট একটা ঘাড় আছে। এদের কপালের অংশ বেশ উঁচু আর মাথাটা বেশ লম্বা। মাথা থেকে সামনের দিকে প্রসারিত থাকে হাঁসের চঞ্চুর মতো চ্যাপ্টা ও লম্বা চঞ্চু। উপর ও নিচের চঞ্চু মিলিয়ে দাঁত থাকে ১৩৬টি। দাঁত তিনকোনা ও সূচালো। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দাঁতগুলো ভোঁতা হয়ে যায় ও খাড়া খাড়া হাড়ের মতো হয়। লেজের শেষ অংশে রয়েছে অপেক্ষাকৃত ছোট একটা পুচ্ছ পাখনা। আর বুকের অংশে রয়েছে সাঁতার কাটার উপযোগী দুটি ফ্লিপার। ফ্লিপার তিনকোনা আর মাপে চঞ্চু বাদে গোটা দেহের দৈর্ঘ্যের এক ষষ্ঠাংশ। এদের নাসারন্ধ্র (Blowhole) রয়েছে মাথার উপরে আর দেখতে লম্বালম্বি চেরা সরু ফাটলের মতো। এদের চোখের আকৃতি মটর দানার মতো তবে তা মণিবিহীন (without lens)। ফলে গঙ্গার শুশুক আদৌ দেখতে পায় না।
‘বাবরনামা’তে গঙ্গার শুশুককে পারসি ভাষায় ‘খাক আবি’ অর্থাৎ জল শুকর নামে অভিহিত করা হয়েছে। ২.৫ কোটি বছর আগে এদের পূর্বপুরুষরা ছিল সমুদ্রবাসী প্রাণী। মধ্য মায়োসিন যুগে এদেরই এক গোষ্ঠী সিন্ধু-গঙ্গা সমভূমি অঞ্চলে চলে আসে। পরবর্তীকালে সমুদ্রের জলস্তর নেমে গেলে এরা গঙ্গা ও সিন্ধু নদীতে থেকে যায়। তারপর কালক্রমে অভিযোজিত হয়ে বর্তমান প্রজাতিতে রূপান্তরিত হয়েছে। গঙ্গার শুশুকের এ পর্যন্ত যত জীবাশ্ম আবিষ্কৃত হয়েছে তার মধ্যে সবথেকে পুরনোটি প্রায় ১২০০০ বছর আগের।
ডলফিন বা শুশুকদের নিয়ে মানুষের আগ্রহ যত না বেশি ততটাই কম জানা গিয়েছে এই অদ্ভুত স্তন্যপায়ী প্রাণীটির বিচিত্র আচরণ সম্পর্কে। আর তাই বোধহয় এদের নিয়ে মানুষের এত কৌতূহল। ডলফিনের পূর্বপুরুষরা ছিল স্থলবাসী, অন্যান্য স্তন্যপায়ী প্রাণীদের মতো। কিন্তু স্থলের পরিবেশ কোনও এক অজানা কারণে ওদের বসবাসের উপযুক্ত না থাকায় তিমির মতো এরাও ডাঙ্গা থেকে ওদের পূর্বপুরুষ মাছেদের সঙ্গে সহাবস্থানের জন্য জলে নেমে যায়। জলজ পরিবেশে অভিযোজনের জন্য এদের অগ্রপদ দুটো সাঁতার কাটার উপযোগী অঙ্গ ফ্লিপারে রূপান্তরিত হয় এবং পশ্চাৎপদ লুপ্ত হয়, আর মাছেদের মতো তৈরি হয় পুচ্ছ পাখনা।
লম্বায় একটা পুরুষ শুশুক ২.১২ মিটার পর্যন্ত এবং স্ত্রী শুশুক ২.৭ মিটার পর্যন্ত লম্বা হয়। অর্থাৎ পুরুষদের থেকে স্ত্রী শুশুকরা আকৃতিতে একটু বড়সড় হয়। এদের দেহের সামনের ও পেছনের দিকটা সরু, আর মাঝখানটা মোটা। ওজন হয় পুরুষদের ক্ষেত্রে ৪০ থেকে ৬০ কেজি আর স্ত্রীদের ক্ষেত্রে ৫০ থেকে ৮০ কেজি।
এদের গড়নটা বেশ আঁটোসাটো। সামুদ্রিক শুশুক ঘাড়হীন হলেও গঙ্গার শুশুকের ছোট একটা ঘাড় আছে। এদের কপালের অংশ বেশ উঁচু আর মাথাটা বেশ লম্বা। মাথা থেকে সামনের দিকে প্রসারিত থাকে হাঁসের চঞ্চুর মতো চ্যাপ্টা ও লম্বা চঞ্চু। উপর ও নিচের চঞ্চু মিলিয়ে দাঁত থাকে ১৩৬টি। দাঁত তিনকোনা ও সূচালো। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দাঁতগুলো ভোঁতা হয়ে যায় ও খাড়া খাড়া হাড়ের মতো হয়। লেজের শেষ অংশে রয়েছে অপেক্ষাকৃত ছোট একটা পুচ্ছ পাখনা। আর বুকের অংশে রয়েছে সাঁতার কাটার উপযোগী দুটি ফ্লিপার। ফ্লিপার তিনকোনা আর মাপে চঞ্চু বাদে গোটা দেহের দৈর্ঘ্যের এক ষষ্ঠাংশ। এদের নাসারন্ধ্র (Blowhole) রয়েছে মাথার উপরে আর দেখতে লম্বালম্বি চেরা সরু ফাটলের মতো। এদের চোখের আকৃতি মটর দানার মতো তবে তা মণিবিহীন (without lens)। ফলে গঙ্গার শুশুক আদৌ দেখতে পায় না।
আরও পড়ুন:

উপন্যাস: আকাশ এখনও মেঘলা : দ্বিতীয় অধ্যায়, পর্ব-৬১: আকাশ এখনও মেঘলা

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৪১: সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী — গড়িয়োল

এই দেশ এই মাটি, ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৯৬: ব্রিটিশ বাংলার বিপ্লবীরা অনেক সময় পালিয়ে এসে আশ্রয় নিতেন ত্রিপুরায়

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৫ : যে জন রহে মাঝখানে
সামুদ্রিক শুশুকের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। তবে অন্ধ হলেও কুছ পরোয়া নেই। আছে একজোড়া কান। কান দুটো এতই ছোট যে বোঝা মুশকিল। চোখে ঠিক পিছনে পিনের ফুটোর মতো কান চোখে দেখার অভাব পুষিয়ে দেয়। এদের গায়ের রং হল গাঢ় সিসে-ধূসর থেকে সিসে-কালো। বাচ্চা জন্মাবার সময় গায়ের রঙ হয় চকোলেট বাদামি। পরিণত শুশুকদের পেটের নিচের অংশ কিছুটা ফিকে, আর দুপাশের রঙ হালকা ছোপ ছোপ। অন্যান্য জলজ স্তন্যপায়ী প্রাণীদের মতো ওদের শরীরেও বইছে উষ্ণ রক্ত। কিন্তু দেহের উষ্ণতা ধরে রাখার জন্য স্থলচর স্তন্যপায়ীদের মতো গায়ে লোম নেই। দেহের তাপ ধরে রাখার কাজ করে ত্বকের নিচে জমে থাকা প্রায় ৫ সেমি পুরু চর্বির স্তর যা ব্লাবার নামে পরিচিত। গঙ্গার ঘোলা জলেই শুশুকের বাস। এছাড়া গঙ্গার শাখা নদী ব্রহ্মপুত্র, মেঘনা, কর্ণফুলি প্রভৃতি নদীতেও শুশুকের দেখা মেলে। জোয়ারে জল যতদূর ওঠে সেই পর্যন্তই প্রধানত শুশুকের ঘোরাফেরার জায়গা। তবে জোয়ারের এলাকার মধ্যে এবং এমনকি নদীর খাঁড়িতেও শুশুকের দেখা মেলে। তবে কখনোই এরা সমুদ্রে ঢোকে না। এরা খাবারের সন্ধানে দুটো স্রোতের সংযোগস্থলে কিংবা নদীর বাঁকের কাছে ঘুরঘুর করে কারণ এরকম জায়গায় মাছ শিকার সহজ হয়। আর তাই সুন্দরবন অঞ্চলে মুড়িগঙ্গা, মাতলা, সপ্তমুখী ইত্যাদি নদীর মোহনায় এদের প্রায়শই দেখা যায়।
বন্যাপ্লাবিত এলাকাতে খাবারের প্রাচুর্যের জন্য মাছেরা জড়ো হয় বলে শুশুকরাও সেখানে হাজির হয়। নদীর কোথাও কোথাও এদের ছোট ছোট দলে দেখা যায়। তবে শুশুকরা প্রধানত নিঃসঙ্গ প্রাণী। আর নদীর একই জায়গায় বছরের সবসময় এদের দেখা যায় না। হয়তো খাদ্যাভাব কিংবা জলের উষ্ণতার পরিবর্তন কিংবা লবণের পরিমাণ বৃদ্ধি এর কারণ। শুশুকের লেজ কিন্তু মাছের মতো ভূমির সঙ্গে খাড়া নয় বরং অনুভূমিক। ফলে এরা মাছের লেজের মতো ডাঁয়ে-বাঁয়ে ঝাপটা না দিয়ে উপরে-নিচে ঝাপটা দিয়ে কিংবা কখনও জাহাজের চাকার মতো ঘুরিয়ে সাঁতার কাটে। আর মাঝে মাঝে কিছুক্ষণের জন্য শ্বাস-প্রশ্বাস চালাতে জলের উপরে উঠে ফের ডিগবাজি দিয়ে জলের গভীরে চলে যায়।
বন্যাপ্লাবিত এলাকাতে খাবারের প্রাচুর্যের জন্য মাছেরা জড়ো হয় বলে শুশুকরাও সেখানে হাজির হয়। নদীর কোথাও কোথাও এদের ছোট ছোট দলে দেখা যায়। তবে শুশুকরা প্রধানত নিঃসঙ্গ প্রাণী। আর নদীর একই জায়গায় বছরের সবসময় এদের দেখা যায় না। হয়তো খাদ্যাভাব কিংবা জলের উষ্ণতার পরিবর্তন কিংবা লবণের পরিমাণ বৃদ্ধি এর কারণ। শুশুকের লেজ কিন্তু মাছের মতো ভূমির সঙ্গে খাড়া নয় বরং অনুভূমিক। ফলে এরা মাছের লেজের মতো ডাঁয়ে-বাঁয়ে ঝাপটা না দিয়ে উপরে-নিচে ঝাপটা দিয়ে কিংবা কখনও জাহাজের চাকার মতো ঘুরিয়ে সাঁতার কাটে। আর মাঝে মাঝে কিছুক্ষণের জন্য শ্বাস-প্রশ্বাস চালাতে জলের উপরে উঠে ফের ডিগবাজি দিয়ে জলের গভীরে চলে যায়।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৫১: জরাসন্ধ কাহিনির আধুনিকতা

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-২৪ : দেবী — ব্যথার পূজা হয়নি সমাপন
এদের শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যবস্থা ভারি অদ্ভুত। যেহেতু এরা স্তন্যপায়ী প্রাণী তাই জলে বাস করলেও বাতাস থেকেই শ্বাসকার্য চালায়। শ্বাসকার্যের সময় এরা এদের উঁচু কপাল (Melon), চঞ্চু এবং নাসাছিদ্র (Blowhole) জলতলের উপরে আনে। এক থেকে তিন মিনিট এরা এভাবে ভেসে থাকে। তারপর ৭ মিনিটের জন্য জলের গভীরে মিলিয়ে যায়। গলায় কোন স্বরতন্ত্রী (Vocal cord) নেই। কিন্তু যখন শ্বাস-প্রশ্বাস চালায় তখন নাসাছিদ্র দিয়ে বাতাসের যাতায়াতের সময় এক রকম শোঁ-শোঁ শব্দ তৈরি হয়। এজন্যই বোধহয় গ্যাঞ্জেটিক ডলফিনদের বাংলা নাম হয়েছে শুশুক, হিন্দিতে শুশু। আমাদের মনে হতে পারে, জলে ডুব দিলে নাসাছিদ্র দিয়ে তো জল ঢুকে যাবে। পুকুরে ডুবে চান করার সময় আমাদের নাকে জল ঢুকে গেলে হেঁচে-কেশে কী অবস্থা হয় তা তো আমরা বিলক্ষণ জানি। শুশুকের এমন হয় না? না, হয় না। কারণ এদের নাসাছিদ্রে আছে ঢাকনা। জলে ভাসার সময় এই ঢাকনা খুলে গিয়ে শ্বাসকার্য চালাতে সাহায্য করে। আবার জলে ডুবে থাকলে ঢাকনা নাসাছিদ্রকে বন্ধ করে রাখে। তাছাড়া শুশুকের নাসাপথ সরাসরি শ্বাসনালীর সাথে যুক্ত, অন্যান্য স্তন্যপায়ী প্রাণীদের মতো গলবিলের সঙ্গে যুক্ত নয়।
গঙ্গার শুশুকের প্রধান খাবার হল কাদার ভেতরের আর জলের উপরতলের ছোট ছোট মাছ। কাদার ভেতরে মাছ খোঁজার ক্ষেত্রে এদের লম্বা চঞ্চু খুব সাহায্য করে। এদের চঞ্চুতে দাঁত থাকলেও মাছ ধরার পর আদৌ চিবোয় না, সরাসরি গিলে নেয়। খাবারের ব্যাপারে শুশুকের বাছবিচারও কম নয়। এরা আহত বা মরা মাছ ছোঁয় না। মাছের ঝাঁক দেখতে পেলে সেটিকে তাড়া করে অগভীর জলের দিকে নিয়ে যায়। আর তারপর টপাটপ ধরে ও গিলে নেয়। মাছ ছাড়াও এরা গেঁড়ি-গুগলি খায়। এই প্রসঙ্গে বলি, সেটাসিয়া বর্গভুক্ত প্রাণীদের মধ্যে গঙ্গার শুশুকই হল একমাত্র প্রাণী যাদের পৌষ্টিকতন্ত্রে তৃণভোজী প্রাণীদের মতো সিকাম আছে। তবে এর কাজ কী তা আজও জানা যায়নি।
গঙ্গার শুশুকের প্রধান খাবার হল কাদার ভেতরের আর জলের উপরতলের ছোট ছোট মাছ। কাদার ভেতরে মাছ খোঁজার ক্ষেত্রে এদের লম্বা চঞ্চু খুব সাহায্য করে। এদের চঞ্চুতে দাঁত থাকলেও মাছ ধরার পর আদৌ চিবোয় না, সরাসরি গিলে নেয়। খাবারের ব্যাপারে শুশুকের বাছবিচারও কম নয়। এরা আহত বা মরা মাছ ছোঁয় না। মাছের ঝাঁক দেখতে পেলে সেটিকে তাড়া করে অগভীর জলের দিকে নিয়ে যায়। আর তারপর টপাটপ ধরে ও গিলে নেয়। মাছ ছাড়াও এরা গেঁড়ি-গুগলি খায়। এই প্রসঙ্গে বলি, সেটাসিয়া বর্গভুক্ত প্রাণীদের মধ্যে গঙ্গার শুশুকই হল একমাত্র প্রাণী যাদের পৌষ্টিকতন্ত্রে তৃণভোজী প্রাণীদের মতো সিকাম আছে। তবে এর কাজ কী তা আজও জানা যায়নি।
আরও পড়ুন:

সংসার ভেঙে… চলে গেলেন শঙ্কর

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৯৯ : দুই সাপের বিবাদ ও রাজকন্যার গুপ্তধন লাভ! প্রাকারকর্ণের চাণক্য-নীতিতে মুগ্ধ উলূকরাজ
বাংলায় একটা কথা প্রচলিত আছে—“কানা, খোঁড়া এক গুণে বাড়া”। শুশুক কানা নয়, একেবারে অন্ধ। আর তাই অসাধারণ শ্রবণক্ষমতা দিয়ে এরা ‘দেখা’-র কাজ করে। প্রাণিজগতে শ্রবণক্ষমতার মাপকাঠিতে বাদুড় ও ইঁদুরের পরে তৃতীয় স্থানে রয়েছে শুশুক। বাদুড়ের শ্রুতিসীমা ৯৮০০০ ডেসিবেল, ইঁদুরের ৯৫০০০ ডেসিবেল, আর শুশুকের ৮০০০০ ডেসিবেল। মানুষের শ্রবণসীমা? মাত্র ২০০০০ ডেসিবেল। এদের বিশেষ ‘সোনার সিস্টেম’ (Sonar system)-এর সাহায্যে ‘ইকোলোকেশন’ পদ্ধতিতে অর্থাৎ প্রতিধ্বনির মাধ্যমে এরা বস্তুর অবস্থান নির্ণয় করতে পারে। রাতের অন্ধকারে ওড়ার সময় বাদুড়ও এইরকম ইকোলোকেশন পদ্ধতির আশ্রয় নেয়। এই পদ্ধতিতে মুখ দিয়ে একপ্রকার শব্দতরঙ্গ জলের মধ্যে প্রেরণ করে। ওই শব্দতরঙ্গ জলের মধ্যে মাছ, নৌকো, জাল প্রভৃতি বস্তুতে প্রতিফলিত হয়ে ফিরে এসে শুশুকের অন্তঃকর্ণে প্রবেশ করে। জলের মধ্যে শব্দের গতিবেগ বায়ুমাধ্যমে শব্দের গতিবেগের চেয়ে ৫ গুণ বেশি, তাই শুশুক প্রথমে নিচু কম্পাঙ্কের শব্দ পাঠায়। এই তরঙ্গ প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরলে শুশুক বস্তুর অবস্থান বুঝতে পারে। শুশুক বস্তুর দিকে যত এগোয় ততই শব্দের কম্পাঙ্ক বাড়ায়। ফলে শুশুক ক্রমশঃ বস্তুর আকৃতি, প্রকৃতি, দূরত্ব সম্পর্কে অবহিত হয়। এই পদ্ধতিতে শুশুক জলের মধ্যে মাছের বিভিন্ন প্রজাতিকেও চিহ্নিত করতে পারে। জলের মধ্যে প্রতিদিনের চেনা জগতের যদি সামান্যতমও পরিবর্তন হয় তা শুশুকের ‘সোনার’ যন্ত্রে ধরা পড়ে। সমুদ্রে ডুবোজাহাজের অস্তিত্ব জানার জন্য ক’দিন আগে মানুষ যে ‘সোনার’ যন্ত্র তৈরি করল লক্ষ লক্ষ বছর আগে প্রকৃতি শুশুকের দেহেই তা তৈরি করে রেখেছে।
পুরুষ শুশুক ৮- ১০ বছর বয়সে এবং স্ত্রী শুশুক ১০-১২ বছর বয়সে প্রজননে সক্ষম হয়। প্রজননের সময় একটি দলের একটি করে পুরুষ ও স্ত্রী শুশুক জোড়ায় জোড়ায় ঘোরে। অবশ্য এই জোড় স্থায়ী নয়। সঙ্গী বা সঙ্গিনী বদল হতেই পারে। যৌন মিলনের ৯-১১ মাস পরে সাধারণত এপ্রিল থেকে জুলাইয়ের মধ্যে স্ত্রী শুশুক প্রায় ৭০ সেমি লম্বা একটি বা দুটি শাবকের জন্ম দেয়। মা শুশুক শুধু বাচ্চার জন্ম দিয়েই দায়িত্ব পালন শেষ করে না। মনুষ্যেতর জীব হলেও সন্তানের প্রতি এদের যত্ন আমাদের শিক্ষণীয়। সন্তান জন্মানোর সঙ্গে সঙ্গে মা শুশুক তাকে ঠেলে জলের উপর তলে তুলে ধরে প্রথম শ্বাসগ্রহণের জন্য। প্রথম শ্বাস নিয়েই বাচ্চা শুশুক ধীরে ধীরে সাঁতার কাটতে শুরু করে। বাচ্চা দু’তিন মাস মায়ের স্তনদুগ্ধ পান করে। এ সময় তারা মায়ের সঙ্গে সঙ্গেই থাকে। তারপর তারা ছোট মাছ, পোকার লার্ভা ইত্যাদি নরম খাবার খেতে শেখে। এই সময়ে মা শুশুকের কাছ থেকে তারা শিকার ধরার কৌশল শেখে।
পুরুষ শুশুক ৮- ১০ বছর বয়সে এবং স্ত্রী শুশুক ১০-১২ বছর বয়সে প্রজননে সক্ষম হয়। প্রজননের সময় একটি দলের একটি করে পুরুষ ও স্ত্রী শুশুক জোড়ায় জোড়ায় ঘোরে। অবশ্য এই জোড় স্থায়ী নয়। সঙ্গী বা সঙ্গিনী বদল হতেই পারে। যৌন মিলনের ৯-১১ মাস পরে সাধারণত এপ্রিল থেকে জুলাইয়ের মধ্যে স্ত্রী শুশুক প্রায় ৭০ সেমি লম্বা একটি বা দুটি শাবকের জন্ম দেয়। মা শুশুক শুধু বাচ্চার জন্ম দিয়েই দায়িত্ব পালন শেষ করে না। মনুষ্যেতর জীব হলেও সন্তানের প্রতি এদের যত্ন আমাদের শিক্ষণীয়। সন্তান জন্মানোর সঙ্গে সঙ্গে মা শুশুক তাকে ঠেলে জলের উপর তলে তুলে ধরে প্রথম শ্বাসগ্রহণের জন্য। প্রথম শ্বাস নিয়েই বাচ্চা শুশুক ধীরে ধীরে সাঁতার কাটতে শুরু করে। বাচ্চা দু’তিন মাস মায়ের স্তনদুগ্ধ পান করে। এ সময় তারা মায়ের সঙ্গে সঙ্গেই থাকে। তারপর তারা ছোট মাছ, পোকার লার্ভা ইত্যাদি নরম খাবার খেতে শেখে। এই সময়ে মা শুশুকের কাছ থেকে তারা শিকার ধরার কৌশল শেখে।
আরও পড়ুন:

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৮৬ : অগ্নি সংস্কার

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৪৮: ঘরে চুরি, বাইরে চুরি
এই আশ্চর্য প্রাণী গঙ্গার শুশুক সভ্যতার অগ্রগতি আর মানুষের অবিবেচনা প্রসূত কর্মকাণ্ডের কবলে পড়ে আজ অবলুপ্তির মুখে দাঁড়িয়ে। অতীতে বর্শা গেঁথে শুশুক শিকার হলেও বর্তমানে মৎস্যজীবীরা সরাসরি শিকার করে না। নদীর জল থেকে ছেঁকে মাছ তুলে নেওয়ার জন্য এখন মৎস্যজীবীরা যে ধরনের নাইলন জাল ব্যবহার করে তা এতই সূক্ষ্ম যে শুশুকরা ইকোলোকেশন করতে এক একসময়ে ব্যর্থ হয়। ফলে জালে আটকা পড়ে বহু শুশুক মারা যায়। আবার জালে আটকে যেসব শুশুক বেঁচে থাকে জাল বাঁচাতে সেগুলোকে মৎস্যজীবীরা মেরে ফেলে। মৃত শুশুকের চর্বি থেকে যে তেল পাওয়া যায় তা বাতি জ্বালাতে এবং মাছ ধরার টোপ হিসেবে একসময়ে ব্যবহৃত হত। এখনও কোথাও কোথাও মানুষ বিশ্বাস করে শুশুকের তেল পিঠ ও কোমরের ব্যথায় মালিশ করলে কাজ দেয়। এছাড়া কোথাও কোথাও রিকেট, পোড়া, নিউমোনিয়া এবং সর্দি-কাশির চিকিৎসাতেও এই তেল ব্যবহৃত হত। অতীতে মাংসের জন্য এদের হত্যা করা হত।
তবে পরিবেশ দূষণ ও বাসস্থান বিলোপ গঙ্গার শুশুকের অস্তিত্বকে সংকটাপন্ন করে তুলেছে। নদীতে বাঁধ ও জলাধার নির্মাণ করতে গিয়ে গঙ্গার শুশুকদের স্থানান্তরে পরিযানের পথ অবরুদ্ধ করে দেওয়া হয়েছে এবং বহু শুশুক গোষ্ঠীকে জিনগতভাবে বিচ্ছিন্ন (genetically isolated) করে দেওয়া হয়েছে। গঙ্গা ও তার শাখানদীগুলোতে প্রতিদিন মিশছে টনটন নালা-নর্দমাজাত আবর্জনা, কলকারখানার শিল্প বর্জ্য ও উপজাত পদার্থ, কৃষি কাজে ব্যবহৃত কীটনাশক ইত্যাদি। আর ব্যাপক হারে অরণ্যনিধনের ফলে ভূমিক্ষয় বাড়ছে। ফলে নদীতে পলির পরিমাণও বাড়ছে। এতে নদী নাব্যতা হারাচ্ছে এবং শুশুকদের বসবাসের অযোগ্য হয়ে যাচ্ছে। তাছাড়া সুন্দরবন অঞ্চলে নদী-নালাতে যেভাবে গণপরিবহন ও মৎস্যজীবীদের যন্ত্রচালিত বোট বিপুল পরিমাণে চলাচল করে তাতে তেলদূষণের সঙ্গে সঙ্গে প্রপেলারের ধাক্কায় আহত হয়ে অনেক শুশুক মারা যাচ্ছে। আর মৎস্যজীবীদের জালে আটকে ওদের মৃত্যুর কথা তো আগেই বলেছি। এইসব কারণেই গঙ্গার শুশুক শুধু সুন্দরবন থেকে নয়, পুরো গঙ্গা জুড়ে এক বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতিতে পরিণত হয়েছে। গঙ্গার শুশুকদের সংকট উপলব্ধি করে ভারতীয় বন্যপ্রাণ সংরক্ষণ আইনের (১৯৭২) শিডিউল-১-এ এদের তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। আইইউসিএন (IUCN)-এর বিপদগ্রস্ত প্রজাতির তালিকাতেও একে ঠাঁই দেওয়া হয়েছে।
তবে পরিবেশ দূষণ ও বাসস্থান বিলোপ গঙ্গার শুশুকের অস্তিত্বকে সংকটাপন্ন করে তুলেছে। নদীতে বাঁধ ও জলাধার নির্মাণ করতে গিয়ে গঙ্গার শুশুকদের স্থানান্তরে পরিযানের পথ অবরুদ্ধ করে দেওয়া হয়েছে এবং বহু শুশুক গোষ্ঠীকে জিনগতভাবে বিচ্ছিন্ন (genetically isolated) করে দেওয়া হয়েছে। গঙ্গা ও তার শাখানদীগুলোতে প্রতিদিন মিশছে টনটন নালা-নর্দমাজাত আবর্জনা, কলকারখানার শিল্প বর্জ্য ও উপজাত পদার্থ, কৃষি কাজে ব্যবহৃত কীটনাশক ইত্যাদি। আর ব্যাপক হারে অরণ্যনিধনের ফলে ভূমিক্ষয় বাড়ছে। ফলে নদীতে পলির পরিমাণও বাড়ছে। এতে নদী নাব্যতা হারাচ্ছে এবং শুশুকদের বসবাসের অযোগ্য হয়ে যাচ্ছে। তাছাড়া সুন্দরবন অঞ্চলে নদী-নালাতে যেভাবে গণপরিবহন ও মৎস্যজীবীদের যন্ত্রচালিত বোট বিপুল পরিমাণে চলাচল করে তাতে তেলদূষণের সঙ্গে সঙ্গে প্রপেলারের ধাক্কায় আহত হয়ে অনেক শুশুক মারা যাচ্ছে। আর মৎস্যজীবীদের জালে আটকে ওদের মৃত্যুর কথা তো আগেই বলেছি। এইসব কারণেই গঙ্গার শুশুক শুধু সুন্দরবন থেকে নয়, পুরো গঙ্গা জুড়ে এক বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতিতে পরিণত হয়েছে। গঙ্গার শুশুকদের সংকট উপলব্ধি করে ভারতীয় বন্যপ্রাণ সংরক্ষণ আইনের (১৯৭২) শিডিউল-১-এ এদের তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। আইইউসিএন (IUCN)-এর বিপদগ্রস্ত প্রজাতির তালিকাতেও একে ঠাঁই দেওয়া হয়েছে।

গঙ্গায় ভেসে উঠেছে শুশুক। ছবি : সংগৃহীত।
সুন্দরবনের অরণ্যে খাদ্যশৃঙ্খলের শীর্ষে যেমন রয়েছে রয়েল বেঙ্গল টাইগার তেমনই সুন্দরবনের জলভাগে খাদ্যশৃঙ্খলের শীর্ষে রয়েছে শুশুক। সুতরাং যতটা গুরুত্ব দিয়ে রয়েল বেঙ্গল টাইগার সংরক্ষণের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে ঠিক ততটাই গুরুত্ব দেওয়া উচিত গঙ্গার শুশুকের সংরক্ষণে। ভারতে মোট ৫৩২ টি সংরক্ষিত অঞ্চলের মধ্যে ৯টি অঞ্চলে শুশুকের দেখভাল করা হয়। আর এর মধ্যে মাত্র একটি হল ঘোষিত স্যাংচুয়ারি— বিক্রমশীলা গ্যাঞ্জেস রিভার ডলফিন স্যাংচুয়ারি। বিহারে গঙ্গার ৫০ কিমি দৈর্ঘ্য জুড়ে বিস্তৃত এই স্যাংচুয়ারি। ‘WWF-India’ এবং দেরাদুনের ওয়াইল্ড লাইফ ইনস্টিটিউট অফ ইন্ডিয়া —এই দুটি বেসরকারি সংস্থাও শুশুক সংরক্ষণে উদ্যোগ নিয়েছে। গঙ্গার শুশুক সংরক্ষণের উপযুক্ত পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং তার দ্রুত রূপায়ণ দরকার। নইলে শুধু সুন্দরবনের নদীনালা থেকে নয়, সমগ্র গঙ্গা ও তার শাখা নদীগুলো থেকে গঙ্গার শুশুক চিরতরে বিলুপ্ত হয়ে যাবে। —চলবে।
* সৌম্যকান্তি জানা। সুন্দরবনের ভূমিপুত্র। নিবাস কাকদ্বীপ, দক্ষিণ ২৪ পরগনা। পেশা শিক্ষকতা। নেশা লেখালেখি ও সংস্কৃতি চর্চা। জনবিজ্ঞান আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত। বিজ্ঞান জনপ্রিয়করণের জন্য ‘দ্য সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশন অফ বেঙ্গল ২০১৬ সালে ‘আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু মেমোরিয়াল অ্যাওয়ার্ড’ এবং শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞান লেখক হিসেবে বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদ ২০১৭ সালে ‘অমলেশচন্দ্র তালুকদার স্মৃতি সম্মান’ প্রদান করে সম্মানিত করেছে।


















