
সোনার হরিণ।
একঝলকে
সঙ্গে সঙ্গে যে সমস্ত সিনেমায় উনি অংশগ্রহণ করেছিলেন প্রত্যেকটি আলাদা আলাদা বৈশিষ্ট্যে স্বতন্ত্র। কোনওটার সঙ্গে কোনওটার মিল ছিল না। এরকম ঘটনা সারা কেরিয়ারে আর কোনও বার ঘটেছিল কিনা জানতে বেশ বেগ পেতে হবে। এবং সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় এই বছরেই সুচিত্রা সেন-র সঙ্গে দু’বার ছবি করতে পারেননি। পরের বছর তো একটিও নয়।
‘সোনার হরিণ’ ছবিটি গতানুগতিক ছবি থেকে একটু আলাদা ছিল এবং পরিচালক মঙ্গল চক্রবর্তী সারা কেরিয়ারে যতগুলো ছবি করেছেন এ ছবি ছিল সবার চেয়ে অন্য ধাঁচের। এর আগে ‘তাসের ঘর’, ‘শিকার’ প্রভৃতি ছবিতে উত্তম কুমারকে যেভাবে ব্যবহার করতে পেরেছেন বা চেয়েছেন তার থেকে অন্য উত্তমকুমার-কে বের করে নিয়েছিলেন সোনার হরিণ ছবিতে।

উত্তম কথাচিত্র পর্ব-৭৩ : ‘খেলাঘর’

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-১৫ : Twoকি!

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৪২: কুইক অ্যাকশন

হ্যালো বাবু! পর্ব-১০৭: ডেসডিমোনার রুমাল/৬
কালী বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি অনবদ্য রোল এই ছবিতে আমরা দেখতে পাই। যে কালী বন্দ্যোপাধ্যায় বছর দুয়েক আগে ‘নীল আকাশের নীচে’ ছবি করে সকলের প্রশংসা কুড়িয়েছেন এবং আগামী দিনেও উত্তমবাবুর থ্রিলার ছবিতে উনি কিছুটা ভিলেনের রোল করে ছবির জগতকে সমৃদ্ধ করবেন।
ছবির কাহিনি অত্যন্ত মনোজ্ঞ। রাসবিহারী লাল নামক একজন লেখকের কাহিনী অবলম্বনে চিত্রনাট্য তৈরি করেছিলেন মঙ্গল চক্রবর্তী স্বয়ং। ছবিটিতে কাহিনির বাঁধুনী এমন একটা মার্জিত ভঙ্গিতে রাখা হয়েছিল যেখানে মানুষ নয় সিচুয়েশন কথা বলছিল। দর্শক প্রেক্ষাগৃহে বসে শুধু কুশীলবদের মুন্সীয়ানাই উপভোগ করেননি উপভোগ করেছেন কাহিনীর বিভিন্ন মোড়ঘোরানো চমককেও।

সুন্দরবনের বারোমাস্যা, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১২৬: সুন্দরবনের পাখি: গুলিন্দা বাটান

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৪১: ঘটি চেয়ে বঁটি
সেজন্যই ছবিগুলো একঘেয়েমি দোষে দুষ্ট হয়নি। ‘সোনার হরিণ’ ছবিতে লুক টেস্টে উনি মুখের উপর যে গোঁফের ব্যবহার করেছেন সেটা গতানুগতিক অন্যান্য ছবির থেকে অনেকটি এগিয়ে দিয়েছিল। তারপর প্রতিটা ফ্রেমে উনি যখন নিজের সিনেমাটিক অ্যাপিয়ারেন্স দেখাচ্ছেন সেটা বিশ্ব চলচ্চিত্র শিল্পের অনুসরণীয় একটা অধ্যায়।
আমাদের দেশে এ ধরনের সেলুলয়েডি ফ্রেম খুব একটা সারস্বত মর্যাদা পায় না কিন্তু মঙ্গল চক্রবর্তী নামক একজন গুণী পরিচালকের হাতে যখন উত্তমবাবু অভিনয়ের প্রতিটা নিয়ম নীতিকে নতুন করে গড়ে তুলছেন তথা মান্যতা দিচ্ছেন। তিনিও হাঁ হয়ে দেখেছেন, একজন শিল্পীর সাধনা কোন পর্যায়ে গেলে এ ধরনের স্ক্রিন প্রেজেন্টস দেখা যায়। সাধারণত নাট্যশাস্ত্রের কিছু বাঁধা নিয়ম অনুযায়ী, মঞ্চের উপর কুশীলবদের আঙ্গিক বাচিক অভিনয়ের প্রকাশ ঘটাতে হয়।

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৩৬: এক অনন্য অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ রামচন্দ্রের অরণ্যবাস

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৮৩: ত্রিপুরা : ঊনকোটির বহু মূর্তি ধ্বংস হয়ে গিয়েছে
আমরা তুলসী চক্রবর্তী মধ্যে যে মেধাপূর্ণ অভিনয় ক্যামেরার সামনে দেখেছি সেটাকে ক্ষণজন্মা বললে বোধহয় কম বলা হয়। কোনো পুরস্কার কোনো সংবর্ধনা কোন সার্টিফিকেটের তোয়াক্কা না করে উনি যে আঙ্গিক অভিনয় বাচিক অভিনয়ের মিশেলে দেখিয়ে গেছেন। তা যে কোন দেশের সম্পদ।
উত্তমবাবুর মতো ক্ষণজন্মা শিল্পীরা এ ধরনের অনুসরণীয় শিল্পীদের সাথে কাজ করার সুযোগ পেয়েছিলেন বলেই বোধ হয় ছবির নির্মাণপর্বটা এত গোছানো হতো। উত্তমবাবুর দুর্ভাগ্য শেষের দিকের কয়েকটা ছবি ছাড়া ওনাকে কখনও পার্শ্ব চরিত্রে অভিনয় করতে হয়নি। বা যে ছবি তো উনি পার্শ্বচরিত্রে অভিনয় করবেন বলে মনোনীত হয়েছেন সেখানে কোন এক জাদু বলে উনি প্রধান আকর্ষণ হয়ে দাঁড়িয়েছেন। মূল চরিত্রের অভিনয়কারীরা অনেকটা গৌণ হয়ে পড়েছেন। কেন হয়ে পড়েছেন, এর কোন সদুত্তর আমাদের কাছে নেই কিন্তু আমরা যে ছবিটি আলোচনা করছি সেখানে দেখব ছবি বিশ্বাস থেকে শুরু করে কালী বন্দোপাধ্যায় কেউই কম শক্তিমান অভিনেতা ছিলেন না। কিন্তু ‘এ বঙ্গের সমতলে তৃণলতা গুল্মদলে বজ্রজয়ী তুমি বনস্পতি’-র মতো উত্তমবাবু যেন সকলকে ছাড়িয়ে গিয়েছেন।

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-৯: শো-কেস শহর, উপসাগরীয় শিস এবং গোরার দিনরাত্রি

রহস্য রোমাঞ্চের আলাস্কা, পর্ব-৬৫: একদিকে জল, অন্যদিকে পাহাড় সিউয়ার্ডের রাস্তা যেন স্বর্গদ্বার!
আমাদের দেশের চলচ্চিত্র সমালোচকরা প্রকৃত ফিল্মের সমালোচনা করতে বিশেষত ফ্রেম টু ফ্রেম আলোচনা করতে খুবই কার্পণ্য দেখিয়ে থাকেন। ফিল্মের কতগুলো আঙ্গিক দিক আলোচনা করেই তাঁরা রায় দেন। কিন্তু যদি কাহিনী এবং কুশীলবদের অভিনয়ের ব্যাকগ্রাউন্ড ভালো করে অনুশীলন করা যায় তাহলে কোথাও না কোথাও সেই অদেখা, অলেখা সুরটা ভেসে ওঠে।
সেই ধরনের একজন ক্ষণজন্মা অভিনেতা যিনি কাহিনীর মূল সুরটা ধরতে পারতেন এবং ক্যামেরার সামনে অতি বাড়াবাড়ি না করে সেটাকে যথাস্থানে পৌঁছে দিতে পারতেন। পাঠকরা যদি ‘সোনার হরিণ’ ছবিটা আরেকবার ফ্রেম টু ফ্রেম দেখেন আমার কথা বোধহয় অনেকটা মিলে যাবে।

১৯৫৯ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত বাংলা ছবি।
হেমন্ত বাবু শুধুমাত্র কণ্ঠসঙ্গীত শিল্পী নন ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক নির্মাণের মাধ্যমে ছবির মনোজাগতিক যে পর্ব থাকে তার সেতু নির্মাণেও তিনি ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দী একজন শিল্পী। বিশেষত যখন কোন গানের প্রিল্যুড এবং ইন্টারল্যুড তৈরি হতো, সেখানে এমন কিছু যন্ত্রের ব্যবহার তিনি করতেন যেটা ফিল্মোচিত গানের একটা নতুন অধ্যায় লিখতে পারতো।
ভারত বিখ্যাত শিল্পী গীতা দত্তকে দিয়ে এ ছবির গান গাইয়ে নেওয়ার যে দক্ষতা তিনি দেখিয়েছেন, সে সময় হেমন্ত বাবুর মতো সংগীত শিল্পীর পক্ষেই সম্ভব হয়েছিল। উনি বুঝতেন কোন ছবিতে কি ধরনের আবহসংগীত এবং কণ্ঠসঙ্গীতের মিশেল ঘটালে সে ছবির প্রাণ প্রতিষ্ঠা পাবে। গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের কথায় ছবিটির প্রত্যেকটি গান অত্যন্ত সময়োপযোগী এবং কালোত্তীর্ণ হয়েছিল বলেই মনে হয়।
সর্বোপরি এ ছবি, কাহিনি-অভিনয়, সাংগীতিক পরিবেশের মিলিত সমন্বয়ে, ভারতীয় চলচ্চিত্রের একটি অমূল্য সম্পদ হিসাবেই বিবেচিত হওয়া উচিত।—চলবে।
* উত্তম কথাচিত্র (Uttam Kumar–Mahanayak–Actor) : ড. সুশান্তকুমার বাগ (Sushanta Kumar Bag), অধ্যাপক, সংস্কৃত বিভাগ, মহারানি কাশীশ্বরী কলেজ, কলকাতা।


















