
ছবি: প্রতীকী। সংগৃহীত।
দণ্ডকারণ্যে, শরভঙ্গমুনির আশীর্বাদধন্য রঘুনন্দন রাম, আশ্রমবাসীদের অনুরোধে, রাজকর্তব্যের দায়িত্ব পালন করবেন। বন, রাক্ষসদের অত্যাচারমুক্ত করবেন—এই মর্মে তিনি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হলেন। আশ্রমবাসীদের এটি অনুরোধ নয়, আদেশ। সেই আদেশানুসারে, ভাই লক্ষ্মণের সঙ্গে তিনি আশ্রমবাসী তাপসদের স্বার্থরক্ষা এবং পিতার আদেশপালন, উভয় কাজ সম্পন্ন করবেন। তপস্বীগণ অচিরেই তাঁদের দুই ভায়ের শৌর্যের প্রকাশ দেখতে প্রস্তুত থাকুন।তপস্বিনাং রণে শত্রূন্ হন্তুমিচ্ছামি রাক্ষসান্। পশ্যন্তু বীর্য্যমৃষয়ঃ সভ্রাতুর্মে তপোধনাঃ।।
রামের পরবর্তী গন্তব্য সুতীক্ষ্ণ মুনির আশ্রম। রাম, লক্ষ্মণ ও সীতা, সেই ব্রাহ্মণগণের সঙ্গে রওনা দিলেন। পর্যাপ্তজলপূর্ণ নদী অতিক্রম করে, বহুপথ পার হয়ে, তিনি, সুমেরুপর্বততুল্য সমুন্নত পর্বত দেখতে পেলেন। ইক্ষ্বাকুকুলগৌরব, দুই কুমার, সীতার সঙ্গে, বিবিধ তরুরাজিশোভিত, সেখানকার কাননভূমিতে প্রবেশ করলেন। সেই গহনারণ্যে প্রবেশ করে দেখলেন, সেখানে বহুফলফুলে সমৃদ্ধ, এক আশ্রম রয়েছে। সেই আশ্রমের একান্তে বিরাজমান চীরখণ্ডগুলি। সেখানে বিরাজমান তাপস সুতীক্ষ্ণ, তাঁর সর্বাঙ্গ কমলতুল্য ব্রণমলদ্বারা আবৃত। রাম তাঁকে যথাবিধি আত্মপরিচয় নিবেদন করলেন। তিনি রাম।রামো২হমস্মি ভগবন্ ভবন্তং দ্রষ্টুমাগতঃ। তস্মাদভিবদ ধর্মজ্ঞ মহর্ষে সত্যবিক্রম।।
রামের পরবর্তী গন্তব্য সুতীক্ষ্ণ মুনির আশ্রম। রাম, লক্ষ্মণ ও সীতা, সেই ব্রাহ্মণগণের সঙ্গে রওনা দিলেন। পর্যাপ্তজলপূর্ণ নদী অতিক্রম করে, বহুপথ পার হয়ে, তিনি, সুমেরুপর্বততুল্য সমুন্নত পর্বত দেখতে পেলেন। ইক্ষ্বাকুকুলগৌরব, দুই কুমার, সীতার সঙ্গে, বিবিধ তরুরাজিশোভিত, সেখানকার কাননভূমিতে প্রবেশ করলেন। সেই গহনারণ্যে প্রবেশ করে দেখলেন, সেখানে বহুফলফুলে সমৃদ্ধ, এক আশ্রম রয়েছে। সেই আশ্রমের একান্তে বিরাজমান চীরখণ্ডগুলি। সেখানে বিরাজমান তাপস সুতীক্ষ্ণ, তাঁর সর্বাঙ্গ কমলতুল্য ব্রণমলদ্বারা আবৃত। রাম তাঁকে যথাবিধি আত্মপরিচয় নিবেদন করলেন। তিনি রাম।রামো২হমস্মি ভগবন্ ভবন্তং দ্রষ্টুমাগতঃ। তস্মাদভিবদ ধর্মজ্ঞ মহর্ষে সত্যবিক্রম।।
মুনির দর্শনলাভের আশায় তিনি এসেছেন। সত্যই যাঁর একমাত্র শৌর্যের প্রকাশ, হে ধর্মজ্ঞ, মহর্ষি, আপনি আমাকে সম্ভাষণ জানান। ধীর সুতীক্ষ্ণ, রঘুকুলশ্রেষ্ঠ রামকে দেখে, দুই বাহু দিয়ে প্রীতি-আলিঙ্গনে জড়িয়ে ধরলেন। সকৃতজ্ঞ ঋষি জানালেন, রামের আগমনহেতু এখন এই আশ্রমটি, প্রভুযুক্ত হল। মুনি আরও জানালেন, যশস্বী রামের আগমনের প্রতীক্ষায় তিনি এই পৃথিবীতে নশ্বর দেহ পরিত্যাগ করে, দেবলোকে যাননি। মহর্ষি সুতীক্ষ্ণ আরও জানালেন, শতক্রতু দেবরাজ ইন্দ্র, এখানে এসেছিলেন। তাঁর কাছে শুনেছেন, রাজ্যচ্যুত রাম, চিত্রকূটে উপস্থিত হয়েছেন। দেবরাজ জানিয়েছেন, ঋষির পুণ্যকর্মের ফললাভের কারণে, তিনি সর্বলোকজয়ের গৌরব অর্জন করেছেন। মহর্ষির প্রস্তাব—আমার প্রসাদে, স্ত্রী সীতা ও ভাই লক্ষ্মণের সঙ্গে, আমার তপস্যালব্ধ, দেবর্ষিদের অভীষ্ট, সেই লোকে তুমি বিহার কর। তেষু দেবর্ষিজুষ্টেষু জিতেষু তপসা ময়া। মৎপ্রসাদাৎ সভার্য্যস্ত্বং বিহরস্ব সলক্ষ্মণঃ।।
কঠোর তপোবলে দীপ্ত, সত্যবাদী, ব্রহ্মাতুল্য মহর্ষিকে, ইন্দ্রসদৃশ রাম, প্রত্যুত্তরে জানালেন, হে মহামুনি, আমি স্বয়ং সেই লোকসমূহ অর্জন করব। এই কাননে, আপনার নির্দেশিত একটি বাসস্থানগ্রহণে ইচ্ছুক হয়েছি আমি। অহমেবাহরিষ্যামি স্বয়ং লোকান্ মহামুনে। আবাসন্ত্বহমিচ্ছামি প্রদিষ্টমিহ কাননে।।
কঠোর তপোবলে দীপ্ত, সত্যবাদী, ব্রহ্মাতুল্য মহর্ষিকে, ইন্দ্রসদৃশ রাম, প্রত্যুত্তরে জানালেন, হে মহামুনি, আমি স্বয়ং সেই লোকসমূহ অর্জন করব। এই কাননে, আপনার নির্দেশিত একটি বাসস্থানগ্রহণে ইচ্ছুক হয়েছি আমি। অহমেবাহরিষ্যামি স্বয়ং লোকান্ মহামুনে। আবাসন্ত্বহমিচ্ছামি প্রদিষ্টমিহ কাননে।।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৩৫: মহর্ষি নারদের প্রশ্নচ্ছলে উপদেশগুলি যেন রাজনীতির পাঠ

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-৫: কিশোরীর মেঘবেলা

আকাশ এখনও মেঘলা/৪১

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৯০: শত্রুকে হারাতে সব সময় অস্ত্র নয়, ছলনারও আশ্রয় নিতে হয়
রাম,সুতীক্ষ্ণ মুনিকে জানালেন, গৌতমবংশীয় মহান ঋষি শরভঙ্গ বলেছেন, মহর্ষি সুতীক্ষ্ণ, সব কাজে সুনিপুণ এবং সকল প্রাণীদের হিতে নিরত। রাম এমন বলতে থাকলে, বিশ্বখ্যাত মহর্ষি, প্রীত হয়ে মধুর বাক্যে বললেন, এই আশ্রম, মনোরম ও বহুগুণযুক্ত। আশ্রমটি সদা ফলমূলসমন্বিত ও ঋষিগণপরিবৃত। আশ্রমটির ক্ষতি না করে, অন্যদের প্রলুব্ধ করে, বিশাল প্রাণীকুল নির্ভয়ে বিচরণ করে এখানে। প্রাণীদের এই উপদ্রব বিনা এই আশ্রমে আর কোনও ত্রুটি নেই।
ঋষির বক্তব্য শুনে, শরসমেত ধনুক তুলে নিলেন লক্ষ্মণাগ্রজ রাম।ধীর,রাম সুমহান মহর্ষিকে বললেন, এখানে সমাগত প্রাণীসমূহ, রামের শাণিতফলাবিশিষ্ট তীক্ষ্ণ শরে বিদ্ধ হয়ে নিহত হতে পারে। তাই দীর্ঘদিন এই আশ্রমবাস তাঁর অভিপ্রেত নয়।কথোপকথনের মাঝে সন্ধ্যাকাল উপস্থিত হল। রাম, সন্ধ্যাকালীন উপাসনা সম্পন্ন করলেন। স্থির হল, সুতীক্ষ্ণ মুনির সেই রমণীয় আশ্রমে রাম, সীতা ও লক্ষ্মণসহ বাস করবেন। সন্ধ্যা অতিক্রান্ত হয়ে রাত্রি সমাগত হয়েছে, বিবেচনা করে,স্বয়ং মহর্ষি সুতীক্ষ্ণ, অতিথিসৎকার করলেন। তিনি পুরুষশ্রেষ্ঠ দুই ভাইকে তাপসদের যোগ্য ভোজ্য অন্ন প্রদান করলেন।
ঋষির বক্তব্য শুনে, শরসমেত ধনুক তুলে নিলেন লক্ষ্মণাগ্রজ রাম।ধীর,রাম সুমহান মহর্ষিকে বললেন, এখানে সমাগত প্রাণীসমূহ, রামের শাণিতফলাবিশিষ্ট তীক্ষ্ণ শরে বিদ্ধ হয়ে নিহত হতে পারে। তাই দীর্ঘদিন এই আশ্রমবাস তাঁর অভিপ্রেত নয়।কথোপকথনের মাঝে সন্ধ্যাকাল উপস্থিত হল। রাম, সন্ধ্যাকালীন উপাসনা সম্পন্ন করলেন। স্থির হল, সুতীক্ষ্ণ মুনির সেই রমণীয় আশ্রমে রাম, সীতা ও লক্ষ্মণসহ বাস করবেন। সন্ধ্যা অতিক্রান্ত হয়ে রাত্রি সমাগত হয়েছে, বিবেচনা করে,স্বয়ং মহর্ষি সুতীক্ষ্ণ, অতিথিসৎকার করলেন। তিনি পুরুষশ্রেষ্ঠ দুই ভাইকে তাপসদের যোগ্য ভোজ্য অন্ন প্রদান করলেন।
আরও পড়ুন:

সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১২৩: সুন্দরবনের পাখি: বাটান

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-১২ : স্বপ্নের নায়ক, নায়কের স্বপ্ন
সুতীক্ষ্ণমুনির আশ্রমে বিশেষ সমাদরে আপ্যায়িত রামচন্দ্র ও লক্ষ্মণ রাত্রি যাপন করলেন। প্রভাতে জেগে উঠে রাঘব রাম সীতার সঙ্গে সুশীতল পদ্মগন্ধে সুরভিত জলে স্নান করলেন। বৈদেহী সীতা এবং রাম, লক্ষ্মণ তাপসদের আশ্রয় বনটিতে অগ্নি, দেবতাদের যথাবিধি অর্চনা সম্পন্ন করলেন। উদীয়মান সূর্যকে দেখে, নিষ্পাপ রাঘবদ্বয় সুতীক্ষ্ণ মুনির কাছে উপস্থিত হলেন। তাঁরা মধুর স্বরে মুনিকে বললেন, মহর্ষি, পূজ্যব্যক্তিত্ব, তা সত্ত্বেও তাঁর দ্বারা সপরিবারে রাম সম্মানিত হয়েছেন। সুতীক্ষ্ণ মুনির অনুমতি নিয়ে এখন তাঁরা প্রস্থান করবেন। কারণ, সহযাত্রী মুনিগণ তাঁদের দ্রুত গমনের জন্য তাড়া দিচ্ছেন। রাম, দণ্ডকারণ্যবাসী পূতচরিত্র ঋষিদের সকল আশ্রম যত তাড়াতাড়ি সম্ভব দেখতে উদগ্রীব হয়েছেন। নিত্য ধর্মপরায়ণ,তপোবলে বশীকৃতচিত্ত, শিখাহীন অগ্নির মতো মুনিশ্রেষ্ঠদের সঙ্গে গমনের অনুমতি প্রার্থনা করলেন রাম। বিপথে অর্জিত অর্থ লাভ করে নীচ যেমন অসহনীয় ওঠে তেমনই সূর্য প্রখর উত্তাপ ধারণ করে যতক্ষণ না অসহ্য হয়ে ওঠেন সেই সময়ের মধ্যেই রাম নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছনোর ইচ্ছা প্রকাশ করলেন।
আরও পড়ুন:

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৩৭: বিলেতে হয়েছিল রবীন্দ্রনাথের অস্ত্রোপচার

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৩৮: আপৎকালীন পরিস্থিতি
রাম সীতা ও লক্ষ্মণ, মহর্ষির চরণদ্বয় বন্দনা করলেন। ঋষিবর সুতীক্ষ্ণ তাঁদের পদযুগল হতে তুলে ধরে প্রগাঢ় আলিঙ্গনে আবদ্ধ করলেন। তিনি সস্নেহে বললেন, হে রাম, তুমি সৌমিত্র লক্ষ্মণ ও ছায়াসঙ্গিনী সীতার সঙ্গে নিরুপদ্রবে যাত্রা কর। অরিষ্টং গচ্ছ পন্থানং রাম সৌমিত্রিণা সহ। সীতয়া চানয়া সার্দ্ধং ছায়েবানুবৃত্তয়া।। বীর, রাম সেখানে তপোবলে বিশুদ্ধাত্মা দণ্ডকারণ্যবাসীদের রমণীয় আশ্রম দর্শন করুন। সেখানে রাম দেখবেন, পর্যাপ্তফলমূলসমন্বিত প্রশস্ত বনভূমি, সুন্দরমৃগকুল যার শোভা এমন কুসুমাস্তীর্ণ বনরাজি, বিহঙ্গরা সেখানে প্রশান্ত, পুষ্পিতকমলদলশোভিত সেই অরণ্য, বিচরণরত বহু কারণ্ডববিশিষ্ট স্বচ্ছসলিল পুষ্করিণী ও সরোবর রয়েছে সেখানে। রাম দেখবেন, দৃষ্টিনন্দন পার্বত্য ঝর্ণাগুলি, ময়ূরের কেকাধ্বনিমুখরিত রম্য বনভূমি। মহর্ষির অনুরোধ, লক্ষ্মণও সহযাত্রী হন, সব কিছু দেখে তাঁরা যেন আবার অবশ্যই আশ্রমে ফিরে আসেন। সুতীক্ষ্ণমুনির প্রস্তাবে সাড়া দিয়ে, রাম মহর্ষিকে প্রদক্ষিণ করলেন। রাম, সম্মতিসূচক তথেতি তাই হবে বলে প্রস্থানে উদ্যোগী হলেন।আয়তলোচনা সীতা প্রস্থানোদ্যত দুই ভাইয়ের হাতে তুলে দিলেন, দুটি শুভ তূণ, ধনুক ও নির্মল খড়্গ। রাম ও লক্ষ্মণ উভয়ে, শুভ তূণ দুটি বেঁধে নিলেন, সশব্দ ধনুক ধারণ করে রাম ও লক্ষ্মণ আশ্রম হতে বাইরে এলেন। ধনুক ও অসি ধারণ করে, রূপবান দুই কুমার, মহর্ষির আদেশানুসারে, সীতাকে সঙ্গে নিয়ে, সত্বর যাত্রা করলেন।
আরও পড়ুন:

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৬৮: দুর্গম গিরি কান্তার ‘মরুতীর্থ হিংলাজ’

রহস্য রোমাঞ্চের আলাস্কা, পর্ব-৬৪: অ্যাঙ্করেজের সঙ্গে সিউয়ার্ডকে জুড়েছে পৃথিবীখ্যাত সিউয়ার্ড হাইওয়ে
অযোধ্যার রাজসিংহাসনের উত্তরাধিকারী প্রত্যাখ্যাত যুবরাজ রাম, পিতৃশর্তরক্ষার্থে বনবাসজীবনে স্বেচ্ছানির্বাসন বেছে নিয়েছেন। দণ্ডকারণ্যের যাত্রাপথে মহর্ষি শরভঙ্গের আশ্রমে রাক্ষসদের হিংস্র আক্রমণে অত্যাচারিত মুনিগণ সুরক্ষাপ্রার্থনা করেছেন তাঁর কাছে। তাপসগণ যেন ক্ষত্রিয়কুমারের শক্তির অপচয় হতে ক্লেদমুক্তির সঠিক পথনির্দেশ দিলেন। অরণ্যবাস যেন ফলপ্রসূ হয়,সে বিষয়ে,রাম প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হলেন। রাক্ষসদের অত্যাচারমুক্ত বনাঞ্চল ও পিতৃশর্তরক্ষা,দুটিই হবে রামের অরণ্যবাসের লক্ষ্য। শরভঙ্গমুনির নির্দেশানুসারে আরও একজন ধর্মজ্ঞ ঋষির সঙ্গে রামের সাক্ষাৎ হল। তিনি মহর্ষি সুতীক্ষ্ণ। ঋষি যেন রামের অপেক্ষায় ছিলেন, তিনি সাদরে রঘুকুলের শ্রেষ্ঠ কুমারকে বরণ করে নিলেন। ঋষিগণ প্রত্যেকেই রামের প্রভুত্বের প্রভাব অস্বীকার করেননি। বরং তাঁদের সস্নেহ স্বীকৃতি লক্ষ্য করা যায় রামের প্রতি সম্ভাষণে। ঋষি সাদরে রামকে তাঁর আশ্রমে আশ্রয় দিলেন। অপরিচয়ের দ্বিধামুক্ত, সংশয়হীন আন্তরিকতায় পরিপূর্ণ সেই সম্ভাষণের গভীরতা। স্বাগতং তে রঘুশ্রেষ্ঠ রাম সত্যভৃতাং বর। আশ্রমোঽয়ং ত্বয়াক্রান্তঃ সনাথ ইব সাম্প্রতম্।। রাম প্রভু, কিন্তু এই প্রভুত্বে নেই ক্ষমতার আস্ফালন বা দম্ভের প্রকাশ, আছে ধর্মজ্ঞ ব্যক্তিদের নির্ভরতার আশ্রয়, আছে দূর অরণ্যবাসী তাপসদের নিশ্চিন্ত জীবনের আশ্বাস। সত্যনিষ্ঠতায় প্রবাদপ্রতিম রাম বোধ হয় এই বিষয়টিতে, “সত্যবাদী যুধিষ্ঠির” এই প্রচলিত প্রবাদকেও ছাপিয়ে ভারতবর্ষের অন্তর্লোকে বিরাজমান। রামের নির্দ্বিধায় পিতৃ-আজ্ঞাপালনের অঙ্গীকার, সাংসারিক জীবনে সস্ত্রীক পার্থিব সুখত্যাগ, যৌথ পারিবারিক জীবনে, জ্যেষ্ঠপুত্রের আদর্শনিষ্ঠতার প্রতীক হয়ে আজও অনুপ্রেরণার উৎস।

ছবি: প্রতীকী। সংগৃহীত।
দেবরাজ ইন্দ্র, ঋষিকে জানিয়েছেন, সুতীক্ষ্ণমুনি, বহুতপস্যালব্ধ অক্ষয়পুণ্যবলে মহর্ষি স্বর্গতুল্য লোকসমূহ লাভ করেছেন, মুনি সেই লোকে বিহারের স্বাধীনতা দিলেন রামকে। রাম সবিনয়ে ঋষির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন। রাম ক্ষত্রিয়, তাঁর আত্মমর্যাদাবোধে, দীপ্ত রাজকীয় ঔদ্ধত্যের প্রকাশ নেই, আছে দীনহীনের আশ্রয়ভিক্ষার আনত মিনতি। বন্য প্রাণীদের অবাধগতি যে আশ্রমে,অহিংস সেই তাপসগণ অধ্যুষিত আশ্রমের বাতাবরণ পাছে শস্ত্রধারী ক্ষত্রিয়কুমারের শাণিত অস্ত্রাঘাতে বিনষ্ট হয়, তাহলে সর্বভূতহিতে রতঃ সকল প্রাণীর কল্যাণ যে মুনির লক্ষ্য তাঁর পরাজয় হবে যে। তাই রাম শুধু একটিমাত্র নিশিযাপনের অনুমতি প্রার্থনা করেছেন। একজন বিবেকবান ক্ষত্রিয়, অপরজন অহিংসব্রতে নিরত কল্যাণকামী এক মহান ঋষি। দু’জনের উদ্দেশ্যে কোনও পার্থক্য নেই। এক উচ্চতায় পৌঁছে পারস্পরিক বোঝাপড়া যেন কোনও মহান লক্ষ্যে ধাবিত হয়। রাম, ঋষিদের প্রাণরক্ষায় যত্নবান, মহর্ষি সুতীক্ষ্ণ, সকল প্রাণের সুরক্ষাবিষয়ে সচেতন। মহর্ষির আশ্রমবর্ণনায় তাঁর নীতিবোধ প্রকটিত হয়েছে। রাম, তাঁর ক্ষত্রিয়সুলভ আদর্শনিষ্ঠতায় প্রজাসুরক্ষাকে গুরুত্ব দিয়েছেন। এক মানবিকবোধ হতে বৃহত্তর মানবিকচেতনায় উত্তরণের বার্তা প্রকাশিত হয়েছে রাম ও মহর্ষি সুতীক্ষ্ণের কথোপকথনে। বৃহত্তর স্বার্থরক্ষার চিন্তা জয়ী হয়েছে। ক্ষত্রিয়কুমার রাম সংযত হয়েছেন, কারণ রাজা যে বিশ্বচরাচরের রক্ষক।
মহর্ষিদের আশীর্বাদধন্য রামের বনবাসজীবন। এমন ক্লেদমুক্ত হয় না কেন জীবন? যেখানে সজ্জনের সংসর্গ মানুষকে নতুন কোন পথনির্দেশ দেয়, যে পথচলায় রয়েছে সদুদ্দেশ্যসাধনের বার্তা। প্রাত্যহিকতার গ্লানি, দৈনন্দিন নৈরাশ্যের অন্ধকারাচ্ছন্ন গুহাপথের শেষ সীমায় নতুন কোনও আলোর দিশা?—চলবে।
মহর্ষিদের আশীর্বাদধন্য রামের বনবাসজীবন। এমন ক্লেদমুক্ত হয় না কেন জীবন? যেখানে সজ্জনের সংসর্গ মানুষকে নতুন কোন পথনির্দেশ দেয়, যে পথচলায় রয়েছে সদুদ্দেশ্যসাধনের বার্তা। প্রাত্যহিকতার গ্লানি, দৈনন্দিন নৈরাশ্যের অন্ধকারাচ্ছন্ন গুহাপথের শেষ সীমায় নতুন কোনও আলোর দিশা?—চলবে।
* মহাকাব্যের কথকতা (Epics monologues of a layman): পাঞ্চালী মুখোপাধ্যায় (Panchali Mukhopadhyay) অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপিকা, সংস্কৃত বিভাগ, যোগমায়া দেবী কলেজে।


















