শুক্রবার ২০ মার্চ, ২০২৬


(বাঁদিকে) স্ত্রী ও পুরুষ কণ্ঠী ঘুঘু মিলে বাসা তৈরি। (মাঝখানে) কণ্ঠী ঘুঘুর ডিম। (ডান দিকে) জোড়া কণ্ঠী ঘুঘু। ছবি: সংগৃহীত।

আমাদের গ্রামের বাড়িতে ধান ভাঙানোর পর খামারে বাতাসে তুষ ও কুঁড়ো উড়িয়ে চাল পরিষ্কার করা হত। তারপরেও চালে থাকা তুষ ও কুঁড়ো কুলোর হাওয়া দিয়ে এবং পাছড়ে পরিষ্কার করা হত। তখন পলিথিন বা ত্রিপল ছিল না, ফলে গোবর দিয়ে নিকানো মসৃণ খামারে মাটির উপরেই এইসব ঝাড়াই মাড়াই চলত। আর তার ফলে খামারে ইতি-উতি কিছু চাল ছড়িয়ে ছিটিয়ে থেকে যেত। সেই চাল খাওয়ার জন্য হাজির হয়ে যেত পায়রা আর ঘুঘুরা। আমাদের বাড়িতে পায়রা পোষা না হলেও অন্যদের বাড়িতে পোষা পায়রা হাজির হত। ঘুঘুর বাসা তো আমাদের বাড়িতে ছিলই। আশপাশ থেকেও অনেক ঘুঘু আসত।

এই সব ঘুঘুগুলো অধিকাংশই ছিট ঘুঘু। কিন্তু মাঝে মাঝে লক্ষ্য করতাম পায়রা ও ঘুঘুদের সঙ্গে আর এক রকমের পাখি দুটো কিংবা চারটে খামার থেকে চাল খুঁটে খাচ্ছে। দেখতে প্রায় ঘুঘুর মতোই তবে আকারে একটু ছোট। সব সময় যে এরা আসত তা নয়, মাঝে মাঝে দেখতাম। রঙের সামান্য পার্থক্য তো ছিলই, তবে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হল এদের ঘাড়ের কাছে কালো রঙের একটা অর্ধচন্দ্রাকার দাগ রয়েছে যা ঘাড়ের দু’পাশ দিয়ে সামান্য নেমে শেষ হয়ে গিয়েছে। দেখে মনে হবে যেন কালো রঙের একটা অর্ধচন্দ্রাকার বলয় কেউ ঘাড়ের ওপরে পরিয়ে দিয়েছে। ছোটবেলায় এদেরও ঘুঘু বলেছি, সঠিক নাম জানতাম না। পরে বড় হয়ে জানলাম এই ঘুঘুর নাম হল কণ্ঠী ঘুঘু। ঘাড়ে কালো রঙের ওই দাগ থাকার জন্যই যে এদের এমন নাম তা বলাবাহুল্য। ইংরেজিতে এদের বলে ‘Eurasian Collared Dove’, বিজ্ঞানসম্মত নাম ‘Streptopelia decaocto’। এরা আসলে ছিট ঘুঘুরই এক নিকটাত্মীয়।
কণ্ঠী ঘুঘু লম্বায় হয় ৩০ থেকে ৩৩ সেন্টিমিটার, আর ওজন হয় ১৫০ থেকে ২০০ গ্রাম। এদের পিঠের দিকের পালকের রং হালকা বাদামি বা বালিরঙা ধূসর। দুই ডানার রঙ কালচে ধূসর, আর প্রান্তের দিকের রং কালো। তবে বুকের কাছে রং সামান্য গোলাপি আভাযুক্ত। আর পেট ছাইরঙা। আগেই বলেছি এদের ঘাড়ের কাছে একটা কালো রঙের অসম্পূর্ণ বলয় আছে। এই বলয়টা আজকালকার দিনে অনেকে ঘাড়ে ইয়ারফোন ঝুলিয়ে রাখলে যেমন লাগে অনেকটা তেমন দেখায়! এদের লেজ হয় বেশ লম্বাটে, আর পালকের প্রান্তের দিকে সাদা রঙের চৌকো দাগ আছে। ওড়ার সময় লেজে এই সাদা দাগ স্পষ্ট দেখা যায়। এদের চোখের মণির রং লাল। আর চোখের বাইরে ধূসর রঙের বলয় রয়েছে। এদের চঞ্চুর রঙ কালো বা গাঢ় ধূসর। পায়ের রংও উজ্জ্বল লাল। অন্যান্য ঘুঘুদের মতো এদেরও স্ত্রী-পুরুষ একই রকম দেখতে।
আরও পড়ুন:

সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১০১: ছিট ঘুঘু

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১১৭: আপাতত পরিত্রাণ

কণ্ঠী ঘুঘুদের চাল খেতে বহুবার দেখেছি নিজের চোখে। তাছাড়া কখনও কখনও ডাল খেতেও দেখেছি। তবে এরা অন্যান্য দানাশস্য যেমন গম, ভুট্টা, জোয়ার ইত্যাদি; বিভিন্ন ডাল, সূর্যমুখীর বীজ এমনকি ঘাসের বীজও খেয়ে থাকে। ছোট ছোট ফল যেমন ডুমুর, বটফল ইত্যাদি এদের খেতে দেখা যায়। সময় বিশেষে ছোটখাটো পোকামাকড় খেতেও এরা অরাজি হয় না। তবে যেহেতু এরা মানুষের চাষ করা শস্য খেতে বেশি পছন্দ করে তাই মনুষ্য বসতির সংলগ্ন এলাকাতেই এদের বেশি দেখা যায়। যদিও সুন্দরবন অঞ্চলের অরণ্য সমৃদ্ধ এলাকাতেও কণ্ঠী ঘুঘু দেখা গিয়েছে। ছোটবেলায় আমি এদের যখনই দেখেছি তখন এদের অল্প সংখ্যায় দেখেছি। তবে জানা গিয়েছে এরা সাধারণত ঝাঁক বেঁধে ওড়ে। সেক্ষেত্রে এক একটা ঝাঁকে ১০ থেকে ৫০টি কণ্ঠী ঘুঘু থাকতে পারে। এরা পরিযায়ী প্রকৃতির পাখি না হলেও প্রজনন ঋতুতে বিচরণ এলাকা পরিত্যাগ করে।
আরও পড়ুন:

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১১৭: রবীন্দ্রনাথ ব্যারিস্টার হতে চেয়েছিলেন

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-৯৯: সারদা মায়ের রোগ নিরাময়ের প্রচেষ্টা

কণ্ঠী ঘুঘুদের নামে কিন্তু বদনামের কথাও শোনা যায়। ১৯৭৪ সালের নাকি বাহামার রাজধানী নাসাউ থেকে পঞ্চাশটির কিছু কম কন্ঠী ঘুঘু কোনওভাবে বন্ধনমুক্ত হয়ে ফ্লোরিডাতে ছড়িয়ে পড়ে। আর তারপর তারা বংশবিস্তার করতে করতে বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও মেক্সিকোর সমস্ত জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছে। ফলে এইসব দেশে কণ্ঠী ঘুঘু বহিরাগত প্রজাতির তকমা পেয়েছে। প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্রের পক্ষে যে কোনও বহিরাগত প্রজাতি বিপজ্জনক।
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৭৯: সময় বুঝে প্রত্যাঘাতের জন্য রাজনীতিতে অনেক সময় পিছিয়েও দাঁড়াতে হয়

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১১৫: অগ্নির কি শুধুই দহনজ্বলা? মহর্ষি মন্দপালের অগ্নিস্তুতিতে অগ্নির কোন সদর্থকতার ইঙ্গিত?

কণ্ঠী ঘুঘুদের প্রজনন সারা বছর ধরে হলেও সব থেকে বেশি হয় বসন্ত ও গ্রীষ্মে। এই সময় এরা গাছের ডালে কিংবা ছাদের কড়িকাঠে কিংবা বাড়ির কার্নিশে শুকনো কাঠি ও ঘাস দিয়ে বাসা বানায়। বাসায় তেমন শৈল্পিক বিশেষত্ব নেই। সাধারণ চ্যাটালো প্রকৃতির বাসা। স্ত্রী পুরুষ উভয়ে মিলে বাসা বানায়। বাসা বানানো শেষ হলে স্ত্রী কন্ঠী ঘুঘু সাধারণত দুটো সাদা রঙের ডিম পাড়ে। দিনের বেলায় পুরুষ ঘুঘু ও রাতে স্ত্রী ঘুঘু ডিমে তা দেয়। ১৪ থেকে ১৮ দিন তা দেওয়ার পর ডিম ফুটে বাচ্চারা বেরিয়ে আসে। ১৫ থেকে ১৯ দিন পর বাচ্চারা উড়তে শেখে। বাচ্চাদের লালন-পালনের দায়িত্ব বাবা ও মা ঘুঘু সমানভাবে পালন করে।
আরও পড়ুন:

গীতা: সম্ভবামি যুগে যুগে, পর্ব-২৩: বন্ধু হে আমার…

রহস্য রোমাঞ্চের আলাস্কা, পর্ব-৫৮: হেলিকপ্টারে সওয়ার হয়ে চূড়ার কাছাকাছি গিয়ে পাহাড় দেখার রোমাঞ্চটাই আলাদা

এক বছরে সাধারণত তিন-চারবার স্ত্রী ঘুঘু ডিম পাড়ে। সময় বিশেষে এর চেয়ে বেশিবারও ডিম পাড়তে পারে। স্ত্রী কণ্ঠী ঘুঘুর সঙ্গে মিলনে ইচ্ছুক পুরুষ কণ্ঠী ঘুঘু অন্যান্য ঘুঘুদের মতোই তার বিচিত্র ভঙ্গিমা প্রদর্শন করে। সে তার বসে থাকা অবস্থান থেকে দ্রুত ও সশব্দ ডানার সঞ্চালনের মাধ্যমে সোজা ওপরের দিকে অনেকটা উঠে যায়। তারপর ডানা ঝাপটানো বন্ধ করে দুটো ডানাকে দেহ থেকে কিছুটা নিচের দিকে ঝুলিয়ে দিয়ে চক্রাকারে ঘুরতে ঘুরতে নিচের দিকে নেমে এসে যেখানে বসেছিল সেখানে ফিরে আসে। আবার মাঝে মাঝে স্ত্রী কণ্ঠী ঘুঘুর থেকে সামান্য দূরে বসে গলা ও পেট ফুলিয়ে কুক ক্রুক কুউউউ… কুক ক্রুক কুউউউ… করে ডাকতে থাকে এবং মাথাটাকে উপর-নিচে দোলাতে থাকে। ছিট ঘুঘুর সঙ্গে এদের এই আচরণের বেশ মিল রয়েছে।

(বাঁদিকে) অপরিণত কণ্ঠী ঘুঘু। (ডান দিকে) কণ্ঠী ঘুঘু। ছবি: সংগৃহীত।

বেশ কয়েক দশক ধরে কিন্তু ছিট ঘুঘুদের নিয়মিত দেখতে পেলেও কণ্ঠী ঘুঘু একটাও দেখিনি। সুন্দরবন থেকে এরা যে বিলুপ্ত হয়ে যায়নি তা নিশ্চিত কারণ সুন্দরবনের একাধিক পর্যটক অরণ্য বা অরণ্য-সন্নিহিত গ্রামে এদের দেখেছেন, ছবিও তুলেছেন। আমিও খোঁজ নিয়ে জেনেছি যে কেউ কেউ সুন্দরবনের বসতি এলাকাতে এখনও মাঝে মাঝে কণ্ঠী ঘুঘু দেখতে পান। তবে আজ থেকে চার-পাঁচ দশক আগে যে পরিমাণ কণ্ঠী ঘুঘু দেখা যেত তা অনেকটাই হ্রাস পেয়েছে। মনে হয় কৃষিতে রাসায়নিক কীটনাশকের বহুল ব্যবহার ওদের খাদ্যশস্যকে বিষিয়ে তুলেছে এবং তার ফলে ওরা প্রজনন ক্ষমতা হারাচ্ছে, মারাও যাচ্ছে। আবার খাদ্যাভাব ও বাসস্থানের অভাব ওদের আর একটা বড় সমস্যা। এজন্য বড় বড় বৃক্ষগুলিকে রক্ষা করতে হবে। সর্বোপরি সুন্দরবনের বসতি এলাকার স্বাভাবিক বাস্তুতন্ত্রকে রক্ষা করতে হবে। আর তা যদি না পারি তবে শেষ কণ্ঠী ঘুঘুকে দেখে কবি জীবনানন্দ দাশের “মাঠের সবুজ ঘাস” কবিতার কয়েকটি লাইন আক্ষেপের সাথে উচ্চারণ করতে হবে—
“ঘুঘুর পাখার গন্ধে ভ’রে আছে দুপুরের বাতাসের পথ
শান্ত রূপবতীদের মত এক বুকভাঙা স্বপ্নের জগত
তাহাদের,”
— জীবনানন্দ দাশ

—চলবে।
* সৌম্যকান্তি জানা। সুন্দরবনের ভূমিপুত্র। নিবাস কাকদ্বীপ, দক্ষিণ ২৪ পরগনা। পেশা শিক্ষকতা। নেশা লেখালেখি ও সংস্কৃতি চর্চা। জনবিজ্ঞান আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত। বিজ্ঞান জনপ্রিয়করণের জন্য ‘দ্য সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশন অফ বেঙ্গল ২০১৬ সালে ‘আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু মেমোরিয়াল অ্যাওয়ার্ড’ এবং শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞান লেখক হিসেবে বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদ ২০১৭ সালে ‘অমলেশচন্দ্র তালুকদার স্মৃতি সম্মান’ প্রদান করে সম্মানিত করেছে।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content