প্রায় চার দশক আগে ত্রিপুরার বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক মহেন্দ্র দেববর্মা লিখেছিলেন, “এ নিয়ে রাজদরবারে কথা উঠে। কোনও রাজকন্যা বা ক্ষত্রিয় বংশের রাজ আত্মীয়াকে বিয়ে না করে তিনি সাধারণ ‘ধর’ পরিবারের কন্যার পানিগ্ৰহণ করাতে নাকি ত্রিপুরার রাজবংশের মর্যাদা হানি হয়েছে।…” আগরতলার সঙ্গে কুমার শচীন দেববর্মণের সম্পর্ক ছিন্ন হওয়ার এটিও একটি কারণ বলে তিনি উল্লেখ করেছেন।
কুমিল্লাতেই কুমার শচীন দেববর্মণের বেড়ে ওঠা, পড়াশোনা। কিন্তু আগরতলার সঙ্গে ছিল নিবিড় সম্পর্ক। মাঝে মাঝে তিনি আগরতলায় আসতেন। রাজ্যেশ্বর মিত্র এক লেখায় জানিয়েছেন যে, তিনি শচীনকর্তাকে আগরতলাতে সাধারণের ব্যবহৃত পথেঘাটে হেঁটে বেড়াতে দেখেছেন। রাস্তার লোকজন কর্তার জন্য সসম্ভ্রমে সরে দাঁড়ালেও তিনি কিন্তু কারও দিকে অবহেলার দৃষ্টিতে তাকাননি।
আগরতলায় ফুটবল মাঠে রেফারিও থাকতেন তিনি। সঙ্গীত চর্চায় বিরতি ছিল না এখানেও। রাজপরিবারের কারও কারও বাড়িতে সাহেব আলি নামে এক জন লোকশিল্পী গান শোনাতে আসতেন। শচীন কর্তা গভীর আগ্রহে তাঁর গান শুনতেন। কিছু কিছু লিখেও রাখতেন। কলকাতা অবস্থান কালেও শচীন কর্তার সঙ্গে আগরতলার যোগাযোগ একেবারে ছিন্ন হয়নি।
রাজপরিবারের অপর এক সদস্য পূর্ণেন্দু কিশোর দেববর্মণ প্রায় দুই দশক আগে আমায় বলেছিলেন, একবার অসুস্থ অবস্থায় কাকি মীরা দেবীকে দেখতে গিয়েছিলেন কলকাতায়। তখন রাহুলকে সঙ্গে নিয়ে তিনি ত্রিপুরায় আসার কথা বলেছিলেন। বলেছিলেন অনেক ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে। সেসবের অবসান প্রয়োজন। কাকির সেই কথায় খুবই আন্তরিকতা ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁর আর ত্রিপুরায় আসা হয়নি।
অভিমান করে নয়, সুরের সাধনাই তাঁকে প্রথমে কলকাতা এবং পরে মুম্বই নিয়ে গিয়েছিল। পিতা পড়ার জন্য নিয়ে গেলেন কলকাতা। সেখানেও সঙ্গীত সাধনা। খোলে গেল এক বিপুল সম্ভাবনার দিগন্ত।বাংলার মন জয়ের পর আকৃষ্ট হল মুম্বই। আরব সাগরের তীরে জীবনের শেষ অধ্যায়ে সাফল্যর শীর্ষে তিনি। ত্রিপুরার রাজপরিবারের কুমার শচীন হয়ে উঠলেন দেশের এসডি বর্মণ।
মান অভিমান যাই থাক জীবনের অন্তিম পর্বেও যে হৃদয়ে ত্রিপুরাই ছিল তাই যেন তাঁর লেখাতেও ধরা পড়েছে। জীবন কথায় তিনি লিখেছেন—”…ত্রিপুরার ধানের ক্ষেতে চাষিরা গান গাইতে গাইতে চাষ করে, নদীর জলে মাঝিরা গানের টান না দিয়ে নৌকা চালাতে জানে না,জেলেরা গান গেয়ে মাছ ধরে, তাঁতিরা তাঁত বুনতে বুনতে আর মজুররা পরিশ্রম করতে করতে গান গায়। সেখানকার লোকদের গানের গলা ভগবৎ-প্রদত্ত। আমি সেই ত্রিপুরার মাটির মানুষ-তাই বোধহয় আমার জীবনটাও শুধু গান গেয়ে কেটে গেল। সঙ্গীত আমার ‘ফার্স্ট লাভ’।…”—চলবে।
* ত্রিপুরা তথা উত্তর পূর্বাঞ্চলের বাংলা ভাষার পাঠকদের কাছে পান্নালাল রায় এক সুপরিচিত নাম। ১৯৫৪ সালে ত্রিপুরার কৈলাসহরে জন্ম। প্রায় চার দশক যাবত তিনি নিয়মিত লেখালেখি করছেন। আগরতলা ও কলকাতার বিভিন্ন প্রকাশনা থেকে ইতিমধ্যে তার ৪০টিরও বেশি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। ত্রিপুরা-সহ উত্তর পূর্বাঞ্চলের ইতিহাস ভিত্তিক তার বিভিন্ন গ্রন্থ মননশীল পাঠকদের সপ্রশংস দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। দেশের বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়ও সে-সব উচ্চ প্রশংসিত হয়েছে। রাজন্য ত্রিপুরার ইতিহাস, রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে ত্রিপুরার রাজ পরিবারের সম্পর্ক, লোকসংস্কৃতি বিষয়ক রচনা, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা সঞ্জাত ব্যতিক্রমী রচনা আবার কখনও স্থানীয় রাজনৈতিক ইতিহাস ইত্যাদি তাঁর গ্রন্থ সমূহের বিষয়বস্তু। সহজ সরল গদ্যে জটিল বিষয়ের উপস্থাপনই তাঁর কলমের বৈশিষ্ট্য।
গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম
‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com